কল্যাণকর কাজই সুখের উৎস
jugantor
কল্যাণকর কাজই সুখের উৎস

  সাব্বিন হাসান  

১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের রাজনৈতিক আবহে এখন শুধু ‘এরনা’ নামেই সুখ্যাতি ছড়িয়েছেন। পুরো নাম এরনা সোলবার্গ। জন্ম ১৯৬১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। জন্মেছেন নরওয়ে বারগেন শহরে। যদিও শৈশব কাটে কালফারেত এলাকায়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর নারী রাজনীতিবিদ। এরনা হলেন গ্রো হারলেম বরুন্দতল্যান্ডের পর নরওয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। শুধু তাই নয়- তিনি নরওয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়া নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় নেত্রী।

করোনার কঠিন সময়ে নারী নেতৃত্বে দৃশ্যত সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছেন এরনা। কঠিন লকডাউন দিয়ে জনগণকে ঘরবন্দি না করে দূরদর্শী আর কৌশলেই সামলে নিয়েছেন করোনার কঠিন সমীকরণ। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা এরনা পুরো নরওয়ের আর্থসামাজিক অবস্থার অভাবনীয় উন্নয়নের মুখ্য কারিগর।

বাবা অ্যাসবর্ন সোলবার্গ ছিলেন বারগেন স্পোরভেইয়ে পরামর্শক। মা ইঙ্গা ওয়েঞ্চি তরগারসেন কর্মজীবী নারী। পরিবারে দুই বোন। বিয়ে করেন সিন্দে ফিন্সকে। দু’সন্তানের মা হিসেবে সুখেই আছেন এরনা।

বিদ্যালয়জীবনে গল্পপ্রিয় আর মিশুক স্বভাবের ছিলেন। ১৯৭৯ সালে উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী ইউনিয়নের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নির্বাচিত হন। একেবারে ছোট্ট বয়স থেকেই সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের হাতেখড়ি। ১৯৮৬ সালে বারগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে øাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনের চূড়ান্ত বর্ষে এসে কনজারভেটিভ পার্টির ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে নিজেকে উপস্থাপন করেন।

২০০৪ সাল থেকে নরওয়ে কনজারভেটিভ পার্টি প্রধানের দায়িত্ব কাঁধে ওঠে। ২০১৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। ফলে ২০১৩ সালের ১৪ অক্টোবর নরওয়ের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইয়েন স্টলটেনবার্গের স্থলাভিষিক্ত হন এরনা। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ‘সরকার ও আঞ্চলিক উন্নয়ন’ মন্ত্রী ছিলেন এরনা। মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণে তার শক্ত ভূমিকার জন্য সংবাদমাধ্যম তাকে ‘লৌহমানবী এরনা’ নামে অভিহিত করে। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল সময়ে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির উপনেতা মনোনীত হন। দলপ্রধান নির্বাচিত হন ২০০৪ সালে।

করোনা সময়ে ঘরবন্দি শিশুদের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে বিশ্বে প্রথম শিশুদের জন্য বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের অভিনব উদ্যোগ নেন এরনা। নরওয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এ সংবাদ সম্মেলনে শুধু শিশুদের ফোন করার সুযোগ করে দেয়া হয়। সম্মেলনে সারা দেশের শিশুদের সব ধরনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী এরনা। আতঙ্কে থাকা শিশুদের মনের ভয় কাটিয়ে উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা দিতেই অভিনব এ আয়োজন, যা সারা বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে করোনা সংকটে ক্ষমতায় থাকা নারীদের মধ্যে বক্তৃতা আর ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে মমতা ও স্নেহের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রকাশ পেয়েছে এরনা’র সুকৌশলী নেতৃত্বে। জিডিপি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নরওয়ে দেশটিকে সুখী ও ব্যাপক সমৃদ্ধশালী করেছে। উত্তরমেরুর দেশ হিসেবে বিখ্যাত নরওয়ের আবহাওয়া প্রায় বারো মাস-ই শীতল। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশটিকে নৈসর্গিক করে তুলেছে। দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলতে গেলে সবাই স্বভাবে আর মেজাজে ঠাণ্ডা। এসব কারণেই দেশটির অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যার নেপথ্যে আছে এরনার অবদান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ‘সুখী কমিটি’র বৈঠকে বিশ্বের শান্তিময় যে কয়টি দেশের নাম ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে নরওয়ে ছিল প্রথম অবস্থানে। তালিকার শীর্ষ পাঁচে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড অন্যতম। এরনা’র গত কয়েক বছরের একচ্ছত্র প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশটির সবচেয়ে বেশি নাগরিক সুখী হয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে- গড় আয়ু, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি (দেশজ সম্পদ), সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা আর দুর্নীতি নিয়ে সব সময়ই সরব এরনা শক্ত হাতেই জনপ্রিয়তা নিয়ে দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

তাছাড়া দেশটির দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ উন্নয়ন, ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি আর ধর্মীয় স্বাধীনতা (দেশটিতে ধর্মীয় কোনো দাঙ্গা হয় না) সুখী রাষ্ট্র হওয়ার প্রধান কারণ। যার পেছনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এরনা।

জনগণ মানে শুধু নবীন-প্রবীণ, বয়োজ্যেষ্ঠ আর ভোটার বোঝায় না। বরং সব বয়স আর শ্রেণির মানুষের-ই রাষ্ট্র আর সরকারি প্রতিনিধির কাছে বাড়তি কিছু প্রত্যাশা থাকে। তা পূরণে রাজনৈতিক নেতাদের সচেষ্ট হয়ে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। কারণ রাজনীতি মানেই মানুষের জন্য কাজ করার দৃঢ় সংকল্প।

মানবজীবন রহস্যের কারখানা। উত্থান-পতনে জীবন অনেক সময়-ই দিশেহারা আর দুর্ভেদ্য। তখন আত্মোপলব্ধি নিয়ে আবারও সামনে পা বাড়াতে হয়। তবেই জীবন আবারও স্ব-রূপে ফিরে। নিজের লড়াকু জীবনের কথাগুলো এভাবেই বর্ণনা করেছেন এরনা সোলবার্গ।

কল্যাণকর কাজই সুখের উৎস

 সাব্বিন হাসান 
১২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বিশ্বের রাজনৈতিক আবহে এখন শুধু ‘এরনা’ নামেই সুখ্যাতি ছড়িয়েছেন। পুরো নাম এরনা সোলবার্গ। জন্ম ১৯৬১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি। জন্মেছেন নরওয়ে বারগেন শহরে। যদিও শৈশব কাটে কালফারেত এলাকায়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর নারী রাজনীতিবিদ। এরনা হলেন গ্রো হারলেম বরুন্দতল্যান্ডের পর নরওয়ের ইতিহাসে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। শুধু তাই নয়- তিনি নরওয়ের দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেয়া নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয় নেত্রী।

করোনার কঠিন সময়ে নারী নেতৃত্বে দৃশ্যত সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছেন এরনা। কঠিন লকডাউন দিয়ে জনগণকে ঘরবন্দি না করে দূরদর্শী আর কৌশলেই সামলে নিয়েছেন করোনার কঠিন সমীকরণ। ২০১৭ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আসা এরনা পুরো নরওয়ের আর্থসামাজিক অবস্থার অভাবনীয় উন্নয়নের মুখ্য কারিগর।

বাবা অ্যাসবর্ন সোলবার্গ ছিলেন বারগেন স্পোরভেইয়ে পরামর্শক। মা ইঙ্গা ওয়েঞ্চি তরগারসেন কর্মজীবী নারী। পরিবারে দুই বোন। বিয়ে করেন সিন্দে ফিন্সকে। দু’সন্তানের মা হিসেবে সুখেই আছেন এরনা।

বিদ্যালয়জীবনে গল্পপ্রিয় আর মিশুক স্বভাবের ছিলেন। ১৯৭৯ সালে উচ্চবিদ্যালয়ের ছাত্রী ইউনিয়নের পরিচালনা পর্ষদে সদস্য নির্বাচিত হন। একেবারে ছোট্ট বয়স থেকেই সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জনের হাতেখড়ি। ১৯৮৬ সালে বারগেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে øাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবনের চূড়ান্ত বর্ষে এসে কনজারভেটিভ পার্টির ছাত্র রাজনীতির নেতৃত্বে নিজেকে উপস্থাপন করেন।

২০০৪ সাল থেকে নরওয়ে কনজারভেটিভ পার্টি প্রধানের দায়িত্ব কাঁধে ওঠে। ২০১৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মধ্য-ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করে। ফলে ২০১৩ সালের ১৪ অক্টোবর নরওয়ের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইয়েন স্টলটেনবার্গের স্থলাভিষিক্ত হন এরনা। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে ‘সরকার ও আঞ্চলিক উন্নয়ন’ মন্ত্রী ছিলেন এরনা। মন্ত্রণালয়ের নীতি-নির্ধারণে তার শক্ত ভূমিকার জন্য সংবাদমাধ্যম তাকে ‘লৌহমানবী এরনা’ নামে অভিহিত করে। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল সময়ে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির উপনেতা মনোনীত হন। দলপ্রধান নির্বাচিত হন ২০০৪ সালে।

করোনা সময়ে ঘরবন্দি শিশুদের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে বিশ্বে প্রথম শিশুদের জন্য বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের অভিনব উদ্যোগ নেন এরনা। নরওয়ে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এ সংবাদ সম্মেলনে শুধু শিশুদের ফোন করার সুযোগ করে দেয়া হয়। সম্মেলনে সারা দেশের শিশুদের সব ধরনের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী এরনা। আতঙ্কে থাকা শিশুদের মনের ভয় কাটিয়ে উৎসাহ আর অনুপ্রেরণা দিতেই অভিনব এ আয়োজন, যা সারা বিশ্বের কাছে অনুকরণীয় হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বজুড়ে করোনা সংকটে ক্ষমতায় থাকা নারীদের মধ্যে বক্তৃতা আর ভাষণে দৃঢ়তার সঙ্গে মমতা ও স্নেহের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবেই প্রকাশ পেয়েছে এরনা’র সুকৌশলী নেতৃত্বে। জিডিপি, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নরওয়ে দেশটিকে সুখী ও ব্যাপক সমৃদ্ধশালী করেছে। উত্তরমেরুর দেশ হিসেবে বিখ্যাত নরওয়ের আবহাওয়া প্রায় বারো মাস-ই শীতল। অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশটিকে নৈসর্গিক করে তুলেছে। দেশটির সাধারণ নাগরিক থেকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বলতে গেলে সবাই স্বভাবে আর মেজাজে ঠাণ্ডা। এসব কারণেই দেশটির অন্যতম সুখী দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, যার নেপথ্যে আছে এরনার অবদান।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ‘সুখী কমিটি’র বৈঠকে বিশ্বের শান্তিময় যে কয়টি দেশের নাম ঘোষণা করা হয় তার মধ্যে নরওয়ে ছিল প্রথম অবস্থানে। তালিকার শীর্ষ পাঁচে থাকা দেশগুলোর মধ্যে আইসল্যান্ড, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ড অন্যতম। এরনা’র গত কয়েক বছরের একচ্ছত্র প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশটির সবচেয়ে বেশি নাগরিক সুখী হয়েছেন। অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ বলছে- গড় আয়ু, দেশের অর্থনৈতিক শক্তি (দেশজ সম্পদ), সামাজিক নিরাপত্তা, ব্যক্তি স্বাধীনতা আর দুর্নীতি নিয়ে সব সময়ই সরব এরনা শক্ত হাতেই জনপ্রিয়তা নিয়ে দেশটির নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন।

তাছাড়া দেশটির দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ উন্নয়ন, ইতিবাচক পররাষ্ট্রনীতি আর ধর্মীয় স্বাধীনতা (দেশটিতে ধর্মীয় কোনো দাঙ্গা হয় না) সুখী রাষ্ট্র হওয়ার প্রধান কারণ। যার পেছনে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন এরনা।

জনগণ মানে শুধু নবীন-প্রবীণ, বয়োজ্যেষ্ঠ আর ভোটার বোঝায় না। বরং সব বয়স আর শ্রেণির মানুষের-ই রাষ্ট্র আর সরকারি প্রতিনিধির কাছে বাড়তি কিছু প্রত্যাশা থাকে। তা পূরণে রাজনৈতিক নেতাদের সচেষ্ট হয়ে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। কারণ রাজনীতি মানেই মানুষের জন্য কাজ করার দৃঢ় সংকল্প।

মানবজীবন রহস্যের কারখানা। উত্থান-পতনে জীবন অনেক সময়-ই দিশেহারা আর দুর্ভেদ্য। তখন আত্মোপলব্ধি নিয়ে আবারও সামনে পা বাড়াতে হয়। তবেই জীবন আবারও স্ব-রূপে ফিরে। নিজের লড়াকু জীবনের কথাগুলো এভাবেই বর্ণনা করেছেন এরনা সোলবার্গ।