হারিয়ে যাচ্ছে সোনালি শৈশব

  রীতা ভৌমিক ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হারিয়ে যাচ্ছে সোনালি শৈশব
হুমডুম জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে ক্যাম্পে ফিরছেন ফিরছে

মিয়ানমারের রাখাইনে বার্মা সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণের শিকার হয়েছে শিশুরাও। মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করে কেউ অভিভাবকের সঙ্গে, কেউ বাবা-মাকে হারিয়ে জনস্রোতে মিশে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।

দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অনেক কষ্ট-বেদনা পেরিয়ে নতুন জীবন পেয়েছে তারা। বাংলাদেশে এসেও তাদের কম ধকল, কষ্ট পোহাতে হয়নি। এখনও হচ্ছে। অনাহারে থাকা দুর্বল ছোট্ট শরীর নিয়ে শিশুরা একটু খাবারের আশায়, সামান্য ত্রাণের জন্য রাস্তায় রাস্তায় দৌড়িয়েছে।

ত্রাণ না পেলে অনাহারে থাকতে হবে তাদের পুরো পরিবারকে। পিতৃমাতৃহীন শিশুরা নিজের খাবার সংগ্রহের জন্য একাই ছুটত মাইলের পর মাইল। অনেকে ত্রাণ পেত। অনেকে টাকাও পেত। আবার অনেকের ভাগ্যে কিছুই জুটতও না।

পাহাড়ের ওপর, টিলায় খোলা আকাশের নিচে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কোনোরকমে জীবন পার করছে এসব শিশুরা। তাদেরই একজন নূরবানু। সাত বছর বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় ঘটেছে তার। প্রথমদিকে একটু খাবারের পানির জন্য এক-দুই কিলোমিটার পাহাড়ি খাড়া উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসত।

বড় বড় দুই বোতলে পানি ভরে। অথবা কলসিতে পানি ভরে আবার ওভাবেই টিলায় ফিরে যেত। ক্যাম্পে ১০-২০টি পরিবারের পানির চাহিদার জন্য একটি টিউবওয়েল দেয়া হয়েছে। কিন্তু টিউবওয়েলের পানিতে আয়রন বেশি। এর ওপর আবার মাঝেমধ্যে পানি ওঠে না। সেই দূর থেকেই শিশুদের পানি টেনে আনতে হয় পরিবারের সদস্যদের পানির চাহিদা মেটানোর জন্য।

দুপুর ছুঁইছুঁই। বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির হুমডুম এলাকার পাহাড়ি জঙ্গল থেকে লাকড়ি সংগ্রহ করে পাহাড়ি পথ ধরে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে ফিরছিলেন মরিয়ম বেগম। তার হাতে লাকড়ির বোঝা।

তার সঙ্গে দুই মেয়ে বারো বছরের সুফিয়া খাতুন, নয় বছরের রোজিনা বিবিও রয়েছে। ওরা এসেছে মিয়ানমারের রাখাইনের মংডু গলিবাজার থেকে। একই ক্যাম্পের দশ বছরের সফুরা বেগম ও নয় বছরের মোহাম্মদ আলম দুই ভাইবোন, ওরা এসেছে মংডুর ফকিরাবাজার থেকে। আট বছরের আসমা বেগম ও সাত বছরের সৈয়দ হোসেনও রয়েছে।

ওরা এসেছে মংডুর খাইচুরাতা থেকে। তাদের কারও মাথায়, কারও কাঁধে, কারও হাতে লাকড়ির বোঝা।

মরিয়ম বেগমের মতে, খুব ভোরে লাকড়ি সংগ্রহে বের হয়েছেন। পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে আমার দুই মেয়ে, দুই প্রতিবেশীর সন্তানদের নিয়ে হুমডুমে যাই। লাকড়ি সংগ্রহ করে আবার পাঁচ কিলোমিটার হেঁটে ক্যাম্পে ফিরছি। সকাল থেকে ওরা কিছুই খায়নি। লাকড়ি নিয়ে ফিরলে রান্না হবে। লাকড়ি না পেলে সবাইকে না খেয়ে থাকতে হতো।

এসব রোহিঙ্গা শিশুরা যেখানে বসবাস করছে তাও স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ছোট্ট একটি তাঁবুতে আট-দশজন লোক বসবাস করছেন। এর মধ্যেই শিশুরা বেড়ে উঠছে। ইউনিসেফের তথ্যে জানা যায়, ৫ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা শিশু গাদাগাদি করে শরণার্থী ক্যাম্প এবং অস্থায়ী শিবিরগুলোতে বসবাস করছে।

এ প্রসঙ্গে ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত শিশুরা অনিরাপদ পানি, অস্বাস্থ্যকর বাথরুম ব্যবহার করছে। অনিরাপদ পানি পান করায় তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।

মশার কামড়ে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। তারা অমানবেতর জীবনযাপন করছে। মার্চ থেকে জুলাই এবং সেপ্টেম্বরে তারা বন্যা, সাইক্লোন ইত্যাদি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকির মুখেও রয়েছে। বৃষ্টি শুরু হলে ভূমিধস ও বন্যা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাসরত শিশুরা চরম ঝুঁকিতে রয়েছে।

তাদের সুরক্ষার জন্য এখন তারা যেখানে রয়েছে, সেখান থেকে নতুন জায়গায় সরানো দরকার। যেখানে তারা অবস্থান করছে সেখানকার পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, তাদের সুবিধা নিশ্চিত করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এ জন্য রোহিঙ্গা শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য এবং নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা দরকার। রোহিঙ্গা শিশুর সোনালি শৈশব ফিরিয়ে দিতে ইউনিসেফ কাজ করছে।

ইউনিসেফের উপনির্বাহী পরিচালক জাস্টিন ফরসিথ বলেন, ৫৮ শতাংশ রোহিঙ্গা শিশু মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সহিংসতা প্রত্যক্ষ করেছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অবস্থানরত এসব শিশুদের সহিংসতা, পাচার এবং অন্যান্য বিপদ থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে।

এ বিষয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, রোহিঙ্গা শিশুর অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তাদের মৌলিক চাহিদা পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে। যে পরিবেশে তারা বড় হচ্ছে তা পরিবেশবান্ধব নয়।

পানীয় ও জলের জন্য তারা পাহাড়ি উঁচু-নিচু পথ হেঁটে দূর-দূরান্ত থেকে পানি নিয়ে এসেছে। রান্নার লাকড়ি সংগ্রহের জন্য বিপদ আছে জেনেও বনজঙ্গলে গিয়েছে। এভাবে প্রতিনিয়ত তারা বেঁচে থাকার লড়াই করছে। শুধু তাই নয়, মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিষ্ঠুরতা প্রত্যক্ষ করেছে।

এ শিশুরা তাদের সামনে মা-বোনকে যৌন নির্যাতনের শিকার হতে দেখেছে। বাবাকে নৃশংসভাবে হত্যা হতে দেখেছে। নিজেরাও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এই নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা প্রত্যক্ষ করায় তাদের মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তাদের ঘুমের সমস্যা দেখা দিবে। তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া শারীরিক সমস্যাগুলো তাদের মানসিক রোগগ্রস্ত করে তুলবে। এসব শিশুদের মানসিক উন্নয়নে ইউনিসেফ, বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, সরকার যৌথভাবে কাজ করছে। এরপরও যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের বাস্তুভিটায় প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তাহলেই তারা স্বস্তি ফিরে পাবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.