মোহে নয় শান্তিতেই জীবনের পূর্ণতা
jugantor
মোহে নয় শান্তিতেই জীবনের পূর্ণতা
লুইস গ্লুক

  সাব্বিন হাসান  

১৯ অক্টোবর ২০২০, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বেই রাতারাতি আলোচ্য হয়ে উঠেছেন ‘গ্লুক’ নামে। পুরো নাম লুইস গ্লুক। জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল। জন্মস্থান নিউইয়র্ক শহরে। তবে বেড়ে উঠেছেন লং আইল্যান্ডে। বর্তমানে তিনি ক্যামব্র্রিজ শহরে থাকেন। ২০২০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তুমুল আলোচনায় আসেন এ মার্কিন কবি-লেখক।

জীবন-মৃত্যুর কঠিন সন্ধিক্ষণ দেখেছেন লুইস। দুর্ভাগ্যের কারণে শৈশব থেকেই অ্যানারেক্সিয়া নার্ভালসা রোগে ভুগেছেন বহুদিন। ফলে সাত বছর থেরাপি নিতে হয়। বাবা ড্যানিয়েল গ্লুক। মা বিয়েট্রেস গ্লুক। পরিবারে আছে অদূরে ছোট বোন।

পারিবারিক জীবনে ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা আর বোনের সঙ্গে চমৎকার সুুসম্পর্ক ছিল। তার লেখায় এসব উপজীব্য আর সর্বজনীন ফুটে ওঠে।। মিথ আর শাস্ত্রীয় দৃষ্টি থেকে প্রেরণা নিয়ে বিশ্বজনীন হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার সব রচনায়।

গর্ডার্ড কলেজে কিছুদিন কবিতা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী লুইস এখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। কানাডিয়ান লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড এবং জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির মতো ব্যক্তিত্বকে পাশ কাটিয়ে লুইস এবারে জিতে নেন সাহিত্যের নোবেল। ১৯৯৩ সালে পুলিৎজার আর (২০০৩-২০০৪) ইউএস পোয়েট লরিয়েট খেতাব অর্জন করেন।

লুইস তার কবিতার মধ্য দিয়ে মানব জীবনের বহুমাত্রিক সংকট, অভিপ্সা এবং অবশ্যই প্রকৃতির কথা তুলে ধরেন। নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্নতা তার কবিতার অন্যতম ভাবার্থ। আলোচকেরা তার কবিতায় খুঁজে পেয়েছেন আত্মজৈবনিকতার সঙ্গে ধ্রুপদী মিথের গভীর আন্তঃসম্পর্ক। বিশেষ কাজের মধ্যে আছে ১২টি কবিতার বই। সাহিত্যের ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তুমুল পাঠকপ্রিয় হয়। এবারে নোবেল কমিটি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণায় বলেন, সব সৃষ্টিতেই স্পষ্টবাদিতা নিশ্চিত করেছে লুইস। সত্যকে কখনও এতটুকুও আড়াল করার চেষ্টা করেননি। সময়ের বিপরীতে গিয়ে কঠিনতম সত্য বলা সহজ নয়। সস্তা জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা না করে নিজের অন্তর্জালের সত্যটা অকপটে শব্দের বুননে সুস্পষ্ট করেছেন।

দ্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি ১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে আসছে। এখন অবধি ১১২ বার এ পুরস্কার দেয়া হয়। বিজয়ী হয়েছেন ১১৬ জন কবি-সাহিত্যিক। এ বছরের ৮ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় ১১৩তম সাহিত্য পুরস্কার। তাবৎ বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের সব জল্পনা-কল্পনার ইতি টেনে একেবারেই আচমকা উচ্চারিত যার নাম, তিনিই লুইস গ্লুুক। সাহিত্যিকদের আলোচনায় কোনো সমীকরণেই আসেনি লুইসের নাম।

সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির ইতিহাসে এখন অবধি ১৪ জন নারী তা অর্জন করেছেন। এবার সংখ্যাটা বাড়ালেন লুইস গ্লুক। উইলিয়াম কলেজ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশ্বের স্বনামধন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন লুইস। স্পর্শকাতরতা পূর্ণ তার কবিতার প্রতিটি ছত্র। ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য লুইসকে দেয়া হয় ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল’ পুরস্কার।

১৯৬৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফার্স্টবর্ন’ প্রকাশ পায়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় বহুল আলোচিত ‘ফেথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’ কাব্যগ্রন্থ। ২০১২ সালে কাব্য সংকলন ‘পোয়েমস ১৯৬২-২০১২’ লস এঞ্জেলেস টাইমস বুক পুরস্কার পায়।

লুইস গ্লুকের প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ পদক, পুলিৎজার পুরস্কার আর ন্যাশনাল বুক পুরস্কার। ২০০৩-০৪ সালে লুইস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কবি। আমেরিকান অরিজিন্যালিটি আর প্রুফস অ্যান্ড থিয়োরিজ তার জনপ্রিয় দুটি কবিতা প্রবন্ধ। নিজেকে বিশেষ কোনো অভিধায় দেখেন না। এমনকি নিজেকে ‘ফেমিনিস্ট’ বলতেও নারাজ। জীবন-মৃত্যুর শাশ্বত জীবনচক্র আর প্রকৃতির অনিঃশেষ রহস্যকেই হাতড়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন।

লুইস তার রচনায় জীবনের যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা আর প্রকৃতির নৈবদ্য নিপুণ ভাষাশৈলীতে লিখেছেন। বিশেষ করে বিষণ্নতা আর একাকিত্ব গভীরতা নিয়ে লিখেছেন সবচেয়ে বেশি।

নাইন-ইলেভেনের মর্মান্তিক ঘটনা লুইসের মনে দাগ কেটে যায়। এ ঘটনা তাকে জীবন গুটিয়ে ফেলার বদলে জীবনকে উদযাপন করতেই বেশি উৎসাহিত করে। তার রচনা সমগ্রে আর ভাবনায় অনেক সময় পৌরাণিক ঘটনা আর ইতিহাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়। জীবনে সবকিছু পাওয়ার জন্য একাকি হয়ে আনন্দকেই বিসর্জন দেয়া প্রকৃতি বিরুদ্ধ আচরণ। রহস্যময় মানবজীবনের বাঁকে বাঁকে কত্তকিছুই না অধরা রয়ে যায়। নির্মল প্রশান্তিতেই জীবনের পূর্ণতা। প্রকৃতির সুরক্ষা যেমন প্রকৃতিতেই দৃশ্যত। মানবজীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। মনের অন্তর্জালে জমে থাকা বেদনার কঠিন ভার শুধু নির্মোহ সুখেই নির্ভার হয়। এ জীবন শুধু মোহের পেছনে ছুটে নয়, বরং শান্তির খোঁজে ব্যয় করা শ্রেয়। নিজের জীবনাদর্শের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন লুইস গ্লুক।

মোহে নয় শান্তিতেই জীবনের পূর্ণতা

লুইস গ্লুক
 সাব্বিন হাসান 
১৯ অক্টোবর ২০২০, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সারা বিশ্বেই রাতারাতি আলোচ্য হয়ে উঠেছেন ‘গ্লুক’ নামে। পুরো নাম লুইস গ্লুক। জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ এপ্রিল। জন্মস্থান নিউইয়র্ক শহরে। তবে বেড়ে উঠেছেন লং আইল্যান্ডে। বর্তমানে তিনি ক্যামব্র্রিজ শহরে থাকেন। ২০২০ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়ে তুমুল আলোচনায় আসেন এ মার্কিন কবি-লেখক।

জীবন-মৃত্যুর কঠিন সন্ধিক্ষণ দেখেছেন লুইস। দুর্ভাগ্যের কারণে শৈশব থেকেই অ্যানারেক্সিয়া নার্ভালসা রোগে ভুগেছেন বহুদিন। ফলে সাত বছর থেরাপি নিতে হয়। বাবা ড্যানিয়েল গ্লুক। মা বিয়েট্রেস গ্লুক। পরিবারে আছে অদূরে ছোট বোন।

পারিবারিক জীবনে ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা আর বোনের সঙ্গে চমৎকার সুুসম্পর্ক ছিল। তার লেখায় এসব উপজীব্য আর সর্বজনীন ফুটে ওঠে।। মিথ আর শাস্ত্রীয় দৃষ্টি থেকে প্রেরণা নিয়ে বিশ্বজনীন হওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল তার সব রচনায়।

গর্ডার্ড কলেজে কিছুদিন কবিতা বিষয়ে শিক্ষকতা করেছেন। বর্তমানে ৭৭ বছর বয়সী লুইস এখন ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। কানাডিয়ান লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউড এবং জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামির মতো ব্যক্তিত্বকে পাশ কাটিয়ে লুইস এবারে জিতে নেন সাহিত্যের নোবেল। ১৯৯৩ সালে পুলিৎজার আর (২০০৩-২০০৪) ইউএস পোয়েট লরিয়েট খেতাব অর্জন করেন।

লুইস তার কবিতার মধ্য দিয়ে মানব জীবনের বহুমাত্রিক সংকট, অভিপ্সা এবং অবশ্যই প্রকৃতির কথা তুলে ধরেন। নিঃসঙ্গতা আর বিষণ্নতা তার কবিতার অন্যতম ভাবার্থ। আলোচকেরা তার কবিতায় খুঁজে পেয়েছেন আত্মজৈবনিকতার সঙ্গে ধ্রুপদী মিথের গভীর আন্তঃসম্পর্ক। বিশেষ কাজের মধ্যে আছে ১২টি কবিতার বই। সাহিত্যের ওপর বেশকিছু প্রবন্ধ তুমুল পাঠকপ্রিয় হয়। এবারে নোবেল কমিটি সাহিত্য পুরস্কার ঘোষণায় বলেন, সব সৃষ্টিতেই স্পষ্টবাদিতা নিশ্চিত করেছে লুইস। সত্যকে কখনও এতটুকুও আড়াল করার চেষ্টা করেননি। সময়ের বিপরীতে গিয়ে কঠিনতম সত্য বলা সহজ নয়। সস্তা জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা না করে নিজের অন্তর্জালের সত্যটা অকপটে শব্দের বুননে সুস্পষ্ট করেছেন।

দ্য সুইডিশ অ্যাকাডেমি ১৯০১ সাল থেকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দিয়ে আসছে। এখন অবধি ১১২ বার এ পুরস্কার দেয়া হয়। বিজয়ী হয়েছেন ১১৬ জন কবি-সাহিত্যিক। এ বছরের ৮ অক্টোবর ঘোষণা করা হয় ১১৩তম সাহিত্য পুরস্কার। তাবৎ বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের সব জল্পনা-কল্পনার ইতি টেনে একেবারেই আচমকা উচ্চারিত যার নাম, তিনিই লুইস গ্লুুক। সাহিত্যিকদের আলোচনায় কোনো সমীকরণেই আসেনি লুইসের নাম।

সাহিত্যে নোবেল প্রাপ্তির ইতিহাসে এখন অবধি ১৪ জন নারী তা অর্জন করেছেন। এবার সংখ্যাটা বাড়ালেন লুইস গ্লুক। উইলিয়াম কলেজ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও বিশ্বের স্বনামধন্য সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনা করেছেন লুইস। স্পর্শকাতরতা পূর্ণ তার কবিতার প্রতিটি ছত্র। ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব একিলিস’ কাব্যগ্রন্থের জন্য লুইসকে দেয়া হয় ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল’ পুরস্কার।

১৯৬৮ সালে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফার্স্টবর্ন’ প্রকাশ পায়। ২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় বহুল আলোচিত ‘ফেথফুল অ্যান্ড ভার্চুয়াস নাইট’ কাব্যগ্রন্থ। ২০১২ সালে কাব্য সংকলন ‘পোয়েমস ১৯৬২-২০১২’ লস এঞ্জেলেস টাইমস বুক পুরস্কার পায়।

লুইস গ্লুকের প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে ন্যাশনাল হিউম্যানিটিজ পদক, পুলিৎজার পুরস্কার আর ন্যাশনাল বুক পুরস্কার। ২০০৩-০৪ সালে লুইস ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় কবি। আমেরিকান অরিজিন্যালিটি আর প্রুফস অ্যান্ড থিয়োরিজ তার জনপ্রিয় দুটি কবিতা প্রবন্ধ। নিজেকে বিশেষ কোনো অভিধায় দেখেন না। এমনকি নিজেকে ‘ফেমিনিস্ট’ বলতেও নারাজ। জীবন-মৃত্যুর শাশ্বত জীবনচক্র আর প্রকৃতির অনিঃশেষ রহস্যকেই হাতড়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন।

লুইস তার রচনায় জীবনের যন্ত্রণা, আকাঙ্ক্ষা আর প্রকৃতির নৈবদ্য নিপুণ ভাষাশৈলীতে লিখেছেন। বিশেষ করে বিষণ্নতা আর একাকিত্ব গভীরতা নিয়ে লিখেছেন সবচেয়ে বেশি।

নাইন-ইলেভেনের মর্মান্তিক ঘটনা লুইসের মনে দাগ কেটে যায়। এ ঘটনা তাকে জীবন গুটিয়ে ফেলার বদলে জীবনকে উদযাপন করতেই বেশি উৎসাহিত করে। তার রচনা সমগ্রে আর ভাবনায় অনেক সময় পৌরাণিক ঘটনা আর ইতিহাসের ছোঁয়া পাওয়া যায়। জীবনে সবকিছু পাওয়ার জন্য একাকি হয়ে আনন্দকেই বিসর্জন দেয়া প্রকৃতি বিরুদ্ধ আচরণ। রহস্যময় মানবজীবনের বাঁকে বাঁকে কত্তকিছুই না অধরা রয়ে যায়। নির্মল প্রশান্তিতেই জীবনের পূর্ণতা। প্রকৃতির সুরক্ষা যেমন প্রকৃতিতেই দৃশ্যত। মানবজীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। মনের অন্তর্জালে জমে থাকা বেদনার কঠিন ভার শুধু নির্মোহ সুখেই নির্ভার হয়। এ জীবন শুধু মোহের পেছনে ছুটে নয়, বরং শান্তির খোঁজে ব্যয় করা শ্রেয়। নিজের জীবনাদর্শের কথা এভাবেই ব্যক্ত করেছেন লুইস গ্লুক।