চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে

  সুরঞ্জনা প্রতিবেদক ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নরসিংদী সদর হাসপাতালের শয্যায় শুয়ে ভয়ে চিৎকার করে উঠছিল মেয়েটি। ঠোঁটে-মুখে-সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। চোখে ভয়। ২ নভেম্বর নরসিংদীর শিবপুরে গণধর্ষণের শিকার হয় রায়পুরা উপজেলার আদিয়াবাদের মেয়ে। মেধাবী এই মেয়েটি নরসিংদী সরকারি কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। দরিদ্র পরিবারের এই মেয়েটি টিউশনি করে এসএসসি পাস করে নরসিংদী কলেজে আইএ ভর্তি হয়। শ্রমিক বাবার একার আয়ে মেয়ের পড়ার খরচ চালানো সম্ভব হচ্ছিল না। মেয়েকে তাই লেখাপড়া না করার কথা বলেন। কিন্তু মেয়ের স্বপ্ন লেখাপড়া শিখে স্বাবলম্বী হবে। আদিয়াবাদে ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানে বান্ধবীর সঙ্গে মোবাইলে টাকা ভর্তি করতে যায়। সেখানে বান্ধবীর সঙ্গে আলোচনা করেন চাকরি পেলে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে যেতে পারতেন। বাড়ি ফেরার ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মেয়েটির কাছে একটি ফোন আসে। লোকটি ফোনে তাকে স্যামসাং কোম্পানির ম্যানেজার বলে পরিচয় দেয়। তাকে বলে, আপনি চাকরি খুঁজছেন, আপনার ছবি, চেয়ারম্যানের সনদপত্রসহ অন্যান্য কাগজপত্র নিয়ে আগামীকাল দেখা করেন। আপনার চাকরি হবে। এরপরই আবার বলে এখনই চলে আসেন। মেয়েটি তার মাকে বলে, স্যামসাং কোম্পানি থেকে ফোন করেছে। কাগজপত্র নিয়ে ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানে দিয়ে আসতে বলেছে। মা তাকে যেতে বারণ করেন।

এ প্রসঙ্গে মেয়েটি বলেন, মা যাইতে বারণ করায় লোকটি আমাকে কয় আমি তোমার বাবার মতোন। ভাবছি কাগজপত্র দোকানে দিয়া চইল্যা আসব। দোকানে গিয়া দেখি লোকটা নাই। লোকটা আমারে ফোন কইর‌্যা সামনে যাইতে বলে। সামনে আগাতেই একটা বড় গাড়ি দেখতে পাই। লোকটারে বলি এত বড় গাড়ি! লোকটা আমারে কয় কোম্পানির গাড়ি। গাড়ি দেইখ্যা মনের ভেতর সন্দেহ হইছে। আমি চাকরি করুম না। আমার আম্মারে নিয়া আসুম। আম্মার সঙ্গে যামু। আমি যাইতে না চাইলে ধাক্কা দিয়া গাড়িতে তুইল্যা মুখ চাইপ্যা ধরে। দরজা আটকাইয়া দেয়। তিনজন আরিফ, রাকিব, কাউসার সারারাইত আমার ওপর অত্যাচার করে। আমারে কষ্ট দিছে। রক্তে ভাইস্যা গেছে। তাও আমারে ছাড়ে না। আমার বুকে পারা দিয়া কইছে তুই এত সুন্দর কে? এইটাই তোর দোষ। একটা বাড়িতে নিয়া আমার চুল ধইর‌্যা গাছের মইধ্যে টুহাইছে। এক বাড়ির সামনে ফালাইয়া যায়। একটা ছেলে ওইখান দিয়া যাইতেছিল। তারে আমারে থানায় নিয়া যাইতে বলি। তিনি আমারে শিবপুর থানায় নিয়া যায়। শিবপুর থানায় মামলা করছি। টাকা দিলেও ওগো ছাইড়ও না। ওরা আমারে ছাড়ে নাই। ওর মায়ের মতে, ওর বাবায় লেখাপড়া করাইত না। মাইয়্যা চাকরি কইর‌্যা লেখাপড়া করত। না করছি। মাইয়্যা শুনে নাই। মাইয়্যা ফিরতাছে না দেইখ্যা বারবার ফোন করতাছি। মাইয়্যা ফোন ধরে না। প্রতিবেশীগো কইতে পারতাছি না। তারা আমার মাইয়ারে খারাপ ভাবব। সারা রাইত এভাবেই কাটে। সকাল এগারোটার দিকে খবর পাই। ওইখান থিক্যা নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আমার মাইয়্যারে।

মামলা প্রসঙ্গে শিবপুর থানার তদন্ত কর্মকর্তা মমিনুল ইসলাম জানান, নারী ও শিশু আইনের ৭/৯(৩)/৩০ তৎসহ পেনাল কোডের ৩৭৯/৩২৩ ধারায় মামলা রুজু হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন ভিকটিমের মা। গাড়ি নিয়ে ওষুধের ক্যানভাস করে আসামি আরিফের সঙ্গে রাকিব ও কাউসারও ছিল। তিনজনেই ওষুধের ক্যানভাস করে। তাদের মধ্যে রাকিবকে শিবপুরের সৃষ্টিগড় এলাকা থেকে ধরা হয়েছে। নরসিংদী সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা আমিরুল হক শামীম মেয়েটির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল মেয়েটির। নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। রক্তক্ষরণ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে বন্ধ করতে হয়েছে। এখন মানসিকভাবে তিনি হতাশাগ্রস্ত। তাকে এখন মনোচিকিৎসকের কাউন্সিলিংয়ের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতা দরকার।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের নরসিংদী জেলা শাখার সভাপতি আশালতা সাহা বলেন, ভিকটিম যাতে ন্যায় বিচার পায় এজন্য লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আইনি সহায়তা দেয়া হবে। আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়ে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করব। কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতে আমাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকেও উদ্যোগ নিতে হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×