বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে লড়ছেন তামান্না
jugantor
বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে লড়ছেন তামান্না
শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া চা বাগানের মেয়ে তামান্না সিং বাড়াইক। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। লিখেছেন-

  রীতা ভৌমিক  

০১ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও নাগরিক উদ্যোগের কর্মকর্তারা ২০১০ সালে শ্রীমঙ্গল চা বাগান পরিদর্শনে যান। সেখানকার মেয়ে, শিশুদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে তামান্না সিং বাড়াইকের বাবা পরিমল সিং বাড়াইকের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। দুটি সংগঠনই দলিত জনগোষ্ঠীর নারী-শিশুর জীবন-মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়।

এ প্রসঙ্গে তামান্না সিং বাড়াইক বলেন, সে বছরই আমি শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছি। ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’ নামে একটি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য দুটি সংগঠনের কর্মকর্তারা আমাকে আহ্বান জানান। তারা আমাকে বলেছিলেন, ‘এখানে অংশ নিলে নিজ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করতে পারবেন।’ ওদের আহ্বানে ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’-এ আবেদন করি। সুযোগ পেয়ে যাই ছয় মাসের প্রশিক্ষণে। ব্রিটিশ কাউন্সিল, নাগরিক উদ্যোগ আর ভলান্টিয়ার ওভার সার্ভিসের যৌথ উদ্যোগে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় জানুয়ারি থেকে মার্চ তিন মাস প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণে মানবিক অধিকার, এইচআইভি/এইডস, শিক্ষা, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। এ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাস ইউকের স্কটল্যান্ডে আরেকটি প্রশিক্ষণ নিই। এ প্রশিক্ষণে তৃতীয় লিঙ্গ, এইচআইভি/এইডসবিষয়ক ধারণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সেখানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায় ভলান্টিয়ারের কাজ করি। দেশে ফিরে শ্রীমঙ্গলে চা বাগানে ফিরে যাই।

দেশে ফিরে তামান্না সিং বাড়াইক শ্রীমঙ্গলে চা কোম্পানির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিন বছর এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি টিউশনি এবং লেখাপড়াও চালিয়ে যান। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে তিনি ২০১২ সালে বিএসসি পাশ করেন। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে বিভিন্ন দিবস পালন, ন্যায্য মজুরি আদায়ে আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও নাগরিক উদ্যোগের যৌথ আয়োজনে ২০১৩ সালে ঢাকায় একটি ইন্টারশিপে যোগ দেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই বছরই তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান জাতিসংঘের আইডিএস আন্তর্জাতিক দলিত সোলিডারিটি নেটওয়ার্কের আমন্ত্রণে। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করে দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অধিবেশনে বাংলাদেশ দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থা তুলে ধরেন। এর পরের বছরই ২০১৪ সালে দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে নেপালে যান। এভাবে বিভিন্ন দেশে তিনি বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

তামান্না সিং বাড়াইকের জন্ম শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া চা বাগানে। বাবা পরিমল সিং বাড়াইক মৌলভীবাজার চা জনগোষ্ঠীর ফ্রন্ট। মা মনিতা সিং বাড়াইক গৃহিণী। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। সিলেট এমসি কলেজ থেকে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি করেন। ধানমণ্ডি ল কলেজ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ছোট ভাই প্রিতম সিং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি করেছেন।

দলিত নারী ফোরামের মাঠ সমন্বয়কারী হিসাবে কর্মরত রয়েছেন তামান্না সিং বাড়াইক। নিজ এবং পরিবারের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও দলিত নারী ফোরাম দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দলিত নারী ও জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করছেন।

দলিত নারী ফোরাম-এর সাধারণ সম্পাদক মনি রানী দাস এ সম্পর্কে বলেন, সরকারের সঙ্গে দলিত গোষ্ঠীর বৈষম্য দূরীকরণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন অনেকে। তবে এখনো আমাদের অনেক নারী-শিশু সরকারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা বৈষম্য বিলোপ আইন চাই। তামান্না সিং বাড়াইকের মতো মেয়েরা আমাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত। ওরা নিজেদের মেধা, পরিশ্রম, চেষ্টা দিয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। আমি নিজেও দলিত জনগোষ্ঠীর একজন।

বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে লড়ছেন তামান্না

শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া চা বাগানের মেয়ে তামান্না সিং বাড়াইক। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। লিখেছেন-
 রীতা ভৌমিক 
০১ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও নাগরিক উদ্যোগের কর্মকর্তারা ২০১০ সালে শ্রীমঙ্গল চা বাগান পরিদর্শনে যান। সেখানকার মেয়ে, শিশুদের জীবনযাপন পর্যবেক্ষণ করেন। সেখানে তামান্না সিং বাড়াইকের বাবা পরিমল সিং বাড়াইকের সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। দুটি সংগঠনই দলিত জনগোষ্ঠীর নারী-শিশুর জীবন-মান উন্নয়নে গুরুত্ব দেয়।

এ প্রসঙ্গে তামান্না সিং বাড়াইক বলেন, সে বছরই আমি শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেছি। ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’ নামে একটি প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য দুটি সংগঠনের কর্মকর্তারা আমাকে আহ্বান জানান। তারা আমাকে বলেছিলেন, ‘এখানে অংশ নিলে নিজ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করতে পারবেন।’ ওদের আহ্বানে ‘গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ’-এ আবেদন করি। সুযোগ পেয়ে যাই ছয় মাসের প্রশিক্ষণে। ব্রিটিশ কাউন্সিল, নাগরিক উদ্যোগ আর ভলান্টিয়ার ওভার সার্ভিসের যৌথ উদ্যোগে রংপুরের গঙ্গাচড়ায় জানুয়ারি থেকে মার্চ তিন মাস প্রশিক্ষণ নিই। প্রশিক্ষণে মানবিক অধিকার, এইচআইভি/এইডস, শিক্ষা, ত্রাণ বিতরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। এ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত তিন মাস ইউকের স্কটল্যান্ডে আরেকটি প্রশিক্ষণ নিই। এ প্রশিক্ষণে তৃতীয় লিঙ্গ, এইচআইভি/এইডসবিষয়ক ধারণা দেওয়া হয়। এ ছাড়া সেখানে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন মেলায় ভলান্টিয়ারের কাজ করি। দেশে ফিরে শ্রীমঙ্গলে চা বাগানে ফিরে যাই।

দেশে ফিরে তামান্না সিং বাড়াইক শ্রীমঙ্গলে চা কোম্পানির একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিন বছর এ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পাশাপাশি টিউশনি এবং লেখাপড়াও চালিয়ে যান। শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজ থেকে তিনি ২০১২ সালে বিএসসি পাশ করেন। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ে বিভিন্ন দিবস পালন, ন্যায্য মজুরি আদায়ে আন্দোলনসহ বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও নাগরিক উদ্যোগের যৌথ আয়োজনে ২০১৩ সালে ঢাকায় একটি ইন্টারশিপে যোগ দেন। এরপর তাকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। ওই বছরই তিনি সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় যান জাতিসংঘের আইডিএস আন্তর্জাতিক দলিত সোলিডারিটি নেটওয়ার্কের আমন্ত্রণে। সেখানে এক সপ্তাহ অবস্থান করে দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অধিবেশনে বাংলাদেশ দলিত জনগোষ্ঠীর অবস্থা তুলে ধরেন। এর পরের বছরই ২০১৪ সালে দলিত জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক অনুষ্ঠানে নেপালে যান। এভাবে বিভিন্ন দেশে তিনি বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করেন।

তামান্না সিং বাড়াইকের জন্ম শ্রীমঙ্গলের ভুরভুরিয়া চা বাগানে। বাবা পরিমল সিং বাড়াইক মৌলভীবাজার চা জনগোষ্ঠীর ফ্রন্ট। মা মনিতা সিং বাড়াইক গৃহিণী। এক ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। সিলেট এমসি কলেজ থেকে তিনি উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি করেন। ধানমণ্ডি ল কলেজ থেকে এলএলবি সম্পন্ন করেন। ছোট ভাই প্রিতম সিং মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে এমএসসি করেছেন।

দলিত নারী ফোরামের মাঠ সমন্বয়কারী হিসাবে কর্মরত রয়েছেন তামান্না সিং বাড়াইক। নিজ এবং পরিবারের উন্নয়নের পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর অধিকার আন্দোলন ও দলিত নারী ফোরাম দুটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দলিত নারী ও জনগোষ্ঠীর অধিকার, শিক্ষা ও উন্নয়নে কাজ করছেন।

দলিত নারী ফোরাম-এর সাধারণ সম্পাদক মনি রানী দাস এ সম্পর্কে বলেন, সরকারের সঙ্গে দলিত গোষ্ঠীর বৈষম্য দূরীকরণে আমরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছি। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষা-প্রশিক্ষণ, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর থেকে মাতৃত্বকালীন ভাতা পাচ্ছেন অনেকে। তবে এখনো আমাদের অনেক নারী-শিশু সরকারের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমরা বৈষম্য বিলোপ আইন চাই। তামান্না সিং বাড়াইকের মতো মেয়েরা আমাদের কাছে একটি দৃষ্টান্ত। ওরা নিজেদের মেধা, পরিশ্রম, চেষ্টা দিয়ে নিজেদের জায়গা তৈরি করে নিয়েছে। আমি নিজেও দলিত জনগোষ্ঠীর একজন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন