ভাল মন্দ যাই আসুক সত্যরে লহ সহজে

  রোকসানা আফরোজ ২১ অক্টোবর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভাল মন্দ যাই আসুক সত্যরে লহ সহজে

ওভারিয়ান ক্যান্সারকে বলা হয় নীরব ঘাতক। ওজন বাড়া, পেটে পানি আসা, তলপেট/কোমরে ব্যথা, ডায়েরিয়া/ কোষ্ঠকাঠিন্য, ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ, কারণ ছাড়াই তীব্র ক্লান্তিবোধ এই ধরনের সমস্যা আমার হচ্ছিল, যেটা আমি খুব একটা গুরুত্ব দেইনি।

দীর্ঘদিন ধরে কাশি ও হঠাৎ একদিন ভীষণ শ্বাসকষ্ট হওয়াতে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এলো সাপ। তাই বিনীত অনুরোধ ২/৩ সপ্তাহের বেশি এসব লক্ষণগুলো থাকলে নিজ গরজে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান।

যাদের পারিবারিক ইতিহাসে ক্যান্সার আছে তারা একটু বেশি সচেতন হোন। জরিপ মতে প্রতি বছর ২২ হাজার নারী ওভারিয়ান ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন। লক্ষণগুলো খুব সাধারণ হওয়ায় একদম প্রাথমিক পর্যায়ে এই রোগ সাধারণত ধরা পড়ে না। তাই সচেতন হওয়া ভীষণ জরুরি।

আমার বড় দুটি টিউমার, পেটে পানি ও চতুর্থ পর্যায়ে ওভারিয়ান ক্যান্সার শনাক্ত হয়। খুব দ্রুত চিকিৎসা শুরু হয়। ছয় মাসে ছয়টি কেমোথেরাপি ও বড় একটা সার্জারি করে তথাকথিত ক্যান্সার জয় করলাম আমি। এই যুদ্ধে আমার হাতিয়ার ছিল প্রচণ্ড মনের জোর আর আমার পরিবারসহ প্রিয়জনদের সর্বদা আমার পাশে থাকা।

এরপর ক্যান্সার জয়ী সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল, প্রকৃত চিত্রটা আসলে এমন নয়। প্রকৃত যুদ্ধটা শুরু হয় চিকিৎসা পরবর্তী পর্যায়ে। শারীরিক, মানসিক ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা পদ্ধতিতে স্থবিরতা চলে আসে জীবনে।

রেডিয়েশনে পুড়ে যাওয়া তামাটে ত্বক, স্থূলতা, চুল, ভ্রু, চোখের পাপড়িবিহীন প্রতিবিম্বটা আয়নায় দেখে শিউরে উঠেছি বারবার। মনের সবটুকু জোর এক করে শুরু হল পথচলা। খাদ্যাভাস পরিবর্তন, শরীরচর্চা, ইয়োগা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে পরিবর্তন আনলাম জীবনযাত্রায়।

পরিচয় হল কয়েকজন ওভারিয়ান ক্যান্সার ভুক্তভোগীর সঙ্গে। এদের মধ্যে চারজনের ক্ষেত্রেই ফেরত এসেছে আবার এই ক্যান্সার অন্যরূপে। ঠিক দেড় বছরের মাথায় আমাকেও মুখোমুখি হতে হল একই পরিস্থিতিতে।

এবার লিভারে। আবার ছয় মাসে ছয়টা কষ্টকর কেমোথেরাপি। চিকিৎসাপরবর্তী পর্যায়ে দেখলাম প্রথম দফার পর যতটুকু এগিয়েছিলাম দ্বিতীয় দফার পর দেখি পিছিয়ে গেছি আরও বেশি। সাপ লুডু এই খেলায় বিষণ্ণতা হতাশা, রাগ, ক্লান্তিবোধ, শারীরিক পরিবর্তন, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, আগের জীবনে ফিরতে না পারার আতঙ্ক অস্থির করে তোলে আমাকে প্রায়ই।

আমি হতাশার কথা বলছি না- বলছি বাস্তবতা। দেখেছি ভুক্তভোগীদের হতাশা, সহযোগিতার অভাব, দাম্পত্য জীবন ভেঙে যাওয়া, পরকীয়ায় ঝুঁকেছে জীবন সঙ্গী, ইচ্ছা থাকলেও ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে নিতে পারছে না অনেকেই।

আমার পরিবার, প্রিয়জনরা যেভাবে আমাকে ঘিরে আছে তাতে নিজেকে ভাগ্যবতী বললেও কম বলা হবে। তবুও থমকে যাচ্ছে আমার পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, হোঁচট খাচ্ছে আমার শিক্ষকতা পেশায় আবার ফেরত যাওয়ার ইচ্ছা।

মনীষা কৈরালা, সোনালী বেন্দ্রে কিংবা আমাদের আলোকচিত্রী আশফিকা রহমানের মতো সেলিব্রেটিদের ক্যান্সার জয়ের গল্প পড়ে মুগ্ধ হয়েছি- তেমনি আমার পরিচিত ভুক্তভোগীদের মাঝে দেখেছি অসাধ্যকে সাধ্য করার শক্তি।

সফল ব্যবসায়ী, গৃহিণী, চাকরিজীবী হিসেবে চলছে ক্যান্সার জয়ীদের জীবন। পৃথিবী জুড়ে প্রতিনিয়ত চলছে গবেষণা, আবিষ্কার। আমাদের জন্য আশার আলো। আমি এখন ওরাল কেমো (ট্যাবলেট) শুরু করেছি।

ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় আমি ভীষণ ক্লান্ত, বিধ্বস্ত থাকি কিন্তু এবার আমি যুদ্ধ করছি না। ক্যান্সারকে জীবনের অংশ হিসেবে মেনে নিয়েছি। হতাশা কিংবা কষ্ট থেকে মন খুলে কাঁদাকে আমি দুর্বলতা মনে করি না। চোখ মুছে আবার উঠে দাঁড়ানোর শক্তি আমার আছে। সবারই থাকে, শুধু হাল না ছাড়ার মতো দৃঢ়তা রাখতে হয়।

নিজেকে দিয়ে বুঝেছি প্রথাগত ক্যান্সার চিকিৎসার সঙ্গে সঙ্গে মেডিটেশন, কাউন্সিলিং, সাইকোথেরাপিও ভীষণ জরুরি জীবনের এই বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য। এই ব্যাপারটি ঠিক গুরুত্ব পাচ্ছে না চিকিৎসার ক্ষেত্রে।

আমি জানি মনোবল ধরে রাখা কঠিন হলেও অসম্ভব না। আমি আমার কাঁধ পর্যন্ত ঝাঁকড়া চুলে মাঝে মাঝে ফুল গুঁজি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘বোঝাপড়া’ কবিতাটা আমাকে শক্তি দেয়- ‘মনেরে আজ কহ যে/ ভাল মন্দ যাই আসুক সত্যরে লহ সহজে।’

প্রতিদিনের টিকে থাকার লড়াইটা লড়তে লড়তে আমি আবার একদিন ঘুরে দাঁড়াব- এই বিশ্বাসটুকুই আমার শক্তি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×