চরাঞ্চলে আলোকিত সবিতা
jugantor
চরাঞ্চলে আলোকিত সবিতা

  মির্জা জাকির  

১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন চাঁদপুরের নদীবেষ্টিত উপজেলা হাইমচরের পশ্চিম চরকৃষ্ণপুর এলাকার সবিতা রায়। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সবিতা।

অভাবের তাড়নায় অল্প বয়সেই জীবন কৃষ্ণ সুতারের সঙ্গে সবিতাকে বিয়ে দেন তার দরিদ্র বাবা।

স্বামী পেশায় দিনমজুর। এক অভাব থেকে আরেক অভাবের সংসারে শুরু হয় সবিতার ‘সংসার’ নামক নতুন জীবন। কিন্তু কে জানত ‘সংসার’ নামক জীবনটি তার ‘অসম্পন্ন সংসারে’ পরিণত হবে। বিয়ের চার বছরের মাথায় সবিতার স্বামী মারা যায়। রেখে যান দুটি কন্যাসন্তান।

অনেকেই বলেছে, সবিতার নাকি ‘পোড়া কপাল’। তার দুই সন্তানের একজন তখন সাড়ে ৩ বছরের, আরেক সন্তান কোলে। সবিতার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কারণ তারাও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছেন। আশপাশের অনেকেই বলেছিলেন, তার বাচ্চাদের শিশু পরিবারে রেখে সবিতাকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে।

সবিতা তার ফুটফুটে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সেদিন তাদের বলেছিলেন, স্বামী ছাড়া কি মেয়েরা জীবন চালাতে পারে না? কিসের অচল? পৃথিবীতে কাউকে ছাড়া কেউ অচল হতে পারে না।

নানাজনের নানা কথা ও সমালোচনা এড়িয়ে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন সবিতা। দুই সন্তানকে নিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা দেখেন। কোনো মূলধনও ছিল না যে, কোনো ব্যবসা করবেন। এদিকে বড় মেয়ের বয়স ৫ বছর। তাকে স্কুলে ভর্তি করান। বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ, সেখানে তিনি কীভাবে সাহায্যের জন্য হাত পাতবেন। কী করবেন- কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

সবিতার মতে, একজনের পরামর্শে একটি এনজিও থেকে স্বল্প সুদে কিছু ঋণ নেই। তারপর চর-এলাকায় থেকে পাটি বুনার কাঁচা পাতা কিনি। কাঁচা পাতা কয়েক সপ্তাহ ধরে শুকিয়ে পাটি তৈরি করি। সেই পাটি এলাকার মানুষের কাছে বিক্রি করতে শুরু করি। একটি পাটি বুনতে দু’ঘণ্টার মতো সময় লাগত। বড় মেয়ের পড়াশোনা, ছোট মেয়ের খাবার, সংসার ও অন্যদিকে ঋণকৃত টাকার চাপ।

ছোট মেয়ে কোলের শিশু হওয়ায় দিনের বেশি সময় পাটি বুনতে পারতাম না। তাই রাতে পাটি বুনতাম। কিন্তু নতুন আরেক বিপদ দেখা দিল। ছোট মেয়ে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাটিপাতা কেনার সব টাকা মেয়ের চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। এর মাঝে কোনোদিন দিনে একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে থাকি। ক্ষুধায় ছোট মেয়ের কান্নায় প্রতিবেশীরাও বিরক্তিবোধ করেন। মেয়ের কষ্ট দূর করতে সিদ্ধান্ত নিলাম।

ছোট মেয়েকে স্থানীয় হাসপাতালে চাকরি করা এক দম্পতির কাছে দত্তক দিলাম। বড় মেয়েকে নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। ঋণকৃত টাকা কিছু গহনা বিক্রি করে পরিশোধ করলাম। এখন আর আমার কোনো সম্বল নেই।

একদিকে মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে হিংস্র মানুষের থাবা। প্রতিবেশীরা তাকে তিরস্কার করতে লাগল। সবিতা ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। সব বাধা পেরিয়ে, প্রতিবেশীদের তিরস্কার, মূলধনের অভাবকে ডিঙিয়ে তিনি এক বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করেন। ভাত না থাকায় মেয়েকে সকালে বিস্কুট ও মুড়ি খাইয়ে স্কুলে দিয়ে আসতেন। তারপর কাজের বাড়িতে চলে যেতেন।

দুপুরে স্কুলে গিয়ে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসতেন। মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে রেখে আবার কাজে আসতেন। এভাবে দু’বছর অতিবাহিত করেন। কাজের টাকা জমিয়ে পাঁচ হাজার হয়।

এত পরিশ্রমের কারণে সবিতা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জমানো টাকা দিয়ে সবিতার চিকিৎসা হয়। এলাকার এক নারীর কাছ থেকে দু’হাজার টাকা ধার করে আবারও পাটি তৈরির পাতা কিনেন। পাটি বুনে বিক্রি করেন।

এদিকে মেয়ের বয়স ৯ বছর। মেয়ের পড়ালেখার খরচও বাড়তে থাকে। তিন বছর পাটি বুনে ৭ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন। এবার এক প্রতিবেশীর কাছে এক হাজার টাকা দিয়ে রাতে অবসর সময়ে সেলাই কাজ শিখেন। নিজের সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনেন। ছেড়ে দেন পাটি বুনার কাজ। ধীরে ধীরে তার কাছে কাপড় সেলাইয়ের কাজ আসতে থাকে। বড় মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে। কিছুদিন পর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি টিনের ঘর এবং কিছু আর্থিক সাহায্যও পান তিনি।

সবিতা বলেন, ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকায় একজন নারী সহকর্মী রাখি। কিছুদিন পর আমার কাছে সেলাই কাজ শেখার জন্য অন্য মেয়েরাও আসতে শুরু করেন। আরেকটি সেলাই মেশিন কিনি।

এভাবে কাজ করার দশ হাজার টাকায় গজ কাপড় কিনি। নিজের ডিজাইনে তৈরি করি বিভিন্ন ধরনের পোশাক। আমার কর্মদক্ষতা দেখে নারীরা আমার কাছে কাজ শিখেন। কাপড় সেলাইয়ের পাশাপাশি কাপড় বিক্রিও করি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে এখন আমি আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছি। নিজ গ্রামের পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করছি। বড় মেয়ে অনার্স পড়ছে।

কিছুদিন আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। মেয়ের বিয়ের আগে জামাইয়ের অবস্থা ভালো শুনেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, সেই সংবাদ সঠিক নয়। মেয়েকে নিয়ে এক ধরনের দুশ্চিন্তায় আছি। করোনার কারণে সেলাইর অর্ডার একেবারেই কমে গেছে। এরপরও জীবনের কাছে হারতে রাজি নই।

চরাঞ্চলে আলোকিত সবিতা

 মির্জা জাকির 
১৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন চাঁদপুরের নদীবেষ্টিত উপজেলা হাইমচরের পশ্চিম চরকৃষ্ণপুর এলাকার সবিতা রায়। পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি দরিদ্র পরিবারের মেয়ে সবিতা।

অভাবের তাড়নায় অল্প বয়সেই জীবন কৃষ্ণ সুতারের সঙ্গে সবিতাকে বিয়ে দেন তার দরিদ্র বাবা।

স্বামী পেশায় দিনমজুর। এক অভাব থেকে আরেক অভাবের সংসারে শুরু হয় সবিতার ‘সংসার’ নামক নতুন জীবন। কিন্তু কে জানত ‘সংসার’ নামক জীবনটি তার ‘অসম্পন্ন সংসারে’ পরিণত হবে। বিয়ের চার বছরের মাথায় সবিতার স্বামী মারা যায়। রেখে যান দুটি কন্যাসন্তান।

অনেকেই বলেছে, সবিতার নাকি ‘পোড়া কপাল’। তার দুই সন্তানের একজন তখন সাড়ে ৩ বছরের, আরেক সন্তান কোলে। সবিতার শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়স্বজন নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। কারণ তারাও দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করে চলছেন। আশপাশের অনেকেই বলেছিলেন, তার বাচ্চাদের শিশু পরিবারে রেখে সবিতাকে আবার বিয়ের পিঁড়িতে বসতে।

সবিতা তার ফুটফুটে মেয়েদের দিকে তাকিয়ে সেদিন তাদের বলেছিলেন, স্বামী ছাড়া কি মেয়েরা জীবন চালাতে পারে না? কিসের অচল? পৃথিবীতে কাউকে ছাড়া কেউ অচল হতে পারে না।

নানাজনের নানা কথা ও সমালোচনা এড়িয়ে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেন সবিতা। দুই সন্তানকে নিয়ে চারদিকে ধোঁয়াশা দেখেন। কোনো মূলধনও ছিল না যে, কোনো ব্যবসা করবেন। এদিকে বড় মেয়ের বয়স ৫ বছর। তাকে স্কুলে ভর্তি করান। বাপের বাড়ির অবস্থা খারাপ, সেখানে তিনি কীভাবে সাহায্যের জন্য হাত পাতবেন। কী করবেন- কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না।

সবিতার মতে, একজনের পরামর্শে একটি এনজিও থেকে স্বল্প সুদে কিছু ঋণ নেই। তারপর চর-এলাকায় থেকে পাটি বুনার কাঁচা পাতা কিনি। কাঁচা পাতা কয়েক সপ্তাহ ধরে শুকিয়ে পাটি তৈরি করি। সেই পাটি এলাকার মানুষের কাছে বিক্রি করতে শুরু করি। একটি পাটি বুনতে দু’ঘণ্টার মতো সময় লাগত। বড় মেয়ের পড়াশোনা, ছোট মেয়ের খাবার, সংসার ও অন্যদিকে ঋণকৃত টাকার চাপ।

ছোট মেয়ে কোলের শিশু হওয়ায় দিনের বেশি সময় পাটি বুনতে পারতাম না। তাই রাতে পাটি বুনতাম। কিন্তু নতুন আরেক বিপদ দেখা দিল। ছোট মেয়ে খুবই অসুস্থ হয়ে পড়ে। পাটিপাতা কেনার সব টাকা মেয়ের চিকিৎসার পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। এর মাঝে কোনোদিন দিনে একবেলা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাতে থাকি। ক্ষুধায় ছোট মেয়ের কান্নায় প্রতিবেশীরাও বিরক্তিবোধ করেন। মেয়ের কষ্ট দূর করতে সিদ্ধান্ত নিলাম।

ছোট মেয়েকে স্থানীয় হাসপাতালে চাকরি করা এক দম্পতির কাছে দত্তক দিলাম। বড় মেয়েকে নিয়ে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলাম। ঋণকৃত টাকা কিছু গহনা বিক্রি করে পরিশোধ করলাম। এখন আর আমার কোনো সম্বল নেই।

একদিকে মেয়ে হারানোর যন্ত্রণা, অন্যদিকে হিংস্র মানুষের থাবা। প্রতিবেশীরা তাকে তিরস্কার করতে লাগল। সবিতা ভেঙে পড়ার মেয়ে নয়। সব বাধা পেরিয়ে, প্রতিবেশীদের তিরস্কার, মূলধনের অভাবকে ডিঙিয়ে তিনি এক বাসায় গৃহপরিচারিকা হিসেবে কাজ করেন। ভাত না থাকায় মেয়েকে সকালে বিস্কুট ও মুড়ি খাইয়ে স্কুলে দিয়ে আসতেন। তারপর কাজের বাড়িতে চলে যেতেন।

দুপুরে স্কুলে গিয়ে মেয়েকে বাসায় নিয়ে আসতেন। মেয়েকে শ্বশুর-শাশুড়ির কাছে রেখে আবার কাজে আসতেন। এভাবে দু’বছর অতিবাহিত করেন। কাজের টাকা জমিয়ে পাঁচ হাজার হয়।

এত পরিশ্রমের কারণে সবিতা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। জমানো টাকা দিয়ে সবিতার চিকিৎসা হয়। এলাকার এক নারীর কাছ থেকে দু’হাজার টাকা ধার করে আবারও পাটি তৈরির পাতা কিনেন। পাটি বুনে বিক্রি করেন।

এদিকে মেয়ের বয়স ৯ বছর। মেয়ের পড়ালেখার খরচও বাড়তে থাকে। তিন বছর পাটি বুনে ৭ হাজার টাকা সঞ্চয় করেন। এবার এক প্রতিবেশীর কাছে এক হাজার টাকা দিয়ে রাতে অবসর সময়ে সেলাই কাজ শিখেন। নিজের সঞ্চয় করা টাকা দিয়ে একটি সেলাই মেশিন কিনেন। ছেড়ে দেন পাটি বুনার কাজ। ধীরে ধীরে তার কাছে কাপড় সেলাইয়ের কাজ আসতে থাকে। বড় মেয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকে। কিছুদিন পর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় একটি টিনের ঘর এবং কিছু আর্থিক সাহায্যও পান তিনি।

সবিতা বলেন, ধীরে ধীরে কাজের পরিধি বাড়তে থাকায় একজন নারী সহকর্মী রাখি। কিছুদিন পর আমার কাছে সেলাই কাজ শেখার জন্য অন্য মেয়েরাও আসতে শুরু করেন। আরেকটি সেলাই মেশিন কিনি।

এভাবে কাজ করার দশ হাজার টাকায় গজ কাপড় কিনি। নিজের ডিজাইনে তৈরি করি বিভিন্ন ধরনের পোশাক। আমার কর্মদক্ষতা দেখে নারীরা আমার কাছে কাজ শিখেন। কাপড় সেলাইয়ের পাশাপাশি কাপড় বিক্রিও করি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথ পাড়ি দিয়ে এখন আমি আর্থিকভাবে কিছুটা সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেছি। নিজ গ্রামের পিছিয়ে পড়া হতদরিদ্র নারীদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে কাজ করছি। বড় মেয়ে অনার্স পড়ছে।

কিছুদিন আগে মেয়ের বিয়ে দিয়েছি। মেয়ের বিয়ের আগে জামাইয়ের অবস্থা ভালো শুনেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি, সেই সংবাদ সঠিক নয়। মেয়েকে নিয়ে এক ধরনের দুশ্চিন্তায় আছি। করোনার কারণে সেলাইর অর্ডার একেবারেই কমে গেছে। এরপরও জীবনের কাছে হারতে রাজি নই।