চুয়াডাঙ্গায় কুমড়ার বড়ির কারিগর
jugantor
চুয়াডাঙ্গায় কুমড়ার বড়ির কারিগর
শীত মৌসুমে তরকারির স্বাদ বাড়াতে কুমড়া বড়ির জুড়ি নেই। পৌষ-মাঘ মাসে বাঙালির ঘরে ঘরে কুমড়ার বড়ি দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। চুয়াডাঙ্গার অনেক পরিবারে বউ-ঝিরা নিজেদের পরিবারের খাওয়ার চাহিদা পূরণের জন্য, কেউ বা বিক্রি করে কিছুটা অর্থ রোজগারের জন্য কুমড়া বড়ি তৈরি করেন। লিখেছেন-

  আহাদ আলী মোল্লা  

১৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভেজা কলাই (মাষকলাই) ডাল পাটায় মিহি করে পিষ ছিলেন চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটি মাঠপাড়ার রোজিনা বেগম। চাল কুমড়া কুঁচিয়ে নিচ্ছিলেন ডালের পেস্টের সঙ্গে মেশানোর জন্য। একটি পাত্রে কুঁচানো চালকুমড়া আর বাটা কলাই ডাল ভালো করে ফেটিয়ে নেন। টিনের ট্রে বা সমান টিনের পাত্রে নারিকেল তেল মেখে সারি সারি কুমড়া ডালের বড়ি বসাতে থাকেন। এভাবেই তিনি পৌষ-মাঘ দু’মাস কুমড়া বড়ি দিয়ে তা কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।

এ প্রসঙ্গে রোজিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী আরজুল্লাহ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্বামীর একার আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমি কুমড়া বড়ি তৈরি করতে পারি। এই শেখাটাকে কাজে লাগিয়ে শীত মৌসুমে কিছু অর্থ উর্পাজনের চেষ্টা করি। শীতকালে বৃষ্টি না হওয়ায় এ সময়টায় আমি কুমড়ার বড়ি তৈরি করি। প্রতি কেজি কুমড়া বড়িতে খরচ বাদ দিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হাতে থাকে। এভাবে শীতকালে কুমড়ো বড়ি বিক্রি করে কিছু টাকা সঞ্চয় করি। কারণ বর্ষা মৌসুমে স্বামীর কাজ-কাম থাকে না। আমার জমানো টাকা তখন সংসারের প্রয়োজনে খরচ করি।

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের কোর্টপাড়ার রুবি খাতুন দালানের ছাদে টিনের ট্রেতে কুমড়া বড়ি দিচ্ছিলেন। বয়স ৬০ বছর। রুবির মতে, ছেলেবেলা থেকেই মা-দাদিদের দেখে আসছি কুমড়া বড়ি বানাতে। আগে ঢেঁকির ব্যবহার লাগত কুমড়ার বড়ি তৈরিতে। পরবর্তীতে পাটার ব্যবহার করা হতো। এখন বাজারে ডাল ভাঙানোর মেশিন আছে। কলাইয়ের ভেজানো ডাল নিয়ে গেলেই মুহূর্তে কলাইয়ের ডাল মিহি করে ঘুটে দেয়।’

একই পাড়ার ফরিদা খাতুন। তিনিও শীত মৌসুমে কুমড়া বড়ি দেন। ফরিদা খাতুন বলেন, পাঁচ কেজি ওজনের একটা চালকুমড়ার সঙ্গে বড়ি দিতে এক কেজি কলাইয়ের ডাল প্রয়োজন হয়। পাঁচ কেজি ওজনের একটি চালকুমড়ার সঙ্গে এক কেজি কলাইয়ের ডাল মিশালে প্রায় দুই কেজি বড়ি তৈরি করা যায়।’ প্রতি কেজি কলাইয়ের ডাল মেশিন দিয়ে মাড়াই করতে ৮ টাকা লাগে।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের সাকিমা বেগমও দীর্ঘদিন ধরে কুমড়া বড়ি তৈরি করে আসছেন। সাকিমা বেগম জানান, চালকুমড়ার বড়ি খুবই সুস্বাদু। যে কোনো তরকারিতেই এটা মিশ খাওয়ানো যায়। কুমড়ার বড়ি শুকিয়ে ঘরে তুলে রাখেন। সারা বছরই টুকটাক তরকারিতে রান্না করে খান। মেয়ের বাড়িসহ বিভিন্ন আত্মীয়কেও উপহার হিসাবে দেন। কুমড়া বড়ি দেওয়ার আগের দিন সকাল থেকে এর প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রথমে চালকুমড়া কুর্নি দিয়ে ছোট ছোট করে কুরে নেন। এরপর পানি নিংড়ানোর জন্য কাপড়ে বেঁধে সারারাত টানিয়ে রাখেন। একই দিন কলাইয়ের ডাল পানিতে ভিজিয়ে রাখেন ২৪ ঘণ্টা। পরদিন সকালে কলাইয়ের ডাল পিষে বা বেটে কুমড়ার সঙ্গে মিশিয়ে বড়ি দেন। কুমড়ার বড়ি দেওয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গায় বাঁশের খিল ও বাঁশের কাবারি দিয়ে এক রকম যন্ত্র বানানো হয়। যার আঞ্চলিক নাম চার বা চালি। ওই চালিতে বসিয়ে বড়ি রোদে শুকান। তিন থেকে চারদিন শুকালেই বড়ি খাওয়ার মতো বা বাজারে বিক্রির মতো হয়ে যায়।

সাকিমা বেগম আরও বলেন, আমাদের এখানে অনেক দরিদ্র নারী আছেন, যারা কুমড়োর বড়ি তৈরি করে তা হাটে বিক্রি করেন। সেই টাকায় সংসার চালান। নিজেদের খাওয়ার জন্যও রাখেন।

চুয়াডাঙ্গায় কুমড়ার বড়ির কারিগর

শীত মৌসুমে তরকারির স্বাদ বাড়াতে কুমড়া বড়ির জুড়ি নেই। পৌষ-মাঘ মাসে বাঙালির ঘরে ঘরে কুমড়ার বড়ি দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। চুয়াডাঙ্গার অনেক পরিবারে বউ-ঝিরা নিজেদের পরিবারের খাওয়ার চাহিদা পূরণের জন্য, কেউ বা বিক্রি করে কিছুটা অর্থ রোজগারের জন্য কুমড়া বড়ি তৈরি করেন। লিখেছেন-
 আহাদ আলী মোল্লা 
১৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ভেজা কলাই (মাষকলাই) ডাল পাটায় মিহি করে পিষ ছিলেন চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাজরাহাটি মাঠপাড়ার রোজিনা বেগম। চাল কুমড়া কুঁচিয়ে নিচ্ছিলেন ডালের পেস্টের সঙ্গে মেশানোর জন্য। একটি পাত্রে কুঁচানো চালকুমড়া আর বাটা কলাই ডাল ভালো করে ফেটিয়ে নেন। টিনের ট্রে বা সমান টিনের পাত্রে নারিকেল তেল মেখে সারি সারি কুমড়া ডালের বড়ি বসাতে থাকেন। এভাবেই তিনি পৌষ-মাঘ দু’মাস কুমড়া বড়ি দিয়ে তা কয়েকদিন রোদে শুকিয়ে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন।

এ প্রসঙ্গে রোজিনা বেগম বলেন, আমার স্বামী আরজুল্লাহ রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। স্বামীর একার আয়ে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। আমি কুমড়া বড়ি তৈরি করতে পারি। এই শেখাটাকে কাজে লাগিয়ে শীত মৌসুমে কিছু অর্থ উর্পাজনের চেষ্টা করি। শীতকালে বৃষ্টি না হওয়ায় এ সময়টায় আমি কুমড়ার বড়ি তৈরি করি। প্রতি কেজি কুমড়া বড়িতে খরচ বাদ দিয়ে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা হাতে থাকে। এভাবে শীতকালে কুমড়ো বড়ি বিক্রি করে কিছু টাকা সঞ্চয় করি। কারণ বর্ষা মৌসুমে স্বামীর কাজ-কাম থাকে না। আমার জমানো টাকা তখন সংসারের প্রয়োজনে খরচ করি।

চুয়াডাঙ্গা জেলা শহরের কোর্টপাড়ার রুবি খাতুন দালানের ছাদে টিনের ট্রেতে কুমড়া বড়ি দিচ্ছিলেন। বয়স ৬০ বছর। রুবির মতে, ছেলেবেলা থেকেই মা-দাদিদের দেখে আসছি কুমড়া বড়ি বানাতে। আগে ঢেঁকির ব্যবহার লাগত কুমড়ার বড়ি তৈরিতে। পরবর্তীতে পাটার ব্যবহার করা হতো। এখন বাজারে ডাল ভাঙানোর মেশিন আছে। কলাইয়ের ভেজানো ডাল নিয়ে গেলেই মুহূর্তে কলাইয়ের ডাল মিহি করে ঘুটে দেয়।’

একই পাড়ার ফরিদা খাতুন। তিনিও শীত মৌসুমে কুমড়া বড়ি দেন। ফরিদা খাতুন বলেন, পাঁচ কেজি ওজনের একটা চালকুমড়ার সঙ্গে বড়ি দিতে এক কেজি কলাইয়ের ডাল প্রয়োজন হয়। পাঁচ কেজি ওজনের একটি চালকুমড়ার সঙ্গে এক কেজি কলাইয়ের ডাল মিশালে প্রায় দুই কেজি বড়ি তৈরি করা যায়।’ প্রতি কেজি কলাইয়ের ডাল মেশিন দিয়ে মাড়াই করতে ৮ টাকা লাগে।

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের সাকিমা বেগমও দীর্ঘদিন ধরে কুমড়া বড়ি তৈরি করে আসছেন। সাকিমা বেগম জানান, চালকুমড়ার বড়ি খুবই সুস্বাদু। যে কোনো তরকারিতেই এটা মিশ খাওয়ানো যায়। কুমড়ার বড়ি শুকিয়ে ঘরে তুলে রাখেন। সারা বছরই টুকটাক তরকারিতে রান্না করে খান। মেয়ের বাড়িসহ বিভিন্ন আত্মীয়কেও উপহার হিসাবে দেন। কুমড়া বড়ি দেওয়ার আগের দিন সকাল থেকে এর প্রক্রিয়া শুরু করেন। প্রথমে চালকুমড়া কুর্নি দিয়ে ছোট ছোট করে কুরে নেন। এরপর পানি নিংড়ানোর জন্য কাপড়ে বেঁধে সারারাত টানিয়ে রাখেন। একই দিন কলাইয়ের ডাল পানিতে ভিজিয়ে রাখেন ২৪ ঘণ্টা। পরদিন সকালে কলাইয়ের ডাল পিষে বা বেটে কুমড়ার সঙ্গে মিশিয়ে বড়ি দেন। কুমড়ার বড়ি দেওয়ার জন্য চুয়াডাঙ্গায় বাঁশের খিল ও বাঁশের কাবারি দিয়ে এক রকম যন্ত্র বানানো হয়। যার আঞ্চলিক নাম চার বা চালি। ওই চালিতে বসিয়ে বড়ি রোদে শুকান। তিন থেকে চারদিন শুকালেই বড়ি খাওয়ার মতো বা বাজারে বিক্রির মতো হয়ে যায়।

সাকিমা বেগম আরও বলেন, আমাদের এখানে অনেক দরিদ্র নারী আছেন, যারা কুমড়োর বড়ি তৈরি করে তা হাটে বিক্রি করেন। সেই টাকায় সংসার চালান। নিজেদের খাওয়ার জন্যও রাখেন।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন