অসহায়দের সহায়তা দেন দিলরুবা
jugantor
অসহায়দের সহায়তা দেন দিলরুবা
অসহায় নারীদের ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌস। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। লিখেছেন-

  আয়শা সিদ্দিকা আকাশী  

২০ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতে ট্যাকা নাই। কি করমু। প্যাট ব্যথায় বাঁচি না। ম্যালা কষ্ট হয়। দোকান থাইক্যা ওষুধ আনছি। তা খাইয়্যা কোনো লাভ হয় নাই। ব্যথা কমে নাই। তহন একজন আমারে কইল, ‘চৌধুরী কিনিক (ক্লিনিক) যাইতে। হেইখানে একজন ডাক্তার আছেন। ট্যাকা না থাকলেও দেইখব। হেই কথা শুইন্যা ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি অনেক ভালা ডাক্তার। কোনো ট্যাকা তো নেন নাই। উলটা আমারে দিছে। কইছে ওষুধ কিনতে আর এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে। পাহের (পা) স্যান্ডেল ছিঁইড়া ছিল তাই কিনতে কইছে। এমন ডাক্তার আর কই পামু কন।’ চিকিৎসাসেবা পেয়ে এভাবেই কথাগুলো বললেন মাদারীপুর সদর উপজেলার হাজির হাওলা গ্রামের ৭০ বছরের বেগম।

স্থানীয় একটি পত্রিকা অফিসের কর্মচারী ডালিয়া আক্তারের জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়েছে। মাদারীপুরের একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। সেই চিকিৎসক পেট ছিদ্র করে টিউমার বের করার জন্য ৮০ হাজার টাকা চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ডালিয়া আক্তার বলেন, আমার কাছে এত টাকা নেই। কি আর করব। ব্যথায় কষ্ট পাই। এভাবে প্রায় এক বছর কেটে যায়। একজনের পরামর্শে ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌসের কাছে যাই। তিনি আমার সব কথা শোনেন। শুধু অবশ করার জন্য আসা ডাক্তার ফি ও ওটি খরচ নামমাত্র নিয়ে অপারেশন করান। তিনি আমাকে এভাবে সহযোগিতা না করলে আমি হয়তো অপারেশন করাতেই পারতাম না।

মাদারীপুরের গরিব অসহায় মানুষের সেবায় বন্ধুখ্যাত ডা. দিলরুবা ফেরদৌসের এমন ভালোবাসার গল্প রয়েছে অসংখ্য। তিনি দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও গরিব অসহায়দের আর্থিক সহযোগিতা করে আত্মতৃপ্তি পান প্রচারবিমুখ মাদারীপুরের চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৌস। দীর্ঘ ১০ বছর বিনামূল্যের পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে মাত্র ৫০ টাকা ফি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ডা. দিলরুবা ফেরদৌস বলেন, আমার স্বামী ডা. এসএম আলীমুর রেজা আমাদের মাঝে আর নেই। তার কাছ থেকেই শিখেছি মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা। তিনি বলতেন, একজন চিকিৎসকের দরকার গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে থাকা। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া। ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করা। ধারাবাহিকভাবে স্বামীর স্বপ্ন পূরণে এ কাজগুলো করে যেতে চাই। আমার স্বামীর নামে একটি সংস্থা খুলতে চাই। সেই সংস্থা হবে গরিব-দুঃখীর আশ্রয়স্থল।

তার বাবা কফিলউদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন দিনাজপুর পার্বতীপুরের একটি বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ডা. দিলরুবা ফেরদৌস সবার ছোট। শ্বশুরবাড়ি যশোহর শহরে। ২০১৪ সালে তার স্বামী ডা. এসএম আলীমুর রেজা ব্রেনস্টোক করে মারা যান। থাকেন ঢাকার গ্রীন রোডে। সপ্তাহে দুদিন এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে মাদারীপুর শহরের শকুনী এলাকায় চিকিৎসাসেবা দেন। এমবিবিএস, এমসিপিএস, ডিজিও, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমএস কোর্সের (অবস্ অ্যান্ড গাইনি) থিসিস শেষ করে জরায়ুর ক্যানসার রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. দিলরুবা ফেরদৌস। ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। ২০০৫ সালে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ঢাকার আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের পুরস্কার পান ডা. দিলরুবা ফেরদৌস। এ ছাড়াও ২০০৬ সালে ওজিএসবি-এর গাইনি অব সোসাইটিতে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসাবে সম্মাননা পান।

ডা. দিলরুবা ফেরদৌস বলেন, আমার বাড়ি মাদারীপুর না হলেও এই জেলার মানুষদের প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার টানে প্রায় দুই যুগ ধরে মাদারীপুরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি।

মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর গ্রামের হেলেনা বেগম বলেন, আমার ১৮ বছর বয়সের ছেলে মাসুদ বেপারি শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে হাঁটতে পারে না। অনেকের কাছে গিয়েছি। কেউ একটা হুইল চেয়ার দেয়নি। কিন্তু ডা. দিলরুবা আপা আমার এ অসহায়ত্বের কথা শোনামাত্রই আমার ছেলেকে একটি হুইল চেয়ার ও নগদ টাকা দিয়েছেন। তিনি গরিবের বন্ধু। গরিবের ডাক্তার আপা।

মাদারীপুর জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মাহমুদা আক্তার কণা বলেন, আমার দেখা তিনি একজন সৎ, ভালো ও গরিবের ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌস। তিনি প্রায় সময় গরিবদের বিনামূল্যে দেখেন। আমি অনেক গরিব রোগী পাঠিয়েছি। তিনি ফি ছাড়াই দেখেছেন। তাকে দেখে অন্য চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ হয়ে এভাবে চিকিৎসাসেবা ও মানবসেবা করা উচিত।

অসহায়দের সহায়তা দেন দিলরুবা

অসহায় নারীদের ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌস। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। লিখেছেন-
 আয়শা সিদ্দিকা আকাশী 
২০ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতে ট্যাকা নাই। কি করমু। প্যাট ব্যথায় বাঁচি না। ম্যালা কষ্ট হয়। দোকান থাইক্যা ওষুধ আনছি। তা খাইয়্যা কোনো লাভ হয় নাই। ব্যথা কমে নাই। তহন একজন আমারে কইল, ‘চৌধুরী কিনিক (ক্লিনিক) যাইতে। হেইখানে একজন ডাক্তার আছেন। ট্যাকা না থাকলেও দেইখব। হেই কথা শুইন্যা ডাক্তারের কাছে যাই। তিনি অনেক ভালা ডাক্তার। কোনো ট্যাকা তো নেন নাই। উলটা আমারে দিছে। কইছে ওষুধ কিনতে আর এক জোড়া স্যান্ডেল কিনতে। পাহের (পা) স্যান্ডেল ছিঁইড়া ছিল তাই কিনতে কইছে। এমন ডাক্তার আর কই পামু কন।’ চিকিৎসাসেবা পেয়ে এভাবেই কথাগুলো বললেন মাদারীপুর সদর উপজেলার হাজির হাওলা গ্রামের ৭০ বছরের বেগম।

স্থানীয় একটি পত্রিকা অফিসের কর্মচারী ডালিয়া আক্তারের জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়েছে। মাদারীপুরের একজন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন তিনি। সেই চিকিৎসক পেট ছিদ্র করে টিউমার বের করার জন্য ৮০ হাজার টাকা চেয়েছেন। এ প্রসঙ্গে ডালিয়া আক্তার বলেন, আমার কাছে এত টাকা নেই। কি আর করব। ব্যথায় কষ্ট পাই। এভাবে প্রায় এক বছর কেটে যায়। একজনের পরামর্শে ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌসের কাছে যাই। তিনি আমার সব কথা শোনেন। শুধু অবশ করার জন্য আসা ডাক্তার ফি ও ওটি খরচ নামমাত্র নিয়ে অপারেশন করান। তিনি আমাকে এভাবে সহযোগিতা না করলে আমি হয়তো অপারেশন করাতেই পারতাম না।

মাদারীপুরের গরিব অসহায় মানুষের সেবায় বন্ধুখ্যাত ডা. দিলরুবা ফেরদৌসের এমন ভালোবাসার গল্প রয়েছে অসংখ্য। তিনি দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ ধরে মানুষের সেবা দিয়ে আসছেন। বিশেষ করে নারীদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও গরিব অসহায়দের আর্থিক সহযোগিতা করে আত্মতৃপ্তি পান প্রচারবিমুখ মাদারীপুরের চিকিৎসক দিলরুবা ফেরদৌস। দীর্ঘ ১০ বছর বিনামূল্যের পাশাপাশি সামর্থ্যবানদের কাছ থেকে মাত্র ৫০ টাকা ফি নিয়ে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে ডা. দিলরুবা ফেরদৌস বলেন, আমার স্বামী ডা. এসএম আলীমুর রেজা আমাদের মাঝে আর নেই। তার কাছ থেকেই শিখেছি মানুষকে ভালোবাসার শিক্ষা। তিনি বলতেন, একজন চিকিৎসকের দরকার গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে থাকা। বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া। ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি নানাভাবে আর্থিক সহযোগিতা করা। ধারাবাহিকভাবে স্বামীর স্বপ্ন পূরণে এ কাজগুলো করে যেতে চাই। আমার স্বামীর নামে একটি সংস্থা খুলতে চাই। সেই সংস্থা হবে গরিব-দুঃখীর আশ্রয়স্থল।

তার বাবা কফিলউদ্দিন আহম্মেদ ছিলেন দিনাজপুর পার্বতীপুরের একটি বিদ্যালয়ের ইংরেজি শিক্ষক। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে ডা. দিলরুবা ফেরদৌস সবার ছোট। শ্বশুরবাড়ি যশোহর শহরে। ২০১৪ সালে তার স্বামী ডা. এসএম আলীমুর রেজা ব্রেনস্টোক করে মারা যান। থাকেন ঢাকার গ্রীন রোডে। সপ্তাহে দুদিন এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে মাদারীপুর শহরের শকুনী এলাকায় চিকিৎসাসেবা দেন। এমবিবিএস, এমসিপিএস, ডিজিও, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে এমএস কোর্সের (অবস্ অ্যান্ড গাইনি) থিসিস শেষ করে জরায়ুর ক্যানসার রোগ নিয়ে গবেষণা করছেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. দিলরুবা ফেরদৌস। ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মাদারীপুরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে স্বামী-স্ত্রী দুজনে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। ২০০৫ সালে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ঢাকার আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসকের পুরস্কার পান ডা. দিলরুবা ফেরদৌস। এ ছাড়াও ২০০৬ সালে ওজিএসবি-এর গাইনি অব সোসাইটিতে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসাবে সম্মাননা পান।

ডা. দিলরুবা ফেরদৌস বলেন, আমার বাড়ি মাদারীপুর না হলেও এই জেলার মানুষদের প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা। সেই ভালোবাসার টানে প্রায় দুই যুগ ধরে মাদারীপুরে চিকিৎসাসেবা দিয়ে আসছি।

মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের পশ্চিম বাহাদুরপুর গ্রামের হেলেনা বেগম বলেন, আমার ১৮ বছর বয়সের ছেলে মাসুদ বেপারি শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে হাঁটতে পারে না। অনেকের কাছে গিয়েছি। কেউ একটা হুইল চেয়ার দেয়নি। কিন্তু ডা. দিলরুবা আপা আমার এ অসহায়ত্বের কথা শোনামাত্রই আমার ছেলেকে একটি হুইল চেয়ার ও নগদ টাকা দিয়েছেন। তিনি গরিবের বন্ধু। গরিবের ডাক্তার আপা।

মাদারীপুর জেলা মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মাহমুদা আক্তার কণা বলেন, আমার দেখা তিনি একজন সৎ, ভালো ও গরিবের ডাক্তার দিলরুবা ফেরদৌস। তিনি প্রায় সময় গরিবদের বিনামূল্যে দেখেন। আমি অনেক গরিব রোগী পাঠিয়েছি। তিনি ফি ছাড়াই দেখেছেন। তাকে দেখে অন্য চিকিৎসকদের উদ্বুদ্ধ হয়ে এভাবে চিকিৎসাসেবা ও মানবসেবা করা উচিত।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন