অধ্যাপক মমতাজ বেগমকে বলেছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা

সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার জন্য তোমাদের কাজ করতে হবে

  রীতা ভৌমিক ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সাবেক সংসদ সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মমতাজ বেগম ১৬ মে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তিনি জাতীয় মহিলা সংস্থার চেয়ারম্যান ছিলেন।

এ বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহের দুপুরে ‘বঙ্গবন্ধু ও আমাদের নারী নেত্রীরা’ শিরোনামে যুগান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য তার সঙ্গে কথা বলতে গিয়েছিলাম জাতীয় মহিলা সংস্থায়। তিনি আগ্রহ ভরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার স্মৃতিচারণ করেছিলেন। তার স্মৃতিচারণের যে অংশটুকু প্রকাশিত হয়নি তাই তুলে ধরার প্রয়াস করেছি মাত্র।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের ভিপি মমতাজ বেগম বঙ্গবন্ধুকে কাছ থেকে দেখার জন্যই প্রথমবার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যান। এর কিছুদিন পরই মমতাজ বেগমের নেতৃত্বে রোকেয়া হলের ছাত্রলীগের মেয়েরা টর্নেডোতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের ত্রাণ দেয়ার জন্য ডেমরায় গিয়েছেন। ওইদিন বঙ্গবন্ধুও টর্নেডো এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দেখতে সেখানে গেছেন। আকস্মিকভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে মমতাজ বেগমের দেখা হয়ে গেল। বঙ্গবন্ধু মমতাজ বেগমকে দেখামাত্রই বললেন, ‘তুমি মমতাজ না? রোকেয়া হলের।’ মমতাজ বেগমও সেদিন মহান নেতা বঙ্গবন্ধুর এই আন্তরিকতায় অভিভূত হয়ে যান। একটুক্ষণের দেখাতেই বঙ্গবন্ধু মমতাজ বেগমের নামটা কীভাবে মনে রেখেছেন। তার বুঝতে দেরি হল না বঙ্গবন্ধু এমনি একজন মানুষ, একজন অবিসংবাদিত নেতা যিনি সবাইকে আপন করে নিতে পারেন।

বঙ্গবন্ধু আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনি সৈয়দ রেজাউর রহমান, মমতাজ বেগমসহ কয়েকজনকে তার বাসায় দুপুরে খেতে ডাকেন। খাবার রেডি কিন্তু পরিবেশন করা হচ্ছে না। মমতাজ বেগম বিষয়টি প্রথমে বুঝতে পারলেন না। কিন্তু বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না। এরই মধ্যে বোরকা পরে একজন ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকলেন। বোরকা খুলতেই সবাই দেখলেন বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মমতাজ বেগমকে আলাদাভাবে ডেকে বললেন, ‘আমি তোমাকে খবর দিতে বলছি। এ আন্দোলন-সংগ্রাম মেয়েরা এগিয়ে না নিয়ে গেলে আন্দোলন সফল হবে না।

সংগ্রাম এগিয়ে নেয়ার জন্য তোমাদের কাজ করতে হবে। আরও মেয়েদের সংশ্লিষ্ট করতে হবে।’ বেগম ফজিলাতুন্নেছার এ আন্তরিকতায় মমতাজ বেগম কাজে অনুপ্রেরণা পেলেন। রোকেয়া হলের ছাত্রলীগের কর্মীদের নিয়ে কাজে লেগে যান। বঙ্গবন্ধুর কাজকে এগিয়ে নিতে বেগম ফজিলাতুন্নেছাও ছাত্রলীগের নেতা, নেত্রীদের নানা সময়ে এভাবেই পরামর্শ দিয়েছেন।

বেগম ফজিলাতুন্নেছাকে প্রথম দেখার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাতীয় মহিলা সংস্থার সভাপতি মমতাজ বেগম বলেছিলেন, ছাত্রলীগের প্রেসিডেন্ট আবদুর রউফ ভাই আমাকে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গেলেন। দুপুরের খাবার খেয়ে বঙ্গবন্ধু শোবার ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দোতলায় বঙ্গবন্ধুর শোবার ঘরে নিয়ে গেলেন। দেখলাম বঙ্গবন্ধু পাইপ টানছেন। আর খাটের পাশে একটি মোড়ায় বসে তার স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছা পান সাজাচ্ছেন।

পরনে লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। ফুলের রেণুর মতো তার অবয়ব, গায়ের রঙের সঙ্গে নামের যে এত মিল, সব কিছু মিলিয়ে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। আবদুর রউফ ভাই পরিচয় করিয়ে দিলেন এই হলো আমাদের ভাবি।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা আন্তরিকতার সঙ্গে আমাকে বললেন, ‘আসো আসো।’ আমাকে বসতে দিলেন। আমাকে একটা পান সাজিয়ে দিয়ে বললেন, ‘তুমি একটা পান খাও।’ পান মুখে দিতেই কিযে স্বাদ পেলাম, মিষ্টি পান। আমাকে বললেন, ‘তোমার ঠোঁট তো টুকটুকে লাল হইছে। তোমাকে সবাই ভালোবাসবে।’

বেগম ফজিলাতুন্নেছা এভাবেই সবাইকে আপন করে নিতেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে নেতাকর্মীদের ভিড় লেগেই থাকত। মমতাজ বেগমও নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যেতেন। নারী-পুরুষ সব কর্মীকেই বেগম ফজিলাতুন্নেছা নিজ হাতে আপ্যায়ন করতেন। পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ ভোটে জয়লাভ করলেন। পূর্ব পাকিস্তানের ৭টি মহিলা সংরক্ষিত আসন।

মমতাজ বেগম বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে শুনলেন, সর্বস্তরের নারীরা মহিলা সংরক্ষিত আসনের জন্য নমিনেশন নেবেন। শেখ ফজলুল হক মনি মমতাজ বেগমকে বললেন, ‘মামির সঙ্গে কথা বল।’ মমতাজ বেগম বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছার সঙ্গে দেখা করতেই তাকে বললেন, ‘কালকে তুই আসিস। সবাই দরখাস্ত করছে।’

বঙ্গবন্ধু মমতাজ বেগমকে ৮০০ টাকা হাতে দিয়ে বললেন, ‘তুমি দরখাস্ত কর গিয়ে। পার্টিতে ৮০০ টাকা জমা দিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ফরম নিতে হবে।’ তিনি ৮০০ টাকা নিলেন। জানতে চাইলেন, কোথায় ফরম নিতে হবে? বঙ্গবন্ধু বলে দিলেন। আওয়ামী লীগের অফিস তখন পুরানা পল্টনে।

আওয়ামী লীগের অফিসে এসে ফরম নিলেন। সই করে দিলেন। নমিনেশনে দেখলেন তার নামও আছে। পার্লামেন্ট বসবে একাত্তরের ৩ মার্চ। ১ মার্চ তাদের নমিনেশন জমা দিতে হবে। পার্টি থেকে সব আয়োজন করল। ফরম পূরণ করে দিল। তাদের নির্বাচন কমিশনে নিয়ে যাওয়া হল। ওখানে গিয়ে ফরম, টাকা জমা দিলেন।

অপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়ে গেলেন। তারা পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসে এলেন। বঙ্গবন্ধু তখন রেডিও নিয়ে বসা। তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, আজকে পার্লামেন্ট। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘অভিনন্দন এমপি হইছ। পার্লামেন্টে বসতে পার নাতো।’ তারা দাঁড়িয়েছিলেন।

ইত্তেফাকের ফটোগ্রাফার মুসা তাদের ৭ নারী এমপিকে বঙ্গবন্ধুর পেছনে দাঁড়াতে বললেন। তারা দাঁড়ালেন। ফটোগ্রাফার ছবি তুললেন। একাত্তরের ২ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকে সেই ছবি ছাপা হল।

১ মার্চ পল্টন অফিসে থাকা অবস্থায় বেলা দু’টার সময় রেডিওতে ঘোষণা দিল, পার্লামেন্ট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তাদের বললেন, ‘প্রেস কনফারেন্স হবে পূর্বাণী হোটেলে।’ তারা গেলেন পূর্বাণীতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বললেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম ৩ মার্চ পল্টনে জনসভা হবে। উই হোপ ফর দ্য বেস্ট বাট প্রিপেয়ার ফর দ্য ওয়ার্ডস।’ বঙ্গবন্ধুর চাদরের কোনা ধরে সেদিন সবার সঙ্গে মমতাজ বেগমও মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্বাধীনতার শপথ নিয়েছিলেন। তারা দেশের স্বাধীনতা আনবে। আন্দোলন করবে। রাস্তা থেকে সরবে না।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত