সাতক্ষীরার বেতনার চরের নারীর জীবন
jugantor
সাতক্ষীরার বেতনার চরের নারীর জীবন
সাতক্ষীরার বেতনা পারের চরভরাটি জমিতে ঘর বানিয়ে থাকেন তারা। নানা রকম প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন তারা। সেসব নারীদের কথা তুলে ধরেছেন-

  সুভাষ চৌধুরী  

১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের ছয় মাস কাজের মধ্যে থাকি। বাকি ছয় মাস বসে থাকতে হয়। কাজই তো নেই এখানে। থাকি বেতনার চরে খাস জমিতে। সারা বছর থাকে দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা। আমাদের জীবন খুব কঠিন। তার ওপর ভূমিদস্যুদের জমি ছাড়ার হুমকি-ধমকি। কে নেবে আমাদের জোনমজুরি। কাজ করতে হয় নোনা পানিতে। হাত পায়ের অবস্থা দেখানোর মতো নয়। নানা রোগে ভুগি। এভাবেই বললেন সাতক্ষীরার বেতনা পারের বাকখালী চরের চরভরাটি জমিতে ঘর বানিয়ে থাকা শিউলি মুন্ডা।

শিউলি মুন্ডা ও তার স্বামী চিরঞ্জীব মুন্ডা যখন যে কাজ পায় তাই করেন। এখন ইটভাটায় ইটের সারি দেওয়ার কাজ চলছে। হাজারে পঞ্চাশ টাকা। তাও আবার বাকি। শিউলির মজুরির সাত হাজার টাকা এখনো বকেয়া। শিউলি ধান কাটেন, ঘেরের শেওলা পরিষ্কার করেন, নদীতে মাছ ধরেন। এ প্রসঙ্গে শিউলি বলেন, এ বেতনা আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আবার এ বেতনাই আমাদের প্রতি বছর ডুবিয়ে দেয়। বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়। চরের এ ভাঙাচোরা ঘরে বসেই মোকাবিলা করতে হয় আম্পান, ইয়াস ঝড়সহ জলাবদ্ধতার। কাছেই রিশিল্পী একটি স্কুল করে দিয়েছে। সেখানে ছেলেটা পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। যা আয় তাই ব্যয়। আমাদের আশপাশে কোনো দোকানপাট নেই। অসুখ-বিসুখ হলে কিংবা গর্ভবতী মায়েদের সেবা নেওয়ার কোনো উপায় নেই।

বেতনা চরের শাল্যে গ্রামে থাকেন সাকিরননেসা। স্বামী দেলায়ার বেঁচে নেই। সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসারে। ছেলেরা বিয়ে করে বউ নিয়ে শহরে বাসা ভাড়া করে থাকে। ভ্যান চালায়। তারা সাকিরনকে দেখে না। সাকিরন জানান, তার কষ্টের শেষ নেই। এক চিলতে খাস জমির ওপর তার বসত। তাও ডুবে আছে বেতনার পানিতে। আমার জোনের দাম কখনো দেড়শ টাকা। কখনো আরও কম। প্রচণ্ড শীত জোন না খাটলে খাব কী? যখন যে কাজ পাই তাই করি। ছোট ছেলেটা বউ নিয়ে থাকে আমার কাছে। সেও ভ্যান চালায়। কতই বা পায়। এই দিয়ে চলতে হয় আমাদের।

সাবিত্রী মুন্ডা ভোর হতেই কাজে চলে যান। বাকখালীর চরে খাস জমিতে বাড়ি তার। স্বামী সন্যাসী মুন্ডা। কাজ না করলে উপোস থাকতে হয় তাদের। বর্ষায় চর পানিতে ডুবে যায়। মাছের ঘেরগুলো নদীর পানিতে একাকার হয়ে যায়।

সাবিত্রী মুন্ডার মতে, নোনা পানিতে দিনভর কাজ করায় শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গাইনি রোগে ভুগছি। তবু তো ভাটায় কাজ করি। ধান ক্ষেতের আগাছা নিংড়াই। সব থেকে বড় ভয় ঝড় বাদলের। তখন মাথা গোঁজার বাড়িটুকু তছনছ হয়ে যায়। দুটি ছেলেমেয়ে রিশিল্পীর স্কুলে পড়ে। এলাকার ভূমিদস্যুরা প্রায়ই হুমকি দেয় এখান থেকে চলে যাওয়ার। কোথায় যাব আমরা। সরকারের এ জমিতেই মাথা গুঁজে থাকতে চাই।

শাল্যে মাছখোলার চরের মাটিতে ঘর তুলেছিলেন লাইলীর স্বামী আতিয়ার। বেতনার পানির তোড়ে সেই মাটির ঘর পড়ে গেছে। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তারা এখন থাকেন গোয়ালঘরে। জোন মজুরি দেয় মাঠে-ঘাটে মাছের ঘেরে। ঘাস কাটে, বিক্রি করে। লাইলী বলেন, এ জমি ছাড়তে হুমকি দেয় পাশের গ্রামের ভূমিদস্যুরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকেরাও হুমকি দেয়। আমরা মুখ বুঝে শুনি। এখন তো শুনতে পাচ্ছি বেতনা নদী খনন করা হবে। আমাদের উঠিয়ে দেবে। আমরা তাহলে দাঁড়াব কোথায়? আমাদের এলাকার ইটভাটাগুলো পানির নিচে। তাই কাজ নেই। কেউ কাজ দিলে করি। বেতনায় মাছ ধরি। এভাবেই আমার দিন চলে।

সাতক্ষীরার বেতনার চরের নারীর জীবন

সাতক্ষীরার বেতনা পারের চরভরাটি জমিতে ঘর বানিয়ে থাকেন তারা। নানা রকম প্রতিকূলতার সঙ্গে যুদ্ধ করে বেঁচে আছেন তারা। সেসব নারীদের কথা তুলে ধরেছেন-
 সুভাষ চৌধুরী 
১৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বছরের ছয় মাস কাজের মধ্যে থাকি। বাকি ছয় মাস বসে থাকতে হয়। কাজই তো নেই এখানে। থাকি বেতনার চরে খাস জমিতে। সারা বছর থাকে দুর্যোগ, জলাবদ্ধতা। আমাদের জীবন খুব কঠিন। তার ওপর ভূমিদস্যুদের জমি ছাড়ার হুমকি-ধমকি। কে নেবে আমাদের জোনমজুরি। কাজ করতে হয় নোনা পানিতে। হাত পায়ের অবস্থা দেখানোর মতো নয়। নানা রোগে ভুগি। এভাবেই বললেন সাতক্ষীরার বেতনা পারের বাকখালী চরের চরভরাটি জমিতে ঘর বানিয়ে থাকা শিউলি মুন্ডা।

শিউলি মুন্ডা ও তার স্বামী চিরঞ্জীব মুন্ডা যখন যে কাজ পায় তাই করেন। এখন ইটভাটায় ইটের সারি দেওয়ার কাজ চলছে। হাজারে পঞ্চাশ টাকা। তাও আবার বাকি। শিউলির মজুরির সাত হাজার টাকা এখনো বকেয়া। শিউলি ধান কাটেন, ঘেরের শেওলা পরিষ্কার করেন, নদীতে মাছ ধরেন। এ প্রসঙ্গে শিউলি বলেন, এ বেতনা আমাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। আবার এ বেতনাই আমাদের প্রতি বছর ডুবিয়ে দেয়। বাড়িঘর ছেড়ে যেতে হয়। চরের এ ভাঙাচোরা ঘরে বসেই মোকাবিলা করতে হয় আম্পান, ইয়াস ঝড়সহ জলাবদ্ধতার। কাছেই রিশিল্পী একটি স্কুল করে দিয়েছে। সেখানে ছেলেটা পড়ে তৃতীয় শ্রেণিতে। যা আয় তাই ব্যয়। আমাদের আশপাশে কোনো দোকানপাট নেই। অসুখ-বিসুখ হলে কিংবা গর্ভবতী মায়েদের সেবা নেওয়ার কোনো উপায় নেই।

বেতনা চরের শাল্যে গ্রামে থাকেন সাকিরননেসা। স্বামী দেলায়ার বেঁচে নেই। সাত ছেলেমেয়ে নিয়ে তার সংসারে। ছেলেরা বিয়ে করে বউ নিয়ে শহরে বাসা ভাড়া করে থাকে। ভ্যান চালায়। তারা সাকিরনকে দেখে না। সাকিরন জানান, তার কষ্টের শেষ নেই। এক চিলতে খাস জমির ওপর তার বসত। তাও ডুবে আছে বেতনার পানিতে। আমার জোনের দাম কখনো দেড়শ টাকা। কখনো আরও কম। প্রচণ্ড শীত জোন না খাটলে খাব কী? যখন যে কাজ পাই তাই করি। ছোট ছেলেটা বউ নিয়ে থাকে আমার কাছে। সেও ভ্যান চালায়। কতই বা পায়। এই দিয়ে চলতে হয় আমাদের।

সাবিত্রী মুন্ডা ভোর হতেই কাজে চলে যান। বাকখালীর চরে খাস জমিতে বাড়ি তার। স্বামী সন্যাসী মুন্ডা। কাজ না করলে উপোস থাকতে হয় তাদের। বর্ষায় চর পানিতে ডুবে যায়। মাছের ঘেরগুলো নদীর পানিতে একাকার হয়ে যায়।

সাবিত্রী মুন্ডার মতে, নোনা পানিতে দিনভর কাজ করায় শারীরিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গাইনি রোগে ভুগছি। তবু তো ভাটায় কাজ করি। ধান ক্ষেতের আগাছা নিংড়াই। সব থেকে বড় ভয় ঝড় বাদলের। তখন মাথা গোঁজার বাড়িটুকু তছনছ হয়ে যায়। দুটি ছেলেমেয়ে রিশিল্পীর স্কুলে পড়ে। এলাকার ভূমিদস্যুরা প্রায়ই হুমকি দেয় এখান থেকে চলে যাওয়ার। কোথায় যাব আমরা। সরকারের এ জমিতেই মাথা গুঁজে থাকতে চাই।

শাল্যে মাছখোলার চরের মাটিতে ঘর তুলেছিলেন লাইলীর স্বামী আতিয়ার। বেতনার পানির তোড়ে সেই মাটির ঘর পড়ে গেছে। দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে তারা এখন থাকেন গোয়ালঘরে। জোন মজুরি দেয় মাঠে-ঘাটে মাছের ঘেরে। ঘাস কাটে, বিক্রি করে। লাইলী বলেন, এ জমি ছাড়তে হুমকি দেয় পাশের গ্রামের ভূমিদস্যুরা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকেরাও হুমকি দেয়। আমরা মুখ বুঝে শুনি। এখন তো শুনতে পাচ্ছি বেতনা নদী খনন করা হবে। আমাদের উঠিয়ে দেবে। আমরা তাহলে দাঁড়াব কোথায়? আমাদের এলাকার ইটভাটাগুলো পানির নিচে। তাই কাজ নেই। কেউ কাজ দিলে করি। বেতনায় মাছ ধরি। এভাবেই আমার দিন চলে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন