অদম্য শাহিদার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প
jugantor
অদম্য শাহিদার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প

  ইন্দ্রজিৎ রায়  

২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অদম্য শাহিদার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প

শাহিদা খাতুন (৩০)। তার আছে একটি হাত, তিনটি আঙুল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। তিন আঙুলে ভর করেই সর্বোচ্চ ডিগ্রি (মাস্টার্স) অর্জন করেছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করেই তিনি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অসম্ভব বলে কোনো কিছু নেই। কারো দয়া ও অনুগ্রহ নয়, আত্মনির্ভরশীল হয়েই এগিয়ে যেতে চান শাহিদা। প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের মুদি দোকানি রফিউদ্দিনের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ শাহিদা। ১৯৯১ সালে শাহিদার জন্ম হলে গোটা পরিবারে যেন আঁধার নেমে আসে। কারণ, মেয়েটির একটি হাত ও দুটি পা নেই। শাহিদার মা শিমুলিয়ার খ্রিষ্টান মিশনে হাতের কাজ করতে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন শাহিদাকে। সেখানেই মিশনের সিস্টার জোসেফ মেরী তাকে হাতেখড়ি দেন। শাহিদার বয়স পাঁচ বছর হলে সেন্ট লুইস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে জোসেফ মেরীর বদৌলতেই সুযোগ হয় স্কুলে পড়ার। কখনো মা-বাবা, কখনো ভাইবোনের কোলে চড়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু হয় শাহিদার। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কোনো কিছুই তাকে স্কুল থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এভাবেই ২০০৭ সালে সেন্ট লুইস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ২০০৯ সালে শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সর্বশেষ যশোর এমএম কলেজ থেকে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে মাস্টার্স পাশ করেও সরকারি চাকরি না মেলায় হতাশ শাহিদা।

শাহিদা খাতুন বলেন, আমার লেখাপড়াটা সহজ ছিল না। অনেক কষ্ট-সংগ্রাম করে লেখাপড়া শেষ করেছি। ভাইবোনদের মধ্যে আমিই বেশি লেখাপড়া করেছি। নিজে স্বাবলম্বী হতে চাই। চাকরি করে পরিবারকে সহযোগিতা করতে চাই। একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে শিক্ষকতা করছি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো বেতন সুবিধা পাই না। সরকারও স্কুলগুলো এমপিওভুক্ত কিংবা অনুমোদন দেয়নি। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। বেশ কিছু সরকারি দপ্তরে চাকরি আবেদন করেছি।

শাহিদা বলেন, মানুষ আমাকে দেখলে বলবে ওকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। কিন্তু আমি তো জানি আমাকে দিয়ে কিছু হবে কি না। আমার আত্মবিশ্বাস আছে বলেই মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে পেরেছি। আমি যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে চাই কাজের মধ্য দিয়ে।

প্রতিবন্ধী দেখলেই মানুষ মনে করে তাকে দিয়ে কাজ হবে না। কিন্তু মানুষ তাকে কাজ দিয়ে বলে না তুমি করে দেখাও। সেই সুযোগ দিলে কিন্তু সে পারবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সারা দেশে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় চালু হয়েছে। সরকার যাচাই-বাছাই করে স্কুলগুলোর অনুমোদন দিলে প্রতিবন্ধীদের উপকার হতো। সেখানে যেমন শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি হতো। কর্মসংস্থান হতো। আবার প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষিত হতো। এ বিষয়ে সরকারকে আন্তরিক হওয়া দরকার।

শাহিদা বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি হস্তশিল্পের কাজ শিখেছি। বাড়িতে হাতের কাজ করছি। হস্তশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে সাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে আমাদের ইউনিয়নের একটি সংগঠন করছি। ২১ সদস্যের এ সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে আমরা কাজ করব।

অদম্য শাহিদার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প

 ইন্দ্রজিৎ রায় 
২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
অদম্য শাহিদার অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প
ফাইল ছবি

শাহিদা খাতুন (৩০)। তার আছে একটি হাত, তিনটি আঙুল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে থামাতে পারেনি। তিন আঙুলে ভর করেই সর্বোচ্চ ডিগ্রি (মাস্টার্স) অর্জন করেছেন। অসম্ভবকে সম্ভব করেই তিনি প্রমাণ করেছেন অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে অসম্ভব বলে কোনো কিছু নেই। কারো দয়া ও অনুগ্রহ নয়, আত্মনির্ভরশীল হয়েই এগিয়ে যেতে চান শাহিদা। প্রতিবন্ধী শিশু ও নারীদের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চান।

যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের মুদি দোকানি রফিউদ্দিনের ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ শাহিদা। ১৯৯১ সালে শাহিদার জন্ম হলে গোটা পরিবারে যেন আঁধার নেমে আসে। কারণ, মেয়েটির একটি হাত ও দুটি পা নেই। শাহিদার মা শিমুলিয়ার খ্রিষ্টান মিশনে হাতের কাজ করতে সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন শাহিদাকে। সেখানেই মিশনের সিস্টার জোসেফ মেরী তাকে হাতেখড়ি দেন। শাহিদার বয়স পাঁচ বছর হলে সেন্ট লুইস প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে নিয়ে যান। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্কুলের শিক্ষকরা তাকে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে জোসেফ মেরীর বদৌলতেই সুযোগ হয় স্কুলে পড়ার। কখনো মা-বাবা, কখনো ভাইবোনের কোলে চড়ে স্কুলে যাতায়াত শুরু হয় শাহিদার। রোদ, বৃষ্টি, ঝড় কোনো কিছুই তাকে স্কুল থেকে দূরে রাখতে পারেনি। এভাবেই ২০০৭ সালে সেন্ট লুইস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও ২০০৯ সালে শিমুলিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সর্বশেষ যশোর এমএম কলেজ থেকে ২০১৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স পাস করেন। শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে দূরে ঠেলে মাস্টার্স পাশ করেও সরকারি চাকরি না মেলায় হতাশ শাহিদা।

শাহিদা খাতুন বলেন, আমার লেখাপড়াটা সহজ ছিল না। অনেক কষ্ট-সংগ্রাম করে লেখাপড়া শেষ করেছি। ভাইবোনদের মধ্যে আমিই বেশি লেখাপড়া করেছি। নিজে স্বাবলম্বী হতে চাই। চাকরি করে পরিবারকে সহযোগিতা করতে চাই। একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে শিক্ষকতা করছি। কিন্তু সেখান থেকে কোনো বেতন সুবিধা পাই না। সরকারও স্কুলগুলো এমপিওভুক্ত কিংবা অনুমোদন দেয়নি। ফলে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি। বেশ কিছু সরকারি দপ্তরে চাকরি আবেদন করেছি।

শাহিদা বলেন, মানুষ আমাকে দেখলে বলবে ওকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। কিন্তু আমি তো জানি আমাকে দিয়ে কিছু হবে কি না। আমার আত্মবিশ্বাস আছে বলেই মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করতে পেরেছি। আমি যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে চাই কাজের মধ্য দিয়ে।

প্রতিবন্ধী দেখলেই মানুষ মনে করে তাকে দিয়ে কাজ হবে না। কিন্তু মানুষ তাকে কাজ দিয়ে বলে না তুমি করে দেখাও। সেই সুযোগ দিলে কিন্তু সে পারবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন দরকার।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে সারা দেশে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় চালু হয়েছে। সরকার যাচাই-বাছাই করে স্কুলগুলোর অনুমোদন দিলে প্রতিবন্ধীদের উপকার হতো। সেখানে যেমন শিক্ষিত প্রতিবন্ধীদের চাকরি হতো। কর্মসংস্থান হতো। আবার প্রতিবন্ধী শিশুরা শিক্ষিত হতো। এ বিষয়ে সরকারকে আন্তরিক হওয়া দরকার।

শাহিদা বলেন, লেখাপড়ার পাশাপাশি হস্তশিল্পের কাজ শিখেছি। বাড়িতে হাতের কাজ করছি। হস্তশিল্পের প্রসার ঘটিয়ে সাবলম্বী হওয়ার জন্য প্রতিবন্ধী নারীদের নিয়ে আমাদের ইউনিয়নের একটি সংগঠন করছি। ২১ সদস্যের এ সংগঠনের উদ্যোগে প্রতিবন্ধী নারীদের উন্নয়নে আমরা কাজ করব।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন