মোল্লাবাড়ির মেয়ে স্বপ্নচারী আঁখি
jugantor
মোল্লাবাড়ির মেয়ে স্বপ্নচারী আঁখি

  নূর ইসলাম রকি  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯-এ খুলনায় হতদরিদ্র মানুষ, রিকশা চালক, ভ্যান চালক, কুলি, মজুরদের মাঝে বিনামূল্যে নিজের তৈরি মাস্ক বিতরণ করেছিলেন আঁখি। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকার মেয়ে আঁখি পেলেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা থেকে ‘রিয়েল লাইফ হিরো’।

খুলনার রূপসা উপজেলার একটি গ্রামে পরের জায়গায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন আঁখি। অতি দরিদ্র বাবার নাম মাসুদ মোল্লা। দক্ষিণ বাগমারা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এরপর সংসারের হাল ধরতে মা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কাজ করেন চিংড়ি মাছ গ্রেডিং কোম্পানিতে।

সকাল ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতেন চিংড়ি মাছের কোম্পানিতে। করোনার সময় মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং হতদরিদ্র মানুষ মাস্ক কিনতে পারবেন না এমন চিন্তাভাবনা থেকে আঁখি সেলাই মেশিনে তৈরি করেন শতশত মাস্ক। তার তৈরি মাস্ক বিনামূল্যে এলাকায় বিতরণ করেন। আঁখির এই মানবতার কথা স্থানীয় ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিও’র কর্মীদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় বিশ্বের সবখানে। যার ফলে আঁখি দেশ-বিদেশে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে ওঠেন। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মিলেছে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন স্মারক।

এ প্রসঙ্গে আঁখি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বাবা মাসুদ মোল্লা, বোন মরিয়ম এবং মায়ের অনুপ্রেরণা তো ছিলই। এছাড়া আমার এ অবদানের পেছনে স্থানীয় ওয়ার্ল্ড ভিশনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অনেক পত্রিকা ও টেলিভিশনে আমাকে নিয়ে সংবাদ প্রচার হচ্ছে যা আমি কখনও স্বপ্নে ভাবিনি। বাবা-মা চিংড়ি মাছের কোম্পানিতে কাজ করতেন। বাবা অসুস্থ হওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে আমরা দুই বোন মায়ের সঙ্গে কাজে যোগদান করি।

সেখান থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের আপারা আমাকে স্কুলে ভর্তি করতে চান। কিন্তু বয়স বেশি হওয়ার কারণে ভর্তি হতে পারিনি। এরপর তারা ২০১৮ সালে আমাকে দুই মাসের একটি ভোকেশনাল ট্রেনিং করায়। পাশাপাশি আমাকে আত্মকর্মসংস্থান করতে উদ্বুব্ধ করেন। শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সচেতন করেন। ট্রেনিং শেষে তারা আমাকে একটি সেলাই মেশিন, ৬০টি থ্রি-পিস, কিছু থান কাপড় ও মেক্সির কাপড় দেন। যাদের বাড়িতে থাকি তারা আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না।

এদিকে বাবা অসুস্থ হলেন। এ প্রশিক্ষণটিকে কাজে লাগাতে বাড়ির সামনে একটি ছোট দোকান দিই। সেখানে সেলাই মেশিন দিয়ে কাপড়, পুঁতির ব্যাগ ইত্যাদি সেলাই করতাম। ফুলের টব, ঘুড়িও বানাতাম। এসব এই দোকানে বিক্রি করতাম।

তিনি আরও বলেন, করোনার প্রকোপ যখন বেড়ে যায়, তখন মাস্কের দামও বাড়িয়ে দেয় সবাই। আমি কিছু কাপড় কিনে মাস্ক তৈরি করলাম। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কাছে ১০ টাকা এবং যাদের সামর্থ্য নেই তাদের বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করতে থাকি। বিষয়টি একে একে অনেকে জানতে পারেন। এলাকার মানুষের কাছে এ সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আমি যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাব এটা কখনও ভাবিনি। আঁখির এখন একটাই স্বপ্ন, নিজ পরিবারের জন্য মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই করার। পাশাপাশি সেলাই মেশিনের কাজ করে আরও মেয়েদের শিশুশ্রম থেকে রক্ষা করার। বিত্তশালীরা এগিয়ে এলেই স্বপ্ন পূরণ হবে এ প্রত্যাশা তার।

মোল্লাবাড়ির মেয়ে স্বপ্নচারী আঁখি

 নূর ইসলাম রকি 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯-এ খুলনায় হতদরিদ্র মানুষ, রিকশা চালক, ভ্যান চালক, কুলি, মজুরদের মাঝে বিনামূল্যে নিজের তৈরি মাস্ক বিতরণ করেছিলেন আঁখি। এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ খুলনার রূপসা উপজেলার বাগমারা এলাকার মেয়ে আঁখি পেলেন জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয় সংস্থা থেকে ‘রিয়েল লাইফ হিরো’। 

খুলনার রূপসা উপজেলার একটি গ্রামে পরের জায়গায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করছেন আঁখি। অতি দরিদ্র বাবার নাম মাসুদ মোল্লা। দক্ষিণ বাগমারা প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। এরপর সংসারের হাল ধরতে মা আনোয়ারা বেগমের সঙ্গে কাজ করেন চিংড়ি মাছ গ্রেডিং কোম্পানিতে।

সকাল ৮টা থেকে রাত পর্যন্ত একটানা কাজ করতেন চিংড়ি মাছের কোম্পানিতে। করোনার সময় মানবিক দিক বিবেচনা করে এবং হতদরিদ্র মানুষ মাস্ক কিনতে পারবেন না এমন চিন্তাভাবনা থেকে আঁখি সেলাই মেশিনে তৈরি করেন শতশত মাস্ক। তার তৈরি মাস্ক বিনামূল্যে এলাকায় বিতরণ করেন। আঁখির এই মানবতার কথা স্থানীয় ওয়ার্ল্ড ভিশন এনজিও’র কর্মীদের মাধ্যমে পৌঁছে যায় বিশ্বের সবখানে। যার ফলে আঁখি দেশ-বিদেশে আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে ওঠেন। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও মিলেছে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন স্মারক।

এ প্রসঙ্গে আঁখি বলেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি বাবা মাসুদ মোল্লা, বোন মরিয়ম এবং মায়ের অনুপ্রেরণা তো ছিলই। এছাড়া আমার এ অবদানের পেছনে স্থানীয় ওয়ার্ল্ড ভিশনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। অনেক পত্রিকা ও টেলিভিশনে আমাকে নিয়ে সংবাদ প্রচার হচ্ছে যা আমি কখনও স্বপ্নে ভাবিনি। বাবা-মা চিংড়ি মাছের কোম্পানিতে কাজ করতেন। বাবা অসুস্থ হওয়ার পর সংসারের হাল ধরতে আমরা দুই বোন মায়ের সঙ্গে কাজে যোগদান করি।

সেখান থেকে ওয়ার্ল্ড ভিশনের আপারা আমাকে স্কুলে ভর্তি করতে চান। কিন্তু বয়স বেশি হওয়ার কারণে ভর্তি হতে পারিনি। এরপর তারা ২০১৮ সালে আমাকে দুই মাসের একটি ভোকেশনাল ট্রেনিং করায়। পাশাপাশি আমাকে আত্মকর্মসংস্থান করতে উদ্বুব্ধ করেন। শিশুশ্রম ও বাল্যবিয়ে সম্পর্কে সচেতন করেন। ট্রেনিং শেষে তারা আমাকে একটি সেলাই মেশিন, ৬০টি থ্রি-পিস, কিছু থান কাপড় ও মেক্সির কাপড় দেন। যাদের বাড়িতে থাকি তারা আমাদের কাছ থেকে ভাড়া নেন না।

এদিকে বাবা অসুস্থ হলেন। এ প্রশিক্ষণটিকে কাজে লাগাতে বাড়ির সামনে একটি ছোট দোকান দিই। সেখানে সেলাই মেশিন দিয়ে কাপড়, পুঁতির ব্যাগ ইত্যাদি সেলাই করতাম। ফুলের টব, ঘুড়িও বানাতাম। এসব এই দোকানে বিক্রি করতাম।

তিনি আরও বলেন, করোনার প্রকোপ যখন বেড়ে যায়, তখন মাস্কের দামও বাড়িয়ে দেয় সবাই। আমি কিছু কাপড় কিনে মাস্ক তৈরি করলাম। যাদের সামর্থ্য আছে তাদের কাছে ১০ টাকা এবং যাদের সামর্থ্য নেই তাদের বিনামূল্যে মাস্ক বিতরণ করতে থাকি। বিষয়টি একে একে অনেকে জানতে পারেন। এলাকার মানুষের কাছে এ সংবাদটি ছড়িয়ে পড়ে।

তবে আমি যে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পাব এটা কখনও ভাবিনি। আঁখির এখন একটাই স্বপ্ন, নিজ পরিবারের জন্য মাথা গোঁজার একটি ঠাঁই করার। পাশাপাশি সেলাই মেশিনের কাজ করে আরও মেয়েদের শিশুশ্রম থেকে রক্ষা করার। বিত্তশালীরা এগিয়ে এলেই স্বপ্ন পূরণ হবে এ প্রত্যাশা তার।