কল্পনাহীন জীবন মৃতপ্রায় আত্মা : ওলগা নাওয়াজা তোকারচুক

  সাব্বিন হাসান ১৮ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বব্যাপী শুধু ‘ওলগা’ নামেই তুমুল জনপ্রিয়। পুরো নাম ওলগা নাওয়াজা তোকারচুক। জন্ম ১৯৬২ সালের ২৯ জানুয়ারি। জন্মেছেন পোল্যান্ডের জিয়েলোনা গোরার কাছাকাছি সুলেচো শহরে। মূলত পলিশড ধারার বুদ্ধিজীবী, লেখিকা ও সমাজকর্মী। সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টিকারী উপন্যাস ‘ফ্লাইটস’ বইয়ের জন্য ২০১৮ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। তার উপন্যাস ‘বাইগুনি’ ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে ‘ফ্লাইটস’ নামে মুদ্রিত হয়। এ বইয়ের জন্যই নোবেল পেয়ে যান। ২০১৯ সালে ঘোষিত ২০১৮ সালের জন্য সাহিত্যকর্মে নোবেল পান।

মানবাধিকারকর্মী, প্রগতিশীল লেখক ও নারীবাদী হিসেবে বিশ্বে সুপরিচিত। তার প্রজন্মের সমালোচক এবং সাহিত্যপ্রেমীরা ওলগা তোকারচুকের লেখার ভূয়সী প্রশংসা করেন। শুধু তাই নয়, বাণিজ্যিকভাবে সফল লেখক হিসেবেও স্বীকৃতি দেয়া হয়। ফ্লাইটস উপন্যাসের জন্য ওলগাকে ‘ম্যানবুকার’ পুরস্কার দেয়া হয়। ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোনো পলিশড লেখক হিসেবে এ পুরস্কার অর্জন করেন।

১৯৮০ সালে ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানী হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। সেখানে অধ্যয়নের সময়ে কিশোরদের আচরণগত সমস্যা নিরাময় কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে কাজ করেন।

১৯৮৫ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন। এরপর ভ্রোক্লাউ ও পরে ভালব্রিচে চলে যান। সেখানে থেরাপিস্ট হিসেবে অনুশীলন করেছেন। নিজেকে কার্ল জাঙের শিষ্য হিসেবে বিবেচনা করেন। জাঙের মনস্তত্ত্বতার সাহিত্যকর্মের প্রেরণা জুগিয়েছে বলে জানান।

১৯৯৮ সাল থেকে ওলগা নোয়া রুদদার কাছের একটি ছোট্ট গ্রামে বসবাস করছেন। নিজের ব্যক্তিগত প্রকাশনা সংস্থা রুটা ওই গ্রামে থেকেই পরিচালনা করেন। রাজনৈতিক দল দ্য গ্রিনসের সদস্য। বামপন্থী ধারণায় বিশ্বাসী। ১৯৮৯ সালে ওলগার প্রথম কবিতার সংকলন মিলাস্তা উলুস্ত্রাচ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রথম উপন্যাস পদ্রোজ লুদজি সিয়েগি প্রকাশ হয়। সপ্তদশ শতাব্দীর ফ্রান্সের পটভূমিতে রচিত বইটি দুজন প্রেমিক-প্রেমিকার একটি বইয়ের রহস্য (জীবনের অর্থের রূপক) খোঁজার ওপর ভিত্তি করে রচিত রূপক উপন্যাস। ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত হয় ‘ই. ই.’ নামে দ্বিতীয় উপন্যাস। বইটির নামকরণে কেন্দ্রীয় চরিত্র এর্না এলৎজনারের নামের প্রথম অক্ষর নেয়া হয়। যার প্রেক্ষাপট ১৯২০ দশকে এর্না বেরুাউয়ে জার্মান-পোলিয় বুর্জোয়া পরিবারে বেড়ে ওঠা এক নারীর কথা। এখানে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার বিষয় তুলে ধরা হয়।

মানুষের জীবনে নানা ধরনের সীমা অতিক্রমের গল্প আছে। আর সেটাই ওলগা তার লেখার মাধ্যমে প্রতিটি মুহূর্তে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার উপন্যাসকে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত করে বিশ্বের কাছে আরও এক ধাপ আলোড়িত করেন জেনিফার ক্রফট। যদিও উপন্যাসটি ফিকশন ধারার রচনা। এখানে জীবনতত্ত্ব, সাংস্কৃতিক নৃ-তত্ত্ব এবং স্মৃতিচারণের নিখুঁত বর্ণনা পাওয়া যায়। বাবা ছিলেন একজন গ্রন্থাগারিক। তাই শৈশব থেকেই তার বইয়ের প্রতি ঝোঁক আর অবাধ টান তৈরি হয়। ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। মনঃসমীক্ষক হিসেবেও প্রশিক্ষিত হন।

মূলত কবিতার হাত ধরে সাহিত্যজগতে পা রাখেন। ১৯৯৩ সালে প্রথম উপন্যাস ‘দ্য জার্নি অব দ্য বুক-পিপল’ প্রকাশিত হয়। সংখ্যার বিবেচনায় খুব বেশি সাহিত্যকর্ম নেই। কিন্তু যা আছে সবই মূল্যবান। সবচেয়ে আলোচিত বই ‘দ্য বুকস অব জ্যাকব’। নয়শ’ পৃষ্ঠার এক মহাকাব্যিক উপন্যাস। যার পটভূমি অষ্টাদশ শতকের পোল্যান্ড। এ লেখার মধ্য দিয়ে পুরো পোল্যান্ডকে নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করেছেন। নোবেল কমিটি ওলগাকে পোল্যান্ডের তার প্রজন্মের সবচেয়ে দূরদর্শী ও মেধাবী লেখক হিসেবে অভিহিত করেন।

বাইগুনি উপন্যাসের উপজীব্য প্রসঙ্গে বলেন, মূলত বাইগুনি একটা উপজাতির নাম। সপ্তদশ শতক থেকে একটা রুশ উপজাতি ছিল। যারা বিশ্বাস করত, অবশ্যই মানুষদের সব সময়ই চলাচলের ভেতর থাকা উচিত। কেননা থেমে গেলেই শয়তান তাদের ধরাশায়ী করবে। তাদের কাছে পরিব্রজ্যা ছিল এক ধরনের প্রার্থনা।

বাইগুনি তার কাছে সাম্প্রতিক সময়ের পরিব্রাজকদের একটি প্রতীকী চিত্রকল্প। এ উপন্যাসে তিনি এ উপজাতি ও তাদের জীবনঘনিষ্ঠ তথ্যচিত্রের নিখুঁত বর্ণনা করেছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি উপন্যাস গঠনের অন্যতম উপাদান হচ্ছে সত্যনির্ভর বিবরণ। কারণ তাছাড়া উপন্যাস অসম্পূর্ণ প্রায়। একটি উপন্যাসের প্রতিটি পরত মস্তিষ্কে কল্পনা করতে সহায়ক হয় একটি আদর্শ বিবরণ। গভীরভাবে তা-ই করেছেন। মানুষের মনে তা পৌঁছে দিতে হয়েছেন চূড়ান্ত সফল।

ওলগার ভাষ্যমতে, যেসব বইয়ে পরিপূর্ণ ও যথার্থ বিবরণ নেই সেসব বই আমাকে একেবারেই টানে না। মনুষ্য জীবন সতত সত্য যেসব বিষয়ে যেমন যে ধরনের শাসন-অনুশাসন তারা করে থাকে বা যে ধরনের কাপড় তারা পরে থাকে তার সুস্পষ্ট বর্ণনা ছাড়া কোনো লেখা পড়তে ভালো লাগে না।

দ্য বুকস অব জ্যাকব উপন্যাস অষ্টাদশ শতকের পোল্যান্ডের পটভূমি নিয়ে রচিত। জীবনের সূক্ষ্ম আর খুঁটিনাটি বিষয়ে বুঁদ হয়ে আচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসেন তিনি। হাজারও বিষয়ে মনোজগতে তৈরি হয় শত শত প্রশ্ন। অতীতে লোকেরা দেখতে কেমন ছিল বা তারা কী খেত, এটা না জেনে তিনি একটি দৃশ্যপট রচনা অসম্পূর্ণই রয়ে যায় বলে তিনি মনে করেন।

কখনই নিজস্ব চিন্তাচেতনাকে অকপটে প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। রাজনীতির প্রসঙ্গে সহাস্য বলেন, রাজনীতিবিষয়ক লেখা লিখতে বা পড়তে পছন্দ করেন না। জীবন আর প্রকৃতি নিয়েই লিখতে ভালোবাসি। জীবনে রাজনীতি আমাকে মোটেই আকৃষ্ট করতে পারেনি। মনোবিজ্ঞানী হিসেবে বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের দৃষ্টিকোণ আলাদা। তা থেকেই পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন রূপ জেনে সেভাবে বর্ণনা করতে ভালোবাসেন। চিরচেনা হলেও ভিন্ন-প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি অনুভব করার ক্ষমতা অসীম। আর তা ঠিক অবিকল লিপিবদ্ধ রাখতে চাওয়াই লেখক হিসেবে তার আগ্রহের মূল কেন্দ্রবিন্দু।

জীবনের দৃশ্যপটকে নিজের কল্পজগতে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয়া অসম্ভব বা অসাধ্য কিছু নয়। যা কিছু আনন্দদায়ক, যা কিছু সুখানুভূতি এনে দেয় তার সৃষ্টি কল্পজগতেই। তিনি যেন নিজেই তার জীবন্ত প্রমাণ। সত্য বাস্তবতা আর কল্পনার মিশ্রণে তৈরি উপন্যাস পাঠকস্পর্শী আর সুপাঠ্য হয়। তবে কল্পনার সূত্রপাতগুলো বাস্তবতার নিরীক্ষেই যেন হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।

ইতিহাসে পোল্যান্ডের অন্ধকার অতীত নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি করায় ওলগা তোকারচুক কট্টর সমালোচকদের বিতর্ক কুড়িয়েছেন। মূলত দেশটির প্রকৃত ইতিহাস ক্ষমতাসীন জাতীয়তাবাদী সরকারের কথিত ভাষ্য থেকে সম্পূর্ণই আলাদা। আগামী ১০ ডিসেম্বর স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ওলগা তোকারচুককে পুরস্কারের অর্থমূল্য, মেডেল আর ডিপ্লোমা দিয়ে সম্মানিত করা হবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×