নিজেকে জয় করার প্রশান্তি
jugantor
নিজেকে জয় করার প্রশান্তি
২০২০ সালে বুকারের জন্য ৩০টি ভাষার ১২৪টি বই নির্বাচিত করা হয়। তা থেকেই চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছেন লেখক মারিকা লুকাস রিনভেল্ড আর অনুবাদক মাইকেল হ্যাচিসন। লিখেছেন-

  সাব্বিন হাসান  

২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বেই ‘রিনভেল্ড’ নামে সুখ্যাতি ছড়িয়েছেন। পুরো নাম মারিকা লুকাস রিনভেল্ড। জন্ম ১৯৯১ সালের ২০ এপ্রিল। জন্মস্থান নেদারল্যান্ডস। ২০২০ সালের বুকার জয় করেছেন। পুরস্কৃত উপন্যাস- ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’। উপন্যাস লিখেছেন ২৬ বছর বয়সে। আর ২৯ বছরে এসে ওই বইয়ের জন্যই পেলেন বুকার। ইতিহাস রচনা করে প্রথম ডাচ ঔপন্যাসিক হিসেবে জয় করলেন বিশ্বের বহুল সম্মানিত বুকার। নিজের লেখা প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করলেন রিনভেল্ড, যা উপন্যাস সৃষ্টির ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। করোনার কারণে ডিজিটাল ইভেন্টের মাধ্যমে অনলাইনে এবারের বুকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

উপন্যাসটি লিখেছেন মাতৃভাষায়। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন খ্যাতনামা অনুবাদক মাইকেল হ্যাচিসন। অনুবাদক হিসেবে তিনিও এ বুকার পুরস্কারের সমঅংশীদার হবেন। ইতোমধ্যে রিনভেল্ড তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ কালফস্কিন আর দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’র জন্য স্নাতকোত্তর সম্মানজনক এএনভি ডেবিউ পুরস্কার জিতেছেন।

বুকারের জন্য চূড়ান্তভাবে ৬টি বইয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকা নির্বাচিত হয় রিনভেল্ড রচিত ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’। বইটি ১০ বছরের বালিকাকে কেন্দ্র করে। তার নাম জস। পৃথিবীকে বোঝাপড়ার জন্য তার রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি। ভাই ম্যাথিস আইস স্কেটিংয়ে গিয়ে মারা যায়। তাদের বর্তমান গল্প এক বিয়োগান্ত দুর্ঘটনার ফলাফল। উপন্যাসটি আবর্তিত হয় তার পরবর্তী বিষাদ ও মানসিক টানাপোড়েনকে ঘিরেই।

আলোচ্য উপন্যাসটি নেদারল্যান্ডসে বিক্রির শীর্ষে জায়গা করে নেয়। মূলত ২০১৮ সালে উপন্যাসটি প্রথম ডাচ ভাষায় প্রকাশিত হয়। তারপর ইংরেজিতে অনুবাদের কাজ শুরু হয়। উপন্যাস-বিশ্লেষকরা বইটিকে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন। রিনভেল্ড ‘অসাধারণ’ শব্দ চয়নে ‘ব্যথার ছোট এক জগৎ সৃষ্টি করেন, যা দেখা কঠিন। আর তা উপেক্ষা করা যেন আরও কঠিন।’ রিনভেল্ড সারা দিন কাজ করেন দুগ্ধ খামারে। বাস্তবজীবনে অল্প বয়সেই ভাইকে হারান। উপন্যাসজুড়ে যেন সেই বিষাদের ছায়াই পাতায় পাতায় ভেসে উঠেছে।

বুকার প্রধান বিচারক টেড হডকিনসন বলেন, একেবারেই ব্যতিক্রমী বিষয়, অবিশ্বাস্য প্রেক্ষাপট ও শব্দশৈলীতে উপন্যাসটি পাঠকদের বাস্তব থেকে কল্পনায় নিয়ে আবার বাস্তবেই ফিরিয়ে আনবে। উপন্যাসের প্রতিটি অংশে সংবেদনশীল অনুবাদে উঠে এসেছে শৈশবের লজ্জা আর আবেগময় আর্তনাদের নিদারুণ কথাকাব্য। তাই বইটি এবার বুকার জয় প্রাপ্য ছিল।

বুকারজয়ী ২৯ বছরের ডাচ তরুণী রিনভেল্ড বুকার জয়ের খবরে টুইটারে লিখেছেন, অবশেষে জিতেছি আমরা। বইয়ের ইংরেজি অনুবাদক মাইকেল হাচিসনকে তিনি জানান আন্তরিক ধন্যবাদ। বিচারকদের প্রতিও তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি বইটির ডাচ সংস্করণ প্রকাশ হয়। যুক্তরাষ্ট্রে যার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮ আগস্ট।

‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে ১০ বছরের বালিকা জস। ভাই ম্যাথিস তাকে আইস স্কেটিংয়ে নিয়ে যায়নি বলে জস তার ওপর প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েন। কিছুই না ভেবে রীতিমতো মৃত্যুর অভিশাপ দিয়ে বসেন। বিস্ময়করভাবে তার কথা ফলে যায়। ওই দিনই মৃত্যুর কোলে

ঢলে পড়েন ম্যাথিস। ঘটনার অভিঘাতে তাৎক্ষণিক পঙ্গু হয়ে যান তাদের মা-বাবা। সারা উপন্যাসে ঘুরেফিরেই আবর্তিত হতে থাকে ম্যাথিসের মৃত্যুপরবর্তী বিষাদ আর মানসিক টানাপোড়েনের নানা জটিল দৃশ্যপট।

শিক্ষাজীবনে স্কুলের গণ্ডি শেষ করতে পারেননি তিনি। তবে হ্যারি পটারের লেখক জে কে রাউলিং তার অনুপ্রেরক। নিজের জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনাকে সাহিত্য ফিকশন দেয়ার অসামান্য শৈল্পিক ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। শুধু লেখার জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছেন তিনি। ফলাফলও মিলল হাতেনাতে। দারিদ্র্যের একবারে নিচের স্তরে পা রাখা রিনভেল্ড কখনও থেমে যাননি জীবনযুদ্ধে। সবার জীবনই ভালো-মন্দে আবর্তিত। কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো মন্দের পাল্টাই বেশি ঝুঁকে থাকে। তবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া কষ্টের বুকচাপা লড়াই একদিন না একদিন লক্ষ্যজয় করবেই। শত শত কষ্টের মাঝেও নিজের ভেতরের শক্তিকে লুকিয়ে লালন করতে হয়। সাফল্য তো শুধু প্রতীকী উপমা। নিজেকে জয় করার প্রশান্তি। এভাবেই নিজের জীবন গল্প জয়ের কথা উপস্থাপন করেন বিস্ময়কর ঔপন্যাসিক মারিকা লুকাস রিনভেল্ড।

নিজেকে জয় করার প্রশান্তি

২০২০ সালে বুকারের জন্য ৩০টি ভাষার ১২৪টি বই নির্বাচিত করা হয়। তা থেকেই চূড়ান্ত বিজয়ী হয়েছেন লেখক মারিকা লুকাস রিনভেল্ড আর অনুবাদক মাইকেল হ্যাচিসন। লিখেছেন-
 সাব্বিন হাসান 
২১ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বেই ‘রিনভেল্ড’ নামে সুখ্যাতি ছড়িয়েছেন। পুরো নাম মারিকা লুকাস রিনভেল্ড। জন্ম ১৯৯১ সালের ২০ এপ্রিল। জন্মস্থান নেদারল্যান্ডস। ২০২০ সালের বুকার জয় করেছেন। পুরস্কৃত উপন্যাস- ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’। উপন্যাস লিখেছেন ২৬ বছর বয়সে। আর ২৯ বছরে এসে ওই বইয়ের জন্যই পেলেন বুকার। ইতিহাস রচনা করে প্রথম ডাচ ঔপন্যাসিক হিসেবে জয় করলেন বিশ্বের বহুল সম্মানিত বুকার। নিজের লেখা প্রথম উপন্যাসেই বাজিমাত করলেন রিনভেল্ড, যা উপন্যাস সৃষ্টির ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত। করোনার কারণে ডিজিটাল ইভেন্টের মাধ্যমে অনলাইনে এবারের বুকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।

উপন্যাসটি লিখেছেন মাতৃভাষায়। বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন খ্যাতনামা অনুবাদক মাইকেল হ্যাচিসন। অনুবাদক হিসেবে তিনিও এ বুকার পুরস্কারের সমঅংশীদার হবেন। ইতোমধ্যে রিনভেল্ড তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ কালফস্কিন আর দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’র জন্য স্নাতকোত্তর সম্মানজনক এএনভি ডেবিউ পুরস্কার জিতেছেন।

বুকারের জন্য চূড়ান্তভাবে ৬টি বইয়ের সংক্ষিপ্ত তালিকা নির্বাচিত হয় রিনভেল্ড রচিত ‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’। বইটি ১০ বছরের বালিকাকে কেন্দ্র করে। তার নাম জস। পৃথিবীকে বোঝাপড়ার জন্য তার রয়েছে নিজস্ব পদ্ধতি। ভাই ম্যাথিস আইস স্কেটিংয়ে গিয়ে মারা যায়। তাদের বর্তমান গল্প এক বিয়োগান্ত দুর্ঘটনার ফলাফল। উপন্যাসটি আবর্তিত হয় তার পরবর্তী বিষাদ ও মানসিক টানাপোড়েনকে ঘিরেই।

আলোচ্য উপন্যাসটি নেদারল্যান্ডসে বিক্রির শীর্ষে জায়গা করে নেয়। মূলত ২০১৮ সালে উপন্যাসটি প্রথম ডাচ ভাষায় প্রকাশিত হয়। তারপর ইংরেজিতে অনুবাদের কাজ শুরু হয়। উপন্যাস-বিশ্লেষকরা বইটিকে ‘বিস্ময়কর’ বলে অভিহিত করেছেন। রিনভেল্ড ‘অসাধারণ’ শব্দ চয়নে ‘ব্যথার ছোট এক জগৎ সৃষ্টি করেন, যা দেখা কঠিন। আর তা উপেক্ষা করা যেন আরও কঠিন।’ রিনভেল্ড সারা দিন কাজ করেন দুগ্ধ খামারে। বাস্তবজীবনে অল্প বয়সেই ভাইকে হারান। উপন্যাসজুড়ে যেন সেই বিষাদের ছায়াই পাতায় পাতায় ভেসে উঠেছে।

বুকার প্রধান বিচারক টেড হডকিনসন বলেন, একেবারেই ব্যতিক্রমী বিষয়, অবিশ্বাস্য প্রেক্ষাপট ও শব্দশৈলীতে উপন্যাসটি পাঠকদের বাস্তব থেকে কল্পনায় নিয়ে আবার বাস্তবেই ফিরিয়ে আনবে। উপন্যাসের প্রতিটি অংশে সংবেদনশীল অনুবাদে উঠে এসেছে শৈশবের লজ্জা আর আবেগময় আর্তনাদের নিদারুণ কথাকাব্য। তাই বইটি এবার বুকার জয় প্রাপ্য ছিল।

বুকারজয়ী ২৯ বছরের ডাচ তরুণী রিনভেল্ড বুকার জয়ের খবরে টুইটারে লিখেছেন, অবশেষে জিতেছি আমরা। বইয়ের ইংরেজি অনুবাদক মাইকেল হাচিসনকে তিনি জানান আন্তরিক ধন্যবাদ। বিচারকদের প্রতিও তিনি বিশেষ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি বইটির ডাচ সংস্করণ প্রকাশ হয়। যুক্তরাষ্ট্রে যার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮ আগস্ট।

‘দ্য ডিসকমফোর্ট অব ইভিনিং’ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্রে আছে ১০ বছরের বালিকা জস। ভাই ম্যাথিস তাকে আইস স্কেটিংয়ে নিয়ে যায়নি বলে জস তার ওপর প্রচণ্ড রাগে ফেটে পড়েন। কিছুই না ভেবে রীতিমতো মৃত্যুর অভিশাপ দিয়ে বসেন। বিস্ময়করভাবে তার কথা ফলে যায়। ওই দিনই মৃত্যুর কোলে

ঢলে পড়েন ম্যাথিস। ঘটনার অভিঘাতে তাৎক্ষণিক পঙ্গু হয়ে যান তাদের মা-বাবা। সারা উপন্যাসে ঘুরেফিরেই আবর্তিত হতে থাকে ম্যাথিসের মৃত্যুপরবর্তী বিষাদ আর মানসিক টানাপোড়েনের নানা জটিল দৃশ্যপট।

শিক্ষাজীবনে স্কুলের গণ্ডি শেষ করতে পারেননি তিনি। তবে হ্যারি পটারের লেখক জে কে রাউলিং তার অনুপ্রেরক। নিজের জীবনঘনিষ্ঠ ঘটনাকে সাহিত্য ফিকশন দেয়ার অসামান্য শৈল্পিক ক্ষমতা সত্যিই বিস্ময়কর। শুধু লেখার জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেছেন তিনি। ফলাফলও মিলল হাতেনাতে। দারিদ্র্যের একবারে নিচের স্তরে পা রাখা রিনভেল্ড কখনও থেমে যাননি জীবনযুদ্ধে। সবার জীবনই ভালো-মন্দে আবর্তিত। কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো মন্দের পাল্টাই বেশি ঝুঁকে থাকে। তবে দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়া কষ্টের বুকচাপা লড়াই একদিন না একদিন লক্ষ্যজয় করবেই। শত শত কষ্টের মাঝেও নিজের ভেতরের শক্তিকে লুকিয়ে লালন করতে হয়। সাফল্য তো শুধু প্রতীকী উপমা। নিজেকে জয় করার প্রশান্তি। এভাবেই নিজের জীবন গল্প জয়ের কথা উপস্থাপন করেন বিস্ময়কর ঔপন্যাসিক মারিকা লুকাস রিনভেল্ড।