নাসরিন সতৌদে
jugantor
নাসরিন সতৌদে
নাসরিন সতৌদে ইরানের একজন মানবাধিকার আইনজীবী। এর চেয়েও তার বড় পরিচয় তিনি একজন জেলবন্দি নারী অধিকার নেত্রী। লিখেছেন-

  আবুল বাশার ফিরোজ  

২৪ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাসরিন সতৌদে একজন সাহসী নারী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াকু এই মানবাধিকার আইনজীবী ২০০৯ সালের জুনে বিতর্কিত ইরানের রাষ্ট্রপতির কারাবন্দি ইরানবিরোধী কর্মী ও রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব করেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ইরানের ধর্মীয়, মধ্যবিত্ত ইরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আইন বিষয়ে ১৯৯৫ সালে তার শিক্ষা সনদ মিললেও দীর্ঘ আট বছর আইন ব্যবসার অনুমোদন মেলেনি। প্রথম জীবনে সরকারি গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় ও একটি সরকারি ব্যাংক তেজারাতের আইনি বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু ইরানের নির্যাতিত রাজনৈতিক মামলার নারী আসামি এবং বন্দিদের অমানবিক জীবন দেখে তিনি আইনি সহায়তার জন্য তাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি সাংবাদিক ইসা সাহারখিজ, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদি এবং হেশমত তাবারজাদি মামলা লড়েছেন। এ ছাড়া হিজাব না পরে জনসমক্ষে বের হওয়ার জন্য গ্রেফতার হওয়া নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটি ইরানের একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি বহু নির্যাতিত নারী ও শিশুর জীবনের করুণ কাহিনি সংগ্রহ করে তা প্রকাশ ও প্রচারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার এই চেষ্টাকে প্রকাশকরা অদৃশ্য ইশারায় দমিয়ে দেয়। এতেও দমে যাননি তিনি। ২০১০ সালে ইরান সরকার প্রথম তার অফিসে তল্লাশি চালায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর গুজব ছড়ানোর দায়ে তাকে গ্রেফতার করে। ২০১১ সালে এই অপরাধে তার ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০ বছর আইন পেশা থেকে দূরে থাকার শাস্তি প্রদান করা হয়। আপিল আদালত দন্ড কমিয়ে ছয় বছরের জেল, ১০ বছরের আইন পেশাগত নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে। প্রায় তিন বছর জেল খাটেন। ২০১৩ সালে জাতিসংঘে ইরানের প্রেসিডেন্ট আলি খোমেনির ভাষণের পূর্ব মুহূর্তে বিরোধীদলীয় একজন রাজনৈতিক নেতা ও নাসরিন সতৌদেসহ ১০ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ইরানে নির্মিত ‘ট্যাক্সি’ ছবিতে তার প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়।

পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে আবারও গোয়েন্দাবৃত্তি, গুজব ছড়ানো এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খোমেনির প্রতি বিষোদগারের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়াও আরও কিছু অভিযোগ দাঁড় করিয়ে ২০১৯ সালে তাকে ৩৮ বছরের জেল ও ১৪৮ ঘা চাবুকের আঘাত দেওয়ার রায় ঘোষিত হয়। তার কণ্ঠ রোধ করার জন্য মেয়েকে আটক করেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট নাসরিন সতৌদে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে, জেলে বিভিন্ন অনিয়মের বিরোধিতা করে একটি চিঠি প্রকাশ করে ক্রমাগত অনশন করেন। চিঠিতে লেখা ছিল : ‘আপিল প্রক্রিয়া, প্যারোল, ফাঁসির দণ্ড স্থগিত করা এবং নূ্যূনতম সাজা দেওয়ার অভিপ্রায় একটি নতুন আইনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব আইনি অধিকারের প্রয়োগ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে যারা তাদের বিচার বহির্ভূতভাবে প্রয়োগ করে, রাজনৈতিক বন্দিদের শেষ দরজা বন্ধ করে দেয়।’ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার রায় ঘোষণার আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ডেপুটি হাইকমিশনার কেট গিলমোরকে নাসরিন সতৌদেকে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীদের বহু বছরের মধ্যে এটি ছিল প্রথম সফর। অনশনের কারণে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ বছরেরই ২০২০ সালে তিনি করোনা আক্রান্ত হন। তাকে হয়রানির উদ্দেশে প্রায়ই জেল পরিবর্তন করানো হয়। ইরানের নারীবাদী নেত্রী নাসরিন সতৌদের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠন বারবার আবেদন জানায়। সাবেক চেক প্রেসিডেন্ট ভ্যাক্লাভ হ্যাভেল এবং বিরোধী নেতা মীর-হোসেন মুসাভির স্ত্রী জাহরা রাহনাভার্ডও তার মুক্তির আহ্বান জানান। কিন্তু তাকে মুক্তি দেওয়া হয় না।

২০২১ সালের সেরা ১০০ ব্যক্তি এবং ১৫ আইকন ব্যক্তির মধ্যে টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে নাসরিন সতৌদে একজন হিসাবে স্থান পান। তার জীবনী নিয়ে ২০২০ সালে আমেরিকায় ‘নাসরিন’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থা ১২ বার তাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়ে সম্মানিত করেছে। ২০১৯ সালে তিনি কাউন্সিল অফ বার অ্যান্ড ল সোসাইটি অফ ইউরোপ মানবাধিকার পুরস্কার, জার্মান বিচারক সমিতির ২০২০ মানবাধিকার পুরস্কার, রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি লাভ করেন।

নাসরিন সতৌদে

নাসরিন সতৌদে ইরানের একজন মানবাধিকার আইনজীবী। এর চেয়েও তার বড় পরিচয় তিনি একজন জেলবন্দি নারী অধিকার নেত্রী। লিখেছেন-
 আবুল বাশার ফিরোজ 
২৪ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নাসরিন সতৌদে একজন সাহসী নারী। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াকু এই মানবাধিকার আইনজীবী ২০০৯ সালের জুনে বিতর্কিত ইরানের রাষ্ট্রপতির কারাবন্দি ইরানবিরোধী কর্মী ও রাজনীতিবিদদের প্রতিনিধিত্ব করেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ১৯৬৩ সালে ইরানের ধর্মীয়, মধ্যবিত্ত ইরানি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। আইন বিষয়ে ১৯৯৫ সালে তার শিক্ষা সনদ মিললেও দীর্ঘ আট বছর আইন ব্যবসার অনুমোদন মেলেনি। প্রথম জীবনে সরকারি গৃহায়ণ মন্ত্রণালয় ও একটি সরকারি ব্যাংক তেজারাতের আইনি বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু ইরানের নির্যাতিত রাজনৈতিক মামলার নারী আসামি এবং বন্দিদের অমানবিক জীবন দেখে তিনি আইনি সহায়তার জন্য তাদের পাশে দাঁড়ান। তিনি সাংবাদিক ইসা সাহারখিজ, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শিরিন এবাদি এবং হেশমত তাবারজাদি মামলা লড়েছেন। এ ছাড়া হিজাব না পরে জনসমক্ষে বের হওয়ার জন্য গ্রেফতার হওয়া নারীদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এটি ইরানের একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তিনি বহু নির্যাতিত নারী ও শিশুর জীবনের করুণ কাহিনি সংগ্রহ করে তা প্রকাশ ও প্রচারের চেষ্টা করেন। কিন্তু তার এই চেষ্টাকে প্রকাশকরা অদৃশ্য ইশারায় দমিয়ে দেয়। এতেও দমে যাননি তিনি। ২০১০ সালে ইরান সরকার প্রথম তার অফিসে তল্লাশি চালায়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর গুজব ছড়ানোর দায়ে তাকে গ্রেফতার করে। ২০১১ সালে এই অপরাধে তার ১১ বছরের কারাদণ্ড হয়। ২০ বছর আইন পেশা থেকে দূরে থাকার শাস্তি প্রদান করা হয়। আপিল আদালত দন্ড কমিয়ে ছয় বছরের জেল, ১০ বছরের আইন পেশাগত নিষেধাজ্ঞা প্রদান করে। প্রায় তিন বছর জেল খাটেন। ২০১৩ সালে জাতিসংঘে ইরানের প্রেসিডেন্ট আলি খোমেনির ভাষণের পূর্ব মুহূর্তে বিরোধীদলীয় একজন রাজনৈতিক নেতা ও নাসরিন সতৌদেসহ ১০ জনকে মুক্তি দেওয়া হয়। ২০১৫ সালে ইরানে নির্মিত ‘ট্যাক্সি’ ছবিতে তার প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হয়।

পাঁচ বছর পর ২০১৮ সালে আবারও গোয়েন্দাবৃত্তি, গুজব ছড়ানো এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খোমেনির প্রতি বিষোদগারের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়াও আরও কিছু অভিযোগ দাঁড় করিয়ে ২০১৯ সালে তাকে ৩৮ বছরের জেল ও ১৪৮ ঘা চাবুকের আঘাত দেওয়ার রায় ঘোষিত হয়। তার কণ্ঠ রোধ করার জন্য মেয়েকে আটক করেও পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও জব্দ করা হয়। ২০২০ সালের ১১ আগস্ট নাসরিন সতৌদে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির দাবিতে, জেলে বিভিন্ন অনিয়মের বিরোধিতা করে একটি চিঠি প্রকাশ করে ক্রমাগত অনশন করেন। চিঠিতে লেখা ছিল : ‘আপিল প্রক্রিয়া, প্যারোল, ফাঁসির দণ্ড স্থগিত করা এবং নূ্যূনতম সাজা দেওয়ার অভিপ্রায় একটি নতুন আইনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এসব আইনি অধিকারের প্রয়োগ জিজ্ঞাসাবাদকারীদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে যারা তাদের বিচার বহির্ভূতভাবে প্রয়োগ করে, রাজনৈতিক বন্দিদের শেষ দরজা বন্ধ করে দেয়।’ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার রায় ঘোষণার আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক ডেপুটি হাইকমিশনার কেট গিলমোরকে নাসরিন সতৌদেকে পরিদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার তদন্তকারীদের বহু বছরের মধ্যে এটি ছিল প্রথম সফর। অনশনের কারণে তিনি প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ বছরেরই ২০২০ সালে তিনি করোনা আক্রান্ত হন। তাকে হয়রানির উদ্দেশে প্রায়ই জেল পরিবর্তন করানো হয়। ইরানের নারীবাদী নেত্রী নাসরিন সতৌদের মুক্তির দাবিতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা এবং অসংখ্য মানবাধিকার সংগঠন বারবার আবেদন জানায়। সাবেক চেক প্রেসিডেন্ট ভ্যাক্লাভ হ্যাভেল এবং বিরোধী নেতা মীর-হোসেন মুসাভির স্ত্রী জাহরা রাহনাভার্ডও তার মুক্তির আহ্বান জানান। কিন্তু তাকে মুক্তি দেওয়া হয় না।

২০২১ সালের সেরা ১০০ ব্যক্তি এবং ১৫ আইকন ব্যক্তির মধ্যে টাইম ম্যাগাজিনের জরিপে নাসরিন সতৌদে একজন হিসাবে স্থান পান। তার জীবনী নিয়ে ২০২০ সালে আমেরিকায় ‘নাসরিন’ নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়। ২০১১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থা ১২ বার তাকে বিশেষ সম্মাননা দিয়ে সম্মানিত করেছে। ২০১৯ সালে তিনি কাউন্সিল অফ বার অ্যান্ড ল সোসাইটি অফ ইউরোপ মানবাধিকার পুরস্কার, জার্মান বিচারক সমিতির ২০২০ মানবাধিকার পুরস্কার, রাইট লাইভলিহুড অ্যাওয়ার্ড ইত্যাদি লাভ করেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন