কলারোয়ার পাঁচ জয়িতার গল্প
jugantor
কলারোয়ার পাঁচ জয়িতার গল্প
কীভাবে উঠে দাঁড়ালেন তারা। কী তাদের সাফল্যের রহস্য। ভাগ্য বদলানো এমন পাঁচ নারী পেয়েছেন জয়িতার সম্মান। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার পাঁচ নারীর পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প নিয়ে লিখেছেন-

  সুভাষ চৌধুরী  

১৫ নভেম্বর ২০২১, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আলেয়া খাতুন

সফল নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন আলেয়া খাতুন। তিন ছেলে নিয়ে বিধবা হন বুইতা গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে আলেয়া বেগম। অনটনের সংসারে চারটি মুখের খোরাক জোগাতে আলেয়া মাঠে কামলা খাটতে শুরু করেন। এর থেকে কিছু টাকা জমিয়ে তা দিয়ে ছোট্ট মুদি দোকান দেন। সংসারে ফিরতে থাকে সচ্ছলতা। সুযোগ বুঝে কিছু জমি কেনেন আলেয়া। সেখানে ফসল হয়। বাড়িতে তৈরি করেন একটি পোলট্রি ফার্ম। সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে আলেয়া ঘরে পোশাক তৈরি করে সেই সঙ্গে পোশাকে হাতের কাজ করে বেশ রোজগার করতে থাকেন। আলেয়ার দুই ছেলে এখন বিদেশে কাজ নিয়ে গেছে। তারা টাকা পাঠায়। সঙ্গে রয়েছে নিজের আয়। নিজের কুঁড়েঘর সরিয়ে আলেয়া বানিয়েছেন ছোটখাটো দালান বাড়ি। মাত্র কয়েক বছরে এভাবেই কেটে গেছে আলেয়ার দুঃখের দিনগুলো। এখন তিনি একজন সফল নারী।

সানজিদা খাতুন

সমাজকর্মী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন সানজিদা খাতুন। পাইকপাড়া গ্রামের দিনমজুর আবদুল মালেকের মেয়ে সানজিদা খাতুন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সানজিদা সবার ছোট। বাবার দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারে লেখাপড়ার কোনো সুযোগই ছিল না। তবু দমে যাননি সানজিদা। স্কুলে পড়তে পড়তে শুরু করেন প্রাইভেট পড়ানো।

এ প্রসঙ্গে সানজিদা বলেন, গ্রামে তো। এ জন্য টাকাও পাওয়া যেত কম। এভাবেই বাবার ওপর চাপ না দিয়ে নিজ আয় থেকে ব্যয় করি লেখাপড়ার জন্য। এসএসসি, এইচএসসির খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে আমাকে। তবে সাফল্য এসেছে একের পর এক। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করি অর্থাৎ এমএ করি।

সদ্য চাকরিতে ঢুকেছেন সানজিদা। শিক্ষায় সফল এ নারী এখন চাকরির পাশাপাশি সমাজের যৌতুক, বাল্যবিয়েসহ নানা বিষয়ে কাজ করে হয়ে উঠছেন সমাজকর্মী।

নার্গিস বেগম

এ বছরের রত্নগর্ভা ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন নার্গিস বেগম। খুব ছোট বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন কলারোয়ার নাথপুর গ্রামের কুতুবউদ্দিনের মেয়ে নার্গিস। তার স্থান হয় নানার বাড়িতে। খুব ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শিখে বড় হওয়ার। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালে তার বিয়ে হয়ে যায়। স্বপ্নগুলো সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান তিনি। নার্গিসের সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই ছেলের একজন জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা, অন্যজন ডাক্তার। পাঁচ মেয়ের তিনজন কলেজশিক্ষক, একজন স্কুলশিক্ষক, অন্যজন গৃহিণী। নিজের জীবনের স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নার্গিস বেগম হয়ে উঠেছেন রত্নগর্ভা।

সীমা বিশ্বাস

সীমা বিশ্বাস পেয়েছেন নির্যাতনবিরোধী সংগ্রামী নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার। স্বামীর নির্যাতনের মুখে শ্বশুরালয় থেকে বিতাড়িত হন কলারোয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের সিমসন বিশ্বাসের কন্যা সীমা বিশ্বাস। খুব ছোট বয়সে বাবা তার বিয়ে দিয়েছিলেন। অল্প বয়সেই হয়ে ওঠেন দুই সন্তানের মা। সেই সঙ্গে অভাব অনটনের সংসারে শুরু হয় স্বামীর নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সীমা চলে আসেন বাবার ভিটায়। সেখানেও দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। এক ভাইয়ের ঘরের চালের সঙ্গে আরেকটি চাল লাগিয়ে দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করতে থাকেন সীমা। মারা যান তার বাবা। তখন ঘোর অন্ধকার সীমার চোখে মুখে। পরের ক্ষেতে জোন কামলা খাটার ফাঁকে ফাঁকে খুঁজতে থাকেন একটি চাকরি। অবশেষে মিলেও যায়। সীমা এখন কলারোয়ার ব্র্যাক অফিসের একজন কর্মচারী। তিনি স্বামীর নির্যাতন জয় করে এতটুকু পথ এগিয়েও বেশ ভালোই আছেন।

মমতাজ বেগম

সমাজের নানা অনিয়ম দেখে নিজেকে আর বসিয়ে রাখতে পারেননি কলারোয়ার উত্তর দিগং গ্রামের আবুল হোসেনের কন্যা মমতাজ বেগম। সমাজকর্মী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়ে তিনি বললেন, চারপাশে যখন দেখি যৌন হয়রানি, যৌতুকের দাপট, বাল্যবিয়ের আয়োজন, স্ত্রীকে নির্যাতন, সেই সঙ্গে দারিদ্র্য। এ সবকিছুই আমাকে পীড়া দিত। একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম এমনসব নারীকে নিয়ে গড়ে তুলব সমিতি। সেই সমিতিতে জমা হওয়া সামান্য সঞ্চয় এক সময় বেশ বড় হলে সদস্যদের জন্য মৎস্য চাষ, কৃষি, হাঁস মুরগি পালন, পশু পালন, দরজি প্রশিক্ষণ, সেলাই, কুটিরশিল্পসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে তুলে দিলেন চাহিদামতো পরিশোধযোগ্য ঋণ। এ ঋণের ওপর ভর করে তারা যে যার মতো সফলতা পেয়েছেন। আমি নিজেও উঠে দাঁড়িয়েছি। এখন আমার সমিতিতে যুক্ত হতে চায় অনেক নারী। দূর থেকেও আসছে তারা।

সমিতির টাকা থেকে কিছু অর্থ মমতাজ ব্যয় করেন দরিদ্র ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কাজেও। মমতাজ কেবল নিজেকে নয়, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনেও এনেছেন সাফল্যের আলো। জয়িতার সম্মান পেয়ে মমতাজ এখন একজন গর্বিত সমাজকর্মী।

কলারোয়ার পাঁচ জয়িতার গল্প

কীভাবে উঠে দাঁড়ালেন তারা। কী তাদের সাফল্যের রহস্য। ভাগ্য বদলানো এমন পাঁচ নারী পেয়েছেন জয়িতার সম্মান। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার পাঁচ নারীর পাল্টে যাওয়া জীবনের গল্প নিয়ে লিখেছেন-
 সুভাষ চৌধুরী 
১৫ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আলেয়া খাতুন

সফল নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন আলেয়া খাতুন। তিন ছেলে নিয়ে বিধবা হন বুইতা গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে আলেয়া বেগম। অনটনের সংসারে চারটি মুখের খোরাক জোগাতে আলেয়া মাঠে কামলা খাটতে শুরু করেন। এর থেকে কিছু টাকা জমিয়ে তা দিয়ে ছোট্ট মুদি দোকান দেন। সংসারে ফিরতে থাকে সচ্ছলতা। সুযোগ বুঝে কিছু জমি কেনেন আলেয়া। সেখানে ফসল হয়। বাড়িতে তৈরি করেন একটি পোলট্রি ফার্ম। সেলাই প্রশিক্ষণ নিয়ে আলেয়া ঘরে পোশাক তৈরি করে সেই সঙ্গে পোশাকে হাতের কাজ করে বেশ রোজগার করতে থাকেন। আলেয়ার দুই ছেলে এখন বিদেশে কাজ নিয়ে গেছে। তারা টাকা পাঠায়। সঙ্গে রয়েছে নিজের আয়। নিজের কুঁড়েঘর সরিয়ে আলেয়া বানিয়েছেন ছোটখাটো দালান বাড়ি। মাত্র কয়েক বছরে এভাবেই কেটে গেছে আলেয়ার দুঃখের দিনগুলো। এখন তিনি একজন সফল নারী।

সানজিদা খাতুন

সমাজকর্মী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন সানজিদা খাতুন। পাইকপাড়া গ্রামের দিনমজুর আবদুল মালেকের মেয়ে সানজিদা খাতুন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সানজিদা সবার ছোট। বাবার দিন আনা দিন খাওয়া পরিবারে লেখাপড়ার কোনো সুযোগই ছিল না। তবু দমে যাননি সানজিদা। স্কুলে পড়তে পড়তে শুরু করেন প্রাইভেট পড়ানো।

এ প্রসঙ্গে সানজিদা বলেন, গ্রামে তো। এ জন্য টাকাও পাওয়া যেত কম। এভাবেই বাবার ওপর চাপ না দিয়ে নিজ আয় থেকে ব্যয় করি লেখাপড়ার জন্য। এসএসসি, এইচএসসির খরচ জোগাতে হিমশিম খেতে হয়েছে আমাকে। তবে সাফল্য এসেছে একের পর এক। অবশেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করি অর্থাৎ এমএ করি।

সদ্য চাকরিতে ঢুকেছেন সানজিদা। শিক্ষায় সফল এ নারী এখন চাকরির পাশাপাশি সমাজের যৌতুক, বাল্যবিয়েসহ নানা বিষয়ে কাজ করে হয়ে উঠছেন সমাজকর্মী।

নার্গিস বেগম

এ বছরের রত্নগর্ভা ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়েছেন নার্গিস বেগম। খুব ছোট বয়সে মাকে হারিয়েছিলেন কলারোয়ার নাথপুর গ্রামের কুতুবউদ্দিনের মেয়ে নার্গিস। তার স্থান হয় নানার বাড়িতে। খুব ইচ্ছা ছিল লেখাপড়া শিখে বড় হওয়ার। কিন্তু পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াকালে তার বিয়ে হয়ে যায়। স্বপ্নগুলো সব ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। তাই নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে যান তিনি। নার্গিসের সাত ছেলেমেয়ের মধ্যে দুই ছেলের একজন জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা, অন্যজন ডাক্তার। পাঁচ মেয়ের তিনজন কলেজশিক্ষক, একজন স্কুলশিক্ষক, অন্যজন গৃহিণী। নিজের জীবনের স্বপ্ন ছেলেমেয়েদের মধ্যে বাস্তবায়নের মাধ্যমে নার্গিস বেগম হয়ে উঠেছেন রত্নগর্ভা।

সীমা বিশ্বাস

সীমা বিশ্বাস পেয়েছেন নির্যাতনবিরোধী সংগ্রামী নারী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার। স্বামীর নির্যাতনের মুখে শ্বশুরালয় থেকে বিতাড়িত হন কলারোয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের সিমসন বিশ্বাসের কন্যা সীমা বিশ্বাস। খুব ছোট বয়সে বাবা তার বিয়ে দিয়েছিলেন। অল্প বয়সেই হয়ে ওঠেন দুই সন্তানের মা। সেই সঙ্গে অভাব অনটনের সংসারে শুরু হয় স্বামীর নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে সীমা চলে আসেন বাবার ভিটায়। সেখানেও দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী। এক ভাইয়ের ঘরের চালের সঙ্গে আরেকটি চাল লাগিয়ে দুই সন্তান নিয়ে বসবাস করতে থাকেন সীমা। মারা যান তার বাবা। তখন ঘোর অন্ধকার সীমার চোখে মুখে। পরের ক্ষেতে জোন কামলা খাটার ফাঁকে ফাঁকে খুঁজতে থাকেন একটি চাকরি। অবশেষে মিলেও যায়। সীমা এখন কলারোয়ার ব্র্যাক অফিসের একজন কর্মচারী। তিনি স্বামীর নির্যাতন জয় করে এতটুকু পথ এগিয়েও বেশ ভালোই আছেন।

মমতাজ বেগম

সমাজের নানা অনিয়ম দেখে নিজেকে আর বসিয়ে রাখতে পারেননি কলারোয়ার উত্তর দিগং গ্রামের আবুল হোসেনের কন্যা মমতাজ বেগম। সমাজকর্মী ক্যাটাগরিতে জয়িতা পুরস্কার পেয়ে তিনি বললেন, চারপাশে যখন দেখি যৌন হয়রানি, যৌতুকের দাপট, বাল্যবিয়ের আয়োজন, স্ত্রীকে নির্যাতন, সেই সঙ্গে দারিদ্র্য। এ সবকিছুই আমাকে পীড়া দিত। একদিন সিদ্ধান্ত নিলাম এমনসব নারীকে নিয়ে গড়ে তুলব সমিতি। সেই সমিতিতে জমা হওয়া সামান্য সঞ্চয় এক সময় বেশ বড় হলে সদস্যদের জন্য মৎস্য চাষ, কৃষি, হাঁস মুরগি পালন, পশু পালন, দরজি প্রশিক্ষণ, সেলাই, কুটিরশিল্পসহ নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের হাতে তুলে দিলেন চাহিদামতো পরিশোধযোগ্য ঋণ। এ ঋণের ওপর ভর করে তারা যে যার মতো সফলতা পেয়েছেন। আমি নিজেও উঠে দাঁড়িয়েছি। এখন আমার সমিতিতে যুক্ত হতে চায় অনেক নারী। দূর থেকেও আসছে তারা।

সমিতির টাকা থেকে কিছু অর্থ মমতাজ ব্যয় করেন দরিদ্র ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার কাজেও। মমতাজ কেবল নিজেকে নয়, সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জীবনেও এনেছেন সাফল্যের আলো। জয়িতার সম্মান পেয়ে মমতাজ এখন একজন গর্বিত সমাজকর্মী।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন