সোনার মেয়ে তিন জলকন্যার স্বপ্নের গল্প

তিন জলকন্যা মানিকগঞ্জের আবেদা আক্তার, কিশোরগঞ্জের ঈশা মণি ও কুষ্টিয়ার সবুরা খাতুন। সাঁতারে স্বর্ণজয় করে নিজ নিজ এলাকার গর্বিত কৃতী সন্তান হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সেই সঙ্গে দেশকে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বিশ্বজয়ের।

  যুগান্তর ডেস্ক    ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাবা-মায়ের দুঃখ ঘোচাতে চান মানিকগঞ্জের আবেদা

মতিউর রহমান

মানিকগঞ্জ জেলার পদ্মা নদী পাড়ের হরিরামপুর উপজেলার বিজয়নগর গ্রামের আবেদা আক্তার। যুব গেমসে ঢাকা বিভাগের খেলায় ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল ও ব্যাক স্টোকে স্বর্ণ জিতে রীতিমতো সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। স্বর্ণ জলকন্যা হিসেবে আবেদা আক্তারকে এখন মানিকগঞ্জের সবাই এক নামে চেনেন। মেয়ের সফলতায় অভাব আর দৈন্যতা এখন আর পীড়া দেয় না সিএনজি চালক বাবা শেখ আকবরকে।

ঋতু, সেতু, আবেদা আর ছেলে আলিফ ইসলাম নুর আর স্ত্রী রিনা বেগমকে নিয়েই সিএনজি চালক আকবর শেখের সংসার। তিন মেয়ে আর এক ছেলের মধ্যে আবেদা তৃতীয়। ২০১০-১১ সালে প্রথমে স্থানীয় গোপীনাথপুর ভাটিপাড়া হাই স্কুলের হয়ে বঙ্গমাতা গোল্ড কাপ খেলে মানিকগঞ্জে চ্যাম্পিয়ন হয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন আবেদা।

সাঁতারে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে আবেদা আক্তার জানান, বাবার একান্ত আগ্রহ আর অনুপ্রেরণায় ২০১২ সালে ভর্তি হন বিকেএফসিতে, জুডোতে। বিকেএফসির কোচ সাঈদের পরামর্শে জুডোতে ভর্তি হলেও পরে কোচ রনির এবং কর্তৃপক্ষ আবেদার উচ্চতা আর পারফরম্যান্স দেখে তাকে সাঁতারে ভর্তি করান। এরপর থেকেই তার প্রতি বিশেষ যত্ন নেন তৎকালীন কোচ সোলায়মান। পরবর্তীতে কোচ মোশারফ কাদের আবেদার পারফরম্যান্স দেখে সাঁতারের কলাকৌশল শেখান।

এ বছরের ৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত মিরপুর সুইমিং ফেডারেশনে অনুষ্ঠিত যুব গেমসে ঢাকা বিভাগের খেলায় ১০০ মিটার ফ্রি স্টাইল ও ব্যাক স্টোক সাঁতারে রীতিমতো সবাইকে তাক লাগিয়ে দুটি স্বর্ণপদক জিতেন। ওর মেজ বোন সেতু আক্তারও আর্চারিতে ভর্তি হয়ে বেশ সুনাম অর্জন করেছেন। আবেদার একটাই স্বপ্ন সাঁতারের ওপর স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ থেকে আরও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেয়া।

আবেদার অর্জনের ঝুলিতে ২০১২ থেকে ২০১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত কম করে হলেও ২০-২২টি পদক। এর মধ্যে স্বর্ণপদক ৫ থেকে ৬টির কম নয়। একটিতে তৃতীয় স্থান ছাড়া বাকি অর্জিত পদক দ্বিতীয় স্থানের। আবেদার বাবা শেখ আকবরের সহায়-সম্বলের মধ্যে তিন চাকার একটি পুরনো সিএনজি গাড়ি আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসেবে মাত্র ৯ শতাংশ বসতভিটা।

আবেদার ক্রীড়ানৈপুণ্য সম্পর্কে মানিকগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সুদেব কুমার সাহা বলেন, মানিকগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে বাংলাদেশ যুব গেমস-১৮ তে সাঁতারের দুটি ইভেন্টে স্বর্ণ জয় করে মানিকগঞ্জ ক্রীড়াঙ্গনকে আরও সুপরিচিত করেছে আবেদা।

মেয়ের এই সাফল্য সম্পর্কে আবেদার বাবা শেখ আকবর জানালেন, অনেক কষ্টের মধ্যে ও সফল হয়েছে। দিন-রাত হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করে সিএনজি চালিয়ে যে আয় হয় তা দিয়ে আবেদা আর সেতুর স্বপ্নকে সামনে এগিয়ে নেয়া খুব সহজ নয়।

কোচ হয়ে সেরা সাঁতারু তৈরি করতে চায় কুষ্টিয়ার জলকন্যা সবুরা

এ এম জুবায়েদ রিপন

সবুরা খাতুন। তিন ভাই তিন বোনের মাঝে সবার ছোট। বাবা রবকুল ইসলাম কৃষিকাজ করেন। অভাব-অনটনের সংসারে নুন আনতে পানতা ফুরোয়। বাড়িতে ঠিকমতো চুলা জ্বলে না। কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমলা নওদা আজিমপুর গ্রামের এই পরিবার থেকেই উঠে এসেছেন দেশের সাঁতার পুল কাঁপিয়ে অনেক রেকর্ড করা জলকন্যা সবুরা খাতুন। মাত্র সাত বছর বয়সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরের পানিতে ভেসে থাকতেন সবুরা। এমন প্রতিভা দেখে বড় ভাই রহমত আলী ও জালাল মাস্টার সবুরাকে নিয়ে যান সাঁতার প্রশিক্ষক আমিরুল ইসলামের কাছে। এ প্রশিক্ষকের হাত ধরেই ১৯৯৫ সালে সাঁতার জগতে প্রবেশ করে সবুরা খাতুন। মাত্র সাত বছর বয়সে যে মেয়েটি সাঁতারে হাতেখড়ি নিয়েছিলেন সেই সবুরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে কুড়িয়ে এনেছেন অনেক সাফল্য। উজ্জ্বল করেছেন দেশের মুখ। সাঁতারের পুলে দেশ-বিদেশের অনেক বড় ক্রীড়া আসরে দেখিয়েছেন নিজের ক্রীড়া-নৈপুণ্য। দেশসেরা জলকন্যা সবুরা অর্জন করেছেন ১৪৫টি পদক। যার মধ্যে ৭৫টি স্বর্ণপদক রয়েছে। জাতীয় জুনিয়র, সিনিয়র, ৮ম সাফ গেমস, বিশ্ব মহিলা ইসলামী গেমস, ১৯ কি.মি. দূরপাল্লা সাঁতার, কমনওয়েলথ গেমস, সাউথ এশিয়ান গেমস ও ইন্দোবাংলা গেমস সাঁতার প্রতিযোগিতা থেকে এসব পদক জয় করেন সবুরা। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত সবুরা বিয়ে করেছেন তারই এক সহকর্মী শরিফুল ইসলামকে। সাঁতারে শরিফুল ইসলামের বেশ কয়েকটি পদক রয়েছে। বর্তমানে তিনি একজন স্কুলশিক্ষক। স্বামী ও ছয় বছরের একমাত্র মেয়ে সাফিয়া ইসলাম শাইলাকে নিয়ে বেশ ভালোই আছেন। সাঁতার সম্পর্কে সবুরা বলেন, বহু কষ্ট আর অক্লান্ত পরিশ্রম করেই নিজের জায়গা তৈরি করতে হয়। পুকুরে বাঁশ, কাঠের তৈরি সুইমিং পুল নির্মাণ করে প্রশিক্ষণ করেছি। বাঁশের ঘঁষায় কতবার হাত-পা কেটেছে তার হিসেব নেই। সব কষ্ট, ব্যথা ভুলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় নিয়ে মনকে দৃঢ় করেছি। মেয়েরা সবসময়ই অবহেলিত। যে গ্রাম থেকে সাঁতারুদের জন্ম হয়, সাঁতারে যারা এত অবদান রাখছেন- সেই সাঁতারুদের প্রশিক্ষণ নিতে হয় নোংরা, দূষিত পানিযুক্ত পুকুরে। সাঁতার অনুশীলনের জন্য বিশ বছরেও এই গ্রামে আধুনিক কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। পুকুরে বাঁশের তৈরি সুইমিং পুলই সাঁতারুদের একমাত্র অবলম্বন। দেশের সাঁতারের সব গল্পই যে গ্রাম থেকে শুরু সেই গ্রামে নাকি সুইমিং পুল নির্মাণে জমির সংকট। এখানে কিসের ভবিষ্যৎ? সাঁতারকে এগিয়ে নিতে সরকারের মহাপরিকল্পনা দরকার। ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে কোচ হয়ে দেশসেরা সাঁতারু তৈরি করার। একদিন তারাই দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে। বড় বড় ক্রীড়া আসরে অর্জন করবে পদক। ভারতীয় দূরপাল্লার সাঁতার, নেপালে সাফ গেমস ও ইরানে সাঁতার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সবুরা ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেন।

অনেক দূর হাঁটতে চায় হাওরকন্যা ঈশা মণি

এ টি এম নিজাম

ভাটিবাংলা ক্লাবের সাঁতারের অনুশীলন করছিলেন ঈশা মণি। শৈশবেই নদী আর হাওরের পানির সঙ্গে সখ্য গড়ে ওঠে ওর। প্রথমে সহপাঠীদের সঙ্গে দলবেঁধে সাঁতার প্রতিযোগিতা করতেন। সাঁতার কেটে নদীর এপার থেকে ওপারে যাওয়া কিংবা রাজহংস দলের সঙ্গে শাপলা-শালুক বিলের উন্মুক্ত জলে এদিক-ওদিক ভেসে বেড়ানো ছিল তার খেলা। সেই ঈশা মণি জাতীয় যুব গেমসে অংশগ্রহণ করে সাঁতারে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রথম হয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও জয়ের ধারা অব্যাহত রেখে দেশের পতাকা উড়াতে চায় জলকন্যা ঈশা মণি। আর তাই লেখাপড়ার পাশাপাশি সময় কাটে তার কঠোর সাঁতার অনুশীলনে।

অনুশীলনের ফাঁকে ফাঁকে ঈশা মণি জানালো তার স্বপ্নের কথা। ঈশা মণির মতে, আমি দেশ ও দেশের বাইরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে চাই। দেশের জন্য সম্মান কুড়িয়ে আনতে চাই। আর আমার বিশ্বাস সরকার ও বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সহযোগিতা পেলে আমার স্বপ্নকে আমি বাস্তবে রূপ দিতে পারব। কিন্তু সবচেয়ে বড় বাধা এখানে কোনো সুইমিং পুল নেই। সাঁতারের প্রয়োজনীয় উপকরণ নেই। সরকার নিকলী সাঁতারুপল্লীতে একটি আন্তর্জাতিক মানের সুইমিং পুল প্রতিষ্ঠা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ করলে আমরা আমাদের সেরাটা দিতে পারতাম।

কিশোরগঞ্জের হাওর উপজেলা নিকলী সদরের নিকলী গ্রামের ঘোড়াউত্রা নদীপাড়ের নগরপাড়ার খেয়াঘাটের মাঝি দরিদ্র সোনামদ্দিন ও মাজেদা বেগমের দ্বিতীয় সন্তান ঈশা মণি। নিকলী মডেল জিসি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী ও।

সাঁতারের সঙ্গে কিভাবে যুক্ত হলেন এ প্রসঙ্গে ঈশা মণি বলেন, নগরপাড়া গ্রামের খেয়াঘাটের মাঝি আমার বাবা সোনামদ্দিন। সাঁতারের প্রতি আগ্রহ দেখে বাবা আমাকে ভাটিবাংলা সুইমিং ক্লাবে ভর্তি করান। সাঁতারে আমার নৈপুণ্যতা দেখে ক্লাব কর্মকর্তারাও আমার প্রতি বিশেষ যতœ নেন।

এ প্রসঙ্গে ভাটিবাংলা সুইমিং ক্লাবের কোচ আবদুল জলিল জানান, জাতীয় যুব গেমসে অংশ নিয়ে ৭টি ইভেন্টের মধ্যে নিকলী সাঁতারপল্লীর ৪ সাঁতারু স্বর্ণ ও ৩ সাঁতারু রৌপ্য পদক লাভ করার গৌরব অর্জন করেছে। তাদের মধ্যে ঈশা মণি অন্যতম। ঈশা মণি ভবিষ্যতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের জন্য গৌরব বয়ে আনবে।

ঈশা মণির মা মাজেদা বেগম মেয়ের এই সাফল্য সম্পর্কে বলেন, সাঁতার খুবই পরিশ্রমের কাজ। কিন্তু অভাবের কারণে ঈশা মণিকে উপযুক্ত পুষ্টিসম্মত খাবার দিতে পারি না। পারি না সাঁতারের পোশাক কিনে দিতে। দৃঢ় মনোবল আর অধ্যবসায় সব বাধা পেরিয়ে ওকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

pran
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

mans-world

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.