অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরীরা

  রীতা ভৌমিক ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১নং ক্যাম্পের আওতাধীন তেলিপাড়া খালের পাড়ের রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্প। বেলা এগারটা হয়ে গেছে। তখনও সকালের খাবার খাওয়া হয়নি এই ক্যাম্পের শিশুদের। ৬ হাত বাই ৬ হাতের একটি পলিথিনের তাঁবু। এর পাশে খোলা আকাশের নিচে সাত বছরের ইয়াসিন আরাফাত মায়ের কাছে ভাত খাওয়ার জন্য কান্না করছিল। মা ওদের দুই ভাইকে একই থালায় ডাল দিয়ে ভাত দেয়। ওদের চোখ-মুখ দেখে মনে হচ্ছিল এই খাবার দেখে ওরা খুশি না। ক্ষুধা নিবারণের জন্য ওরা খাচ্ছে।

ইয়াসিন আরাফাত বাবা-মা, ভাই-বোনদের সঙ্গে থাকত মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু হাইচুরাতা গ্রামে। সাত মাস আগে মিয়ানমারের সেনারা রাতের অন্ধকারে ওদের গ্রামে ঢুকে গোলা-গুলি শুরু করে। ভয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে তিন ভাই পাশের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। ওরা ওই বাড়ির ঘরেই লুকিয়ে ছিল। ক্ষুধায় টিকতে না পেরে মায়ের কাছে বায়না ধরে খাবার দেয়ার জন্য। কিন্তু ওর মা কোথা থেকে খাবার দিবেন। এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছেন। ছেলেদের ক্ষুধার কষ্ট দেখতে না পেরে শেষমেষ বাবা খাবার কিনতে বেরিয়েছিলেন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ছোঁড়া গুলিতে সেখানেই শহীদ হন ওর বাবা আবদুল হামিদ। বাবার মৃত্যু খবর লোক মুখে জানতে পারে ওরা। লাশ খোঁজার সুযোগও পায়নি। প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। মায়ের সঙ্গে ওরা তিন ভাইও ( নয়, সাত ও পাঁচ বছর) জীবন বাঁচাতে ওই বাড়িতে আশ্রয় নেয়া লোকদের সঙ্গে হাঁটতে থাকে। বন, জঙ্গল পেরিয়ে মিয়ানমারের নাইক্ষাংদিয়া সীমান্তে হেঁটে আসতে তাদের সময় লাগে পাঁচ দিন। পথে আতঙ্কের মধ্যে দিন পেরিয়ে রাত আসে। রাত পেরিয়ে দিন। এভাবেই ওরা সীমান্তের দিকে এগিয়েছেন। এই কয়দিন পানি ছাড়া কোনো খাবারই জোটেনি ওদের ভাগ্যে।

এ প্রসঙ্গে ইয়াসিন আরাফাতের মা দিলদার বেগম (২৫) বলেন, সুখের সংসার ছিল। স্বামী সাগরে মাছ ধরত। মাছ বিক্রি করে যা আয় হতো তা দিয়ে দিন ভালোই চলত। ছেলেদের শখ-আহলাদ পূরণ করতে তো পারতাম। এখন মা হয়ে সন্তানদের অভুক্ত মুখ দেখতে হচ্ছে। আমার কাছে টাকা-পয়সা নাই। মানবতার কারণেই দুই পরিবার মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকায় আমাদের অসহায় চারজনকে আশ্রয় দেয়। দুই পরিবারের সদস্যসহ আমরা মিলে বারো জন নাফ নদী পার হইতে এক লাখ বিশ হাজার টাকা লাগে। দুই পরিবার আমাদের নৌকা ভাড়া দেয়। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি রাতে। সেখান থেকে সকালে একটা গাড়ি ভাড়া করে ওদের সঙ্গে কক্সবাজারের উখিয়ার এই ক্যাম্পে আশ্রয় নেই। এখানে আসার পথে রাস্তায় মানুষ সামান্য খাবার দেয়। তাই ভাগাভাগি কইর‌্যা সবাই খাই। স্বামী নাই ছেলেদের মুখে ডাল-ভাত জুটাইতে নিজেই দুই মাইল হাঁইট্যা বালুখালী ৩নং ত্রাণ কেন্দ্রে যাই ত্রাণ আনতে। দুই মাইল হাঁইট্যা এই বোঝা টাইন্যা আনতে খুব কষ্ট হয়। এর চেয়েও বেশি কষ্ট হয় বাচ্চাগো মুখে এই সাত মাসে এক টুকরা মাছ, গোশত, ডিম, সবজি তুইল্যা দিতে পারি নাই। শুধু ডাল-ভাত ওরা খাইতে চায় না।

একটি থালায় ভাতের পাশে এক টুকরো মুলা। মুলার তরকারির ঝোল দিয়ে ভাত মাখিয়ে খোলা আকাশের নিচে মাটিতে বসে খাচ্ছিল তিন বছরের এক শিশু। মুলার দিকে তাকিয়ে সে মাছ ভেবে ঝোল দিয়ে ভাত খাচ্ছে। ডাল-ভাত ছাড়া কোনো কিছুই জোটে না তাদের। মা অনেক কষ্টে ওই মুলা জোগাড় করে তরকারি রান্না করেছে। মুলার তরকারি পেয়ে সে খুব খুশি। মাছ- গোশত-ডিম না খাওয়ার কষ্ট ভুলে গেছে। সাত মাস পর মা ডালের বদলে এক টুকরা মুলার তরকারি দিয়ে ভাত দিয়েছে ওকে। কিশোরীদেরও একই অবস্থা। একজন শিশু বা কিশোরী চাহিদা অনুযায়ী খাবার খেতে পাচ্ছে না। প্রতিদিন ডাল-ভাত খেতে খেতে ডায়রিয়ার শিকার হচ্ছে ওরা। এর ফলে ওরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজারের কুতুপালং, নয়াপাড়া শিবির ও নতুন গড়া অস্থায়ী শিবিরগুলোতে অক্টোবর ও নভেম্বরে পুষ্টি জরিপ চালানো হয়। তাতে দেখা যায়, সেখানকার ৫০ শতাংশ শিশু রক্তশূন্যতায় (অ্যানিমিয়া) ভুগছে। কুতুপালংয়ে ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ শিশু বৈশ্বিক অপুষ্টির শিকার। এ ছাড়া ডায়রিয়া, খর্বাকৃতি সমস্যাও শিশুদের আছে।

২২ অক্টোবর থেকে ২৭ নভেম্বর ইউনিসেফ রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও অস্থায়ী শিবিরগুলোতে তিন ধরনের স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির ওপর জরিপ পরিচালনা করে। পাঁচ বছরের নিচে ২৫ শতাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। ১৫ শতাংশ শিশু রক্তশূন্যতা, ৪০ শতাংশ ডায়রিয়া এবং ৬০ শতাংশ শিশু সংক্রমণে ভুগছে।

এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার বলেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আগত শরণার্থী শিশুরা তাদের বাড়িঘর ছেড়ে এসে বিষণ্ণতায় ভুগছে। এখন তারা বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। কুতুপালং, নয়াপাড়া, উখিয়া এবং টেকনাফে ১ হাজার ৭০০ নতুন শরণার্থী শিশু এসেছে। তাদের মধ্যে কুতুপালংয়ে এক চর্তুথাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার। এর অর্ধেক রক্তশূন্যতা, ৪০ শতাংশ ডায়রিয়া এবং এর অর্ধেকেরও বেশি সংক্রমণে ভুগছে। নয়াপাড়া ক্যাম্পে ১৬ শতাংশ অপুষ্টির শিকার, ৫০ শতাংশ রক্তশূন্যতা, ৪০ শতাংশ ডায়রিয়া এবং এক দ্বিতীয়াংশ সংক্রমণে ভুগছে। অস্থায়ী শিবিরগুলোতে এক পঞ্চমাংশ শিশু অপুষ্টির শিকার, এক দ্বিতীয়াংশ রক্তশূন্যতা, দুই পঞ্চমাংশ ডায়রিয়া এবং তিন পঞ্চমাংশ সংক্রমণে ভুগছে। এছাড়া কুতুপালং শরণার্থী ক্যাম্প এবং অস্থায়ী শিবির এবং নতুন আগত রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুর অপুষ্টির হারের মধ্যে সর্বোচ্চ অপুষ্টির হার ৭.৫ শতাংশ কুতুপালংয়ে। অস্থায়ী শিবিরগুলোতে ৩ শতাংশ এবং নয়াপাড়া শরণার্থী ক্যাম্পে এক তৃতীয়াংশ শিশু অপুষ্টির শিকার।

চার বছরের নূরনাহার। নিজের পলিথিনের তাঁবুর পাশে সকালের খাবার খাচ্ছিল সকাল সাড়ে এগারটার দিকে। মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু হাইচুরাতা গ্রামে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীরা আক্রমণ চালালে বাবা-মায়ের সাথে ওরা চার ভ্ইা-বোন ধান ক্ষেতের ভেতর দিয়ে পালিয়ে আসছিল । এটি মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দৃষ্টি এড়ায় না। তারা ওদের লক্ষ্য করে গুলি চালাতে থাকে। মিয়ানমার সেনাদের গুলিতে শহীদ হয় ওর মেজ ভাই। ওর বাবা ছেলের লাশ আনার চেষ্টা করতেই মিয়ানমারের সেনারা ওদের ধাওয়া করে। ওরা দূর থেকে দেখতে পায় মিয়ানমারের সেনারা ওর মেজ ভাই আবদুল হাইয়ের লাশ টেনে নিয়ে একটা কূপে ফেলে দেয়।

এ প্রসঙ্গে নূরনাহারের মা লাইজু (৩৭) জানান, আমার স্বামী মিয়ানমারের সাগরে মাছ ধরত। মাঝে মাঝে গ্রামে মাছ বিক্রি করত। চার ছেলেমেয়ে নিয়ে আমাদের সুখের সংসার ছিল। বড় ছেলের বয়স চৌদ্দ, মেজ ছেলের দশ, সেজ ছেলের আট আর সবার ছোট মেয়ের বয়স চার বছর। সেই সুখের সংসার মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তছনছ করে দেয়। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গ্রামে আক্রমণ করলে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় স্বামী চার সন্তানসহ বাড়ি থেকে পালিয়ে আসেন। পথে সেজ ছেলেকে হারান। সন্তান হারানোর যন্ত্রণা বুকে নিয়ে স্বামীসহ অন্য সন্তানদের জীবন বাঁচাতে পাড়ি দেন অজানার পথে। পাঁচদিন জীবন বাজি রেখে পথে পথে ঘুরেন। না খেয়ে সন্তানদের নিয়ে কিভাবে বেঁচে আছেন তা শুধু আল্লাহই জানেন। দুই পরিবার মাছ ধরার ডিঙ্গি নৌকায় আসছিল। তাদের সঙ্গে মিলে তারা চার জন দেন দশ লাখ টাকা। টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন রাতে। এখানে এলে মানুষ খাবার দিলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন। একটু খাবারের জন্য রাস্তায় রাস্তায় দৌঁড়িয়েছেন। এখনও ডাল-ভাত ছাড়া কিছুই খেতে দিতে পারেন না ছেলেমেয়েদের। সাত মাস ধরে এক টুকরা গোশত চোখেও দেখে নাই ছেলেমেয়েরা। একটা টিউবওয়েলের পানি ১০/২০ পরিবার ব্যবহার করেন। সবসময় পানি উঠে না। যখন উঠে পানিতে আয়রণ বেশি। খাওয়া যায় না।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক খুরশীদ জাহান বলেন, রোহিঙ্গা শিশুরা ডাল-ভাত ছাড়া আর কোনো খাবার খেতে পায় না। এই চাল থেকে শিশু ক্যালরি অন্যান্য উপাদান ও ডাল থেকে উদ্ভিজ আমিষ পাচ্ছে। এক্ষেত্রে বলা যেতে পারে, এসব শিশুরা ডাল-ভাত খাচ্ছে সেই খাবারের পরিমাণ কতটুকু। তাদের জন্য যে খাবার রান্না হচ্ছে সেই খাবারে ডাল-চাল পরিমিত পরিমাণে রয়েছে কিনা? যদি পরিমিত না থাকে তখনই ওই শিশু অপুষ্টির শিকার হবে। প্রাণীজ উৎসের খাবার মাছ, মাংস, ডিম। এসব খাবারে লৌহের পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়। দুধ, শাকসবজি থেকে শিশু ক্যালসিয়াম পেয়ে থাকে। ফলে এসব খাবারের ঘাটতি হলে শিশুর রক্তশূন্যতা দেখা দেয়। রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুরা এসব খাবার থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত হচ্ছে। খাবারে পুষ্টিহীনতার পাশাপাশি আরেকটি বিষয়কেও গুরুত্ব দিতে হবে যে পরিবেশে তাদের খাবার রান্না করা হচ্ছে তা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশে হচ্ছে কিনা? খাবারটা স্বাস্থ্যসম্মত কিনা, জীবাণু মুক্ত কিনা। যে পরিবেশে এবং যে পাত্রে তাদের খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে তা স্বাস্থ্যসম্মত কিনা? যে পানি তারা পান করছে, ব্যবহার করছে তা জীবাণুমুক্ত কিনা? জীবাণুমুক্ত পানি পান না করায় তাদের পানিবাহিত রোগ ক্রিমি, ডায়রিয়া ইত্যাদি রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একজন শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য দুধ, ডিম, মাছ, মাংস, চাল, ডাল দিয়ে তৈরি খাবার পরিমিত পরিমাণে খেতে হবে। এসব শিশুকে শুধু ডাল-ভাত খাওয়ালেই হবে না। তাদের স্বাস্থ্য পুষ্টির বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter