মজুরি বৈষম্যের শিকার চরের নারী শ্রমিকরা
jugantor
মজুরি বৈষম্যের শিকার চরের নারী শ্রমিকরা
দেওয়ানগঞ্জ যমুনা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের নারীরা এখনো তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। পুরুষ শ্রমিকরা সারা দিন কাজ করে মজুরি পাচ্ছেন ৫০০ টাকা। একই কাজ করে নারী কৃষি শ্রমিকরা পাচ্ছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। লিখেছেন-

  মদন মোহন ঘোষ  

১৬ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পাহাড়ি নদী জিঞ্জিরাম। এ এলাকার চরাঞ্চলে মরিচ, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। কৃষকরা কম মজুরিতে নারী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতে বেশি আগ্রহ।

চৈত্র মাসে প্রচণ্ড গরম, রোদ উপেক্ষা করে মরিচ তুলছিলেন কাজলাপাড়ার নারী শ্রমিকরা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রোদে পুড়ে মরিচ তোলেন তারা।

কাজলাপাড়া গ্রামের দুই সন্তানের মা বিলকিছ। বয়স ৩০ বছর। স্বামী দিনমজুর। নয় বছরের মেয়ে প্রতিবন্ধী।

বিলকিছ বলেন, অভাবের সংসারে স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। সংসারে সহযোগিতার জন্য ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, এ তিন মাস চরের খেত থেকে মরিচ ও ভুট্টা তুলি। প্রচণ্ড রোদে মরিচ তুলে তা শুকানো, ভুট্টা তোলা এবং শুকানো খুবই কঠিন কাজ। রোদে খেতে মরিচ তোলার সময় সারা গা জ্বালাপোড়া করে। গাউ কালা হইয়া যায়। কী করুম কাম কাজ না থাকায় পেটেভাতে বাঁচার জন্য রোদে পুইড়ে কাজ করছি। আমাকে সহযোগিতা করে নয় বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েও। দুজনে সারা দিন মরিচ তুলে হাতে পাই ১৫০ টাকা। বেশি মরিচ তুললে গেরস্ত হাতে ২০০ টাকাও দেয়।

বিকালে বাড়ি ফিরে সংসারের কাজ সেরে রান্না করি। সেই ভাত রাতে খাই পরদিন সকালে খাই। দুপুরের জন্য সঙ্গে নিয়ে আসি। স্বামীও তাই করেন।

কাঠফাটা রোদে মরিচ গাছ থেকে পাকা লাল মরিচ তুলছিলেন লাভলী বেগম। ৩৫ বছর বয়সে তিনি তিন ছেলে এক মেয়ের মা। স্বামী ওয়েলডিং মিস্ত্রি। থাকেন পশ্চিম কাজলাপাড়ায়। তিনিও বিলকিছের মতো রাতে রান্না করে সকালে খেয়ে দুপুরের জন্য নিয়ে আসেন। এ পর্যন্ত মরিচ তুলে তিনি ৩ হাজার টাকা মজুরি পেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে লাভলী বলেন, বেটারা মরিচ ভুট্টা তুলে পায় ৫০০ টাকা, আমরা হ্যাগে থেকে বেশি কাম কইরা পাই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, সারা বছর বসনা থাকি, ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার চালানো খুবই কঠিন, কাজ না থাকলে বাড়িতে বসনা থাকতে হয়, তাই খরায় মরিচ ভুট্টা তুলি, গা জ্বালা পোড়া করে, রাতে ঘুমাইতে পারি না, আমাগো কেউ খোঁজখবর নেয় না।

একইভাবে ঘাম ঝরিয়ে ক্ষেত থেকে লাল মরিচ তুলছেন যমুনা পারে তিন সন্তানের মা সানাকা। তার স্বামী মিস্ত্রির কাজ করে। সকাল ৮টায় খেতে আসেন তিনি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত খেত থেকে মরিচ তুলে সারা দিনে দেড় থেকে দুই মণ। দিন শেষে মজুরি পান ১৫০ টাকা। যেদিন বেশি তুলে দেন সেদিন মালিক ২০০ টাকা দেন। তারও একই কথা, ব্যাটারা পায় ৫০০ আমরা পাই ১৫০। কাজ না থাকায় মুখ বুঝে কাজ করি। চৈত্র মাসের গরমে ও প্রখর রোদে খেত থেকে মরিচ তোলা ও ভুট্টার কলা থেকে ভুট্টা এড়ানো খুবই শক্ত কাজ হাত পায়ে ফুসকা পড়ে, শরীর জ্বালা পোড়া করে। বাড়িতে গিয়ে রান্না করে সংসার সামাল দিতে হয়। স্বামীর প্রতিদিন কাজ থাকে না। অভাবেই থাকতে হয়। বছরের অধিকাংশ সময়েই জীবনযুদ্ধ করে বাঁইচা থাকতে হয়।

মজুরি বৈষম্যের শিকার চরের নারী শ্রমিকরা

দেওয়ানগঞ্জ যমুনা নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের নারীরা এখনো তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। পুরুষ শ্রমিকরা সারা দিন কাজ করে মজুরি পাচ্ছেন ৫০০ টাকা। একই কাজ করে নারী কৃষি শ্রমিকরা পাচ্ছেন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। লিখেছেন-
 মদন মোহন ঘোষ 
১৬ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পাহাড়ি নদী জিঞ্জিরাম। এ এলাকার চরাঞ্চলে মরিচ, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হয়। কৃষকরা কম মজুরিতে নারী শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করাতে বেশি আগ্রহ।

চৈত্র মাসে প্রচণ্ড গরম, রোদ উপেক্ষা করে মরিচ তুলছিলেন কাজলাপাড়ার নারী শ্রমিকরা। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত রোদে পুড়ে মরিচ তোলেন তারা।

কাজলাপাড়া গ্রামের দুই সন্তানের মা বিলকিছ। বয়স ৩০ বছর। স্বামী দিনমজুর। নয় বছরের মেয়ে প্রতিবন্ধী।

বিলকিছ বলেন, অভাবের সংসারে স্বামী দিনমজুরের কাজ করেন। সংসারে সহযোগিতার জন্য ফাল্গুন, চৈত্র, বৈশাখ, এ তিন মাস চরের খেত থেকে মরিচ ও ভুট্টা তুলি। প্রচণ্ড রোদে মরিচ তুলে তা শুকানো, ভুট্টা তোলা এবং শুকানো খুবই কঠিন কাজ। রোদে খেতে মরিচ তোলার সময় সারা গা জ্বালাপোড়া করে। গাউ কালা হইয়া যায়। কী করুম কাম কাজ না থাকায় পেটেভাতে বাঁচার জন্য রোদে পুইড়ে কাজ করছি। আমাকে সহযোগিতা করে নয় বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েও। দুজনে সারা দিন মরিচ তুলে হাতে পাই ১৫০ টাকা। বেশি মরিচ তুললে গেরস্ত হাতে ২০০ টাকাও দেয়।

বিকালে বাড়ি ফিরে সংসারের কাজ সেরে রান্না করি। সেই ভাত রাতে খাই পরদিন সকালে খাই। দুপুরের জন্য সঙ্গে নিয়ে আসি। স্বামীও তাই করেন।

কাঠফাটা রোদে মরিচ গাছ থেকে পাকা লাল মরিচ তুলছিলেন লাভলী বেগম। ৩৫ বছর বয়সে তিনি তিন ছেলে এক মেয়ের মা। স্বামী ওয়েলডিং মিস্ত্রি। থাকেন পশ্চিম কাজলাপাড়ায়। তিনিও বিলকিছের মতো রাতে রান্না করে সকালে খেয়ে দুপুরের জন্য নিয়ে আসেন। এ পর্যন্ত মরিচ তুলে তিনি ৩ হাজার টাকা মজুরি পেয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে লাভলী বলেন, বেটারা মরিচ ভুট্টা তুলে পায় ৫০০ টাকা, আমরা হ্যাগে থেকে বেশি কাম কইরা পাই ১৫০ থেকে ২০০ টাকা, সারা বছর বসনা থাকি, ছেলেমেয়েদের নিয়ে সংসার চালানো খুবই কঠিন, কাজ না থাকলে বাড়িতে বসনা থাকতে হয়, তাই খরায় মরিচ ভুট্টা তুলি, গা জ্বালা পোড়া করে, রাতে ঘুমাইতে পারি না, আমাগো কেউ খোঁজখবর নেয় না।

একইভাবে ঘাম ঝরিয়ে ক্ষেত থেকে লাল মরিচ তুলছেন যমুনা পারে তিন সন্তানের মা সানাকা। তার স্বামী মিস্ত্রির কাজ করে। সকাল ৮টায় খেতে আসেন তিনি। বিকাল ৫টা পর্যন্ত খেত থেকে মরিচ তুলে সারা দিনে দেড় থেকে দুই মণ। দিন শেষে মজুরি পান ১৫০ টাকা। যেদিন বেশি তুলে দেন সেদিন মালিক ২০০ টাকা দেন। তারও একই কথা, ব্যাটারা পায় ৫০০ আমরা পাই ১৫০। কাজ না থাকায় মুখ বুঝে কাজ করি। চৈত্র মাসের গরমে ও প্রখর রোদে খেত থেকে মরিচ তোলা ও ভুট্টার কলা থেকে ভুট্টা এড়ানো খুবই শক্ত কাজ হাত পায়ে ফুসকা পড়ে, শরীর জ্বালা পোড়া করে। বাড়িতে গিয়ে রান্না করে সংসার সামাল দিতে হয়। স্বামীর প্রতিদিন কাজ থাকে না। অভাবেই থাকতে হয়। বছরের অধিকাংশ সময়েই জীবনযুদ্ধ করে বাঁইচা থাকতে হয়।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন