হুইল জয়যাত্রায় তিন নারীর গল্প

জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে ‘হুইল জয়যাত্রা’ ক্যাম্পেইনের উদ্যোগে ২৪ থেকে ২৬ অক্টোবর ‘গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা’ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ৫০-এর বেশি গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা এ মেলায় অংশ নেন। হুইলের পক্ষ থেকে সফল তিন নারী পুরস্কৃত হন। প্রথম হন বাবলী আক্তার। দ্বিতীয় মনিরা পারভীন ও তৃতীয় পেয়ারা পারভীন। লিখেছেন-

  রীতা ভৌমিক ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বাবলী আক্তার

‘গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা’ মেলায় প্রথম হয়েছেন সরিষাবাড়ীর পোগল দিঘা ইউনিয়নের মালীপাড়া গ্রামের গৃহবধূ বাবলী আক্তার। পুরস্কারস্বরূপ পেয়েছেন ৫০ হাজার টাকা। পুরস্কারপ্রাপ্তির অনুভূতি বলতে গিয়ে বাবলী আক্তার বলেন, আমি ভাবতেই পারিনি পুরস্কার পাব। মাদারগঞ্জ পৌরসভা, সরিষাবাড়ী পৌরসভার নারী উদ্যোক্তারা এ মেলায় অংশ নিই। ইউনিলিভার আমাদের স্টল তৈরি করে দেয়। আমার স্টল নম্বর ৭। নকশিকাঁথা, কুশন কভার, নকশি চাদর, থ্রি-পিস দিয়ে স্টলটাকে সুন্দর করে সাজাই। ইউনাইটেড পারপাস এনজিও কোকাকোলার সঙ্গে উইমেন বিজনেস সেন্টারের নেত্রী কানিজ ফাতেমাও ছিলেন। মায়ের সঙ্গে সেলাই করতাম। সংসারের সচ্ছলতার জন্য বছরপাঁচেক আগে সেলাইয়ের কাজ শুরু করি।

সরিষাবাড়ীতে স্টার কনস্ট্রাকশন নামে একটি দোকান থেকে ১৫ থেকে ২৫টি নকশিকাঁথা, নকশি চাদর, থ্রি-পিস ইত্যাদির অর্ডার বাবলী বাড়িতেই তৈরি করেন। গ্রামের নারীদেরও তিনি এ কাজে যুক্ত করেছেন। তার কাছ থেকে তারাও দু-একটি চাদর নিয়ে বাড়িতে বসেই তাতে নকশা করেন। চাদরপ্রতি মজুরি ৩০০ টাকা। সুতা, কাপড় দোকানের। কয়েক বছর আগে এভাবেই কাজ শুরু করেন তিনি। মজুরিভিত্তিক সেলাই করার পাশাপাশি পাইকারি দরেও নকশিকাঁথা, চাদর কিনে বিক্রি করেন গ্রামের মানুষের কাছে। এতে তার সংসারে সচ্ছলতা ফিরে এসেছে।

মালীপাড়া গ্রামে বাবলী আক্তারের স্বামীর একটি ডিসপেনসারি আছে। এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে তার সুখের সংসার। ছেলে মাদ্রাসায় পড়ে। মেয়ে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী।

জামালপুরের কেন্দুয়া কালিবাড়ির মেয়ে বাবলীর বাবা ট্রাঙ্কমিস্ত্রি। এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার পরই বাবলীর বিয়ে হয়। যৌথ পরিবারে বিয়ে হওয়ায় স্বামীর একার আয়ে নয় সদস্যের সংসার চালানোই কষ্ট হয়ে পড়ে। এদিকে শাশুড়ি ক্যান্সরের রোগী। তার চিকিৎসার খরচ, লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যাওয়া হয়ে ওঠে না তার।

মনিরা পারভীন

‘গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা’ মেলায় দ্বিতীয় হয়েছেন সরিষাবাড়ীর একই ইউনিয়নের গেন্দারপাড়া গ্রামের গৃহবধূ মনিরা পারভীন। তার স্টল নম্বর ৯। নকশিকাঁথা, থ্রি-পিস, বিছানার চাদর, শাড়ি দিয়ে সাজিয়েছিলেন তার স্টল। পুরস্কারের মূল্যমান ৩০ হাজার টাকা। মেলায় অংশগ্রহণ সম্পর্কে মনিরা পারভীন জানান, একটি প্রতিযোগিতামূলক মেলা হয়েছে। মেলায় অংশগ্রহণকারীরা সবাই নারী। এখানে এর আগে পরিবার থেকে নারীদের মেলা করতে দেয়া হতো না। এ ধরনের প্রতিযোগিতামূলক মেলায় অংশ নিতে পেরে খুবই ভালো লাগছে। প্রজেক্টে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। এ ধরনের সুযোগ আগে কখনও পাইনি। তাই সুযোগটাকে হাতছাড়া করতে চাইনি।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বিয়ে হয়। বিয়ের বছরদুয়েকের মধ্যে ছেলে হয়। বাবার বাড়ি সরিষাবাড়ী উপজেলার ইগনা ইউনিয়নের রাধানগর গ্রাম। বাবা কৃষিকাজ করেন। মা গৃহিণী। দু’ভাই ও দু’বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বিয়ের পরপরই নকশিকাঁথা সেলাই করেন। এছাড়া থ্রি-পিস, নকশিকাঁথার অর্ডার পান। এক পিস নকশি কামিজ তৈরিতে ৫০০ টাকা খরচ হলে বিক্রি করেন ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা। পাইকারদের কাছ থেকে নকশিকাঁথার অর্ডার নিয়ে তৈরি করলে নকশা অনুযায়ী মজুরি পায় ৫০০ টাকা। অর্ডার বেশি থাকলে প্রতিবেশী ছাত্রী, গৃহবধূদেরও তিনি মজুরি দিয়ে কাজ করান। এক পিস কামিজের নকশার মজুরি বাবদ দেয়া হয় ২০০ টাকা।

স্বামী কৃষিকাজ করেন। এক ছেলে এক মেয়ে। ছেলে আইএ’র ছাত্র, মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। এখন তার সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। নিজে লেখাপড়ার সুযোগ না পেলেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করাতে চান।

পেয়ারা পারভীন

‘গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তা’ মেলায় তৃতীয় হয়েছেন সরিষাবাড়ীর একই ইউনিয়নের জামনজানি গ্রামের গৃহবধূ পেয়ারা পারভীন। পুরস্কার মূল্য ২০ হাজার টাকা। নকশিকাঁথা, টেবিল ক্লথ, নকশি চাদর, নকশি ব্যাগ দিয়ে সাজিয়েছেন তার স্টল। তার স্টল নম্বর ৮।

পুরস্কারপ্রাপ্তি সম্পর্কে পেয়ারা পারভীন বলেন, আমার অনেক দিনের স্বপ্ন নিজের তৈরি পণ্য নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করার। এ স্বপ্ন পূরণ করতে সহযোগিতা করেছে ‘হুইল জয়যাত্রা’। যদিও ভাবিনি পুরস্কার পাব। সব প্রাপ্তি আনন্দের। তাই পুরস্কার প্রাপ্তিতে আমিও আনন্দিত।

পেয়ারা পারভীন ২০০২ সালে এসএসসি পাস করেন। এসএসসি পাসের পরই তার বিয়ে হয়। চার বোন দু’ভাইয়ের মধ্যে তিনি তৃতীয়। কৃষক বাবার পক্ষে আটজনের সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছিল। আইএ ভর্তি হলেও বিয়ের পর কলেজে যাওয়া হয়ে ওঠে না তার। কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ থেকেই উন্মুক্তে আইএ ভর্তি হন। ২০০৪ সালে আইএ পাস করেন। গর্ভবতী হলে বিএ পড়া হয়ে ওঠে না। স্বামী কাঁচামালের ব্যবসায়ী। স্বামী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়েই তার সংসার। ছেলে এবার জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। মেয়ে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ধনবাড়ি থেকে নকশিকাঁথা অর্ডার নিয়ে নকশিকাঁথা সেলাই করেন। নিজেও করেন, অন্যদেরও এ কাজে সম্পৃক্ত করেছেন। একটি নকশিকাঁথা বাবদ মজুরি দেন ৪৫০ টাকা। নিজে করলে মজুরি পান ৫০০ টাকা। প্রতি মাসে একটা নকশিকাঁথা সেলাই করতে পারেন।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×