রক্তকন্যা স্মৃতির সংগ্রামের গল্প
jugantor
রক্তকন্যা স্মৃতির সংগ্রামের গল্প

  আরাফাত আহমেদ রিফাত  

১৩ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট বা ফোনের মাধ্যমে পরিচিতদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করেন। এই পোস্ট বা ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে কখনো রক্ত পাওয়া যায়, আবার কখনো পাওয়া যায় না। তবুও হাল ছাড়েন না তিনি। মানুষের সেবায় এভাবেই কাজ করছেন তিনি। লিখেছেন-আরাফাত আহমেদ রিফাত

শুধু ফেসবুকে পোস্ট দিয়েই বসে থাকেন না রাজবাড়ীর সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। রক্তের গ্রুপ জানা আছে এমন মানুষদেরও ফোন করেন রক্ত দিয়ে একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসার জন্য। কেউ রক্ত দিতে রাজি হলে যত দ্রুত সম্ভব তা সংগ্রহ করে সঠিক স্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করেন। ডাক নাম স্মৃতি হলেও সবার কাছে তিনি রক্তকন্যা নামেই পরিচিত। কারণ স্মৃতি গত ১৩ বছরে ২৭ হাজারের অধিক মুমূর্ষু রোগীকে বিনামূল্যে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তিনি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে তা মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

তবে সোনিয়া আক্তার স্মৃতির জীবনের গল্পটা একটু আলাদা। ছোট থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন গরিব-অসহায় মানুষদের সাহায্য করবেন। কিন্তু ২০০৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার পরই তার বিয়ে হয়ে যায়। এর ফলে তার স্বপ্নটাও চাপা পড়ে যায়। পরে স্বামীর উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি গরিব এবং অসহায় মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন। এতে সফলও হন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বলেন, আমার দাদার অপারেশন রক্তের জন্য পিছিয়ে যায়। রক্ত সংগ্রহ করতে না পারায় অপারেশনের পর তিনি মারা যান। এ ঘটনাটি আমাকে প্রবল নাড়া দেয়। সঠিক সময়ে রক্ত সংগ্রহ করতে পারলে দাদা আমাদের ছেড়ে চিরজীবনের মতো চলে যেতেন না। সিদ্ধান্ত নিলাম, রক্তের অভাবে আরেকটি জীবনও যেন ঝরে না যায়। ২০১১ সালের দিকে একদিন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখি একজন বাবা তার অসুস্থ মেয়ের জন্য হন্যে হয়ে রক্তের সন্ধান করছেন। আমার রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ওই মেয়ের রক্তের গ্রুপের মিল না হওয়ায় আমি রক্ত দিতে পারিনি। কিন্তু থেমে রইলাম না। অনেক খোঁজ করে ওর গ্রুপের রক্ত জোগাড় করি। মেয়েটির বাবা রক্ত পেয়ে আনন্দে কান্না করেন। একজন মুমূর্ষ রোগীর বাবার মুখে সেদিন প্রশস্তি দেখে অনেকটা শান্তি পাই। এভাবেই মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত নিয়ে আমার কাজ শুরু হলো।

রক্ত সংগ্রহের পাশাপাশি সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বেশ কয়েকবার রক্তদান করেছেন। একদল তরুণ-তরুণীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘রাজবাড়ী ব্লাড ডোনার্স ক্লাব’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যার মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত মুমূর্ষু রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। এ ছাড়াও তিনি এ সংগঠন থেকে ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে রক্তদাতা সংগ্রহ, ফ্রি ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রক্ত নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এবং তার সংগঠন করোনার লকডাউন চলাকালীন সময়ে গরিব এবং অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে খাবার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, মাস্ক বিতরণ করেছেন।

জনসেবামূলক কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বলেন, মাঝে মাঝে রোগীর স্বজনদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ব্লাড ব্যাগ, যিনি রক্ত টেনে দেন তার খরচ, ডোনারের যাতায়াত খরচ, ডোনারের জন্য সামান্য জুস বা ফল কেনাসহ এক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে প্রায় চার-পাঁচশ টাকা খরচ হয়। রোগীর স্বজনরা সেই টাকা দেওয়ার সময় ভাবেন আমরা তাদের কাছে ব্লাড বিক্রি করছি। এই বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। এমন দিন আসবে তারা বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

সোনিয়া আক্তার স্মৃতির দুই সন্তান। স্বামী প্রবাসী। সামাজিক কাজে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন ‘সাহিত্যের খেয়াঘাট পুরস্কার’, ‘প্রিয়বাসিনী বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড’সহ অনেক সম্মাননা।

রক্তকন্যা স্মৃতির সংগ্রামের গল্প

 আরাফাত আহমেদ রিফাত 
১৩ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট বা ফোনের মাধ্যমে পরিচিতদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করেন। এই পোস্ট বা ফোনে যোগাযোগের মাধ্যমে কখনো রক্ত পাওয়া যায়, আবার কখনো পাওয়া যায় না। তবুও হাল ছাড়েন না তিনি। মানুষের সেবায় এভাবেই কাজ করছেন তিনি। লিখেছেন-আরাফাত আহমেদ রিফাত

শুধু ফেসবুকে পোস্ট দিয়েই বসে থাকেন না রাজবাড়ীর সোনিয়া আক্তার স্মৃতি। রক্তের গ্রুপ জানা আছে এমন মানুষদেরও ফোন করেন রক্ত দিয়ে একজন রোগীর জীবন বাঁচাতে এগিয়ে আসার জন্য। কেউ রক্ত দিতে রাজি হলে যত দ্রুত সম্ভব তা সংগ্রহ করে সঠিক স্থানে পৌঁছানোর ব্যবস্থাও করেন। ডাক নাম স্মৃতি হলেও সবার কাছে তিনি রক্তকন্যা নামেই পরিচিত। কারণ স্মৃতি গত ১৩ বছরে ২৭ হাজারের অধিক মুমূর্ষু রোগীকে বিনামূল্যে রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছেন। তিনি প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৫ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে তা মুমূর্ষু রোগীর স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।

তবে সোনিয়া আক্তার স্মৃতির জীবনের গল্পটা একটু আলাদা। ছোট থেকেই তিনি স্বপ্ন দেখতেন গরিব-অসহায় মানুষদের সাহায্য করবেন। কিন্তু ২০০৭ সালে এসএসসি পরীক্ষার পরই তার বিয়ে হয়ে যায়। এর ফলে তার স্বপ্নটাও চাপা পড়ে যায়। পরে স্বামীর উৎসাহ আর অনুপ্রেরণায় এবং বন্ধুদের সহযোগিতায় তিনি গরিব এবং অসহায় মানুষের জন্য কাজ শুরু করেন। এতে সফলও হন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বলেন, আমার দাদার অপারেশন রক্তের জন্য পিছিয়ে যায়। রক্ত সংগ্রহ করতে না পারায় অপারেশনের পর তিনি মারা যান। এ ঘটনাটি আমাকে প্রবল নাড়া দেয়। সঠিক সময়ে রক্ত সংগ্রহ করতে পারলে দাদা আমাদের ছেড়ে চিরজীবনের মতো চলে যেতেন না। সিদ্ধান্ত নিলাম, রক্তের অভাবে আরেকটি জীবনও যেন ঝরে না যায়। ২০১১ সালের দিকে একদিন রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখি একজন বাবা তার অসুস্থ মেয়ের জন্য হন্যে হয়ে রক্তের সন্ধান করছেন। আমার রক্তের গ্রুপের সঙ্গে ওই মেয়ের রক্তের গ্রুপের মিল না হওয়ায় আমি রক্ত দিতে পারিনি। কিন্তু থেমে রইলাম না। অনেক খোঁজ করে ওর গ্রুপের রক্ত জোগাড় করি। মেয়েটির বাবা রক্ত পেয়ে আনন্দে কান্না করেন। একজন মুমূর্ষ রোগীর বাবার মুখে সেদিন প্রশস্তি দেখে অনেকটা শান্তি পাই। এভাবেই মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত নিয়ে আমার কাজ শুরু হলো।

রক্ত সংগ্রহের পাশাপাশি সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বেশ কয়েকবার রক্তদান করেছেন। একদল তরুণ-তরুণীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘রাজবাড়ী ব্লাড ডোনার্স ক্লাব’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। যার মাধ্যমে তিনি প্রতিনিয়ত মুমূর্ষু রোগীদের রক্ত সংগ্রহ করে দিচ্ছেন। এ ছাড়াও তিনি এ সংগঠন থেকে ভ্রাম্যমাণ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে রক্তদাতা সংগ্রহ, ফ্রি ব্লাড গ্রুপ নির্ণয় এবং রক্তদানের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

রক্ত নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি তিনি এবং তার সংগঠন করোনার লকডাউন চলাকালীন সময়ে গরিব এবং অসহায় মানুষের মাঝে বিনামূল্যে খাবার, হ্যান্ড স্যানিটাইজার, গ্লাভস, মাস্ক বিতরণ করেছেন।

জনসেবামূলক কাজ করতে গিয়ে কখনো কখনো বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। বিব্রতকর পরিস্থিতিতেও পড়েছেন। এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার স্মৃতি বলেন, মাঝে মাঝে রোগীর স্বজনদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। ব্লাড ব্যাগ, যিনি রক্ত টেনে দেন তার খরচ, ডোনারের যাতায়াত খরচ, ডোনারের জন্য সামান্য জুস বা ফল কেনাসহ এক ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করতে প্রায় চার-পাঁচশ টাকা খরচ হয়। রোগীর স্বজনরা সেই টাকা দেওয়ার সময় ভাবেন আমরা তাদের কাছে ব্লাড বিক্রি করছি। এই বিষয়টা খুবই দুঃখজনক। এমন দিন আসবে তারা বিষয়টা বুঝতে পারবেন।

সোনিয়া আক্তার স্মৃতির দুই সন্তান। স্বামী প্রবাসী। সামাজিক কাজে অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন ‘সাহিত্যের খেয়াঘাট পুরস্কার’, ‘প্রিয়বাসিনী বাংলাদেশ অ্যাওয়ার্ড’সহ অনেক সম্মাননা।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন