অভাবকে জয় করেছে জয়িতা শিরিন
jugantor
অভাবকে জয় করেছে জয়িতা শিরিন

  আব্বাস আলী  

১২ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিম্ন-মধ্যবিত্ত এক কৃষক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন শিরিন সুলতানা। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। অভাবের সংসারেও মা শাহানা বানুর প্রবল ইচ্ছা ছিল মেয়েকে লেখাপড়া শেখান।

কিন্তু বাবা ইসমাইলের ইচ্ছা মেয়েকে যেটুকু পড়ান হয়েছে তা আর কম কিসের। তাইতো মায়ের ইচ্ছা পূরণ না করেই স্বামীর সংসারে পাড়ি জমাতে হয়েছে শিরিনকে। বাবার বাড়ি দিনাজপুর জেলার বিরামপুর থানার মোহনপুর গ্রামে হলেও স্বামীর বাড়ি নওগাঁর রানীনগরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে।

স্ব-পরিবারে নওগাঁ শহরের পোস্ট অফিস পাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভাবকে জয় করে নিজ চেষ্টায় আজ তিনি সফল। গত বছর সদর উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে তিনি প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তার অধীনে প্রায় শতাধিক নারীকর্মী কাজ করে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হচ্ছেন।

শিরিন সুলতানা ১৯৯৫ সালে বিরামপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে বিরামপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। বিএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে ২০০৩ সালে পারিবারিকভাবে নওগাঁর রানীনগরের গোনা গ্রামের ইদ্রিস আলী মোল্লার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

স্বামীর পরিবারের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়। বলতে গেলে বাড়িটুকুই সম্বল। শ্বশুরের পরিবারে সদস্য সংখ্যা নয় জন। এত বড় সংসারের হাল শিরিনকেই ধরতে হয়। একদিকে বেকার স্বামী অন্যদিকে সংসারে দৈন্যদশা। সেলাইয়ের কাজ জানা থাকায় শিরিন সংসারের সচ্ছলতার জন্য প্রতিবেশীদের জামা কাপড় সেলাই করে আয় করেন। বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর স্বামীর ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক পদে চাকরি হয়। স্বামীর সঙ্গে স্বামীর কর্মস্থল নওগাঁ শহরে চলে আসেন।

বিয়ের বছর তিনেক পর ছেলে আল কাফি স্বাক্ষর তার কোলজুড়ে আসে। সেলাইয়ের পাশাপাশি আরও কিছু করার আগ্রহ থেকে ২০০৭ সালে ‘রূপমাধুরী বিউটি পার্লার’ থেকে ৩ মাসের একটি প্রশিক্ষণ নেন। ভাড়া বাসার তিনটি ঘরের মধ্যে একটি ঘরে বিউটি পার্লার খুলেন।

এ প্রসঙ্গে শিরিন সুলতানা বলেন, বাড়িতে বিউটি পার্লার হওয়ায় মানুষ কম আসত। এরপর তিনি অন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ২০০৯ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর ২০১৩ সালে নওগাঁ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন থেকে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সেলাই ও ব্লক বাটির ওপর ৩ মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি বুটিকস এবং বিউটি পার্লারের প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে কার্যক্রম শুরু করেন। পাশাপাশি যুব উন্নয়নে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই বছরের মধ্যে তিনি বুটিকসের আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করে আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ২০১৪ সালে তার প্রতিষ্ঠান ‘সেজ্যোতি বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিক ফ্যাশন’ এর রেজিস্ট্রেশন করেন। তার এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর এবং রাজশাহী থেকে পাইকাররা এসে পোশাক কিনে নিয়ে যান।

অর্থনৈতিকভাবে সফলতা অর্জনকারী শিরিন সুলতানা বলেন, এক সময় অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেছি। এরপর স্বামীর বাড়িতে এসেও যুদ্ধ। পরিশ্রম আর একাগ্রতার কারণে আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছলতা অর্জন করতে পেরেছি। আমার অধীনে প্রায় শতাধিক নারী কর্মী বুটিকসের কাজ করে প্রতিমাসে তারা ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা আয় করছেন। প্রতিমাসে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো থ্রি-পিস, জামা, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ ব্লক বাটিকের তৈরিকৃত অন্যান্য পোশাক বিক্রি হয়। সব খরচ বাদে প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। এছাড়া বিউটি পার্লার থেকে মাসে আসে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা।

শিরিন আরও বলেন, এ কাজে স্বামীর সার্বিক সহযোগিতা ও উৎসাহ পেয়েছি। তার চাকরি এবং আমার ব্যবসা দু’জনে পরিশ্রম করেছি। নওগাঁ মুখীবধির বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছি। আমার কর্মজীবনের আয় দিয়ে বাবার বাড়িতে প্রায় দেড় বিঘা জমি কিনেছি। এছাড়া শহরে বসবাসের মতো একটা বাড়ি তৈরি করেছি। ছেলে ভালো স্কুলে লেখাপড়া করছে। বুটিকসে যারা কাজ করতে আগ্রহী তাদের এখন কষ্ট কম করতে হবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা অনলাইনেও ব্যবসা করতে পারবে। যা আমরা করতে পারিনি। তবে চাকরির পেছনে না ঘুরে ওই টাকা যদি ব্যবসার কাজে লাগান যায় তবে বেশি সফলতা আসবে। ধৈর্য্যরে সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।

স্বামী ইদ্রিস আলী মোল্লা বলেন, ও যখন এ কাজ শুরু করতে চেয়েছিল তখন আমার পরামর্শ চেয়েছিল। সংসার ও সন্তান সামলিয়ে কাজ করায় আমার কোনো আপত্তি ছিল না। এছাড়া আমার চাকরির সামান্য বেতনে সংসার ঠিকমতো চালান যেত না। এরপর ভাবলাম তার ব্যবসা ও আমার চাকরির বেতনে দু’জনে টাকায় সংসারে উন্নয়ন হবে।

অভাবকে জয় করেছে জয়িতা শিরিন

 আব্বাস আলী 
১২ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নিম্ন-মধ্যবিত্ত এক কৃষক পরিবারে বেড়ে উঠেছেন শিরিন সুলতানা। দুই ভাইবোনের মধ্যে তিনি বড়। অভাবের সংসারেও মা শাহানা বানুর প্রবল ইচ্ছা ছিল মেয়েকে লেখাপড়া শেখান।

কিন্তু বাবা ইসমাইলের ইচ্ছা মেয়েকে যেটুকু পড়ান হয়েছে তা আর কম কিসের। তাইতো মায়ের ইচ্ছা পূরণ না করেই স্বামীর সংসারে পাড়ি জমাতে হয়েছে শিরিনকে। বাবার বাড়ি দিনাজপুর জেলার বিরামপুর থানার মোহনপুর গ্রামে হলেও স্বামীর বাড়ি নওগাঁর রানীনগরের এক প্রত্যন্ত গ্রামে।

স্ব-পরিবারে নওগাঁ শহরের পোস্ট অফিস পাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অভাবকে জয় করে নিজ চেষ্টায় আজ তিনি সফল। গত বছর সদর উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতাদের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী হিসেবে তিনি প্রথম নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তার অধীনে প্রায় শতাধিক নারীকর্মী কাজ করে আর্থিক দিক দিয়ে লাভবান হচ্ছেন।

শিরিন সুলতানা ১৯৯৫ সালে বিরামপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে বিরামপুর ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। বিএ দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময়ে ২০০৩ সালে পারিবারিকভাবে নওগাঁর রানীনগরের গোনা গ্রামের ইদ্রিস আলী মোল্লার সঙ্গে তার বিয়ে হয়।

স্বামীর পরিবারের অবস্থা অনেকটাই শোচনীয়। বলতে গেলে বাড়িটুকুই সম্বল। শ্বশুরের পরিবারে সদস্য সংখ্যা নয় জন। এত বড় সংসারের হাল শিরিনকেই ধরতে হয়। একদিকে বেকার স্বামী অন্যদিকে সংসারে দৈন্যদশা। সেলাইয়ের কাজ জানা থাকায় শিরিন সংসারের সচ্ছলতার জন্য প্রতিবেশীদের জামা কাপড় সেলাই করে আয় করেন। বিয়ের প্রায় দেড় বছর পর স্বামীর ভূমি অফিসের অফিস সহায়ক পদে চাকরি হয়। স্বামীর সঙ্গে স্বামীর কর্মস্থল নওগাঁ শহরে চলে আসেন।

বিয়ের বছর তিনেক পর ছেলে আল কাফি স্বাক্ষর তার কোলজুড়ে আসে। সেলাইয়ের পাশাপাশি আরও কিছু করার আগ্রহ থেকে ২০০৭ সালে ‘রূপমাধুরী বিউটি পার্লার’ থেকে ৩ মাসের একটি প্রশিক্ষণ নেন। ভাড়া বাসার তিনটি ঘরের মধ্যে একটি ঘরে বিউটি পার্লার খুলেন।

এ প্রসঙ্গে শিরিন সুলতানা বলেন, বাড়িতে বিউটি পার্লার হওয়ায় মানুষ কম আসত। এরপর তিনি অন্য কিছু করার পরিকল্পনা করেন। ২০০৯ সালে যুব উন্নয়ন অধিদফতর থেকে সেলাইয়ের ওপর প্রশিক্ষণ নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। এরপর ২০১৩ সালে নওগাঁ সদর উপজেলা যুব উন্নয়ন থেকে এক পরিচিত বড় ভাইয়ের মাধ্যমে সেলাই ও ব্লক বাটির ওপর ৩ মাসের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রশিক্ষণ শেষে কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ২৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনি বুটিকস এবং বিউটি পার্লারের প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে কার্যক্রম শুরু করেন। পাশাপাশি যুব উন্নয়নে ভ্রাম্যমাণ প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই বছরের মধ্যে তিনি বুটিকসের আয় থেকে ঋণ পরিশোধ করে আবারও ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেন। ২০১৪ সালে তার প্রতিষ্ঠান ‘সেজ্যোতি বিউটি পার্লার অ্যান্ড বুটিক ফ্যাশন’ এর রেজিস্ট্রেশন করেন। তার এ প্রতিষ্ঠান থেকে ঢাকা, দিনাজপুর, রংপুর, সৈয়দপুর এবং রাজশাহী থেকে পাইকাররা এসে পোশাক কিনে নিয়ে যান।

অর্থনৈতিকভাবে সফলতা অর্জনকারী শিরিন সুলতানা বলেন, এক সময় অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে বেড়ে উঠেছি। এরপর স্বামীর বাড়িতে এসেও যুদ্ধ। পরিশ্রম আর একাগ্রতার কারণে আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছলতা অর্জন করতে পেরেছি। আমার অধীনে প্রায় শতাধিক নারী কর্মী বুটিকসের কাজ করে প্রতিমাসে তারা ৩ থেকে ৮ হাজার টাকা আয় করছেন। প্রতিমাসে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকার মতো থ্রি-পিস, জামা, শাড়ি, পাঞ্জাবিসহ ব্লক বাটিকের তৈরিকৃত অন্যান্য পোশাক বিক্রি হয়। সব খরচ বাদে প্রায় ২৫-৩০ হাজার টাকার মতো লাভ থাকে। এছাড়া বিউটি পার্লার থেকে মাসে আসে প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা।

শিরিন আরও বলেন, এ কাজে স্বামীর সার্বিক সহযোগিতা ও উৎসাহ পেয়েছি। তার চাকরি এবং আমার ব্যবসা দু’জনে পরিশ্রম করেছি। নওগাঁ মুখীবধির বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হয়েছি। আমার কর্মজীবনের আয় দিয়ে বাবার বাড়িতে প্রায় দেড় বিঘা জমি কিনেছি। এছাড়া শহরে বসবাসের মতো একটা বাড়ি তৈরি করেছি। ছেলে ভালো স্কুলে লেখাপড়া করছে। বুটিকসে যারা কাজ করতে আগ্রহী তাদের এখন কষ্ট কম করতে হবে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তারা অনলাইনেও ব্যবসা করতে পারবে। যা আমরা করতে পারিনি। তবে চাকরির পেছনে না ঘুরে ওই টাকা যদি ব্যবসার কাজে লাগান যায় তবে বেশি সফলতা আসবে। ধৈর্য্যরে সঙ্গে লেগে থাকতে হবে।

স্বামী ইদ্রিস আলী মোল্লা বলেন, ও যখন এ কাজ শুরু করতে চেয়েছিল তখন আমার পরামর্শ চেয়েছিল। সংসার ও সন্তান সামলিয়ে কাজ করায় আমার কোনো আপত্তি ছিল না। এছাড়া আমার চাকরির সামান্য বেতনে সংসার ঠিকমতো চালান যেত না। এরপর ভাবলাম তার ব্যবসা ও আমার চাকরির বেতনে দু’জনে টাকায় সংসারে উন্নয়ন হবে।