পানিওয়ালী জেসমিনের জীবন যুদ্ধ
jugantor
পানিওয়ালী জেসমিনের জীবন যুদ্ধ

  আনোয়ার হোসেন মনোয়ার  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরগুনা শহরে যে নারীরা বাসাবাড়ি, হোটেল ও দোকানে পানি সরবরাহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনায় তারাও কাজ হারিয়েছেন। দিন এনে দিন খাওয়া, নুন আনতে পানতা ফুরানো এ নারীদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ।

বরগুনা শহর ও এর আশপাশে অর্ধশতাধিক নারী রয়েছেন, যারা একইভাবে হোটেল রেস্টুরেন্ট ও বাসাবাড়িতে খাবার পানি সরবরাহ করেন। এদের বেশিরভাগই বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা। আবার কারও কারও স্বামী অসুস্থ আবার কারও স্বামী মারা গেছেন। রোজগার বন্ধ তো খাবারও বন্ধ। কিছুদিন চেয়েচিন্তে খাবার জুটলেও অধিকাংশ সময়েই তাদের না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। ধার-দেনা আর ঋণের বোঝা চেপেছে অনেকের মাথায়। দোকানপাট খুলে দেয়া হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বাসাবাড়িতে এখনও পানি সরবরাহ বন্ধপ্রায়।

বাসাবাড়ি, দোকান ও হোটেলে পানি সরবরাহকারীদের একজন জেসমিন। জেসমিনের বয়স যখন ১২ বছর, বিয়ে হয় বেতাগী এলাকার রিকশাচালক হানিফের সঙ্গে। হানিফ বরগুনা শহরে রিকশা চালাতেন। শ্বশুরবাড়ি আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি জেসমিনের। শহরেই ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এভাবেই সংসার যাত্রা শুরু হয়েছিল জেসমিনের। বিয়ের পর স্বামীর টানাপোড়েন সংসার। রিকশার চাকা না ঘুরলে খাবার জোটে না- এ অবস্থায় চলছিল জীবনযাত্রা। কেটে যায় দীর্ঘ বছর। ইতোমধ্যে হানিফ-জেসমিন দম্পতির ঘর আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। কর্মক্ষম স্বামী হানিফের কাজের সক্ষমতা কমছে প্রতিনিয়ত, শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে নানা রোগ। সন্তান বড় হতে থাকে। স্বামীর আয়ে আর চলে না। জেসমিন নিজেই নেমে পড়েন কাজে। প্রথমে ইট ও পাথর ভাঙা, এরপর নির্মাণ শ্রমিকদের সহযোগীসহ যখন যে কাজ পায় করতে থাকে। হঠাৎ করেই স্বামী হানিফ দুর্ঘটনার শিকার হন। চেয়েচিন্তে স্বামীর যতটুকু সাধ্য চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু সুচিকিৎসার অভাবে আজও সুস্থ হননি হানিফ। শয্যাশায়ী হয়েছে আজ ১২ বছর।

ইতোমধ্যে জেসমিন নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কাজের সুযোগও হারিয়েছেন। দিশেহারা জেসমিন কী করবেন- ভেবে অস্থির। হঠাৎ দেখা হয় ‘পানিওয়ালী’ এক নারীর সঙ্গে, কথা হয়; অবশেষে ঠিক করেন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান আর বাসাবাড়িতে কলসে খাবার পানি সরবরাহ করবেন। কয়েকজন দোকানির সঙ্গে আলাপ হয়। এরপর কলস কিনে শুরু করেন পানি সরবরাহের কাজ। টাকা সঞ্চয় করে কিনেছেন আধভাঙা একখানি ভ্যান। বরগুনার ক্রোক এলাকার খালের চরে একটি ঝুপড়ির মতো একটি বাসা। এখানে এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে জেসমিনের বসতি। জেসমিন এখন বরগুনা শহরের ‘পানিওয়ালা’।

এ প্রসঙ্গে জেসমিন বলেন, ‘ফয়জরের আয়জান দেলেই কলস লইয়া নাইম্মা যাই, টিউবয়েলে যাইয়া কলস ভইর‌্যা ভ্যানে লইয়া দোকানে দোকানে এবং বাসায় পানি দিয়া আইতাম। বিকালে আবার নামতাম, রাইত পর্যন্ত পানি দেয়ার কাজ করতাম। আগে যহন পানি টানতাম তহন দু-তিনশ’ টাহাও পাইছি, এহন একশ’ টাহাও পাইতে কষ্ট অয়, কোনো কোনোদিন ৫০ টাহাও রোজগার করি। এইয়া দিয়া নিজেরা খামু না মানের দেনা দিমু।’

পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া সোহেল পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মা’কে এ কাজে সহযোগিতা করে। মা-ছেলে দ্বৈরথে দিনভর এ যুদ্ধে রোজগার হয় দুশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা, আবার কখনও কখনও একশ’ টাকাও রোজগার হয়। সংসার, স্বামীর চিকিৎসার খরচ সামলিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচও চালায়। জেসমিন যেদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় সেদিন পানি দেয়া, চুলায় আর আগুন জ্বলে না।

জেসমিনের মতো ক্রোক এলাকার খালের পাড়ে আরও তিনজনের বসবাস। তারাভানু, নাসিমা ও কাজল। এদের মধ্যে কাজলের শুধু স্বামী আছে, তারাভানুর স্বামী মারা গেছে ১২ বছর আগে আর নাসিমারও স্বামী ছেড়ে গেছে ১৫ বছর আগে। প্রত্যেকেরই একাধিক সন্তান রয়েছে। মধ্যবয়স পেরিয়েছে প্রত্যেকেরই। এরা গড়ে প্রতিদিন ১৫টি দোকান ও ৩টি বাসায় নিয়মিত পানি সরবরাহ করে যে আয় করে, তাতেই চলে তাদের সংসার। সরকারি-বেসরকারি কিছু সহায়তা পেলেও তা ছিল যৎসামান্য।

পানিওয়ালী জেসমিনের জীবন যুদ্ধ

 আনোয়ার হোসেন মনোয়ার 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরগুনা শহরে যে নারীরা বাসাবাড়ি, হোটেল ও দোকানে পানি সরবরাহ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন, বৈশ্বিক মহামারী করোনায় তারাও কাজ হারিয়েছেন। দিন এনে দিন খাওয়া, নুন আনতে পানতা ফুরানো এ নারীদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। 

বরগুনা শহর ও এর আশপাশে অর্ধশতাধিক নারী রয়েছেন, যারা একইভাবে হোটেল রেস্টুরেন্ট ও বাসাবাড়িতে খাবার পানি সরবরাহ করেন। এদের বেশিরভাগই বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্তা। আবার কারও কারও স্বামী অসুস্থ আবার কারও স্বামী মারা গেছেন। রোজগার বন্ধ তো খাবারও বন্ধ। কিছুদিন চেয়েচিন্তে খাবার জুটলেও অধিকাংশ সময়েই তাদের না খেয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। ধার-দেনা আর ঋণের বোঝা চেপেছে অনেকের মাথায়। দোকানপাট খুলে দেয়া হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। বাসাবাড়িতে এখনও পানি সরবরাহ বন্ধপ্রায়।

বাসাবাড়ি, দোকান ও হোটেলে পানি সরবরাহকারীদের একজন জেসমিন। জেসমিনের বয়স যখন ১২ বছর, বিয়ে হয় বেতাগী এলাকার রিকশাচালক হানিফের সঙ্গে। হানিফ বরগুনা শহরে রিকশা চালাতেন। শ্বশুরবাড়ি আর যাওয়া হয়ে ওঠেনি জেসমিনের। শহরেই ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। এভাবেই সংসার যাত্রা শুরু হয়েছিল জেসমিনের। বিয়ের পর স্বামীর টানাপোড়েন সংসার। রিকশার চাকা না ঘুরলে খাবার জোটে না- এ অবস্থায় চলছিল জীবনযাত্রা। কেটে যায় দীর্ঘ বছর। ইতোমধ্যে হানিফ-জেসমিন দম্পতির ঘর আলো করে আসে এক পুত্রসন্তান। কর্মক্ষম স্বামী হানিফের কাজের সক্ষমতা কমছে প্রতিনিয়ত, শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে নানা রোগ। সন্তান বড় হতে থাকে। স্বামীর আয়ে আর চলে না। জেসমিন নিজেই নেমে পড়েন কাজে। প্রথমে ইট ও পাথর ভাঙা, এরপর নির্মাণ শ্রমিকদের সহযোগীসহ যখন যে কাজ পায় করতে থাকে। হঠাৎ করেই স্বামী হানিফ দুর্ঘটনার শিকার হন। চেয়েচিন্তে স্বামীর যতটুকু সাধ্য চিকিৎসা করিয়েছেন কিন্তু সুচিকিৎসার অভাবে আজও সুস্থ হননি হানিফ। শয্যাশায়ী হয়েছে আজ ১২ বছর।

ইতোমধ্যে জেসমিন নির্মাণ শ্রমিকদের সঙ্গে কাজের সুযোগও হারিয়েছেন। দিশেহারা জেসমিন কী করবেন- ভেবে অস্থির। হঠাৎ দেখা হয় ‘পানিওয়ালী’ এক নারীর সঙ্গে, কথা হয়; অবশেষে ঠিক করেন হোটেল, রেস্টুরেন্ট, দোকান আর বাসাবাড়িতে কলসে খাবার পানি সরবরাহ করবেন। কয়েকজন দোকানির সঙ্গে আলাপ হয়। এরপর কলস কিনে শুরু করেন পানি সরবরাহের কাজ। টাকা সঞ্চয় করে কিনেছেন আধভাঙা একখানি ভ্যান। বরগুনার ক্রোক এলাকার খালের চরে একটি ঝুপড়ির মতো একটি বাসা। এখানে এখন স্বামী-সন্তান নিয়ে জেসমিনের বসতি। জেসমিন এখন বরগুনা শহরের ‘পানিওয়ালা’।

এ প্রসঙ্গে জেসমিন বলেন, ‘ফয়জরের আয়জান দেলেই কলস লইয়া নাইম্মা যাই, টিউবয়েলে যাইয়া কলস ভইর‌্যা ভ্যানে লইয়া দোকানে দোকানে এবং বাসায় পানি দিয়া আইতাম। বিকালে আবার নামতাম, রাইত পর্যন্ত পানি দেয়ার কাজ করতাম। আগে যহন পানি টানতাম তহন দু-তিনশ’ টাহাও পাইছি, এহন একশ’ টাহাও পাইতে কষ্ট অয়, কোনো কোনোদিন ৫০ টাহাও রোজগার করি। এইয়া দিয়া নিজেরা খামু না মানের দেনা দিমু।’

পঞ্চম শ্রেণিপড়ুয়া সোহেল পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে মা’কে এ কাজে সহযোগিতা করে। মা-ছেলে দ্বৈরথে দিনভর এ যুদ্ধে রোজগার হয় দুশ’ থেকে আড়াইশ’ টাকা, আবার কখনও কখনও একশ’ টাকাও রোজগার হয়। সংসার, স্বামীর চিকিৎসার খরচ সামলিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচও চালায়। জেসমিন যেদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে বন্ধ হয়ে যায় সেদিন পানি দেয়া, চুলায় আর আগুন জ্বলে না।

জেসমিনের মতো ক্রোক এলাকার খালের পাড়ে আরও তিনজনের বসবাস। তারাভানু, নাসিমা ও কাজল। এদের মধ্যে কাজলের শুধু স্বামী আছে, তারাভানুর স্বামী মারা গেছে ১২ বছর আগে আর নাসিমারও স্বামী ছেড়ে গেছে ১৫ বছর আগে। প্রত্যেকেরই একাধিক সন্তান রয়েছে। মধ্যবয়স পেরিয়েছে প্রত্যেকেরই। এরা গড়ে প্রতিদিন ১৫টি দোকান ও ৩টি বাসায় নিয়মিত পানি সরবরাহ করে যে আয় করে, তাতেই চলে তাদের সংসার। সরকারি-বেসরকারি কিছু সহায়তা পেলেও তা ছিল যৎসামান্য।