বিশ্বকাপের খেলায় বাঁশি বাজানোর স্বপ্ন সামলার

  ওমর ফারুক রুবেল ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাগ্য আর পরিশ্রম কাকে কোথায় নিয়ে যায়, কেউই বলতে পারে না। কে জানত স্কুলে যার নেশা ছিল অ্যাথলেটিক্সে, সেই কিনা হয়ে উঠল বিশ্ব ফুটবল সংস্থা ফিফার রেফারি। বাংলাদেশের নারী ফুটবলের ইতিহাসে প্রথম দু’জন ফিফা রেফারি হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন নেত্রকোনার মেয়ে সালমা আক্তার মনি। পরিশ্রম আর ধৈর্য শক্তিতেই আজ স্বীকৃতি অর্জনের দ্বারপ্রান্তে তিনি। এখন অপেক্ষায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রেফারি হিসেবে বাঁশি বাজানোর।

প্রত্যেক দিন বিকাল হলেই নেত্রকোনা স্টেডিয়ামে বসে ক্রীড়াবিদদের মিলনমেলা। কেউ ফুটবল খেলেন, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়েন ক্রিকেট নিয়ে। অনেকে আবার অ্যাথলেটিক্স নিয়েও মেতে থাকেন। কয়েক বছর আগের কথা, নেত্রকোনা আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী সালমা আক্তার মনি। অ্যাথলেটিক্স অনুশীলন করেই নেমে পড়তেন ফুটবল নিয়ে। ফুটবলের সঙ্গে মনির পরিচয় সেই নেত্রকোনা স্টেডিয়াম থেকেই। ছোটবেলা থেকেই তার ঝোঁক ছিল অ্যাথলেটিক্সে। ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্ট, লং জাম্প ও হাই-জাম্পেই খেলতেন। এমনকি ২০১২ সালে জাতীয় জুনিয়র অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে লং জাম্পে ব্রোঞ্জও জিতেছিলেন তিনি। বহু প্রতিভার অধিকারী সালমা অ্যাথলেটিক্স এবং ফুটবলের পাশাপাশি হ্যান্ডবলও খেলতেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের হয়ে জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৬ হ্যান্ডবল চ্যাম্পিয়নশিপেও অংশ নিয়েছিলেন। তবে ফুটবলে তার গণ্ডিটা ছিল জেলা পর্যায়েই। অথচ সেই ফুটবলেই ইতিহাস গড়লেন নেত্রকোনার মেয়ে সালমা আক্তার মনি।

বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) নারী ফুটবলের কোচ জয়া চাকমা ১০ বছর ধরে আছেন রেফারি হিসেবে। বাঁশি বাজিয়েছেন ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ফুটবল ম্যাচে। সেই তুলনায় সালমা আক্তার মনি কমই ছিলেন প্রচারের আলোয়। ফিফা রেফারি হওয়ার পর নেত্রকোনার মেয়ে সালমা এখন মিডিয়ার আলোয়। বাবা মো. শহর আলী একজন ব্যবসায়ী ও মা রেখা আক্তার গৃহিণী। এক ভাই ও তিন বোনের মধ্যে সবার ছোট সালমা আক্তার মনি। নেত্রকোনা আদর্শ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ঢাকার বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকার ইডেন মহিলা কলেজে তিনি এখন স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি ফুটবল রেফারি হওয়ার জন্য অনেক অনুশীলন করেছেন। এতদিনের অনুশীলন পূর্ণতা পেল চলতি বছরের ২৩ আগস্ট। দিনটি তার জন্য স্মরণীয়। এই দিনটিতে বাংলাদেশের ফুটবল প্রথম দু’জন বাঙালি নারী ফিফা রেফারি পেল।

এ প্রসঙ্গে সালমা আক্তার মনি বলেন, সংবাদটি প্রথম জানতে পেরে কী যে আনন্দ পেয়েছি, সেটা ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। জীবনের একটা বড় লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। আনন্দে ওই রাত নির্ঘুম কেটেছে আমার। তখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

রানিং আর ফিটনসে দক্ষতা দেখে সালমাকে রেফারি হিসেবে পছন্দ করেন তারই গ্রামের একজন ফিফা রেফারি ফেরদৌস আহমেদ। একদিন মনিদের বাড়ি গিয়ে তার মায়ের কাছে ফেরদৌস প্রস্তাব দেন, তাকে রেফারিং শেখানোর। মনির মা সম্মতি দিলে শুরু হয় তার রেফারিং জগতে পথচলা।

সালমার মতে, ফেরদৌস ভাই বলতেন, আমাদের দেশে মেয়ে রেফারি খুব কম। চেষ্টা করে দেখ। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) তাদের নেত্রকোনায় সাত দিনের একটা রেফারিং কোর্স করায়। ফেরদৌস ভাইয়ের অনুপ্রেরণায় ছেলেদের সঙ্গে একমাত্র নারী হিসেবে তিনি ওই কোর্সে অংশ নেন। অবাক হলেও সত্যি, তিনি রেফারিং কোর্সের প্রথম পরীক্ষায় পাস করেন। এরপর আর তাকে পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

সালমা আরও বলেন, তখন আমাদের জেলা ক্রীড়া সংস্থার কেউ কেউ আমার কোর্সে অংশগ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, বাধা দিয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল আমার নাকি বয়স কম ছিল, রেফারিং কোর্সের জন্য। তারপরও আমি তা সম্পন্ন করেছি। ওই কোর্সের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন সাবেক রেফারি এম আর মুকুল স্যার। কোর্সে আমি তৃতীয় হয়েছিলাম।

কোর্সের প্রতিটি ধাপ পার হয়ে ২০১৬ সালে জয়া চাকমার সঙ্গে জাতীয় রেফারি হন মনি। এবার দু’জন এক সঙ্গেই হলেন ফিফা রেফারি। এক পর্যায়ে সালমা আক্তার মনি ব্যক্তিগত কারণে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে রেফারি প্রশিক্ষণ থেকে দূরে ছিলেন। চলতি বছরে তিনি আবার ফিরে আসেন। এই ফিরে আসার সবচেয়ে বেশি অবদান রয়েছে রেফারি মাহমুদ জামাল ফারুকী নাহিদের। তার অনুপ্রেরণায় তিনি আবার প্র্যাকটিস শুরু করেন। এবার দ্বিতীয়বারের মতো ফিফা রেফারি হওয়ার পরীক্ষা দেন। দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও পাস করেন। যদিও ২০১৭ সালে প্রথমবার রেফারি হওয়ার পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

তবে দু’জন একসঙ্গে রেফারি হলেও একজন হবেন রেফারি এবং অন্যজন সহকারী রেফারি। সে ক্ষেত্রে জয়ার অভিজ্ঞতা বেশি বলে রেফারি হওয়ার সম্ভাবনা তারই বেশি। আর আপাতত সহকারী রেফারির দায়িত্ব পালন করবেন সালমা। দক্ষিণ এশিয়ার ১৫টি ম্যাচে রেফারি ও সহকারী রেফারির দায়িত্ব পালন করেছেন সালমা। সেগুলো হল- বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটান।

সালমা আক্তার মনি তার স্বপ্নের কথা বলতে গিয়ে বলেন, আমার ইচ্ছা রেফারি হওয়া। এখন রেফারিজ কমিটি যেভাবে নাম পাঠাবে সেভাবেই হবে। যে দায়িত্বই পাই আমি, তাতে এলিট রেফারি হতে চাই। এ পেশাটা অনেক চ্যালেঞ্জিং। আমি চ্যালেঞ্জ নিয়েই দায়িত্ব পালন করে দেশের সুনাম অর্জন করতে চাই। জানি, এ পেশায় ভুলগুলো নিয়েই বেশি আলোচনা-সমালোচনা হয়। আমার স্বপ্ন ছিল, ভালো রেফারি হওয়ার। ফিফার রেফারি হয়ে ভালোভাবে দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই সেই পূর্ণতা আসবে। তাছাড়া অনেক লড়াই আর কঠোর অনুশীলন করে নিজের একটা স্বপ্ন সত্যি করেছি। এখন স্বপ্ন বাংলাদেশের হয়ে একদিন বিশ্বকাপে ম্যাচে বাঁশি বাজাব।

ইতিমধ্যে দক্ষিণ এশিয়ায় চারজন নারী ফিফা রেফারি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারতের দু’জন রুবাদেবী গুরুস্বামী (২০১৬) ও রঞ্জিতা দেবী (২০১৮) এবং নেপালের আসমিতা মানানধর (২০১১) ও ভুটানের রেফারি চকি ওম (২০১৭)। এছাড়া সহকারী রেফারি তালিকায় ভারতের রিওলাং ধর (২০১৮) ও উভেনা ফার্নান্দেস (২০১৪) এবং ভুটানের সহকারী রেফারি শেরিং চোয়েন (২০১৭) ও বীনা শ্রেষ্ঠার (২০১০) নাম রয়েছে। ২০২০ সাল থেকেই সালমা খান মনি ও জয়া চাকমা পরিচালনা করতে পারবেন দেশ-বিদেশে ফিফার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: jugantor.ma[email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×