আমার সাংবাদিক মায়ের করোনাযুদ্ধ

  অহনা আনজুম ১০ আগস্ট ২০২০, ০০:০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

অদৃশ্য করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছে সারা বিশ্ব। ৮ মার্চ থেকে বাংলাদেশেও শুরু হয়েছে এ যুদ্ধ। করোনা যুদ্ধে সম্মুখ লড়াইয়ে চিকিৎসক, পুলিশের পাশাপাশি রয়েছেন সংবাদকর্মীরাও। আমার মা শাহনাজ শারমীন একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সংবাদকর্মী।

সারা দেশে এ ভাইরাসের বিরুদ্ধে চিকিৎসক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি মাঠে থেকে যুদ্ধ করতে দেখছি মাকেও। পেশাগত কারণে মাকে সবখানেই যেতে হচ্ছে। রাজধানীর হাসপাতালের করোনা ওয়ার্ডের চিকিৎসা ব্যবস্থার অভিযোগের খবর নিতে যাচ্ছেন মা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটাচ্ছেন করোনা রোগী, চিকিৎসক আর চিকিৎসাকর্মীদের সঙ্গে। মহামারীর এ ক্রান্তিকালে অসহায় মানুষরা কেমন আছেন সেই খোঁজ নিতে মা যাচ্ছেন রাজধানীর অলিতে-গলিতে।

মা গিয়েছেন করোনায় মৃতদের লাশ সৎকারের তথ্যগুলো তুলে আনতে। করোনাভাইরাসে মৃতদের রেখে যখন স্বজনরাও দূরে চলে যায়, তখন বিনা পারিশ্রমিকে যারা দাফন বা সৎকার করছে সেই নায়কদের কথাও তুলে ধরেছেন মা। করোনাযুদ্ধের সৈনিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মৃতুর খবর দিচ্ছেন মা। এমনকি করোনা চিকিৎসা নিয়ে ভ্রান্ত তথ্য আর ব্যবসা বন্ধ করতে সংবাদমাধ্যম চালিয়ে যাচ্ছে সঠিক তথ্যের প্রচার। নানাভাবে মাঠের যোদ্ধাদের মনোবল শক্ত রাখার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি আর তার সহকর্মী সহযোদ্ধা গণমাধ্যম কর্মীরা।

লকডাউনে কিভাবে চলছে রাজনীতি আর জনপ্রতিনিধিরা করোনাকালে কি করছেন তার এলাকায়, পুলিশবাহিনীর নানা সহায়তার কথা আর মানবিক কার্যক্রম যারা চালাচ্ছেন স্বেচ্ছাশ্রমে তাদের নিয়ে মধ্যরাতে অনলাইন টকশো করছেন মা। সবাইকে জানাচ্ছেন নানা শ্রেণিপেশার মানুষের দারুণ সব সেবা কার্যক্রমের কথা। যা দেশের মানুষকে এই যুদ্ধ জয়ের জন্য লড়াইয়ে সাহস জোগায়।

এ অবস্থায় ১৮ মার্চ স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমার ৬ বছরের ছোট বোন আরিসা আর আমাকে মা বাগেরহাট আমাদের দাদা বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। সেই থেকে আজ পর্যন্ত আমরা দাদা-দাদির কাছে। পহেলা বৈশাখ, ঈদ সবসময় আমরা নতুন পোশাক আর মজার খাবার খাই। এবার মা ছাড়াই কাটে আমাদের সব উৎসব। ঈদেও মা আমাদের কাছে আসতে পারেননি। আমার ছোটবোন আরিসা এখন আর মার সঙ্গে ভিডিও কলে বা ফোনে কথা বলে না। কথা বলতে গেলে নাকি তার কান্না আসে।

আমার এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশ হল সেদিনও আমার মা-বাবা দুজনেই ঢাকায়। বাবা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত, তাকেও কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে। অনেকেই ছুটি কাটাচ্ছেন, কেউ কেউ বাড়ি থেকে অফিস চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ক্ষেত্রে বিশেষ করে সম্প্রচার গণমাধ্যম কর্মীদের সবাইকে এ সুযোগ দেয়া সম্ভব নয়। কারণ ক্যামেরার চোখে সব তুলে আনলেই মানুষ সঠিক তথ্য জানতে পারছে। মহামারীর সময়ে ঘরবন্দি মানুষ বেশি করে তথ্য জানতে চায়। গণমাধ্যমের চোখেই মানুষ দেখছে দেশ ও বিশ্বকে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে দুর্যোগে মানুষকে বেশি করে তথ্য জানাতে। মানুষ উৎকণ্ঠায় আছে, আতঙ্কিত হচ্ছে, গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করছে সংবাদকর্মীরা। চিকিৎসকরা সুরক্ষা পেল কিনা, খাবার পাচ্ছে কোথায়, চিকিৎসকের পরিবার কেমন আছে, চিকিৎসকদের কী দরকার, তারা কী কী সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে সব প্রচার করছেন সংবাদকর্মীরা।

চিকিৎসকদের মনোবল কীভাবে বাড়ানো যায়, তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার জন্যও চেষ্টা করছেন তারা। সশস্ত্র বাহিনীর দারুণ ভূমিকার প্রশংসা উঠে আসছে গণমাধ্যমে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মানবিক হয়ে ওঠার গল্পও প্রকাশ পায় সংবাদমাধ্যমে।

সবকিছুর পর সবারই সংকট আছে, অভিযোগ আছে। কিন্তু সংবাদকর্মীদের সংকটের কথা কেউ বলে না। নিজেদের কথাগুলো চাপা পড়ে থাকে সবার সংকট আর সমস্যার ভিড়ে। তারা নিজেদের জন্য চাওয়ার আগে অন্যের চাওয়াগুলোকেই মুখ্য মনে করছেন।

আরও খবর

সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত