ভালো নেই শ্রীমঙ্গলের নারী চা শ্রমিকরা
jugantor
ভালো নেই শ্রীমঙ্গলের নারী চা শ্রমিকরা

  সৈয়দ সালাউদ্দিন  

২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকরা কেমন আছেন? কীভাবে চলছে তাদের দিন।

লিখেছেন- সৈয়দ সালাউদ্দিন

শুকনো একটা রুটি চিবিয়ে কি সারাটা বেলা চা পাতা তোলা যায়? এতে কি শরীরের হাড় মাংস থাকে? ১২০ টাকা হাজিরা দিয়ে এ যুগে সংসার কেমনে চলে? এভাবেই কষ্টের কথা বললেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চা বাগানের নারী শ্রমিক তিসরা উমা হাজরা।

শ্রীমঙ্গলের ফিনলে কোম্পানির ভাড়াউড়া চা বাগানের দক্ষিণপাড়া লাইনের বাসিন্দা উমা হাজরা। স্বামী, ৪ ছেলে, ছেলে বউ, নাতি-পুতি মিলে ১১ সদস্যের সংসার। উপার্জনক্ষম মাত্র ৩ জন। বড় সংসারের আহার জোগাতে একটা রুটি চিবিয়ে দিনভর ৪০-৫০ কেজি চা পাতা তুলতে হয় তাকে। মাঝে দুপুরে কচি চা পাতার চাটনি আর তপ্ত জলে চা পাতা ভেজানো পানি খেয়ে দিনভর কাজ করেন। চা পাতা তোলার পর সেকশনে নিয়ে মাপজোখ করতে করতে বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর বাগান থেকে শুকনা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। রাতে রান্না করে খেয়ে জীর্ণ বিছানায় যাওয়ার আগে আবারও পরের দিনের জীবিকার জন্য নতুন করে ছক কষতে হয় তাকে। এ প্রসঙ্গে উমা হাজরা (৬২) বলেন, সেই সকালে একটা আটার রুটি মুখে গুঁজে চা পাতা তুলতে আসি। সারা দিনে কোম্পানিকে ২৪ কেজি চা পাতা তুলে দিতে পারলে হাজিরা পাব ১২০ টাকা। ৪০-৫০ কেজি পাতা তুলতে পারলে বাকিটা সাড়ে ৪টাকা হারে ওভারটাইম হিসাবে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাঞ্জাবিরা বাগানে হামলা করে। আমরা অনেকের মতো পালিয়ে যাইনি। নির্যাতন সহ্য করে বাপ-দাদার ভিটা আঁকড়ে পড়েছিলাম। অনেক শ্রমিক লাইনে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে মিলিটারি। অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। মেয়েদের সম্মান নষ্ট করেছে। আমাদের অনেকে চা শ্রমিক পাঞ্জাবিদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করে মরেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশেও আমরা সে রকমই আছি, আগে যেমন ছিলাম।

ভাড়াউড়া চা বাগানের ১০নং সেকশনের আরেক নারী চা শ্রমিক লক্ষ্মী হাজরা (৪৫)। গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণ হয়েছে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে চা উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পরও তাদের জীবন জীবিকার কোনো পরিবর্তন নেই। শত বছর ধরে তারা অবহেলিত।

লক্ষ্মী হাজরার মতে, ভোটের সময় এলে সবাই ভালো ভালো কথা বলে। এটা করব, ওটা করব, বেতন বাড়াব বলে আমাদের থেকে ভোট নেয়। কিন্তু বেতন তো আর বাড়ে না। গরিব তো গরিবই আছি। পরিবারের সদস্য ৯ জন। এর মধ্যে উপার্জনক্ষম ৩ সদস্য। ফলে ১২০ টাকা হাজিরায় ৩ জন রোজগার করলেও সংসারে অভাব অনটন ফুরায় না। সপ্তাহ অন্তে বাগান থেকে সাড়ে তিন কেজি আটা রেশন দেওয়া হয়। ‘৯ জনের সংসারে সাড়ে ১০ কেজি আটা কয়দিন চলে? ১২০ টাকা হাজিরা আর সাড়ে তিন কেজি আটায় সংসার চলে না। চাল, ডাল, লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ তো কেনা লাগে। এসব ঠিকমতো কিনতে পারি না। মাছ মাংস জোটে ভাগ্যক্রমে। কেবল পূজা পার্বণে পেট পুরে খেতে পারি। বাকি সময় অর্ধাহারেই থাকি। এসব এখন সয়ে গেছে’।

অভিজ্ঞ আর নিপুণ হাতে পাতা তুলছিলেন অষ্টাদশী সঞ্জিতা ঘেটুয়া। কমলগঞ্জের ধলাই চা বাগানে বাপের বাড়ি। সঞ্জিতা যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তখন তার বয়স ১৫। বিয়ে হয় শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের চা শ্রমিক তপন ঘেটুয়ার সঙ্গে। প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাবা মায়ের কাজে সাহায্য করতে কাজে যোগ দেয় সঞ্জিতা। আর পড়ালেখা করতে পারেনি। সঞ্জিতা বলেন, পড়ালেখায় অনেক ইচ্ছা ছিল। কিন্তু চা বাগানের সমাজব্যবস্থা ও দরিদ্রতার কারণে হাইস্কুলে ভর্তি হতে পারিনি। স্বামী তপন ঘেটুয়া, দেড় বছরের শিশু পিয়াঙ্কা ও বৃদ্ধা শাশুড়ি নিয়ে তার সংসার। ‘স্বামী তপন স্থায়ী শ্রমিক হিসাবে চা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। দু’জনের রোজগারে কোনো রকম চলছে তাদের সংসার’। আমাদের কোনো বাথরুম নেই। চা বাগান, জঙ্গলে টয়লেট করি ৫৫ শতাংশ নারী শ্রমিক।

নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে চা বাগানগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনেক বাগানে স্কুল সংস্কার, সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় চা শ্রমিক সন্তান নারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে খাদ্য, শিক্ষা উপরকরণ, বাইসাইকেল ও নগদ অর্থ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। হ

ভালো নেই শ্রীমঙ্গলের নারী চা শ্রমিকরা

 সৈয়দ সালাউদ্দিন 
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে কর্মরত নারী শ্রমিকরা কেমন আছেন? কীভাবে চলছে তাদের দিন।

লিখেছেন- সৈয়দ সালাউদ্দিন

শুকনো একটা রুটি চিবিয়ে কি সারাটা বেলা চা পাতা তোলা যায়? এতে কি শরীরের হাড় মাংস থাকে? ১২০ টাকা হাজিরা দিয়ে এ যুগে সংসার কেমনে চলে? এভাবেই কষ্টের কথা বললেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চা বাগানের নারী শ্রমিক তিসরা উমা হাজরা।

শ্রীমঙ্গলের ফিনলে কোম্পানির ভাড়াউড়া চা বাগানের দক্ষিণপাড়া লাইনের বাসিন্দা উমা হাজরা। স্বামী, ৪ ছেলে, ছেলে বউ, নাতি-পুতি মিলে ১১ সদস্যের সংসার। উপার্জনক্ষম মাত্র ৩ জন। বড় সংসারের আহার জোগাতে একটা রুটি চিবিয়ে দিনভর ৪০-৫০ কেজি চা পাতা তুলতে হয় তাকে। মাঝে দুপুরে কচি চা পাতার চাটনি আর তপ্ত জলে চা পাতা ভেজানো পানি খেয়ে দিনভর কাজ করেন। চা পাতা তোলার পর সেকশনে নিয়ে মাপজোখ করতে করতে বেলা গড়িয়ে যায়। তারপর বাগান থেকে শুকনা জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। রাতে রান্না করে খেয়ে জীর্ণ বিছানায় যাওয়ার আগে আবারও পরের দিনের জীবিকার জন্য নতুন করে ছক কষতে হয় তাকে। এ প্রসঙ্গে উমা হাজরা (৬২) বলেন, সেই সকালে একটা আটার রুটি মুখে গুঁজে চা পাতা তুলতে আসি। সারা দিনে কোম্পানিকে ২৪ কেজি চা পাতা তুলে দিতে পারলে হাজিরা পাব ১২০ টাকা। ৪০-৫০ কেজি পাতা তুলতে পারলে বাকিটা সাড়ে ৪টাকা হারে ওভারটাইম হিসাবে দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাঞ্জাবিরা বাগানে হামলা করে। আমরা অনেকের মতো পালিয়ে যাইনি। নির্যাতন সহ্য করে বাপ-দাদার ভিটা আঁকড়ে পড়েছিলাম। অনেক শ্রমিক লাইনে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে মিলিটারি। অনেককে ধরে নিয়ে গেছে। মেয়েদের সম্মান নষ্ট করেছে। আমাদের অনেকে চা শ্রমিক পাঞ্জাবিদের সঙ্গে মুখোমুখি যুদ্ধ করে মরেছে। কিন্তু স্বাধীন দেশেও আমরা সে রকমই আছি, আগে যেমন ছিলাম।

ভাড়াউড়া চা বাগানের ১০নং সেকশনের আরেক নারী চা শ্রমিক লক্ষ্মী হাজরা (৪৫)। গায়ের রং রোদে পুড়ে তামাটে বর্ণ হয়েছে। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে চা উৎপাদন করে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখার পরও তাদের জীবন জীবিকার কোনো পরিবর্তন নেই। শত বছর ধরে তারা অবহেলিত।

লক্ষ্মী হাজরার মতে, ভোটের সময় এলে সবাই ভালো ভালো কথা বলে। এটা করব, ওটা করব, বেতন বাড়াব বলে আমাদের থেকে ভোট নেয়। কিন্তু বেতন তো আর বাড়ে না। গরিব তো গরিবই আছি। পরিবারের সদস্য ৯ জন। এর মধ্যে উপার্জনক্ষম ৩ সদস্য। ফলে ১২০ টাকা হাজিরায় ৩ জন রোজগার করলেও সংসারে অভাব অনটন ফুরায় না। সপ্তাহ অন্তে বাগান থেকে সাড়ে তিন কেজি আটা রেশন দেওয়া হয়। ‘৯ জনের সংসারে সাড়ে ১০ কেজি আটা কয়দিন চলে? ১২০ টাকা হাজিরা আর সাড়ে তিন কেজি আটায় সংসার চলে না। চাল, ডাল, লবণ, পেঁয়াজ, মরিচ তো কেনা লাগে। এসব ঠিকমতো কিনতে পারি না। মাছ মাংস জোটে ভাগ্যক্রমে। কেবল পূজা পার্বণে পেট পুরে খেতে পারি। বাকি সময় অর্ধাহারেই থাকি। এসব এখন সয়ে গেছে’।

অভিজ্ঞ আর নিপুণ হাতে পাতা তুলছিলেন অষ্টাদশী সঞ্জিতা ঘেটুয়া। কমলগঞ্জের ধলাই চা বাগানে বাপের বাড়ি। সঞ্জিতা যখন বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তখন তার বয়স ১৫। বিয়ে হয় শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগানের চা শ্রমিক তপন ঘেটুয়ার সঙ্গে। প্রাথমিক স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাবা মায়ের কাজে সাহায্য করতে কাজে যোগ দেয় সঞ্জিতা। আর পড়ালেখা করতে পারেনি। সঞ্জিতা বলেন, পড়ালেখায় অনেক ইচ্ছা ছিল। কিন্তু চা বাগানের সমাজব্যবস্থা ও দরিদ্রতার কারণে হাইস্কুলে ভর্তি হতে পারিনি। স্বামী তপন ঘেটুয়া, দেড় বছরের শিশু পিয়াঙ্কা ও বৃদ্ধা শাশুড়ি নিয়ে তার সংসার। ‘স্বামী তপন স্থায়ী শ্রমিক হিসাবে চা ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। দু’জনের রোজগারে কোনো রকম চলছে তাদের সংসার’। আমাদের কোনো বাথরুম নেই। চা বাগান, জঙ্গলে টয়লেট করি ৫৫ শতাংশ নারী শ্রমিক।

নারী শিক্ষা সম্প্রসারণে চা বাগানগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। অনেক বাগানে স্কুল সংস্কার, সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রত্যন্ত এলাকায় চা শ্রমিক সন্তান নারী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে খাদ্য, শিক্ষা উপরকরণ, বাইসাইকেল ও নগদ অর্থ প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। হ

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন