দুর্গম পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি
jugantor
দুর্গম পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি

  রীতা ভৌমিক  

১৬ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। নদীপথে পাহাড়িরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন। সড়কপথে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই। যাতায়াতের কারণে জটিলতর সমস্যার সম্মুখীন না হলে এখানকার মেয়ে-বৌঝিরা বেশিরভাগই রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন না। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

পলিকাপাড়া গ্রামের দশ মাসের গর্ভবতী মেসিনু মারমা। ২০২১ সালের ৩১ জুলাই। শেষ রাতে তার প্রসব ব্যথা ওঠে। স্ত্রীকে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামী স্থানীয় দাইকে ডেকে আনেন। কিন্তু দাই তাকে দেখেই বুঝতে পারেন, প্রসব জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেসঙ্গে মেসিনুর শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে দাই প্রসব করাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। উপায়ন্তর না দেখে তার স্বামী বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্ত্রীকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। একটা নৌকা জোগাড় করতেই সকাল ৮টা বেজে যায়। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অনেক কষ্টে কাঁধে করে মেসিনুকে সাঙ্গু নদীর ঘাটে এনে নৌকায় তোলেন। সাঙ্গু নদীতে পানির পরিমাণ কম থাকায় ধীরগতিতে নৌকা চলে। সকাল সাড়ে দশটার দিকে নৌকা রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঘাটে এসে ভিড়ে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স মিডওয়াইফ ঝিলকি শর্মা বলেন, একজন ভদ্রলোক হন্তদন্তভাবে দৌড়ে এসে আমাকে খবর দিলেন তার স্ত্রী নৌকায় প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এ অবস্থায় তাকে কাঁধে করে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ওপরে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই তাকে নৌকায় রেখেই আমাদের নিয়ে যেতে এসেছেন। রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নৌ ঘাটের দূরত্ব সাত-আট মিনিটের পথ। এ সংবাদ শোনামাত্রই ডেলিভারির সরঞ্জামসহ সহকর্মী সংকীমকে নিয়ে দৌড়ে নদীর ঘাটে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি নৌকায় পাটাতন না থাকায় তলায় মেসিনু মারমাকে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। এদিকে নবজাতকের মাথা বেরিয়ে আসছে। এ জটিল অবস্থায় তাকে পাহাড়ের ওপর তুলে আনা অসম্ভব। আর দেরি না করে নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য তৎক্ষণাৎ নৌকায় ডেলিভারি করার সিদ্ধান্ত নিই। স্বাভাবিক ডেলিভারি করাই। বেলা ১১টায় তার একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর নৌকায় মা ও নবজাতককে প্রসবপরবর্তী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিই।

এ প্রসঙ্গে মেসিনু মারমা বলেন, প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয় এ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। গুরুতর সমস্যা না হলে আমাদের গ্রামের মেয়েরা কেউ ডাক্তারের কাছে যায় না। আমার প্রথম সন্তানের বয়স তিন বছর। যাতায়াতের সমস্যার কারণে প্রথম সন্তানের সময়ও রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাইনি। কোনো স্বাস্থ্যসেবাও নেইনি। প্রথম সন্তান দাইয়ের হাতে বাড়িতেই প্রসব হয়। দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হই। এবারও প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন ৪ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাইনি। দুর্গম পাহাড়ে বসতবাড়ি। তাই গর্ভবতী অবস্থায়ও আমাকে পানির সব কাজ যেমন বাসন ধোওয়া, কাপড় ধোওয়া, গোসল করা ইত্যাদি পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে নিচে এসে করতে হতো। পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে মাটির কলসিতে খাওয়ার, রান্নার, বাথরুমের পানি ভরে ওই পথেই নিচ থেকে ওপরে উঠতাম। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি স্বামীকেও চাষাবাদে সাহায্য করি। কিন্তু এবার প্রসবব্যথা উঠলে প্রসব জটিলতা দেখা দেয়। দাই প্রসব ঝুঁকি নিতে চায় না। আমার স্বামী অনেক কষ্টে আমাকে কাঁধে নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নেমে নদীর ঘাটে আসেন। এ সময় চিকিৎসাসেবা না পেলে হয়তো আমি ও আমার সন্তানের বিপদ ঘটে যেতে পারত।

পাহাড়ি এলাকার একটাই সমস্যা হলো, এখানকার অধিকাংশ গর্ভবতী স্বাস্থ্যসচেতন নন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন কমপক্ষে চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। কিন্তু বেশিরভাগ গর্ভবতী নারীই এ তথ্য জানেন না। এসব জানাতে হলে তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের যেতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কমিউনিটিতে যেসব গর্ভবতী আছেন, তাদের খুঁজে সেবা দিতে হবে। তবে আশার আলো, যে কোনো পরিস্থিতিতে মিডওয়াইফ কর্মীরা তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং তাদের সেবা দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. নীহার রঞ্জন নন্দী বলেন, বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা রুমা ও ধানচি উপজেলায় যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই সংকীর্ণ। যাতায়াতের সমস্যার কারণে এসব এলাকার গর্ভবতীরা প্রসবপূর্ববতী ও পরবর্তী চিকিৎসাসেবা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে অনীহা দেখায়। এ ক্ষেত্রে সেকেলে ধ্যানধারণা পোষণকারী শাশুড়িরা বাড়ির বউকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে নিরুৎসাহিত করেন। তারা বউকে বোঝায়, তাদের এতগুলো বাচ্চা হয়েছে কোনো সমস্যা হয় নাই। তাহলে বউকে ডাক্তার দেখাতে হবে কেন? অনেকে ভাবেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসবপূর্ববতী সেবা নিলে বা সন্তান প্রসব করাতে গেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হবে। এটা নিয়েও তাদের মনে ভয় কাজ করে। এ কুসংস্কার ভাঙতে পাহাড়ি এলাকার গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। গর্ভধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তারা যাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রসবপূর্ববতী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ডায়াবেটিস, প্রেসার, বাচ্চার পজিশন ঠিক রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। গর্ভকালীন জটিলতা দেখা দিলে তারা যেন দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক বা হাসপাতালমুখী হয় সেটাও তদারকি করতে হবে। যারা গর্ভবতী হচ্ছেন তাদের তালিকায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে যারা বাড়িতে সন্তান প্রসব করাতে গিয়ে মারা গেছেন, নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে তাদের খবর বের করে আনা সম্ভব হয়নি।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সিদ্দিকা আক্তারের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সারা দেশে মিডওয়াইফ কর্মীরা যেভাবে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে, নিরাপদ প্রসব সেবা প্রদানে কাজ করেছেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এ থেকে দেখা যায়, তারা নিজেদের পেশাকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। এ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এর ফলে দেশে নিরাপদ প্রসব সেবার হারও বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মিডওয়াইফরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ প্রসব সেবায়ও অংশ নিতে পারেন।

ইউএনএফপি-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধান ডা. বিভাবেন্দ্র রঘুয়ামশি বলেন, বাংলাদেশে ধাত্রী প্রবর্তনের পর থেকে মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস পেয়েছে। মিডওয়াইফারি এমন একটি পেশা যা বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। মাত্র এক দশক আগে বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ৩০০ জনের বেশি প্রসূতি মা মারা যাচ্ছিল, সেখানে আজ এর সংখ্যা প্রায় ১৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার

দুর্গম পাহাড়ে স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি

 রীতা ভৌমিক 
১৬ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পাহাড়ের গা ঘেঁষে বয়ে গেছে সাঙ্গু নদী। নদীপথে পাহাড়িরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করেন। সড়কপথে যাতায়াতের কোনো ব্যবস্থা নেই। যাতায়াতের কারণে জটিলতর সমস্যার সম্মুখীন না হলে এখানকার মেয়ে-বৌঝিরা বেশিরভাগই রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসেন না। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

পলিকাপাড়া গ্রামের দশ মাসের গর্ভবতী মেসিনু মারমা। ২০২১ সালের ৩১ জুলাই। শেষ রাতে তার প্রসব ব্যথা ওঠে। স্ত্রীকে প্রসব যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে তার স্বামী স্থানীয় দাইকে ডেকে আনেন। কিন্তু দাই তাকে দেখেই বুঝতে পারেন, প্রসব জটিলতা দেখা দিয়েছে। সেসঙ্গে মেসিনুর শারীরিক অবস্থারও অবনতি হতে থাকে। এ পরিস্থিতিতে দাই প্রসব করাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। উপায়ন্তর না দেখে তার স্বামী বান্দরবান জেলার রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্ত্রীকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। একটা নৌকা জোগাড় করতেই সকাল ৮টা বেজে যায়। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে অনেক কষ্টে কাঁধে করে মেসিনুকে সাঙ্গু নদীর ঘাটে এনে নৌকায় তোলেন। সাঙ্গু নদীতে পানির পরিমাণ কম থাকায় ধীরগতিতে নৌকা চলে। সকাল সাড়ে দশটার দিকে নৌকা রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ঘাটে এসে ভিড়ে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্স মিডওয়াইফ ঝিলকি শর্মা বলেন, একজন ভদ্রলোক হন্তদন্তভাবে দৌড়ে এসে আমাকে খবর দিলেন তার স্ত্রী নৌকায় প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন। শারীরিক অবস্থা ভালো নয়। এ অবস্থায় তাকে কাঁধে করে পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে ওপরে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই তাকে নৌকায় রেখেই আমাদের নিয়ে যেতে এসেছেন। রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে নৌ ঘাটের দূরত্ব সাত-আট মিনিটের পথ। এ সংবাদ শোনামাত্রই ডেলিভারির সরঞ্জামসহ সহকর্মী সংকীমকে নিয়ে দৌড়ে নদীর ঘাটে ছুটে যাই। গিয়ে দেখি নৌকায় পাটাতন না থাকায় তলায় মেসিনু মারমাকে আধশোয়া করে রাখা হয়েছে। এদিকে নবজাতকের মাথা বেরিয়ে আসছে। এ জটিল অবস্থায় তাকে পাহাড়ের ওপর তুলে আনা অসম্ভব। আর দেরি না করে নিরাপদ সন্তান প্রসবের জন্য তৎক্ষণাৎ নৌকায় ডেলিভারি করার সিদ্ধান্ত নিই। স্বাভাবিক ডেলিভারি করাই। বেলা ১১টায় তার একটি ফুটফুটে মেয়ে সন্তানের জন্ম হয়। এরপর নৌকায় মা ও নবজাতককে প্রসবপরবর্তী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা দিই।

এ প্রসঙ্গে মেসিনু মারমা বলেন, প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয় এ সম্পর্কে আমাদের কোনো ধারণা ছিল না। গুরুতর সমস্যা না হলে আমাদের গ্রামের মেয়েরা কেউ ডাক্তারের কাছে যায় না। আমার প্রথম সন্তানের বয়স তিন বছর। যাতায়াতের সমস্যার কারণে প্রথম সন্তানের সময়ও রুমা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গর্ভকালীন স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে যাইনি। কোনো স্বাস্থ্যসেবাও নেইনি। প্রথম সন্তান দাইয়ের হাতে বাড়িতেই প্রসব হয়। দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হই। এবারও প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন ৪ বার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাইনি। দুর্গম পাহাড়ে বসতবাড়ি। তাই গর্ভবতী অবস্থায়ও আমাকে পানির সব কাজ যেমন বাসন ধোওয়া, কাপড় ধোওয়া, গোসল করা ইত্যাদি পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে নিচে এসে করতে হতো। পাহাড়ি ঝর্ণা থেকে মাটির কলসিতে খাওয়ার, রান্নার, বাথরুমের পানি ভরে ওই পথেই নিচ থেকে ওপরে উঠতাম। গৃহস্থালি কাজের পাশাপাশি স্বামীকেও চাষাবাদে সাহায্য করি। কিন্তু এবার প্রসবব্যথা উঠলে প্রসব জটিলতা দেখা দেয়। দাই প্রসব ঝুঁকি নিতে চায় না। আমার স্বামী অনেক কষ্টে আমাকে কাঁধে নিয়ে পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নেমে নদীর ঘাটে আসেন। এ সময় চিকিৎসাসেবা না পেলে হয়তো আমি ও আমার সন্তানের বিপদ ঘটে যেতে পারত।

পাহাড়ি এলাকার একটাই সমস্যা হলো, এখানকার অধিকাংশ গর্ভবতী স্বাস্থ্যসচেতন নন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, প্রসবপূর্ববতী গর্ভকালীন কমপক্ষে চারবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা দরকার। কিন্তু বেশিরভাগ গর্ভবতী নারীই এ তথ্য জানেন না। এসব জানাতে হলে তাদের কাছে স্বাস্থ্যকর্মীদের যেতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। কমিউনিটিতে যেসব গর্ভবতী আছেন, তাদের খুঁজে সেবা দিতে হবে। তবে আশার আলো, যে কোনো পরিস্থিতিতে মিডওয়াইফ কর্মীরা তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন এবং তাদের সেবা দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. নীহার রঞ্জন নন্দী বলেন, বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা রুমা ও ধানচি উপজেলায় যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই সংকীর্ণ। যাতায়াতের সমস্যার কারণে এসব এলাকার গর্ভবতীরা প্রসবপূর্ববতী ও পরবর্তী চিকিৎসাসেবা নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসতে অনীহা দেখায়। এ ক্ষেত্রে সেকেলে ধ্যানধারণা পোষণকারী শাশুড়িরা বাড়ির বউকে স্বাস্থ্যসেবা নিতে নিরুৎসাহিত করেন। তারা বউকে বোঝায়, তাদের এতগুলো বাচ্চা হয়েছে কোনো সমস্যা হয় নাই। তাহলে বউকে ডাক্তার দেখাতে হবে কেন? অনেকে ভাবেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রসবপূর্ববতী সেবা নিলে বা সন্তান প্রসব করাতে গেলে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হবে। এটা নিয়েও তাদের মনে ভয় কাজ করে। এ কুসংস্কার ভাঙতে পাহাড়ি এলাকার গ্রাম পর্যায়ে স্বাস্থ্য সহকারীদের মাধ্যমে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে। গর্ভধারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তারা যাতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিকে প্রসবপূর্ববতী স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ডায়াবেটিস, প্রেসার, বাচ্চার পজিশন ঠিক রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা জরুরি। গর্ভকালীন জটিলতা দেখা দিলে তারা যেন দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক বা হাসপাতালমুখী হয় সেটাও তদারকি করতে হবে। যারা গর্ভবতী হচ্ছেন তাদের তালিকায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে যারা বাড়িতে সন্তান প্রসব করাতে গিয়ে মারা গেছেন, নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে তাদের খবর বের করে আনা সম্ভব হয়নি।

নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সিদ্দিকা আক্তারের মতে, কোভিড-১৯ মহামারির সময় সারা দেশে মিডওয়াইফ কর্মীরা যেভাবে মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়নে, নিরাপদ প্রসব সেবা প্রদানে কাজ করেছেন তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এ থেকে দেখা যায়, তারা নিজেদের পেশাকে গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। এ সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। এর ফলে দেশে নিরাপদ প্রসব সেবার হারও বাড়ছে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মিডওয়াইফরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বিশ্বব্যাপী নিরাপদ প্রসব সেবায়ও অংশ নিতে পারেন।

ইউএনএফপি-এর স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রধান ডা. বিভাবেন্দ্র রঘুয়ামশি বলেন, বাংলাদেশে ধাত্রী প্রবর্তনের পর থেকে মাতৃমৃত্যু হার হ্রাস পেয়েছে। মিডওয়াইফারি এমন একটি পেশা যা বাংলাদেশের ভাগ্য পরিবর্তন করছে। মাত্র এক দশক আগে বাংলাদেশে প্রতি ১ লাখ জীবিত জন্মে ৩০০ জনের বেশি প্রসূতি মা মারা যাচ্ছিল, সেখানে আজ এর সংখ্যা প্রায় ১৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন