নকশির ফোঁড়ে ফোঁড়ে স্বপ্ন বোনেন নাদিরা
jugantor
নকশির ফোঁড়ে ফোঁড়ে স্বপ্ন বোনেন নাদিরা

  রায়হান রাশেদ  

০১ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুই-সুতার ফোঁড়ে নকশিকাঁথা তৈরি করছিলেন নাদিরা। বিভিন্ন সাইজের নকশিকাঁথা তৈরি করেন তিনি। নবজাতকদের জন্য নকশিকাঁথাও তৈরি করেন তিনি। সুতি নরম কাপড়ে বিভিন্ন নকশা তুলে নকশিকাঁথা তৈরি করেন। নকশার ফাঁকে ফাঁকে থাকে ঘন সেলাই।

এ প্রসঙ্গে নাদিরা বলেন, আমি মানসম্মত কাঁথা তৈরি করি। উন্নতমানের সুতির নরম কাপড়ে সুন্দর নকশা তুলি। যাতে আমার নকশাগুলো গ্রাহকদের দৃষ্টি কাড়ে। যিনি এ কাঁথা ব্যবহার করবেন, তিনি যেন আরাম অনুভব করেন। এভাবেই নকশিকাঁথার একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাই।

নকশিকাঁথার পাশাপাশি থ্রি-পিসও তৈরি করেন নাদিরা। হরেক রকম ডিজাইনের থ্রি-পিস। ওর তত্ত্বাবধানে তিনজন মেয়ে কাজ করেন। নাদিরার পাশাপাশি তারাও কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নকশিকাঁথা, থ্রি-পিস ইত্যাদি পসারকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। এর ফলে অনেক মেয়ের কাজের সংস্থান হবে। এভাবেই একজন নারী উদ্যোক্তা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। তার মতে, প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানও বাড়বে। নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য কাজ করতে চান।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরমধুয়ায় নাদিরার জন্ম। চরমধুয়া আদর্শ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। বর্তমানে নরসিংদী সরকারি কলেজে মাস্টার্সে পড়াশোনা করছেন। অনার্স পড়াকালীন তার বিয়ে হয়ে যায় সুনামগঞ্জের আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। স্বামীর চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় থাকেন।

কোভিড ১৯-এর কারণে সারা বিশ্ব অচল হয়ে ওঠে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় কুমিল্লায় ছিলেন নাদিরা। ঘরকন্নার পর বাকি সময়টা কী করবেন ভাবছিলেন। দেখলেন অনেকে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। নাদিরা ঠিক করলেন, তিনিও উদ্যোক্তা হবেন। সময় নিয়ে নিজেকে তৈরি করছিলেন। আবার এও ভাবছিলেন, একটা সরকারি চাকরি পেলে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কাজ করা যাবে।

একদিন তার বাসায় বান্ধবী ইভা আহমেদ এলেন। আড্ডা হলো। গল্প হলো। ইভা বললেন, ‘কিছু একটা কর। চাকরি তো আর এখনই হচ্ছে না।’ বান্ধবীর কথায় কিছু করার ছক কষতে লাগলেন। শুরু করলেন নকশি পিঠা বানানো। বাহারি ডিজাইনের নকশি পিঠা বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট শুরু করলেন। পিঠা বিক্রির জন্য একটি পেজ খোলেন। নাম দেন-‘গ্রামবাংলার পিঠাঘর’।

অল্প দিনের মধ্যে সাড়া ফেলে নাদিরার পিঠাঘর। অর্ডার আসতে থাকে। ভালোই রোজগার হয়। পিঠা যায় ঢাকা, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা জায়গায়। গ্রাহকরা প্রশংসা করেন। প্রচার হয়। অর্ডার বাড়ে। নিত্য নতুন ডিজাইনের পিঠা তৈরি করেন তিনি। এভাবে দিন চলছিল। হঠাৎ পিঠা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক করলেন, নকশিকাঁথা বানাবেন। অনলাইনে বেচবেন। আগের তৈরি কয়েকটি নকশিকাঁথার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেন। অনেকে প্রশংসা করেন। কেউ বাহবা দেন। কিন্তু অর্ডার পেলেন না। তিন দিন পর একজন অর্ডার দেন। অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেন। নাদিরা ভীষণ খুশি হয়। কাজের গতি বাড়ান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন প্রায় প্রতিদিনই অর্ডার পান। অনেকে ফোন করে, মেসেঞ্জারে অর্ডার কনফার্ম করেন। এ কাজে স্বামী তাকে সহযোগিতা করেন। অর্ডার অনুযায়ী নকশিকাঁথা কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেন।

নকশিকাঁথা আইডির নাম দিয়েছেন ‘নাদিরা ক্রিয়েশন’। এ আইডি থেকে নকশিকাঁথা, থ্রি-পিস বিক্রি করেন তিনি। কয়েকটি অনলাইন গ্রুপও পণ্যের বিজ্ঞাপন দেন। ‘ক্রয়-বিক্রয় গ্রুপ নরসিংদী’ থেকে তার পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এখান থেকে রোজগারও ভালো হয়। অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা নেন না তিনি। গ্রাহক পণ্য হাতে পেয়ে যাচাই করে টাকা দেন।

এ প্রসঙ্গে নাদিরা বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধোঁকার শিকার হইনি। নকশিকাঁথা বাজারজাতের মাধ্যমে সংসারেও আয় বেড়েছে। নিজে স্বাবলম্বী হয়েছি। অন্যদেরও স্বাবলম্বী করছি। এ জন্য প্রচুর শ্রম দিতে হয় আমাকে। সন্তান লালন-পালন, রান্নাবান্নার পর বাকিটা সময় এ কাজে ব্যয় করি। প্রথম দিকে স্বামী এ কাজে আমাকে নিরুৎসাহিত করতেন। বলতেন, ‘আমি তোমার কোনো কিছু কুরিয়ার করতে পারব না।’ সংসারে আয় বাড়ায় স্বামীও তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্বামীই ডেলিভারির দায়িত্ব পালন করছেন। আমাকে সাহস দেন। একজন বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখান।

নাদিরার দুই ছেলেমেয়ে। নাদিম মাহতাব ও নুসাইবা মুসকান ইকরা। স্বামী, সন্তানদের নিয়ে তার সুখের সংসার।

নকশির ফোঁড়ে ফোঁড়ে স্বপ্ন বোনেন নাদিরা

 রায়হান রাশেদ 
০১ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সুই-সুতার ফোঁড়ে নকশিকাঁথা তৈরি করছিলেন নাদিরা। বিভিন্ন সাইজের নকশিকাঁথা তৈরি করেন তিনি। নবজাতকদের জন্য নকশিকাঁথাও তৈরি করেন তিনি। সুতি নরম কাপড়ে বিভিন্ন নকশা তুলে নকশিকাঁথা তৈরি করেন। নকশার ফাঁকে ফাঁকে থাকে ঘন সেলাই।

এ প্রসঙ্গে নাদিরা বলেন, আমি মানসম্মত কাঁথা তৈরি করি। উন্নতমানের সুতির নরম কাপড়ে সুন্দর নকশা তুলি। যাতে আমার নকশাগুলো গ্রাহকদের দৃষ্টি কাড়ে। যিনি এ কাঁথা ব্যবহার করবেন, তিনি যেন আরাম অনুভব করেন। এভাবেই নকশিকাঁথার একটি ব্র্যান্ড তৈরি করতে চাই।

নকশিকাঁথার পাশাপাশি থ্রি-পিসও তৈরি করেন নাদিরা। হরেক রকম ডিজাইনের থ্রি-পিস। ওর তত্ত্বাবধানে তিনজন মেয়ে কাজ করেন। নাদিরার পাশাপাশি তারাও কাজ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। নকশিকাঁথা, থ্রি-পিস ইত্যাদি পসারকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি। এর ফলে অনেক মেয়ের কাজের সংস্থান হবে। এভাবেই একজন নারী উদ্যোক্তা হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চান তিনি। তার মতে, প্রতিষ্ঠান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীদের কর্মসংস্থানও বাড়বে। নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য কাজ করতে চান।

নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার চরমধুয়ায় নাদিরার জন্ম। চরমধুয়া আদর্শ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন। বর্তমানে নরসিংদী সরকারি কলেজে মাস্টার্সে পড়াশোনা করছেন। অনার্স পড়াকালীন তার বিয়ে হয়ে যায় সুনামগঞ্জের আব্দুল মান্নানের সঙ্গে। স্বামীর চাকরির সুবাদে কুমিল্লায় থাকেন।

কোভিড ১৯-এর কারণে সারা বিশ্ব অচল হয়ে ওঠে। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় কুমিল্লায় ছিলেন নাদিরা। ঘরকন্নার পর বাকি সময়টা কী করবেন ভাবছিলেন। দেখলেন অনেকে অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেছে। নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। নাদিরা ঠিক করলেন, তিনিও উদ্যোক্তা হবেন। সময় নিয়ে নিজেকে তৈরি করছিলেন। আবার এও ভাবছিলেন, একটা সরকারি চাকরি পেলে উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য কাজ করা যাবে।

একদিন তার বাসায় বান্ধবী ইভা আহমেদ এলেন। আড্ডা হলো। গল্প হলো। ইভা বললেন, ‘কিছু একটা কর। চাকরি তো আর এখনই হচ্ছে না।’ বান্ধবীর কথায় কিছু করার ছক কষতে লাগলেন। শুরু করলেন নকশি পিঠা বানানো। বাহারি ডিজাইনের নকশি পিঠা বানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট শুরু করলেন। পিঠা বিক্রির জন্য একটি পেজ খোলেন। নাম দেন-‘গ্রামবাংলার পিঠাঘর’।

অল্প দিনের মধ্যে সাড়া ফেলে নাদিরার পিঠাঘর। অর্ডার আসতে থাকে। ভালোই রোজগার হয়। পিঠা যায় ঢাকা, দিনাজপুর, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা জায়গায়। গ্রাহকরা প্রশংসা করেন। প্রচার হয়। অর্ডার বাড়ে। নিত্য নতুন ডিজাইনের পিঠা তৈরি করেন তিনি। এভাবে দিন চলছিল। হঠাৎ পিঠা না বানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। ঠিক করলেন, নকশিকাঁথা বানাবেন। অনলাইনে বেচবেন। আগের তৈরি কয়েকটি নকশিকাঁথার ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট দেন। অনেকে প্রশংসা করেন। কেউ বাহবা দেন। কিন্তু অর্ডার পেলেন না। তিন দিন পর একজন অর্ডার দেন। অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেন। নাদিরা ভীষণ খুশি হয়। কাজের গতি বাড়ান। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন প্রায় প্রতিদিনই অর্ডার পান। অনেকে ফোন করে, মেসেঞ্জারে অর্ডার কনফার্ম করেন। এ কাজে স্বামী তাকে সহযোগিতা করেন। অর্ডার অনুযায়ী নকশিকাঁথা কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেন।

নকশিকাঁথা আইডির নাম দিয়েছেন ‘নাদিরা ক্রিয়েশন’। এ আইডি থেকে নকশিকাঁথা, থ্রি-পিস বিক্রি করেন তিনি। কয়েকটি অনলাইন গ্রুপও পণ্যের বিজ্ঞাপন দেন। ‘ক্রয়-বিক্রয় গ্রুপ নরসিংদী’ থেকে তার পণ্য সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়। এখান থেকে রোজগারও ভালো হয়। অনলাইনে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অগ্রিম টাকা নেন না তিনি। গ্রাহক পণ্য হাতে পেয়ে যাচাই করে টাকা দেন।

এ প্রসঙ্গে নাদিরা বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধোঁকার শিকার হইনি। নকশিকাঁথা বাজারজাতের মাধ্যমে সংসারেও আয় বেড়েছে। নিজে স্বাবলম্বী হয়েছি। অন্যদেরও স্বাবলম্বী করছি। এ জন্য প্রচুর শ্রম দিতে হয় আমাকে। সন্তান লালন-পালন, রান্নাবান্নার পর বাকিটা সময় এ কাজে ব্যয় করি। প্রথম দিকে স্বামী এ কাজে আমাকে নিরুৎসাহিত করতেন। বলতেন, ‘আমি তোমার কোনো কিছু কুরিয়ার করতে পারব না।’ সংসারে আয় বাড়ায় স্বামীও তাকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। স্বামীই ডেলিভারির দায়িত্ব পালন করছেন। আমাকে সাহস দেন। একজন বড় উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখান।

নাদিরার দুই ছেলেমেয়ে। নাদিম মাহতাব ও নুসাইবা মুসকান ইকরা। স্বামী, সন্তানদের নিয়ে তার সুখের সংসার।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন