পরিবারের জন্য মনিকার সংগ্রাম
jugantor
পরিবারের জন্য মনিকার সংগ্রাম

  ইসমাইল মাহমুদ  

১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মনিকা দে, বয়স বারো। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ইকড়ছই হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি এ বয়সেই সংসারের হাল ধরেছে সে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে পান-সুপারির ব্যবসা করে সাত সদস্যের পরিবারের খরচ বহন করে।

মনিকারা পাঁচ বোন। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। সপ্তাহের তিনদিন স্কুল করতে পারে। স্কুল থেকে ফিরে বিকালে দোকানে বসে। রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত পান-সুপারি বিক্রি করে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলো দোকান চালাতে গিয়ে স্কুলে যাওয়া হয় না তার। এ দিনগুলো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানদারি করে। লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ থাকার পরও পরিবারের চরম আর্থিক অনটন, নিজের লেখাপড়ার খরচ ও দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাকে এ ব্যবসায় হাল ধরতে হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মনিকা বলেন, এত কষ্টের মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। রাতে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে যাই। এরপরও পড়তে বসি। আমাকে ভালো ফলাফলও করতে হবে। দোকানদারি করতে প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত। আমি মনে করি, আমি কাজ করছি আমার পরিবারের জন্য। প্রথম দিকে সংকোচবোধ করলেও এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। পাশের ব্যবসায়ীরাও আমাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ কারণে ব্যবসা চালাতে কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের মোল্লারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মনিকার বাবা পিযুষ দে জগন্নাথপুর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে পান-সুপারির ব্যবসা করছিলেন। তার পান-সুপারির ব্যবসায় ৫ মেয়ে ও স্ত্রীসহ পরিবারের ভরণপোষণ, মেয়েদের লেখাপড়া, উপজেলা সদরে বাসা ভাড়া দিয়ে অতি কষ্টে কাটছিল সংসার। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের পরিবারে বিপদ নেমে আসে। প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন পিযুষ দে। চিকিৎসক দেখালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর থেকে ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকেন তিনি। ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পরিবারের বড় মেয়ে রিমা দে পড়ছে জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজে। দ্বিতীয় মেয়ে সোমা দে ও তৃতীয় মেয়ে মিতা দে সৈয়দপুর আদর্শ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে, চতুর্থ মেয়ে মনিকা দে হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং পঞ্চম মেয়ে লাবনি দে ইকড়ছই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। বাবার এ অসুস্থতায় সব বোনদের লেখাপড়া যখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় তখন দোকান চালানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মনিকা দে। বাবার ব্যবসার হাল ধরেন তিনি। এছাড়া রিমা ও সোমা টিউশনি ও বিউটি পার্লারে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ এবং সংসার খরচ জোগাতে সাহায্য করছে। এসব আয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি তাদের অসুস্থ বাবার চিকিৎসা ব্যয়ও চলছে।

জগন্নাথপুর বাজার তদারক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহির উদ্দিন জানান, মনিকা খুবই ভদ্র ও বিনয়ী মেয়ে। তাকে বাজারের সবাই সবসময় সহযোগিতা করেন। তার যেন কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে বাজারের সবাই খেয়াল রাখেন। এছাড়া অনেক সময় রাতে বাজার থেকে বাসায় যাওয়ার সময় সে যেন নিরাপদে বাসায় যেতে পারে সেদিকে সবাই সজাগ ও সচেতন। অনেক সময় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেন।

ইকড়ছই হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, মনিকা তার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাই তাকে তার বাবার ব্যবসা দেখতে হয়। বিষয়টি জানার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছে। মনিকা পড়াশোনায় খুবই আন্তরিক ও মনোযোগী। তিনি প্রত্যাশা করেন, মনিকা দে তার পরিবারের দরিদ্রতা বিমোচনে যে সংগ্রাম করছে এর মধ্য দিয়েও সে লেখাপড়া চালিয়ে যাবে।

পরিবারের জন্য মনিকার সংগ্রাম

 ইসমাইল মাহমুদ 
১২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মনিকা দে, বয়স বারো। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর পৌর এলাকার ইকড়ছই হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। লেখাপড়ার পাশাপাশি এ বয়সেই সংসারের হাল ধরেছে সে। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে পান-সুপারির ব্যবসা করে সাত সদস্যের পরিবারের খরচ বহন করে।

মনিকারা পাঁচ বোন। ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসার খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। সপ্তাহের তিনদিন স্কুল করতে পারে। স্কুল থেকে ফিরে বিকালে দোকানে বসে। রাত ৮টা-৯টা পর্যন্ত পান-সুপারি বিক্রি করে। সপ্তাহের বাকি দিনগুলো দোকান চালাতে গিয়ে স্কুলে যাওয়া হয় না তার। এ দিনগুলো সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানদারি করে। লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ থাকার পরও পরিবারের চরম আর্থিক অনটন, নিজের লেখাপড়ার খরচ ও দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত বাবার চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাকে এ ব্যবসায় হাল ধরতে হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মনিকা বলেন, এত কষ্টের মাঝেও লেখাপড়া চালিয়ে যেতে চাই। রাতে বাড়ি ফিরে ক্লান্ত হয়ে যাই। এরপরও পড়তে বসি। আমাকে ভালো ফলাফলও করতে হবে। দোকানদারি করতে প্রথম প্রথম লজ্জা লাগত। আমি মনে করি, আমি কাজ করছি আমার পরিবারের জন্য। প্রথম দিকে সংকোচবোধ করলেও এখন সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। পাশের ব্যবসায়ীরাও আমাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ কারণে ব্যবসা চালাতে কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না।

সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার কলকলিয়া ইউনিয়নের মোল্লারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মনিকার বাবা পিযুষ দে জগন্নাথপুর বাজারে দীর্ঘদিন ধরে পান-সুপারির ব্যবসা করছিলেন। তার পান-সুপারির ব্যবসায় ৫ মেয়ে ও স্ত্রীসহ পরিবারের ভরণপোষণ, মেয়েদের লেখাপড়া, উপজেলা সদরে বাসা ভাড়া দিয়ে অতি কষ্টে কাটছিল সংসার। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের পরিবারে বিপদ নেমে আসে। প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন পিযুষ দে। চিকিৎসক দেখালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ধরা পড়ে তিনি দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত। এরপর থেকে ক্রমেই অসুস্থ হতে থাকেন তিনি। ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারটি নিঃস্ব হয়ে পড়ে। পরিবারের বড় মেয়ে রিমা দে পড়ছে জগন্নাথপুর ডিগ্রি কলেজে। দ্বিতীয় মেয়ে সোমা দে ও তৃতীয় মেয়ে মিতা দে সৈয়দপুর আদর্শ কলেজে একাদশ শ্রেণিতে, চতুর্থ মেয়ে মনিকা দে হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং পঞ্চম মেয়ে লাবনি দে ইকড়ছই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। বাবার এ অসুস্থতায় সব বোনদের লেখাপড়া যখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড় তখন দোকান চালানোর দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন মনিকা দে। বাবার ব্যবসার হাল ধরেন তিনি। এছাড়া রিমা ও সোমা টিউশনি ও বিউটি পার্লারে কাজ করে লেখাপড়ার খরচ এবং সংসার খরচ জোগাতে সাহায্য করছে। এসব আয়ে সংসারের খরচের পাশাপাশি তাদের অসুস্থ বাবার চিকিৎসা ব্যয়ও চলছে।

জগন্নাথপুর বাজার তদারক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহির উদ্দিন জানান, মনিকা খুবই ভদ্র ও বিনয়ী মেয়ে। তাকে বাজারের সবাই সবসময় সহযোগিতা করেন। তার যেন কোনো সমস্যা না হয় সেদিকে বাজারের সবাই খেয়াল রাখেন। এছাড়া অনেক সময় রাতে বাজার থেকে বাসায় যাওয়ার সময় সে যেন নিরাপদে বাসায় যেতে পারে সেদিকে সবাই সজাগ ও সচেতন। অনেক সময় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেন।

ইকড়ছই হলি চাইল্ড নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মতিউর রহমান জানান, মনিকা তার স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। তার বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত। তাই তাকে তার বাবার ব্যবসা দেখতে হয়। বিষয়টি জানার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাকে সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছে। মনিকা পড়াশোনায় খুবই আন্তরিক ও মনোযোগী। তিনি প্রত্যাশা করেন, মনিকা দে তার পরিবারের দরিদ্রতা বিমোচনে যে সংগ্রাম করছে এর মধ্য দিয়েও সে লেখাপড়া চালিয়ে যাবে।