সহসা হাল ছাড়তে হয় না
jugantor
সহসা হাল ছাড়তে হয় না

  সাব্বিন হাসান  

১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু ‘আয়েশা’ নামেই তুমুল আলোচিত এখন। পুরো নাম আয়েশা এ মালিক। জন্ম ১৯৬৬ সালের ৩ জুন। জন্মসূত্রে পাকিস্তানের নাগরিক। আইনজীবী হিসাবে পাকিস্তানের ইতিহাসে গড়লেন নতুন অধ্যায়। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে উঠলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ তিনিই প্রথম নারী বিচারপতি হয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে ইতিহাস রচিত করলেন।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া প্রথম নারীই এখন আয়েশা মালিক। আয়েশা প্যারিস এবং নিউইয়র্কের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। লন্ডনের ফ্রান্সিস হল্যান্ড স্কুল ফর গার্লস থেকে এ লেভেল করেন। পাকিস্তানে তার শিক্ষা করাচি গ্রামার স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ এবং করাচি সরকারি কলেজ অব কমার্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স থেকে বাণিজ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি পাকিস্তান কলেজ অব ল আর লাহোর থেকে তার প্রাথমিক আইনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি হার্ভার্ড ল স্কুল, কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস থেকে এলএলএম করেন। আয়েশার শিক্ষাগত কৃতিত্বে অসামান্য যোগ্যতার জন্য লন্ডন এইচ. গ্যামন ফেলো ১৯৯৮-১৯৯৯ নামে পরিচিত। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত। তিন সন্তানের মা।

একেবারে ছোটবেলা থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যায় ছিল আয়েশার। সেজন্য স্কুল জীবন থেকেই নানামুখী এনজিও ও কল্যাণ সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন। স্বপ্ন দেখতেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন। পাকিস্তানের বিচারপতিদের পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে জুডিশিয়াল কমিশন অব পাকিস্তান সংক্ষেপে জেসিপি। বর্তমানে ৫৫ বছর বয়সি আয়েশা মালিককে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করার পক্ষে ভোট দেয় নয় সদস্যের জেসিপি। বলতে গেলে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি পাকিস্তানের স্বাধীনতার ৭৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতে একজন নারী বিচারপতি নিযুক্ত হচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের সাংসদ ও আইনবিষয়ক সংসদীয় সচিব মালেকা বোখারি টুইটে লিখেছেন, একজন মেধাবী আইনজীবী ও সুদক্ষ বিচারকের পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি হওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্ববহ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক হলেও আলোচিত এমন পদক্ষেপ নিয়ে পাকিস্তানে বিভক্তি ছড়িয়েছে। গত বছর দেশটির শীর্ষ আদালতে আয়েশা মালিকের পদোন্নতি জেসিপি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ তখন জেসিপির সদস্যরা আয়েশা মালিকের পদোন্নতির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। তবে সবশেষ জেসিপি যে ভোটাভুটি করে সেখানে বিভক্তির চিহ্ন স্পষ্ট হয়। কারণ আয়েশার পদোন্নতির পক্ষে ভোট দেন পাঁচজন। আর বিপক্ষে যায় চার ভোট।

পাকিস্তানের বহু আইনজীবী ও বিচারক নিজস্ব ফোরামের ভেতরে-বাইরে ঐতিহাসিক এ পদক্ষেপের সরাসরি বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, পদোন্নতি অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়। ইসলামাবাদভিত্তিক আইনজীবী ইমান মাজারি-হাজির বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আয়েশা মালিকের পদোন্নতির সিদ্ধান্তে জেসিপির স্বেচ্ছাচারী ও অস্বচ্ছতা নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন উঠেছে।

পাকিস্তানের আইনজীবীদের কয়েকটি সংগঠন বলছে, সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের লক্ষ্যে বিচারক মনোনয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির জন্য তারা বহু আগে থেকেই দাবি তুলেছে। কিন্তু তাদের দাবি উপেক্ষা করা হয়। আয়েশার নিয়োগের বিরুদ্ধে তারা ধর্মঘট ও আদালতের কার্যক্রম বয়কট করার হুমকি দিয়েছে। তাই পদোন্নতি আর দায়িত্ব পালন করা খুব একটা সহজ হবে না আয়েশার জন্য এমন মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সাবেক বিচারপতিরা। তবে বৈশ্বিক মান্নোয়নের কথা চিন্তা করে নারী বিদ্বেষী মনোভাব উসকে দেওয়া থেকে সবার বিরত থাকা উচিত মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।

জলবায়ু, ব্যাংকিং খাত এবং জনকল্যাণের স্বার্থে বহু ধরনের ঐতিহাসিক রায় দিয়ে তিনি দেশটির বিচারিক মহলে আলোচিত হয়েছেন। নিজগুণে বৈচিত্র্যপূর্ণ রায় প্রদানে তার জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে যে কোনো লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। নিজেকে সব সময় কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তা না হলে সামনে এগোনোর পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সহজে দমে যাওয়া মানে লড়াইয়ের আগেই হেরে যাওয়া। তাই যে কোনো কাজে সহসা হাল ছাড়তে হয় না। ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকলে আজ না হোক কাল সফলতা কাউকেই নিরাশ করবে না। নিজের বিশ্বাসের কথাগুলো এভাবেই ব্যক্ত করেছেন বহুল আলোচিত বিচারপতি আয়েশা মালিক।

সহসা হাল ছাড়তে হয় না

 সাব্বিন হাসান 
১৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শুধু ‘আয়েশা’ নামেই তুমুল আলোচিত এখন। পুরো নাম আয়েশা এ মালিক। জন্ম ১৯৬৬ সালের ৩ জুন। জন্মসূত্রে পাকিস্তানের নাগরিক। আইনজীবী হিসাবে পাকিস্তানের ইতিহাসে গড়লেন নতুন অধ্যায়। পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হয়ে উঠলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। কারণ তিনিই প্রথম নারী বিচারপতি হয়ে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে ইতিহাস রচিত করলেন।

পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন দলের সদস্যরা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তাই পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি হিসাবে নিয়োগের অনুমোদন পাওয়া প্রথম নারীই এখন আয়েশা মালিক। আয়েশা প্যারিস এবং নিউইয়র্কের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। লন্ডনের ফ্রান্সিস হল্যান্ড স্কুল ফর গার্লস থেকে এ লেভেল করেন। পাকিস্তানে তার শিক্ষা করাচি গ্রামার স্কুল থেকে সিনিয়র কেমব্রিজ এবং করাচি সরকারি কলেজ অব কমার্স অ্যান্ড ইকোনমিক্স থেকে বাণিজ্যে স্নাতক সম্পন্ন করেন। তিনি পাকিস্তান কলেজ অব ল আর লাহোর থেকে তার প্রাথমিক আইনি শিক্ষা গ্রহণ করেন। পরে তিনি হার্ভার্ড ল স্কুল, কেমব্রিজ, ম্যাসাচুসেটস থেকে এলএলএম করেন। আয়েশার শিক্ষাগত কৃতিত্বে অসামান্য যোগ্যতার জন্য লন্ডন এইচ. গ্যামন ফেলো ১৯৯৮-১৯৯৯ নামে পরিচিত। ব্যক্তিজীবনে তিনি বিবাহিত। তিন সন্তানের মা।

একেবারে ছোটবেলা থেকেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যায় ছিল আয়েশার। সেজন্য স্কুল জীবন থেকেই নানামুখী এনজিও ও কল্যাণ সংস্থার সঙ্গে কাজ করতেন। স্বপ্ন দেখতেন প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবেন। পাকিস্তানের বিচারপতিদের পদোন্নতির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকে জুডিশিয়াল কমিশন অব পাকিস্তান সংক্ষেপে জেসিপি। বর্তমানে ৫৫ বছর বয়সি আয়েশা মালিককে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি করার পক্ষে ভোট দেয় নয় সদস্যের জেসিপি। বলতে গেলে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম পরাশক্তি পাকিস্তানের স্বাধীনতার ৭৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আদালতে একজন নারী বিচারপতি নিযুক্ত হচ্ছেন।

ক্ষমতাসীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের সাংসদ ও আইনবিষয়ক সংসদীয় সচিব মালেকা বোখারি টুইটে লিখেছেন, একজন মেধাবী আইনজীবী ও সুদক্ষ বিচারকের পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের প্রথম নারী বিচারপতি হওয়ার বিষয়টি পাকিস্তানের জন্য গুরুত্ববহ ও স্মরণীয় মুহূর্ত। সিদ্ধান্ত ঐতিহাসিক হলেও আলোচিত এমন পদক্ষেপ নিয়ে পাকিস্তানে বিভক্তি ছড়িয়েছে। গত বছর দেশটির শীর্ষ আদালতে আয়েশা মালিকের পদোন্নতি জেসিপি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ তখন জেসিপির সদস্যরা আয়েশা মালিকের পদোন্নতির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেননি। তবে সবশেষ জেসিপি যে ভোটাভুটি করে সেখানে বিভক্তির চিহ্ন স্পষ্ট হয়। কারণ আয়েশার পদোন্নতির পক্ষে ভোট দেন পাঁচজন। আর বিপক্ষে যায় চার ভোট।

পাকিস্তানের বহু আইনজীবী ও বিচারক নিজস্ব ফোরামের ভেতরে-বাইরে ঐতিহাসিক এ পদক্ষেপের সরাসরি বিরোধিতা করছেন। তারা বলছেন, পদোন্নতি অনুমোদনের ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। একই সঙ্গে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়। ইসলামাবাদভিত্তিক আইনজীবী ইমান মাজারি-হাজির বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, আয়েশা মালিকের পদোন্নতির সিদ্ধান্তে জেসিপির স্বেচ্ছাচারী ও অস্বচ্ছতা নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন উঠেছে।

পাকিস্তানের আইনজীবীদের কয়েকটি সংগঠন বলছে, সুপ্রিম কোর্টে নিয়োগের লক্ষ্যে বিচারক মনোনয়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির জন্য তারা বহু আগে থেকেই দাবি তুলেছে। কিন্তু তাদের দাবি উপেক্ষা করা হয়। আয়েশার নিয়োগের বিরুদ্ধে তারা ধর্মঘট ও আদালতের কার্যক্রম বয়কট করার হুমকি দিয়েছে। তাই পদোন্নতি আর দায়িত্ব পালন করা খুব একটা সহজ হবে না আয়েশার জন্য এমন মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সাবেক বিচারপতিরা। তবে বৈশ্বিক মান্নোয়নের কথা চিন্তা করে নারী বিদ্বেষী মনোভাব উসকে দেওয়া থেকে সবার বিরত থাকা উচিত মনে করেন সমাজ বিশ্লেষকেরা।

জলবায়ু, ব্যাংকিং খাত এবং জনকল্যাণের স্বার্থে বহু ধরনের ঐতিহাসিক রায় দিয়ে তিনি দেশটির বিচারিক মহলে আলোচিত হয়েছেন। নিজগুণে বৈচিত্র্যপূর্ণ রায় প্রদানে তার জ্ঞানের প্রশংসা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা। অদম্য ইচ্ছা আর সাহস থাকলে যে কোনো লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। নিজেকে সব সময় কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়। তা না হলে সামনে এগোনোর পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায়। সহজে দমে যাওয়া মানে লড়াইয়ের আগেই হেরে যাওয়া। তাই যে কোনো কাজে সহসা হাল ছাড়তে হয় না। ধৈর্য নিয়ে লেগে থাকলে আজ না হোক কাল সফলতা কাউকেই নিরাশ করবে না। নিজের বিশ্বাসের কথাগুলো এভাবেই ব্যক্ত করেছেন বহুল আলোচিত বিচারপতি আয়েশা মালিক।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন