করোনাকালে নারী উদ্যোক্তা আফরিন
jugantor
করোনাকালে নারী উদ্যোক্তা আফরিন
আফরিন শাহনাজ তেরো বছর কাজ করেছেন দুটি মিডিয়ায়। কোভিড-১৯-এর মহামারিতে তিনি চাকরি হারান। চাকরি হারিয়েও মুষড়ে পড়েননি তিনি। নতুন উদ্যোমে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। লিখেছেন-

  শিল্পী নাগ  

১৮ জানুয়ারি ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯-এর মহামারিতে গত বছরের ২০ আগস্ট আফরিন শাহনাজের চাকরিটি চলে যায়। আট মাসের বেতনসহ পাওনাদি পেয়ে যান ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় কি করবেন ভাবছিলেন তিনি। শুধু ঘরকন্না করে সময় কাটাবেন তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কৈশোরেই রান্নার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। এ ঝোঁকটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইলেন। গত বছরের আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন অনলাইনে খাবার ব্যবসা। ‘টেস্ট কিংডম’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাবারের অর্ডার পান। ফোনেও খাবারের অর্ডার পেয়ে থাকেন।

এর আগে চাকরির পাশাপাশি কুকিজ- বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, জন্মদিনের কেক, পার্টি কেক, পিৎজা, বন ইত্যাদি তৈরি করতেন। সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীরা খেয়ে পছন্দ করতেন। অর্ডারও দিতেন। তারা প্রতি কেজি বিভিন্ন স্বাদের বিস্কুট ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনতেন।

এ প্রসঙ্গে আফরিন শাহনাজ বলেন, কুকিজের বাজার তৈরিতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন আমার মামাতো ভাই। ও আমাকে কুকিজ গিফট বক্সের অর্ডার দিত। কয়েক স্বাদের বিস্কুট মিলে কুকিজ গিফট বক্স তৈরি করি। ও যেখানে বেড়াতে যায় সেখানে কুকিজ গিফট বক্স উপহার দেয়। এভাবে আমার কুকিজের অর্ডারের চাহিদা বাড়তে থাকে। পার্টি কেক, জন্মদিনের কেক, লেমন কেক তৈরি করি। বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জন্মদিনের কেকের অর্ডার বেশি পাই। উই গ্রুপে ‘সমুদ্র বিলাস’ নামে জন্মদিনের লেমন কেক পোস্ট করেছিলাম। সাড়ে ছয় হাজার লাইক পড়ে। এতে লেমন কেক ছাড়াও বিভিন্ন স্বাদের কেক তৈরির প্রতি আগ্রহ বাড়ে। অনলাইনে লেমন কেকসহ বিভিন্ন স্বাদের কেকের অর্ডার পাই। দেড় থেকে দুই পাউন্ড লেমন কেকের দাম পড়বে সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

লকডাউনের সময়ে ঘরে থেকেই আগস্ট মাস পর্যন্ত অফিস করেন আফরিন শাহনাজ। এ সময়টিকে কাজে লাগান তিনি। রান্না জানলেও নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে অনলাইনে রন্ধন বিষয়ক ছোট ছোট কোর্সগুলো সম্পন্ন করেন। ব্রেকিং আইটেম- পেস্টি, কুকিজ, ব্রাউনি ইত্যাদি। জ্যাম-জেলির উপরেও কোর্স করেন। একেকটি কোর্সে খরচ পড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

আফরিন শাহনাজের এ কাজের সহযোগী হয়েছেন তার বান্ধবী নাসরীন সুলতানা। নাসরীন আশা ইউনির্ভাসিটির প্রশাসন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। কোভিড-১৯-এর কারণে জুলাই মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না। চাকরি আছে কি নেই সেটিও তাকে জানানো হয়নি। চাকরির এই অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে ভাবতে তার ভেতর হতাশা কাজ করে। বান্ধবীর বাসা তার বাসার কাছেই। বান্ধবীকে হতাশা থেকে বের করে আনতে কুকিজ, কেক তৈরি শেখান। এরপর দু’জনে মিলে খাবারের অনলাইন ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই বান্ধবী মিলে এখন তৈরি করেন কুকিজ, কেকসহ নানা আইটেম। স্বামী কাজী জাহিদুল হক কেনাকাটায় সহযোগিতা করেন। মেয়ে জয়িতাও মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করে। এখন পার্টি, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে লাঞ্চ, ডিনারে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পোলাও, মুরগির রোস্ট, হাঁস ভুনা, চাইনিজ সবজি, শাহী জর্দা, পুর্ডিং ইত্যাদি খাবার সরবরাহ করেন।

তিন বোনের মধ্যে আফরিন শাহনাজ বড়। নোয়াখালীর মেয়ে আফরিন শাহনাজের জন্ম চিটাগাংয়ে। বাবা আহসান মালেক একজন বিশিষ্ট ছড়াকার। বাবার ব্যবসার সুবাদে চিটাগাংয়ে তার শৈশব কাটে। তেরো বছর বয়সে ১৯৯৩ সালে সপরিবারে ঢাকায় আসেন। ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় এমকম করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স করেন। প্রথম আলোতে সহকারী গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে চার বছর কাজ করার পর চলে যান মাছরাঙা টেলিভিশনে। আর্কাইভের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে তিন বছর কাজ করে আবার ফিরে আসেন প্রথম আলোতে। পদোন্নতি পেয়ে আর্কাইভের সিনিয়র আর্কিভিস্ট হন।

চাকরি হারিয়ে মুষড়ে না পড়ে দুই বান্ধবী ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। সবার সহযোগিতায় কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে জয় করেছেন একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।

করোনাকালে নারী উদ্যোক্তা আফরিন

আফরিন শাহনাজ তেরো বছর কাজ করেছেন দুটি মিডিয়ায়। কোভিড-১৯-এর মহামারিতে তিনি চাকরি হারান। চাকরি হারিয়েও মুষড়ে পড়েননি তিনি। নতুন উদ্যোমে একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। লিখেছেন-
 শিল্পী নাগ 
১৮ জানুয়ারি ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

কোভিড-১৯-এর মহামারিতে গত বছরের ২০ আগস্ট আফরিন শাহনাজের চাকরিটি চলে যায়। আট মাসের বেতনসহ পাওনাদি পেয়ে যান ঠিকই। কিন্তু হঠাৎ চাকরি চলে যাওয়ায় কি করবেন ভাবছিলেন তিনি। শুধু ঘরকন্না করে সময় কাটাবেন তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না। কৈশোরেই রান্নার প্রতি তার ঝোঁক ছিল। এ ঝোঁকটাকেই পেশা হিসেবে বেছে নিতে চাইলেন। গত বছরের আগস্ট থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেন অনলাইনে খাবার ব্যবসা। ‘টেস্ট কিংডম’ নামে ফেসবুকে একটি পেজ খোলেন। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের খাবারের অর্ডার পান। ফোনেও খাবারের অর্ডার পেয়ে থাকেন।

এর আগে চাকরির পাশাপাশি কুকিজ- বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, জন্মদিনের কেক, পার্টি কেক, পিৎজা, বন ইত্যাদি তৈরি করতেন। সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীরা খেয়ে পছন্দ করতেন। অর্ডারও দিতেন। তারা প্রতি কেজি বিভিন্ন স্বাদের বিস্কুট ৪০০ থেকে ৬৫০ টাকায় কিনতেন।

এ প্রসঙ্গে আফরিন শাহনাজ বলেন, কুকিজের বাজার তৈরিতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন আমার মামাতো ভাই। ও আমাকে কুকিজ গিফট বক্সের অর্ডার দিত। কয়েক স্বাদের বিস্কুট মিলে কুকিজ গিফট বক্স তৈরি করি। ও যেখানে বেড়াতে যায় সেখানে কুকিজ গিফট বক্স উপহার দেয়। এভাবে আমার কুকিজের অর্ডারের চাহিদা বাড়তে থাকে। পার্টি কেক, জন্মদিনের কেক, লেমন কেক তৈরি করি। বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জন্মদিনের কেকের অর্ডার বেশি পাই। উই গ্রুপে ‘সমুদ্র বিলাস’ নামে জন্মদিনের লেমন কেক পোস্ট করেছিলাম। সাড়ে ছয় হাজার লাইক পড়ে। এতে লেমন কেক ছাড়াও বিভিন্ন স্বাদের কেক তৈরির প্রতি আগ্রহ বাড়ে। অনলাইনে লেমন কেকসহ বিভিন্ন স্বাদের কেকের অর্ডার পাই। দেড় থেকে দুই পাউন্ড লেমন কেকের দাম পড়বে সাড়ে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা।

লকডাউনের সময়ে ঘরে থেকেই আগস্ট মাস পর্যন্ত অফিস করেন আফরিন শাহনাজ। এ সময়টিকে কাজে লাগান তিনি। রান্না জানলেও নিজেকে আরও দক্ষ করে তুলতে অনলাইনে রন্ধন বিষয়ক ছোট ছোট কোর্সগুলো সম্পন্ন করেন। ব্রেকিং আইটেম- পেস্টি, কুকিজ, ব্রাউনি ইত্যাদি। জ্যাম-জেলির উপরেও কোর্স করেন। একেকটি কোর্সে খরচ পড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

আফরিন শাহনাজের এ কাজের সহযোগী হয়েছেন তার বান্ধবী নাসরীন সুলতানা। নাসরীন আশা ইউনির্ভাসিটির প্রশাসন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। কোভিড-১৯-এর কারণে জুলাই মাস থেকে বেতন পাচ্ছেন না। চাকরি আছে কি নেই সেটিও তাকে জানানো হয়নি। চাকরির এই অনিশ্চয়তার কথা ভাবতে ভাবতে তার ভেতর হতাশা কাজ করে। বান্ধবীর বাসা তার বাসার কাছেই। বান্ধবীকে হতাশা থেকে বের করে আনতে কুকিজ, কেক তৈরি শেখান। এরপর দু’জনে মিলে খাবারের অনলাইন ব্যবসাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দুই বান্ধবী মিলে এখন তৈরি করেন কুকিজ, কেকসহ নানা আইটেম। স্বামী কাজী জাহিদুল হক কেনাকাটায় সহযোগিতা করেন। মেয়ে জয়িতাও মাঝেমধ্যে সহযোগিতা করে। এখন পার্টি, জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, বিভিন্ন ঘরোয়া অনুষ্ঠানে লাঞ্চ, ডিনারে ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পোলাও, মুরগির রোস্ট, হাঁস ভুনা, চাইনিজ সবজি, শাহী জর্দা, পুর্ডিং ইত্যাদি খাবার সরবরাহ করেন।

তিন বোনের মধ্যে আফরিন শাহনাজ বড়। নোয়াখালীর মেয়ে আফরিন শাহনাজের জন্ম চিটাগাংয়ে। বাবা আহসান মালেক একজন বিশিষ্ট ছড়াকার। বাবার ব্যবসার সুবাদে চিটাগাংয়ে তার শৈশব কাটে। তেরো বছর বয়সে ১৯৯৩ সালে সপরিবারে ঢাকায় আসেন। ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনায় এমকম করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৬ সালে তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনায় মাস্টার্স করেন। প্রথম আলোতে সহকারী গ্রন্থাগারিক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে চার বছর কাজ করার পর চলে যান মাছরাঙা টেলিভিশনে। আর্কাইভের সহকারী ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখানে তিন বছর কাজ করে আবার ফিরে আসেন প্রথম আলোতে। পদোন্নতি পেয়ে আর্কাইভের সিনিয়র আর্কিভিস্ট হন।

চাকরি হারিয়ে মুষড়ে না পড়ে দুই বান্ধবী ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। পারিবারিক সহযোগিতার পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন। সবার সহযোগিতায় কোভিড-১৯-এর অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে জয় করেছেন একজন নারী উদ্যোক্তা হিসেবে।