কুমিল্লার খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত
jugantor
কুমিল্লার খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত
কুমিল্লার খাদি কাপড় অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে বাজার তৈরি করেছেন চান্দিনার উম্মে ছালমা আজাদ সুমি, নাছরিন আক্তার সাথী, মীরা মজুমদার। লিখেছেন-

  মো. আব্দুল বাতেন  

২৩ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উম্মে ছালমা আজাদ সুমি। স্বামীর সরকারি চাকরির সুবাদে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তার ছিল ভরা সংসার। করোনায় ছয় মাস বয়সি মেয়ে সালওয়া সারা আফরা মারা যান। মেয়ের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। স্ত্রীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন স্বামী আনোয়ার হোসেন নিপু। স্বামীর পরামর্শে কুমিল্লার ঐতিহ্য খাদি নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। খাদি কাপড় কিনে থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়ায় নিজেই বাহারি ব্লক ও নকশি কাজ করেন। মেয়ের নামেই গড়ে তোলেন ‘আফরা ফ্যাশন হাউজ’। অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন।

কাপড়ের সুতা থেকে শুরু করে পণ্য তৈরির পুরোটাই তিনি করেন নিজের হাতে। উন্নতমানের পণ্যের কারণে অনলাইন ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন ঘরে বসেই প্রতি মাসে আয় করেন প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।

এ প্রসঙ্গে উম্মে ছালমা আজাদ সুমির মতে, কোলের ফুটফুটে মেয়েকে হারিয়ে মনে হচ্ছিল নিঃস্ব হয়ে গেছি। স্বামীর উৎসাহে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে শুরু করি। কুমিল্লার খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। খাদি কাপড় আরমদায়ক আর উভয় ঋতুতে ব্যবহার করা যায়। তাই কুমিল্লার খাদি নিয়েই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। এভাবেই পথচলা শুরু। খাদি কাপড়ে বাহারি ডিজাইনের ব্লক, নকশি কাজ করে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকও ভালোভাবে গ্রহণ করছে।

স্বামী পুলিশ সদস্য আনোয়ার হোসেন নিপু জানান, মেয়ের মৃত্যুতে ও অনেকটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ওর মানসিক মনোবল ফেরানোর জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন। খাদি কাপড় ছাড়া এত অল্প সময়ে এ ব্যবসার প্রসার ঘটানো সম্ভব ছিল না।

চান্দিনার বিশ্বাস গ্রামে নাছরিন আক্তার সাথীর বাড়ি। থাকেন চান্দিনার উপজেলা সদর ‘ধানসিঁড়ি’ আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসায়। করোনাকালীন ‘লকডাউনে’ স্বামীর ব্যবসার অচল অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে খাদি কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। অনলাইনে খাদি কাপড় বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। মাত্র ২ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ছয় মাসেই তার বিক্রি দাঁড়ায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। চান্দিনা ও পার্শ্ববর্তী বরকামতা গ্রাম থেকে খাদি কাপড় কিনেন। নিজের পছন্দমতো নকশা করেন থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবিতে। এমনকি গামছাও বিক্রি করেন।

নাছরিন আক্তার সাথী বলেন, অনার্সে পড়ার সময় বিয়ে হয়। স্বামীর বাড়িও চান্দিনা পৌরসভাধীন বেলাশহর কচুয়ারপাড় এলাকায়। ঢাকায় পড়ার সময় মা বিলকিছ আক্তার থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে প্রথমে অনলাইনে কসমেটিক্সের ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু করোনাকালীন ওই ব্যবসাও বেশি দূর এগোতে পারিনি। বাধ্য হয়ে চান্দিনায় চলে আসি। চান্দিনার খাদি নিয়ে ব্যবসায় অন্যরা বেশ এগোচ্ছে দেখে আমিও খাদি নিয়ে কাজ শুরু করি। গড়ে তুলি ‘লেডিস কেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে আমার ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

অপরদিকে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মীরা মজুমদার খাদিকে ভালোবেসে শখের বসে গড়ে তোলেন ‘ঈদিকা ফ্যাশন হাউজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিজেই চরকায় সুতা কাটা, কাপড় কাটা, পোশাক তৈরি, ব্লক ও নকশায় আধুনিক ডিজাইনে তৈরি করছেন খাদির বিভিন্ন পণ্য। তার তৈরি কাপল ড্রেস, ফ্যামিলি ড্রেস ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। তার তৈরি খাদি পোশাক দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় বসবাসরত বাঙালি গ্রাহকদেরও মন কেড়েছে।

মীরা মজুমদার জানান, ২০১৯ সালে তিনি উই নামক একটি প্ল্যাটফরমে যুক্ত হন। সে সময়ে তার উই প্ল্যাটফরম সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সময় কাটানোর জন্য উইতে সবার পোস্ট পড়তেন। অনেক নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প পড়ে খুব ভালো লাগত তার। স্নাতক শেষ করে ঘরেই বসেছিলেন, এর মধ্যেই করোনা মহামারি শুরু হয়ে যায়। চারদিকে হতাশা আর হতাশা। তিনি ভাবলেন, তার দ্বারা কিছুই হবে না। এ সময় তাকে সাহস জোগায় তার স্বামী। ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল তিনি উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরু করেন ৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ নিয়ে। টাঙ্গাইলের কয়েকটি শাড়ি দিয়ে শুরু করেন তার ব্যবসা। তাতে তেমন সাড়া না পেয়ে আবারও হতাশ হন। গুগলে সার্চ দিয়ে চান্দিনার খাদি সম্পর্কে জানতে পারেন। ছুটে যান খাদি পল্লিতে। গ্রামীণ খাদি থেকে খাদি কাপড় কিনে তৈরি করেন পাঞ্জাবি, শাড়ি ও ওড়না। তাতে হ্যান্ড পেইন্টিং করে পোস্ট দেন। ওই দিনই খাদি পাঞ্জাবির কাস্টমার পান।

তিনি বলেন, চেষ্টা করেছি ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড় কিনে নিজ হাতে ব্লকের নকশা করা, চরকায় সুতা কেটে ওই সুতায় নকশা করে নতুন মাত্রা যোগ করে।

কুমিল্লার খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত

কুমিল্লার খাদি কাপড় অনলাইন ব্যবসার মাধ্যমে বাজার তৈরি করেছেন চান্দিনার উম্মে ছালমা আজাদ সুমি, নাছরিন আক্তার সাথী, মীরা মজুমদার। লিখেছেন-
 মো. আব্দুল বাতেন 
২৩ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

উম্মে ছালমা আজাদ সুমি। স্বামীর সরকারি চাকরির সুবাদে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলা সদরে বসবাস শুরু করেন। দুই ছেলে এক মেয়ে নিয়ে তার ছিল ভরা সংসার। করোনায় ছয় মাস বয়সি মেয়ে সালওয়া সারা আফরা মারা যান। মেয়ের মৃত্যুতে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। স্ত্রীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন স্বামী আনোয়ার হোসেন নিপু। স্বামীর পরামর্শে কুমিল্লার ঐতিহ্য খাদি নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি। খাদি কাপড় কিনে থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ফতুয়ায় নিজেই বাহারি ব্লক ও নকশি কাজ করেন। মেয়ের নামেই গড়ে তোলেন ‘আফরা ফ্যাশন হাউজ’। অনলাইনে ব্যবসা শুরু করেন।

কাপড়ের সুতা থেকে শুরু করে পণ্য তৈরির পুরোটাই তিনি করেন নিজের হাতে। উন্নতমানের পণ্যের কারণে অনলাইন ব্যবসার দ্রুত প্রসার ঘটেছে। তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। এখন ঘরে বসেই প্রতি মাসে আয় করেন প্রায় ৩০ হাজার টাকার মতো।

এ প্রসঙ্গে উম্মে ছালমা আজাদ সুমির মতে, কোলের ফুটফুটে মেয়েকে হারিয়ে মনে হচ্ছিল নিঃস্ব হয়ে গেছি। স্বামীর উৎসাহে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসাবে গড়ে তুলতে শুরু করি। কুমিল্লার খাদি বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। খাদি কাপড় আরমদায়ক আর উভয় ঋতুতে ব্যবহার করা যায়। তাই কুমিল্লার খাদি নিয়েই কাজ করার সিদ্ধান্ত নিই। এভাবেই পথচলা শুরু। খাদি কাপড়ে বাহারি ডিজাইনের ব্লক, নকশি কাজ করে ভিন্নতা আনার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন প্রান্তের গ্রাহকও ভালোভাবে গ্রহণ করছে।

স্বামী পুলিশ সদস্য আনোয়ার হোসেন নিপু জানান, মেয়ের মৃত্যুতে ও অনেকটাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। ওর মানসিক মনোবল ফেরানোর জন্য উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন। খাদি কাপড় ছাড়া এত অল্প সময়ে এ ব্যবসার প্রসার ঘটানো সম্ভব ছিল না।

চান্দিনার বিশ্বাস গ্রামে নাছরিন আক্তার সাথীর বাড়ি। থাকেন চান্দিনার উপজেলা সদর ‘ধানসিঁড়ি’ আবাসিক এলাকার ভাড়া বাসায়। করোনাকালীন ‘লকডাউনে’ স্বামীর ব্যবসার অচল অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে খাদি কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন। অনলাইনে খাদি কাপড় বিক্রি করে সংসারে সচ্ছলতা এনেছেন। মাত্র ২ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। ছয় মাসেই তার বিক্রি দাঁড়ায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা। চান্দিনা ও পার্শ্ববর্তী বরকামতা গ্রাম থেকে খাদি কাপড় কিনেন। নিজের পছন্দমতো নকশা করেন থ্রি-পিস, শাড়ি, পাঞ্জাবিতে। এমনকি গামছাও বিক্রি করেন।

নাছরিন আক্তার সাথী বলেন, অনার্সে পড়ার সময় বিয়ে হয়। স্বামীর বাড়িও চান্দিনা পৌরসভাধীন বেলাশহর কচুয়ারপাড় এলাকায়। ঢাকায় পড়ার সময় মা বিলকিছ আক্তার থেকে ২ হাজার টাকা নিয়ে প্রথমে অনলাইনে কসমেটিক্সের ব্যবসা শুরু করি। কিন্তু করোনাকালীন ওই ব্যবসাও বেশি দূর এগোতে পারিনি। বাধ্য হয়ে চান্দিনায় চলে আসি। চান্দিনার খাদি নিয়ে ব্যবসায় অন্যরা বেশ এগোচ্ছে দেখে আমিও খাদি নিয়ে কাজ শুরু করি। গড়ে তুলি ‘লেডিস কেয়ার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। মাত্র ৬ মাসের মধ্যে আমার ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটে।

অপরদিকে পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রী মীরা মজুমদার খাদিকে ভালোবেসে শখের বসে গড়ে তোলেন ‘ঈদিকা ফ্যাশন হাউজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। নিজেই চরকায় সুতা কাটা, কাপড় কাটা, পোশাক তৈরি, ব্লক ও নকশায় আধুনিক ডিজাইনে তৈরি করছেন খাদির বিভিন্ন পণ্য। তার তৈরি কাপল ড্রেস, ফ্যামিলি ড্রেস ব্যাপক সাড়া পেয়েছে। তার তৈরি খাদি পোশাক দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় বসবাসরত বাঙালি গ্রাহকদেরও মন কেড়েছে।

মীরা মজুমদার জানান, ২০১৯ সালে তিনি উই নামক একটি প্ল্যাটফরমে যুক্ত হন। সে সময়ে তার উই প্ল্যাটফরম সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না। সময় কাটানোর জন্য উইতে সবার পোস্ট পড়তেন। অনেক নারীর উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প পড়ে খুব ভালো লাগত তার। স্নাতক শেষ করে ঘরেই বসেছিলেন, এর মধ্যেই করোনা মহামারি শুরু হয়ে যায়। চারদিকে হতাশা আর হতাশা। তিনি ভাবলেন, তার দ্বারা কিছুই হবে না। এ সময় তাকে সাহস জোগায় তার স্বামী। ২০২০ সালের ৪ এপ্রিল তিনি উদ্যোক্তা জীবনের পথচলা শুরু করেন ৬ হাজার টাকা বিনিয়োগ নিয়ে। টাঙ্গাইলের কয়েকটি শাড়ি দিয়ে শুরু করেন তার ব্যবসা। তাতে তেমন সাড়া না পেয়ে আবারও হতাশ হন। গুগলে সার্চ দিয়ে চান্দিনার খাদি সম্পর্কে জানতে পারেন। ছুটে যান খাদি পল্লিতে। গ্রামীণ খাদি থেকে খাদি কাপড় কিনে তৈরি করেন পাঞ্জাবি, শাড়ি ও ওড়না। তাতে হ্যান্ড পেইন্টিং করে পোস্ট দেন। ওই দিনই খাদি পাঞ্জাবির কাস্টমার পান।

তিনি বলেন, চেষ্টা করেছি ঐতিহ্যবাহী খাদি কাপড় কিনে নিজ হাতে ব্লকের নকশা করা, চরকায় সুতা কেটে ওই সুতায় নকশা করে নতুন মাত্রা যোগ করে।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন