সংশপ্তক অভিযাত্রায় শ্রাবণী
jugantor
সংশপ্তক অভিযাত্রায় শ্রাবণী

  শামীমা রওশন সামান্থা  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সময়টা প্যান্ডামিকের। যখন সারা পৃথিবী স্থবির হয়ে ছিল ভাইরাসের ছোবলে। ঠিক তখনই ঘরে বসে থাকা অনেক মানুষের মতো স্কুল শিক্ষিকা রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণীও ঝোঁকের বশে অনলাইন বিজনেসের খাতায় নাম লেখান। পেশাগত জীবনে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১১ সালে।

এক বন্ধুর মাধ্যমে জয়েন করেন Women and e-commerce forum (WE) গ্রুপে। গল্পটা ২০২০ সালের ১৪ জুলাইয়ের। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর মহামারির ছুটি পাচ্ছিলেন ক্রমাগত। বাচ্চাটার বয়স যখন ৭ মাস, তখন থেকেই কাজ শুরু করলেন অনলাইনে। স্বামীর পূর্ণ সমর্থন থাকায় অনেকটা সাহস পান নতুন পথ চলতে। শুরুতে একান্নবর্তী পরিবারের কাউকে বলতে পারেননি তার এ নতুন পরিচয়ের কথা। অল্প দিনের মধ্যেই সবাই জানতে পারেন তার উদ্যোগ সম্পর্কে। যারা প্রথমে নেতিবাচক মন্তব্য করত তার কাজ নিয়ে, এখন তারা তার ট্রাস্টেড সেবাগ্রহীতা ক্রেতা। এমনকি তার বাবাও ভালোভাবে নেননি এ কাজটাকে। মেয়েকে নিয়ে তার স্বপ্নটা যেন অনেকটা আকাশছোঁয়া ছিল। অবশ্য সব বাবা মা-ই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় এমন পেশা পছন্দ করেন। পরে মেয়ের কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখে তিনিও মেনে নেন। আস্থা রাখেন মেয়ের ওপর। এমন সমর্থন তার কাজের গতি বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ।

নওগাঁর স্থানীয় পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণী। তিনি নওগাঁর ই-কমার্স সেক্টরকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নওগাঁর চাল, প্যারা সন্দেশ, গুঁড়া মসলা সারা দেশে বিপণনের কাজ শুরু করেন। এ উদ্যোগের নাম দেন ‘হাটবাজার’। শীতের সময় তার পণ্যের আইটেমে যোগ করেন কুমড়া বড়ি আর খেজুরের পাটালিগুড়।

এ পথটা তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হতো আর শেষ হতে হতে মাঝরাতে। নির্ঘুমও কেটেছে অনেক রাত। শুরুতে সব নিজ হাতে করতেন। পণ্যের সোর্সিং, প্রসেসিং, প্যাকেজিং এবং শিপিং (ডেলিভারি) সব। এখন অবশ্য জনবল আছে। তবে আরও বেশি নারীকে স্বাবলম্বী দেখতে চান তিনি। বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনদের দিয়ে সেল শুরু হলেও একপর্যায়ে তা বাড়তে থাকে এবং উই প্লাটফরমের অনেক অজানা অচেনা ক্রেতাও তার ‘হাটবাজার’ থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করেন। গত রমজানে তিনি লাখপতি সেলার হয়েছেন উইতে। অর্থাৎ ১ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন। এখন শুধু অনলাইনে না, অফলাইন থেকেও অর্ডার আসে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে জন্ম নেওয়া শ্রাবণী ছোটবেলা থেকেই বেশ আত্মনির্ভরশীল, কর্মঠ এবং সাহসী। যে কোনো কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতেন। ছোটবেলা থেকেই লিডারশিপ ব্যাপারটা ছিল তার মধ্যে। স্কাউট, খেলাধুলা, আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ইভেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তখন থেকেই নেতৃত্বদানের বিষয়টি তার রপ্ত। এরই ফলে ১২ লাখ সদস্যের উই গ্র“পের নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি হতে পেরেছেন শ্রাবণী। হয়েছেন উইয়ের বিশেষ আয়োজন ৬৪ জেলার ভার্চুয়াল বৈঠকখানা প্রোগ্রামের ১৬ জন ট্রেইনারের মধ্যে একজন গর্বিত ট্রেইনার। মায়ের কাছে শিখেছেন, কীভাবে নিজের কাজ নিজে করতে হয়। বাবার অনুপ্রেরণায় হতে চেয়েছিলেন পাইলট এবং পরে চেয়েছিলেন প্রকৌশলী হতে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার আগেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ পেয়ে যান। সরকারি চাকরি হওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরও আর অন্য পেশায় যেতে পারেননি। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের পর স্থায়ীভাবে নওগাঁতে বসবাস করছেন। দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার স্বপ্নটাও যেন স্বপ্নই রয়ে যায়। শিক্ষা জীবনে কোনো দ্বিতীয় বিভাগ পাননি তিনি। এমনকি পেশাগত জীবনেও পেয়েছেন দুটি প্রথম শ্রেণির সার্টিফিকেট। যারা তার সঙ্গে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছেন, তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেন সব সময়। একা এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রে বিশ্বাসী নন তিনি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জেলার অন্য উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বা বিভিন্ন প্রণোদনার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন জেলা প্রশাসন, বিসিক, যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, চেম্বার অব কমার্স, জেলা কৃষি অফিসসহ অন্য সব সরকারি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে। বর্তমানে তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও প্রায় শতাধিক উদ্যোক্তা। তিনি তাদের ডিস্ট্রিক্ট হেড হিসাবে আছেন। তাদের সমস্যাগুলো উইতে রিপ্রেজেন্ট করেন। আর বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা এনে দেন যা তাদের উদ্যোগে কাজে লাগে বা সাহায্য করে নিজেকে পরিণত করতে। শুধু নিজের উদ্যোগ হাটবাজারের পণ্য নয়, তিনি চান নওগাঁর প্রতিটি পণ্য সম্পর্কে মানুষ জানুক, চিনুক। নওগাঁর আম, ড্রাগন ফল, মাল্টা, তাঁতশিল্প ইত্যাদি পণ্যের সম্ভারকে কীভাবে ই-কমার্সে তুলে ধরা যায় সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছেন।

রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণীর মতে, স্বপ্ন দেখি নওগাঁর পর্যটন সম্ভাবনা পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে নারীদের কর্মসংস্থানের। নওগাঁ জেলাকে ব্র্যান্ড হিসাবে তৈরি করতে চাই। নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের দেশের নিগৃহীত, নিপীড়িত নারীদের আত্মনির্ভরশীল দেখতে চাই। এ জন্যই Women and e-commerce forum (WE) গ্রুপের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশাকে আদর্শ মানি। তার কাছ থেকেই শিখেছি ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলোকে সামাল দিয়ে কীভাবে অন্যের জন্য কাজ করতে হয়, এগিয়ে যেতে হয়।হ

সংশপ্তক অভিযাত্রায় শ্রাবণী

 শামীমা রওশন সামান্থা 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সময়টা প্যান্ডামিকের। যখন সারা পৃথিবী স্থবির হয়ে ছিল ভাইরাসের ছোবলে। ঠিক তখনই ঘরে বসে থাকা অনেক মানুষের মতো স্কুল শিক্ষিকা রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণীও ঝোঁকের বশে অনলাইন বিজনেসের খাতায় নাম লেখান। পেশাগত জীবনে তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসাবে নির্বাচিত হয়েছিলেন ২০১১ সালে।

এক বন্ধুর মাধ্যমে জয়েন করেন Women and e-commerce forum (WE) গ্রুপে। গল্পটা ২০২০ সালের ১৪ জুলাইয়ের। মাতৃত্বকালীন ছুটির পর মহামারির ছুটি পাচ্ছিলেন ক্রমাগত। বাচ্চাটার বয়স যখন ৭ মাস, তখন থেকেই কাজ শুরু করলেন অনলাইনে। স্বামীর পূর্ণ সমর্থন থাকায় অনেকটা সাহস পান নতুন পথ চলতে। শুরুতে একান্নবর্তী পরিবারের কাউকে বলতে পারেননি তার এ নতুন পরিচয়ের কথা। অল্প দিনের মধ্যেই সবাই জানতে পারেন তার উদ্যোগ সম্পর্কে। যারা প্রথমে নেতিবাচক মন্তব্য করত তার কাজ নিয়ে, এখন তারা তার ট্রাস্টেড সেবাগ্রহীতা ক্রেতা। এমনকি তার বাবাও ভালোভাবে নেননি এ কাজটাকে। মেয়েকে নিয়ে তার স্বপ্নটা যেন অনেকটা আকাশছোঁয়া ছিল। অবশ্য সব বাবা মা-ই সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয় এমন পেশা পছন্দ করেন। পরে মেয়ের কাজের প্রতি একাগ্রতা ও নিষ্ঠা দেখে তিনিও মেনে নেন। আস্থা রাখেন মেয়ের ওপর। এমন সমর্থন তার কাজের গতি বাড়িয়ে দেয় অনেকগুণ।

নওগাঁর স্থানীয় পণ্য নিয়ে কাজ শুরু করেন রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণী। তিনি নওগাঁর ই-কমার্স সেক্টরকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে নওগাঁর চাল, প্যারা সন্দেশ, গুঁড়া মসলা সারা দেশে বিপণনের কাজ শুরু করেন। এ উদ্যোগের নাম দেন ‘হাটবাজার’। শীতের সময় তার পণ্যের আইটেমে যোগ করেন কুমড়া বড়ি আর খেজুরের পাটালিগুড়।

এ পথটা তার জন্য মোটেও মসৃণ ছিল না। সেই ভোর থেকে কাজ শুরু হতো আর শেষ হতে হতে মাঝরাতে। নির্ঘুমও কেটেছে অনেক রাত। শুরুতে সব নিজ হাতে করতেন। পণ্যের সোর্সিং, প্রসেসিং, প্যাকেজিং এবং শিপিং (ডেলিভারি) সব। এখন অবশ্য জনবল আছে। তবে আরও বেশি নারীকে স্বাবলম্বী দেখতে চান তিনি। বন্ধুবান্ধব আর পরিচিতজনদের দিয়ে সেল শুরু হলেও একপর্যায়ে তা বাড়তে থাকে এবং উই প্লাটফরমের অনেক অজানা অচেনা ক্রেতাও তার ‘হাটবাজার’ থেকে নিয়মিত কেনাকাটা করেন। গত রমজানে তিনি লাখপতি সেলার হয়েছেন উইতে। অর্থাৎ ১ লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন। এখন শুধু অনলাইনে না, অফলাইন থেকেও অর্ডার আসে।

পাবনার ঈশ্বরদীতে জন্ম নেওয়া শ্রাবণী ছোটবেলা থেকেই বেশ আত্মনির্ভরশীল, কর্মঠ এবং সাহসী। যে কোনো কাজে সফল না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকতেন। ছোটবেলা থেকেই লিডারশিপ ব্যাপারটা ছিল তার মধ্যে। স্কাউট, খেলাধুলা, আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন ইভেন্টে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তখন থেকেই নেতৃত্বদানের বিষয়টি তার রপ্ত। এরই ফলে ১২ লাখ সদস্যের উই গ্র“পের নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি হতে পেরেছেন শ্রাবণী। হয়েছেন উইয়ের বিশেষ আয়োজন ৬৪ জেলার ভার্চুয়াল বৈঠকখানা প্রোগ্রামের ১৬ জন ট্রেইনারের মধ্যে একজন গর্বিত ট্রেইনার। মায়ের কাছে শিখেছেন, কীভাবে নিজের কাজ নিজে করতে হয়। বাবার অনুপ্রেরণায় হতে চেয়েছিলেন পাইলট এবং পরে চেয়েছিলেন প্রকৌশলী হতে। কিন্তু পড়াশোনা শেষ করার আগেই শিক্ষকতা পেশায় নিয়োগ পেয়ে যান। সরকারি চাকরি হওয়ায় ইচ্ছা থাকার পরও আর অন্য পেশায় যেতে পারেননি। পড়াশোনা শেষ করে বিয়ের পর স্থায়ীভাবে নওগাঁতে বসবাস করছেন। দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার স্বপ্নটাও যেন স্বপ্নই রয়ে যায়। শিক্ষা জীবনে কোনো দ্বিতীয় বিভাগ পাননি তিনি। এমনকি পেশাগত জীবনেও পেয়েছেন দুটি প্রথম শ্রেণির সার্টিফিকেট। যারা তার সঙ্গে ই-কমার্স নিয়ে কাজ করছেন, তাদের সবাইকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেন সব সময়। একা এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্রে বিশ্বাসী নন তিনি। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জেলার অন্য উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বা বিভিন্ন প্রণোদনার জন্য নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন জেলা প্রশাসন, বিসিক, যুব উন্নয়ন, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, চেম্বার অব কমার্স, জেলা কৃষি অফিসসহ অন্য সব সরকারি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে। বর্তমানে তার সঙ্গে কাজ করছেন আরও প্রায় শতাধিক উদ্যোক্তা। তিনি তাদের ডিস্ট্রিক্ট হেড হিসাবে আছেন। তাদের সমস্যাগুলো উইতে রিপ্রেজেন্ট করেন। আর বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা এনে দেন যা তাদের উদ্যোগে কাজে লাগে বা সাহায্য করে নিজেকে পরিণত করতে। শুধু নিজের উদ্যোগ হাটবাজারের পণ্য নয়, তিনি চান নওগাঁর প্রতিটি পণ্য সম্পর্কে মানুষ জানুক, চিনুক। নওগাঁর আম, ড্রাগন ফল, মাল্টা, তাঁতশিল্প ইত্যাদি পণ্যের সম্ভারকে কীভাবে ই-কমার্সে তুলে ধরা যায় সেই লক্ষ্যে এগোচ্ছেন।

রওয়াইদা তানজিদা শ্রাবণীর মতে, স্বপ্ন দেখি নওগাঁর পর্যটন সম্ভাবনা পরিপূর্ণ সদ্ব্যবহার করে নারীদের কর্মসংস্থানের। নওগাঁ জেলাকে ব্র্যান্ড হিসাবে তৈরি করতে চাই। নারীদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে চাই। আমাদের দেশের নিগৃহীত, নিপীড়িত নারীদের আত্মনির্ভরশীল দেখতে চাই। এ জন্যই Women and e-commerce forum (WE) গ্রুপের প্রেসিডেন্ট নাসিমা আক্তার নিশাকে আদর্শ মানি। তার কাছ থেকেই শিখেছি ব্যক্তিগত জীবনের সমস্যাগুলোকে সামাল দিয়ে কীভাবে অন্যের জন্য কাজ করতে হয়, এগিয়ে যেতে হয়।হ

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন