কালিয়াকৈরের চার জয়িতা
jugantor
কালিয়াকৈরের চার জয়িতা

  সরকার আব্দুল আলীম  

১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সভ্যতা বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীও তাদের অবদান রাখছেন। দৃঢ় মনোবল, সাহস, বুদ্ধি ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চার জয়িতা। তাদের নিয়ে আজকের আয়োজন।

হাসনা আক্তার : সমাজ উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছেন কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর গ্রামের হাসনা আক্তার। উপজেলার পাশাপাশি জেলায়ও তিনি জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। ৮ ভাইবোনের অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ চালানো খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এসএসসি পাস করার পর মা-বাবা তাকে আলাউদ্দিন শিকদারের সঙ্গে বিয়ে দেন। অভাবের সংসারে স্বামীকে সহায়তা করার জন্য সেলাই কাজ শিখেন। স্থানীয় নারীদের নিয়ে একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন। প্রথমে দুটি সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ শুরু করেন। সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়াও হস্তশিল্প, বাঁশ-বেতের কাজ, শাক-সবজি চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন ইত্যাদি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নারীদের বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এ প্রসঙ্গে হাসনা আক্তার বলেন, আমার তত্ত্বাবধানে ২৫ জন নারী বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কাজ করছেন। ১১ জন অসহায় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছি।

তাসমিন সায়রা লাভলী : শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন তাসমিন সায়রা লাভলী। তিনি কালিয়াকৈর উপজেলার হাটুরিয়াচালা বড়ইবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ৭ ভাইবোনের সংসারে লেখাপড়ার খরচ জোগানো খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এর ফলে এসএসসি’র পর তার আর লেখাপড়া হয়ে ওঠে না। মা-বাবা তাকে শামছুল হক মিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পরও লেখাপড়ার প্রতি তার অদম্য ইচ্ছা-ই তাকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। ভাইয়ের সহযোগিতায় তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স পাস করেন। এ চলার পথে তার জীবনে অনেক বাধাএসেছে। কিন্তু তিনি তার স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। বড়ইবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাসমিন সায়রা লাভলীর মতে, বিয়ের পর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে অনেক বাধা এসেছে। কিন্তু মনোবল হারাইনি। আমার মতো অনেক মেয়ে-ই এ রকম বাধা ডিঙিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। আমার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলার পাশাপাশি জেলায়ও আমি জয়িতা নির্বাচিত হয়েছি।

মহেলা আক্তার : অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন মহেলা আক্তার। অভাব-অনটনের জন্য লেখাপড়ায় তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। তিনি তার স্বপ্ন পূরণের জন্য সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবনযুদ্ধে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে তিনি ১৫০টি হাঁস-মুরগি, ৪টি গরু, ১১টি ছাগল ও ২০টি কবুতর পালন করেন। এছাড়াও তিনি তার বাড়ির আঙিনায় শাক-সবজি চাষ করেন। তার স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তার উৎপাদিত দ্রব্যাদি তিনি নিজেই বাজারজাত করেন। এভাবে তিনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

মহেলা আক্তার জানান, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল-কবুতর প্রতিপালন করেন। এভাবেই সংসারের অভাব দূর করেছেন।

মুকুল রানী পাল : সফল মা হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছেন মুকুল রানী পাল। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেননি। তার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে সেবিকার চাকরি নেন। অভাবের সংসারে যেহেতু তিনি লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোতে পারেননি তাই সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি জোর দেন। তার-ই প্রচেষ্টায় সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তার একমাত্র ছেলে ভারতের হাওড়া ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। ভারতের একটি টিভি চ্যানেলে কর্মরত রয়েছেন। তার এক মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, আরেক মেয়ে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক।

মুকুল রানী পালের মতে, নিজে লেখাপড়া করতে না পারলেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে স্বপ্ন পূরণ করেছি।

কালিয়াকৈরের চার জয়িতা

 সরকার আব্দুল আলীম 
১২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সভ্যতা বিনির্মাণে পুরুষের পাশাপাশি নারীও তাদের অবদান রাখছেন। দৃঢ় মনোবল, সাহস, বুদ্ধি ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে জীবনসংগ্রামে জয়ী হয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলার চার জয়িতা। তাদের নিয়ে আজকের আয়োজন।

হাসনা আক্তার : সমাজ উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করেছেন কালিয়াকৈর উপজেলার চাপাইর গ্রামের হাসনা আক্তার। উপজেলার পাশাপাশি জেলায়ও তিনি জয়িতা নির্বাচিত হয়েছেন। ৮ ভাইবোনের অভাবের সংসারে লেখাপড়ার খরচ চালানো খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এসএসসি পাস করার পর মা-বাবা তাকে আলাউদ্দিন শিকদারের সঙ্গে বিয়ে দেন। অভাবের সংসারে স্বামীকে সহায়তা করার জন্য সেলাই কাজ শিখেন। স্থানীয় নারীদের নিয়ে একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন। প্রথমে দুটি সেলাই মেশিন দিয়ে কাজ শুরু করেন। সেলাই প্রশিক্ষক হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় সেলাইয়ের প্রশিক্ষণ দেন। এছাড়াও হস্তশিল্প, বাঁশ-বেতের কাজ, শাক-সবজি চাষ ও হাঁস-মুরগি পালন ইত্যাদি প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে নারীদের বিভিন্ন সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করেন।

এ প্রসঙ্গে হাসনা আক্তার বলেন, আমার তত্ত্বাবধানে ২৫ জন নারী বিভিন্ন আয়বর্ধনমূলক কাজ করছেন। ১১ জন অসহায় মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছি।

তাসমিন সায়রা লাভলী : শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেছেন তাসমিন সায়রা লাভলী। তিনি কালিয়াকৈর উপজেলার হাটুরিয়াচালা বড়ইবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ৭ ভাইবোনের সংসারে লেখাপড়ার খরচ জোগানো খুব কষ্টকর হয়ে যায়। এর ফলে এসএসসি’র পর তার আর লেখাপড়া হয়ে ওঠে না। মা-বাবা তাকে শামছুল হক মিয়ার সঙ্গে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের পরও লেখাপড়ার প্রতি তার অদম্য ইচ্ছা-ই তাকে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখায়। ভাইয়ের সহযোগিতায় তিনি লেখাপড়া চালিয়ে যান। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইসলামের ইতিহাসে মাস্টার্স পাস করেন। এ চলার পথে তার জীবনে অনেক বাধাএসেছে। কিন্তু তিনি তার স্বপ্ন থেকে সরে যাননি। বড়ইবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তাসমিন সায়রা লাভলীর মতে, বিয়ের পর লেখাপড়া চালিয়ে যেতে অনেক বাধা এসেছে। কিন্তু মনোবল হারাইনি। আমার মতো অনেক মেয়ে-ই এ রকম বাধা ডিঙিয়ে সামনে এগিয়ে যাবে। আমার কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ উপজেলার পাশাপাশি জেলায়ও আমি জয়িতা নির্বাচিত হয়েছি।

মহেলা আক্তার : অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জন করেছেন মহেলা আক্তার। অভাব-অনটনের জন্য লেখাপড়ায় তিনি বেশিদূর এগোতে পারেননি। তিনি তার স্বপ্ন পূরণের জন্য সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে যাচ্ছেন। জীবনযুদ্ধে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যে তিনি ১৫০টি হাঁস-মুরগি, ৪টি গরু, ১১টি ছাগল ও ২০টি কবুতর পালন করেন। এছাড়াও তিনি তার বাড়ির আঙিনায় শাক-সবজি চাষ করেন। তার স্বামী বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় তার উৎপাদিত দ্রব্যাদি তিনি নিজেই বাজারজাত করেন। এভাবে তিনি আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।

মহেলা আক্তার জানান, অভাবের সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনতে হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল-কবুতর প্রতিপালন করেন। এভাবেই সংসারের অভাব দূর করেছেন।

মুকুল রানী পাল : সফল মা হিসেবে সাফল্য অর্জন করেছেন মুকুল রানী পাল। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়ার কারণে তিনি উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেননি। তার স্বামী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকেই সংসারের হাল ধরতে হয়। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে সেবিকার চাকরি নেন। অভাবের সংসারে যেহেতু তিনি লেখাপড়ায় বেশি দূর এগোতে পারেননি তাই সন্তানদের লেখাপড়ার প্রতি জোর দেন। তার-ই প্রচেষ্টায় সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলছেন। তার একমাত্র ছেলে ভারতের হাওড়া ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করছেন। ভারতের একটি টিভি চ্যানেলে কর্মরত রয়েছেন। তার এক মেয়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, আরেক মেয়ে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক।

মুকুল রানী পালের মতে, নিজে লেখাপড়া করতে না পারলেও ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়ে স্বপ্ন পূরণ করেছি।