যুগান্তরের সুরঞ্জনা বিভাগের আড্ডায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ঘোষণা

‘ কন্যাশিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা’

  মুশফিকুল হক মুকিত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

‘ কন্যাশিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা’
যুগান্তরের সুরঞ্জনা বিভাগের আড্ডায় দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম ও অন্যান্যরা, ছবি: যুগান্তর

যুগান্তর কনফারেন্স কক্ষে শনিবার ‘সুরঞ্জনা’ বিভাগ আয়োজিত ‘কন্যাশিশুর অধিকার ও নিরাপত্তা’ শীর্ষক সুরঞ্জনা আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন দৈনিক যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাইফুল আলম, মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের মহাপরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব বদরুন নেছা, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম, দি হাঙ্গার প্রজেক্টের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর মোহাম্মদ আসলাম, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সহ-সভাপতি ও নারী মৈত্রীর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আকতার ডলি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান অনুষদের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ ডিপার্টমেন্টের অধ্যাপক তানিয়া হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক সালমা পারভীন, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের সম্পাদক নাছিমা আক্তার জলি, দৈনিক যুগান্তরের চিফ রিপোর্টার মাসুদ করিম। সঞ্চালনায় সুরঞ্জনা সম্পাদক রীতা ভৌমিক। সহযোগিতায় জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরাম। আলোচকদের কথা তুলে ধরেছেন -

সৃজনশীলতার বিকাশের সুযোগ আছে

-বদরুন নেছা

একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যেমনটা জরুরি, তেমনি জরুরি সেই শিশু সম্পর্কে জানা। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি পরিবর্তন না হচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কোনো চেষ্টাই সফল হবে না। কন্যাশিশুর অধিকার খর্ব হয় প্রথম পরিবারেই। পরিবারে অভাব অনটন দেখা দিলে সেই পরিবারের কন্যাশিশুর লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। নিরাপত্তার অভাব হলে ছেলেশিশু স্কুলে গেলেও মেয়েশিশু ঝরে পড়ছে।

কন্যাশিশুর অধিকার কিভাবে সমুন্নত রাখব কিভাবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করব তা আমাদের ঠিক করতে হবে। ২০৪১ সালের উন্নয়নের যে স্বপ্ন আমরা দেখছি সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমাদের পদক্ষেপগুলো কেমন হওয়া উচিত তা ভেবে দেখতে হবে। মানবসম্পদকে দক্ষভাবে গড়ে তুলতে হলে কন্যাশিশুকে বাদ দিয়ে এই উন্নয়ন সম্ভব নয়। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে গর্ভবতী অবস্থা থেকে নারীর শিশুপালন ও বিকাশের বিভিন্ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

একজন কিশোরীর পড়াশোনার পাশাপাশি সৃজনশীলতা বিকাশের সুযোগ রয়েছে। ১০৯ হেল্প ডেস্ক এবং জয় মোবাইল অ্যাপ যে কোনো বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা পেতে কন্যাশিশু ও নারীদের জন্য সহায়ক। সমাজের অবক্ষয় পরিবারের ভূমিকা অপরিসীম। পরিবারের একে অন্যের সঙ্গে পারস্পরিক সোহার্দ্য সুসংগঠিত করতে হবে। আমি আশা হারাহীন এক নারী। প্রতিকূলতা থাকবেই তবুও আমরা সবাই মিলে সামনে এগিয়ে যাবই। ২০৪১ সালে আমরা যে স্বপ্ন দেখছি সেই স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাব।

কন্যাশিশুকে সামনে এগিয়ে চলার দীক্ষা দিতে পারি

-সাইফুল আলম

কন্যাশিশুর অধিকার ও তার নিরাপত্তা বর্তমানের প্রেক্ষাপটে বড় একটি বিষয়। যুগান্তর মনে করে যুগান্তর একটি পত্রিকা নয়। যুগান্তরের দেশ, মাটি ও মানুষের প্রতি সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। পাঠকের কাছে তথ্য ও বস্তুনির্ভর সংবাদ পরিবেশন করাই যুগান্তরের মূল উদ্দেশ্য।

আমি মাতৃতান্ত্রিক পরিবারের সন্তান। আমার মা এখনও আমার পরিবারের প্রধান। একান্নবর্তী পরিবারে এখনও মায়ের ইচ্ছা ছাড়া কিছুই প্রাধান্য পায় না। মানুষ হয়েছি, সম্মানজনক স্থানে পৌঁছাতে পেরেছি এর কারণ হল মা। যে পরিবারে বসবাস করি সে পরিবারে আমি একমাত্র পুরুষ। আমার আজকের এই পর্যায়ে আসার পেছনে প্রথমত আমার মা, তারপর স্ত্রী ও বর্তমানে আমার দু’মেয়ের প্রতিনিয়ত সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছি।

আমার ছোট মেয়ের উদার চিন্তা-ভাবনা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। তার মতো করে বাংলাদেশের অন্যান্য মেয়েরা যদি ভাবতে পারত তাহলে তারা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, পড়াশোনার দিক থেকে নিজের সম্মান এবং মর্যাদা রাখার প্রশ্নে এগিয়ে যেতে পারত বলে মনে করি। নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, উৎসাহ থেকেই আমার অনুপ্রেরণা। আজকের কন্যাশিশুই আগামীর নারী। সেই শিশুকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে দরকার শিক্ষা, মনন, বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা এবং সাহসের সঙ্গে দাঁড়ানো। সমাজে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানো এবং হাঁটতে পারা মেয়ের সংখ্যা খুবই কম।

এই মুহূর্তে আমরা যদি আমাদের কন্যাশিশু, মেয়েকে সামনে এগিয়ে চলার দীক্ষা দিতে পারি, প্রতিবাদ করার সাহস জোগাতে পারি তাহলে নিরাপত্তাটা কিন্তু আপনা আপনি হয়ে যায়। আমরা যদি নারীবান্ধব সরকার পাই, সেই সরকার যদি রাজনৈতিক সরকার হয়, রাজনৈতিক সরকারের যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে তাহলে আমার মনে হয় আমরা অনেক এগিয়েছি। আরও অনেক এগিয়ে যাব।

আইনের নির্দেশনার ভেতরে ফাঁক রয়েছে

-আয়শা খানম

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি আমাদের অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সমাজের প্রতিস্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আমাদের ক্রমশ উন্নয়নশীল দেশ থেকে উন্নত দেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এরপরও আমাদের সমাজ কিভাবে বিকশিত হচ্ছে সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। আমাদের সমাজ দু’ভাবে বিকশিত হয়। একটি হচ্ছে সচেতনতার চেষ্টা এবং অন্যটি টেকসই উন্নয়ন।

আমাদের খুঁজে দেখতে হবে কেন সমাজে এসব সহিংসতা বিস্তার লাভ করছে? আমাদের ভাবতে হবে সমাজ ও উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ভেতরে কেন এই পশুত্বভাব তৈরি হচ্ছে? যৌক্তিকতা কোথায়? মানসিক বিকারগ্রস্ততা কেন ব্যাপকতা লাভ করছে! আমাদের তার শিকড়ে যেতে হবে। এখানে রাষ্ট্রের ভূমিকা ও সরকারের ভূমিকা জরুরি। সরকার হল জাহাজের নাবিক। তিনি কিভাবে তার তরীকে চালাবেন বা নির্দেশ দিবেন। তা নির্ভর করে নাবিকের ওপর। ধর্ষণ আইনের একটি ব্যাপার লক্ষণীয়। ধর্ষণের শিকার মেয়ের যুক্তি প্রমাণ লাগবে।

তিন বছরের বাচ্চা শিশুকে চকলেটের নাম বলে তাকে যখন ধর্ষণ করা হয় তখন প্রমাণটা কিভাবে দাখিল করবে। আইনের নির্দেশনার ভিতরে ফাঁক রয়েছে। তাই মনে করি এইদিকটাতে স্বচ্ছভাবে তুলে ধরা দরকার। বেইজিং আগামী বিশ বছরের পরিকল্পনা করছে। আমরা কোথায় আছি? দৃষ্টিভঙ্গি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, বিচারবিভাগ, সংসদ সর্বত্র আমাদের এটা নিয়ে ভাবতে হবে।

কন্যাশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশু অনিরাপদ

-মোহাম্মদ আসলাম

আমাদের সমাজব্যবস্থা ভালো হলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভালো হতো। আমাদের আইন আছে। তার বাস্তবিক প্রয়োগ নেই। বর্তমানে আমাদের দেশে মোটরবাইক চালকদের হেলমেট ব্যবহারে যে এত মনোযোগী এর কারণ হলো আইনের প্রয়োগ। কন্যাশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশু বর্তমানে অনিরাপদ। তাই আমাদের নির্বিশেষে এগিয়ে আসতে হবে আমাদের শিশুদের সুস্থ বিকাশে। আমাদের ভাবতে হবে আমাদের সন্তানের বিয়ের আগ থেকে সন্তান জন্মদানের পূর্ব পর্যন্ত তাদের কাউন্সিলিং করানো দরকার। যাতে করে আগামী শিশুরা ভালো অভিভাবক পায়। সুন্দর স্বপ্ন নিয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে

-শাহিন আকতার ডলি

কন্যাশিশু মানব সমাজের অঙ্কুর। আজকের অঙ্কুর কালকের নারী। কন্যাশিশুর স্বাস্থ্য ও প্রজননস্বাস্থ্যের দিকে নজর দেয়া দরকার। উঠান বৈঠক আমরা নিয়মিত কার্যক্রমের ভিতর পরিচালিত করছি। বর্তমানে উঠান বৈঠককে আমরা উঠান কাউন্সিলিং নামকরণ করেছি। এর মাধ্যমে প্রজননস্বাস্থ্যের পাশাপাশি নিরাপদ গর্ভধারণ করতে পারে সেদিকে তাদের যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করা হয়। নির্যাতন ও বৈষম্য আসে পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে। আমাদের সেসব জায়গায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে। পুরুষদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। আমরা যেই মঞ্চে আলোচনা করি না কেন আমাদের কন্যাশিশুদের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরতে হবে।

যৌন শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে

-তানিয়া হক

ধর্ষণের বর্তমান সংজ্ঞা পাল্টে গেছে। কন্যাশিশুর পাশাপাশি ছেলেশিশুও বিভিন্নভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে। সভ্য সমাজে আমরা বসবাস করছি। অহঙ্কারের সঙ্গে বলছি আমরা সভ্য জাতি, সভ্য মানুষ। আমাদের চারপাশে টেকসই সমস্যাকে পাশে রেখে আমরা টেকসই সমাধানের পিছনে ছুটে বেড়াচ্ছি। এক্ষেত্রে নারীবাদীরা প্রচলিত একটি সংজ্ঞা দিয়ে থাকেন ধর্ষণের প্রধান কারণ জেন্ডার বৈষম্য। প্রতিনিয়ত আমরা বিভিন্ন কারণ দেখতে পাচ্ছি ধর্ষণের। মানসিক বিকারগ্রস্তের পাশাপাশি ব্যক্তির হিংসাসহ বহুমাত্রিক কারণে এই সমস্যার উদ্ভব।

পারিবারিক বন্ধন, শিক্ষা, নৈতিকতা এখন আগের থেকে বহুলাংশে নড়বড়ে। পরিবারের মানুষ এখন খুবই ব্যস্ত। কারও কোনো সময় নেই। পারিবারিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য যে সময় দেয়া দরকার, পরিবারের জন্য যে পরিচর্যার দরকার তা এখন দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। বিশ্বায়নের যুগে আমাদের উন্নতি হলেও আমরা উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে প্রতিনিয়ত কৃত্রিম জীবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

শিশু-কিশোরদের হাতে উপন্যাস, গল্পের বই উপহার হিসেবে তুলে দেয়া হতো। সেখানে আজ বাধ্য হয়ে মোবাইল ফোন তুলে দিচ্ছেন অভিভাবকরা। সে সঙ্গে তাদের বাড়তি পাওনা ইন্টারনেট। ইন্টারনেটের ভালো দিকটা বাদ দিয়ে খারাপ দিকে ঝুঁকে পড়ছে গ্রাম কি শহরের তরুণরা। আমাদের দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারের নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই। এর ফলে তৈরি হচ্ছে সামাজিক অস্থিরতা ও বৈরিতার বীজ।

নাটক, সিনেমাতে ধর্ষণের একটা মুখরোচক চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। সেখানে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে কিন্তু সামাজিক যে অবক্ষয় বাড়ছে সেদিকে আমরা সচেতন নই। সেদিকে দৃষ্টি নেই। আমাদের দেশে ধর্ষণ হলে গবেষণার বিষয় হয় সে ধর্ষিত নারী। তার চরিত্র কেমন ছিল। অন্যান্য মেয়ে ধর্ষিত হল না সে কেন হল? যাবতীয় প্রশ্নে সেই নারী হয়ে ওঠে আক্রান্তের বিষয়। আমাদের দেশে যে আইনের পাহাড় আছে তা দক্ষিণ এশিয়ার ভিতরে অনন্য। তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। আইনের কাছে ধর্ষণের শিকার নারী যেতে ভয় পায়। এই পরিবেশ ধর্ষক তৈরি করছে।

আমাদের যে জায়গাগুলোতে জোর দেয়া দরকার তা হল গবেষণা। ধর্ষণ কোনো স্থান কাল পাত্র দেখছে না। যে কোনো বয়সের যে কেউ ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আমাদের শিকড়ে কাজ করতে হবে। সমস্যাটা কেন সমাজে প্রকটরূপ ধারণ করেছে তা বুঝতে হবে। গবেষণার নীতিমালা তৈরি করতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক দারিদ্র্যকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছি মানসিক দারিদ্র্য থেকে।

সংখ্যাগত উন্নয়ন থেকে আমাদের এখন নজর দিতে হবে গুণগত উন্নয়নের দিকে। সেই সঙ্গে জেন্ডার নির্বিশেষ সমতার অভিভাবক হতে হবে। ছেলেমেয়ে সমান চোখে দেখে তাদের পর্যাপ্ত পরিচর্যা দিতে হবে। উঠান বৈঠকের মাধ্যমে অভিভাবকদের সচেতন করতে হবে। যৌন শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। পরিবার থেকে শিক্ষা দিতে হবে ভালো স্পর্শ কি মন্দ স্পর্শ কি? রাষ্ট্র যদি সক্রিয় ভূমিকা পালন না করে সে ক্ষেত্রে এই চেষ্টা ব্যর্থ হবে।

কন্যাশিশুরও শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে

-নাসিমা আক্তার জলি

বাংলাদেশ সরকার শিশু অধিকার বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কন্যাশিশুদের প্রতি যে অনুরাগ সেজন্য তিনি ‘পিস অফ ট্রি’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। বাংলাদেশে শিশুদের সংখ্যা পাঁচ কোটি তেইশ লাখ। এক্ষেত্রে কন্যাশিশুর সংখ্যা ৪৭.৬ শতাংশ। হিসেবে দেখা যায় তা দুই কোটি ঊনপঞ্চাশ লাখের মতো। কন্যাশিশুর অধিকারের প্রশ্ন এলে আমাদের সংবিধানের দিকে তাকাতে হবে।

সংবিধানের একজন কন্যাশিশুও শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকার রয়েছে। তারপরেও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আমাদের প্রতিদিন দেখতে হচ্ছে কন্যাশিশুরা নানা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে দেখছি, প্রতিদিন নতুন মাত্রিকে সহিংসতা বাড়ছে। বিগত বছরে দেশের পনেরোটি পত্রিকার পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ৮৭ জন।

২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২০ জন। গত এক বছরে এই যৌন সহিংসতার হার বেড়েছে শতকরা ৩৭ ভাগ। ২০১৮ সালে ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৪৯৬ জন এবং ২০১৯ সালে ছয় মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৭১ জন। সে হারে শতকরা ১৫ ভাগ যৌন হয়রানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৮ সালের ছয় মাসে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৯৪ জন, ২০১৯ সালে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৩ জন।

২০১৮ সালে প্রতিবন্ধী শিশু ধর্ষণের শিকার হয় ২৮ জন এবং ২০১৯ সালে ২৭ জন। আমরা চাই আমাদের কন্যাশিশুরা নিরাপদে বেড়ে উঠুক। কিন্তু যেসব কন্যাশিশুরা প্রতিদিন মানসিক আঘাতের ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠছে। আমরা এই কন্যাশিশুদের থেকে আগামী কোন সমাজ পেতে যাচ্ছি তা নিয়ে ভাবনার সময় এখন। মনীষীরা বলেছেন, একটি সমাজব্যবস্থা কেমন জানতে হলে সে দেশের নারীরা কেমন আছে তা বিশ্লেষণ করতে হবে।

একজন গর্ভবতী নারী যদি চিন্তিত থাকে তবে তার গর্ভপাতের হার তুলনামূলকভাবে বেড়ে যায়। মানসিকভাবে আঘাতগ্রস্ত গর্ভবতী নারী কখনও সুস্থ স্বাভাবিক বাচ্চা জন্মদান করতে পারে না। ঢাকাতে পাঁচটি আদালত আছে। যেখানে নারী ও কন্যাশিশুদের নির্যাতনের সহায়তায় কাজ করে।

২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার ধর্ষণের মামলা দায়ের করা হয়। যার মধ্যে দায়েরকৃত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র তিন শতাংশ। নারীদের সুরক্ষার জন্য কিছু সুপারিশ গ্রহণ করা যেতে পারে। নারী ও শিশু সুরক্ষা আইনের ১০নং ধারার একটি মাত্র একটি লাইন দেয়া আছে। যেখানে সুস্পষ্ট কোনো কিছুর উল্লেখ নেই। বাস্তবে এর পূর্ণাঙ্গ কোনো রূপরেখা নেই। ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেক আইন থাকলেও যথাযথ তদারকি নেই।

নারী ও শিশুদের সুরক্ষার জন্য বাজেটে ১০০ কোটি বরাদ্দ থাকলেও তা খরচ করার সুযোগ হয়নি। আমাদেরকে সর্বোপরি এই দিকগুলোতে সচেতন হতে হবে। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যৌন সহিংসতায় আক্রান্ত কন্যাশিশুর বিচার হচ্ছে না। কারণ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সামাজিক লজ্জাবোধ, পারিবারিক লজ্জাবোধ, মেয়েটা অত্যন্ত ছোট, সামাজিক চাপে আক্রান্ত ব্যক্তি গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে তা সমাধান করে ফেলছে। পক্ষান্তরে, দোষী ব্যক্তি রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

প্রত্যেকটি পরিবারে ক্ষমতার অসামঞ্জস্যতা পাওয়া যায়

-সালমা পারভিন

যারা সহিংসতা করছে তারা মানসিকভাবে কতটা সুস্থ। একটা পরিবারে একজন কন্যাশিশু কতটা গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে তা ভেবে দেখতে হবে। মানসিক স্থিতিশীলতা একটা মানুষকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আমাদের প্রত্যেকটি পরিবারে ক্ষমতার অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পাওয়া যায়। এক একটা পরিবারে ক্ষমতার উৎসে থাকে বাবা কিংবা ভাই। মনোবিজ্ঞানে একটা কথা আছে, আপনি যেভাবে চিন্তা করবেন সেভাবেই আচরণ করবেন।

ছোটবেলা থেকেই আমাদের মনে গেঁথে দেয়া হয় নারী মানেই সব কিছু খাপ খাইয়ে নিবে। ক্ষমতা, চিন্তার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে। নারী মানেই দেবে! কিন্তু নারীর যে বিশ্রাম, চিকিৎসা, পুষ্টি, স্বাস্থ্যের অধিকার রয়েছে এই বোধটা পরিবার থেকে গড়ে ওঠে না। এই কন্যাশিশু ছোটবেলা থেকে আদর্শ হিসেবে বাবা-মাকে দেখছে। সে শিখছে তাকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। বাচ্চারা চোখের সামনে যা দেখে তাই শিখে। সে শিক্ষা গ্রহণ করছে পরিবার থেকে।

সমাজে কন্যাশিশু অবিশ্বাস মর্যাদাহীন নারী হিসেবে পরিণত হয়ে উঠছে। নারীদের মানসিকভাবে কখনও পরিপূর্ণ মানসিক শক্তি সামর্থ্য স্থিতিশীলতা থাকে না। নারী সর্বংসহা। এই বোধ থেকেই নারী তার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলছে। প্রতিটি স্কুলে মনোবিশেষজ্ঞ থাকতে হবে। তাহলে ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মনে গড়ে উঠবে একজন অন্য জনকে কিভাবে শ্রদ্ধা ও মর্যাদা দিতে হবে। ধর্ষণ মামলায় ভিকটিমকে মানসিকভাবে শক্তভাবে গড়ে তুলতে হবে। তাকে সেভাবে অনুপ্রেরণা শুশ্রূষা প্রদান করতে হবে। তাকে স্বাভাবিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। নিজেকে নিজের মর্যাদা বাড়িয়ে

তুলতে হবে।

কন্যাশিশু ও নারীর উন্নয়ন নিয়ে যুগান্তর সদা প্রতিশ্রুতিশীল

-মাসুদ করিম

যুগান্তর বরাবর কন্যাশিশু ও নারীর উন্নয়ন নিয়ে সর্বদা প্রতিশ্রুতিশীল। গুরুত্ব সহকারে আমরা কন্যাশিশু-নারীদের দুর্দশার চিত্র তুলে নিয়ে আসি। বর্তমানে আশংকাজনকভাবে ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা বেড়ে গেছে। তা কেন কিভাবে ঘটছে আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। তারপরেও আমরা সাফল্যের খবর জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে পারছি। আমরা চাই সমৃদ্ধশীল নারী-পুরুষের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×