ঝুঁকিতে দশ হাজার রোহিঙ্গা অনাথ শিশু

  রীতা ভৌমিক ১৯ মার্চ ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ঝুঁকিতে দশ হাজার রোহিঙ্গা অনাথ শিশু
রোহিঙ্গা অনাথ শিশুরা

নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল মোকারমা। ছয় বছর বয়সে বাবা-মা দু’জনকেই হারিয়েছে সে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নৃশংসতায় সে পিতৃমাতৃহীন, স্বজনহারা। মিয়ানমারের রাখাইনের হাইচুংরাতা গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। বাবা আবুল কালাম অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করতেন।

আর মা হালিমা খাতুন ঘরকন্নার। সংসারে সচ্ছলতা না থাকলেও সুখ ছিল। বাবা-মায়ের আদরে বেড়ে উঠছিল মোকারমা। এক রাতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ওদের গ্রামে ঢুকে গোলাগুলি শুরু করলে ওর বাবা-মা ওকে দাদির কাছে রেখে বাইরে বের হয়। আর ঘরে ফিরেনি ওর বাবা-মা। লোকমুখে ছেলে-ছেলের বউয়ের মৃত্যু সংবাদ জানতে পেরেছিলেন ওর দাদি। প্রতিবেশীদের সঙ্গে নাতনিকে নিয়ে জীবন বাজি রেখে ডিঙ্গি নৌকায় চড়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

এ প্রসঙ্গে দাদি গুলবাহার বলেন, মৃত্যু ওঁৎপেতে আছে জেনেও পাঁচ থেকে ছয়দিন নাতনিকে নিয়ে হেঁটে, অনাহারে মিয়ানমারের সীমান্তে এসে পৌঁছি।

পাঁচ বছরের তসলিমা আক্তার আর তিন বছরের নূরকলিমা দুই বোন। ওরা মিয়ানমারের রাখাইনের কোন গ্রাম থেকে এসেছে কিছুই বলতে পারে না। শুধু বাবার নাম ইউসুফ আর মায়ের নাম হাসিনা বলতে পারে। মাহমুদুল হকের পরিবারের সঙ্গে ওরা দুই বোন কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালী ১নং ক্যাম্পের আওতাধীন তেলিপাড়া খালের পাড়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে রয়েছে। ক্যাম্পের সামনে নতুন মানুষ দেখলেই অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে। একজন আরেকজনকে কাছ ছাড়া করতে চায় না।

দুই বোনকে কোথায় পেয়েছেন এ প্রসঙ্গে মাহমুদুল হক বলেন, মিয়ানমারের রাখাইনের রাশিদং রাজারবিল গ্রামে আমাদের বাড়ি। মিয়ানমারের সেনারা রাজারবিল এলাকায় ঢুকে ৬০০ থেকে ৭০০ মানুষকে গুলি করে হত্যা করে। গোলাগুলির মধ্যে আমরা একপাড়া থেকে আরেকপাড়ায় পালানোর চেষ্টা করি। হুড়োহুড়ি, আতঙ্কের মধ্যে দুই মেয়েশিশুকে কাঁদতে দেখি। ওদের কান্না দেখে খুব মায়া লাগে। আমার পাঁচ সন্তান। ওদের সঙ্গেও তো এরকম ঘটনা ঘটতে পারত।

ভয়ে ওরা প্রথম প্রথম কিছুই বলতে পারত না। যখন ওদের আর বাবা-মায়ের নাম বলে সেই অনুযায়ী আমরা অনেক খুঁজেও তাদের সন্ধান পাইনি। তারা বেঁচে আছে কিনা তাও জানি না। ওরাও বলতে পারে না ওদের বাবা-মা বেঁচে আছে কিনা? বাড়ি কোথায় বলতে না পারায় ওর স্বজনদেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

বন-জঙ্গল পেরিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে করতে ওদেরসহ আমরা নয়জন মিয়ানমার-বাংলাদেশের সীমান্তে আসি। ডিঙ্গি নৌকায় নাফ নদী পার হয়ে টেকনাফ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করি। এখানেও অনেক কষ্টে দিন পার করছি। নিজের সন্তানদের সঙ্গেই ওদের রাখছি। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে এতিমের তালিকায় ওদের নাম তালিকাভুক্ত হয়েছে।

তসলিমা আক্তারের সঙ্গে গল্পের ছলে জানা যায়, গোলাগুলির শব্দ শুনে ওরা দু’বোন ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। সে সময় বাবা-মা ওদের সঙ্গে ছিল না।

ইউনিসেফের উপ-নির্বাহী পরিচালক জাস্টিন ফরসিথ ২৪-২৫ জানুয়ারি কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে বলেছেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের কক্সবাজারে ৫৮ শতাংশ রোহিঙ্গা শিশু একা এসেছে। ৯ লাখ ৭৫ হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীর মধ্যে ১০ হাজার শিশু অভিভাবকহীন।

মিয়ানমারের সেনারা তাদের বাবা-মাকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে। বাঁচার তাগিদে তারা বাংলাদেশে একা এসেছে। পিতৃমাতৃহীন এসব শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে তাদের জীবন কাটছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গবেষণা, মূল্যায়ন, প্রকাশনা ও জনসংযোগের উপপরিচালক মোঃ সাজ্জাদুল ইসলাম এর মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আগত এতিম রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৪১ জন।

তাদের মধ্যে মেয়েশিশু ২০ হাজার ৭৮২, ছেলেশিশু ১৯ হাজার ৫৯ জন। এসব শিশুর মধ্যে পিতৃমাতৃহীন এতিম শিশু ৮ হাজার ৩৯১, পিতৃহীন ২৯ হাজার ৩১৫, বাবা-মা থেকে পৃথক পরিচিতদের সাথে ৮৬৫, বাবা-মা থেকে পৃথক অপরিচিতদের সাথে ৩৭, বাবা-মা থেকে পৃথক একা রয়েছে ৬৮জন শিশু।

মিয়ানমার থেকে আগত অভিভাবকহীন রোহিঙ্গা এতিম শিশু সুরক্ষায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ সম্পর্কে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল আমিন জামেলি বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশে আগত রোহিঙ্গা এতিম শিশুদের সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ইউনিসেফের মধ্যে এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। রোহিঙ্গা এতিম শিশুদের ৯ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারে রেখে পরিবারিক আবহে বড় করা হবে।

এছাড়া যথোপযোগী আশ্রয়কেন্দ্রে রেখে নিরাপত্তাসহ নিরাপদ আবাসন, পোশাক, খাবার, শিক্ষা ও বিনোদনের মাঝে বড় করা হবে। এসব শিশু আতঙ্কের মধ্য দিয়ে, অভিভাবক হারিয়ে মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে গেছে। এ সমস্যা থেকে বের করে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য চাইল্ড ফ্রেন্ডলি সেন্টার, সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সমাজকর্মীরা তাদের কাউন্সিলিং করবেন।

ইউনিসেফ বাংলাদেশের চাইল্ড প্রোডাকশন স্পেশালিস্ট শাবনাজ জাহিরিন এর মতে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৭ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু বাংলাদেশে এসেছে। তাদের মধ্যে ১০ হাজার অনাথ শিশু রয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সমাজসেবার অধীনে ইউনিসেফ অভিভাবকহীন, অনাথ রোহিঙ্গা শিশুদের ছয় মাসের সহযোগিতা করবে। এসব সহযোগিতার মধ্যে রয়েছে ফস্টার কেয়ারের মাধ্যমে অনাথ, অভিভাবকহীন শিশুদের রোহিঙ্গা প্রতিবেশী অথবা আত্মীয়ের তত্ত্বাবধানে রাখা হবে। যে পরিবারে শিশুরা প্রতিপালিত হবে সেই ৯ হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে ক্যাশ ট্রান্সফার করা হবে। এছাড়া এসব শিশুর জন্য ১০০টি চাইল্ড ফ্রেন্ডলি সেন্টার করা হবে। প্রত্যেক শিশুকে এখানে এনে সমাজকর্মীদের মাধ্যমে কাউন্সিলিং করা হবে।

এসব শিশু কি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে তারা জানার জন্য। এসব শিশুর কি ধরনের সহযোগিতা লাগবে সেই অনুযায়ী যেমন- মেয়েশিশুর বাল্যবিয়ে বন্ধ, পাচার প্রতিরোধে সমাজকর্মীরা কাজ করবেন। এছাড়া স্বাস্থ্যকেন্দ্র, নারী কেন্দ্র, ফস্টার কেয়ার ইত্যাদি জায়গায় ৫০ জন সমাজকর্মী ৩৫ হাজার শিশুকে সেবা ও সহযোগিতা করবেন।

মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গা অভিভাবকহীন শিশুরা বাবা-মা স্বজন হারানোয় তারা কিভাবে মানসিকভাবে পর্যুদস্ত হয়েছে, এ থেকে কিভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব এ প্রসঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা এ শিশুরা দেখেছে।

এর ওপর বাবা-মা, ভাইবোন, স্বজনকে হারিয়ে তারা মনস্তাত্ত্বিক ট্রমার মধ্য দিয়ে রয়েছে। তিনদিন থেকে এক মাস বা ২৮ দিনের মধ্যে তারা আপনজনদের মৃত্যু, সহিংসতা দেখলে, গুরুতর আহত বা শারীরিকভাবে অক্ষম হলে এক্যুয়েট ট্রেস ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত হতে পারে।

তাদের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হতে পারে। মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে হলে পিটিএসডি (পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার) ডিপ্রেশনের কারণে তাদের মধ্যে সহিংসতার বৈশিষ্ট্য ঢুকে যেতে পারে। অনেকে নির্বাক হয়ে যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে এ শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা করলে তাদের এডজাস্টমেন্ট ডিজঅর্ডার ডিপ্রেশন থেকে বেরিয়ে এনে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যেতে পারে। জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে তাদের মৌলিক অধিকার খাদ্য, শিক্ষা, বাসস্থান ও নিরাপত্তাবোধ ইত্যাদি নিশ্চিত করতে হবে।

ঘটনাপ্রবাহ : রোহিঙ্গা বর্বরতা

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter