প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থান
jugantor
প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থান
উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারী সংসারের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। একেকজন একেক পেশা বেছে নিয়েছেন। তাদের সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরেছেন-

  শিপু ফরাজী  

২৫ জুলাই ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চরকুকরি মুকরির বিলকিস বেগম (২৩), নূরজাহান বেগম (২৪) কিংবা কুকরির শিরিন আক্তার (৩৫)। এরা বহু আগে থেকেই পরিবারের প্রধান। চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে মাত্র এই তিনজনই নয়। এমন আরও অনেক নারী রয়েছেন, যাদের স্বামী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কারও স্বামী ফেলে চলে গেছেন, আবার কারও স্বামী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। সংসারের বোঝা এখন তাদের কাঁধে। ফলে পরিবারে অভাব অনটন লেগে আছে বারো মাস। পরিবারের প্রধান দুস্থ-অভাবী নারীদের কষ্ট যেন পিছু ছাড়ে না। এখানে ওখানে চেয়ে চিন্তে খাওয়া, ধারকর্জ করে চলা, সাহায্যের জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় হাত বাড়ানো তাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও আটার রুটি বা আটার পায়েস খেয়ে জীবন ধারণ, কখনো অর্ধাহারে-অনাহারেও দিন কাটে তাদের।

উপকূলে নারীদের ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনে অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার নিত্যদিনের, নেই সমাধান। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারে নারী হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। উপরন্তু আছে যৌতুকের চাপ, তালাকের ভয়। স্বামীর একাধিক বিয়ে শেষ জীবনেও নারীকে দেয় না স্বস্তি। ওদিকে জীবনের রঙিন দিনগুলোর শুরুতেই বাল্যবিয়ের ভোগান্তির চাপ নারীর কাঁধেই। তবুও নারীকে সইতে হয় নানাবিধ গঞ্জনা। দুর্যোগ এলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি বাড়ে নারীর। লঙ্ঘিত হয় অধিকার। ভয়াল নদীতে মাছ ধরার মতো পেশায় দেখা মেলে উপকূলের নারীর। জীবিকার তাগিদে নদীতে গিয়ে স্বামী ফিরে না। কখনো ফিরে এলেও নারীকে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে।

কুকরি মুকরির বিলকিস বেগমের স্বামী বাচ্চু মিয়া ফকির দুই সন্তান জন্মের পর বিনা নোটিশেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। প্রথম স্ত্রী বিউটি বেগম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে বিলকিসকে বিয়ে করেন বাচ্চু মিয়া। কিন্তু বিয়ের পর বিলকিস জানতে পারেন বিউটি বেগম সুস্থ। একে একে দুটি সন্তান আসে বিলকিসের ঘরে। ছেলে মান্না আর মেয়ে লামিয়া। এক সময় বাচ্চু মিয়া চলে যান বিলকিসকে ফেলে। অনটনের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা ছিল বিলকিসের। মান্না পড়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। অবশেষে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। লামিয়া এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। তার লেখাপড়াও কতদূর যায় কে জানে!

এ প্রসঙ্গে বিলকিস বলেন, রাস্তার পাশে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর তুলে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি।

কুকরি মুকরির বাবুগঞ্জ লঞ্চঘাটে শিরিন আক্তারের বসবাস। স্বর্ণা আর ঝর্ণা দুই মেয়ে খেলছে ঘরের কাছেই। স্বামী আর দুসন্তান নিয়েই তার পরিবার। রাস্তার পাশে টং ঘর বানিয়ে একটি দোকান করেছেন। পাশের ছোট্ট ঘরটিতে বসবাস। স্বামী জয়নাল আবেদীন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিরিনকে এখন শুধু সংসারের বোঝাই বইতে হচ্ছে না, স্বামীর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। সারা দিন দোকানে বসে বেচাকেনা, চা বানানোর কাজ। পাশাপাশি সুযোগ বুঝে রান্নাবান্নার কাজটিও সেরে ফেলেন।

এ প্রসঙ্গে শিরিন আক্তার বলেন, কর্মব্যস্ততার মধ্যেই সন্তানদেরও দেখাশোনা করি। দোকানে একদিকে ক্রেতা, ওদিকে রান্নার আয়োজন। হাটবাজারের চিন্তাটাও আমাকেই করতে হয়।

দুস্থ এ নারীদের সংসার চালিয়ে নিতে সরকারি সাহায্য থাকলেও তা পাওয়ার সৌভাগ্য হাতেগোনা কয়েকজনের হয়। কুকরি মুকরি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন বলেন, উপকূল অঞ্চলে নারীদের মধ্যে যারা পরিবারের প্রধান, তাদের অনেকেই দুস্থ, অসহায়। এদের জন্য সরকারি-বেসরকারি কিছু প্রকল্প থাকলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে এবং এদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে এদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটতে পারে।

প্রশিক্ষণ নিয়ে কর্মসংস্থান

উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক নারী সংসারের হাল ধরেছেন শক্ত হাতে। একেকজন একেক পেশা বেছে নিয়েছেন। তাদের সংগ্রামী জীবনের কথা তুলে ধরেছেন-
 শিপু ফরাজী 
২৫ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

চরকুকরি মুকরির বিলকিস বেগম (২৩), নূরজাহান বেগম (২৪) কিংবা কুকরির শিরিন আক্তার (৩৫)। এরা বহু আগে থেকেই পরিবারের প্রধান। চরফ্যাশনের দক্ষিণ উপকূলে মাত্র এই তিনজনই নয়। এমন আরও অনেক নারী রয়েছেন, যাদের স্বামী চলে গেছেন না ফেরার দেশে। কারও স্বামী ফেলে চলে গেছেন, আবার কারও স্বামী দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছেন। সংসারের বোঝা এখন তাদের কাঁধে। ফলে পরিবারে অভাব অনটন লেগে আছে বারো মাস। পরিবারের প্রধান দুস্থ-অভাবী নারীদের কষ্ট যেন পিছু ছাড়ে না। এখানে ওখানে চেয়ে চিন্তে খাওয়া, ধারকর্জ করে চলা, সাহায্যের জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় হাত বাড়ানো তাদের নিত্যসঙ্গী। তবুও আটার রুটি বা আটার পায়েস খেয়ে জীবন ধারণ, কখনো অর্ধাহারে-অনাহারেও দিন কাটে তাদের।

উপকূলে নারীদের ভাগ্য বিড়ম্বিত জীবনে অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার নিত্যদিনের, নেই সমাধান। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারে নারী হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। উপরন্তু আছে যৌতুকের চাপ, তালাকের ভয়। স্বামীর একাধিক বিয়ে শেষ জীবনেও নারীকে দেয় না স্বস্তি। ওদিকে জীবনের রঙিন দিনগুলোর শুরুতেই বাল্যবিয়ের ভোগান্তির চাপ নারীর কাঁধেই। তবুও নারীকে সইতে হয় নানাবিধ গঞ্জনা। দুর্যোগ এলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি বাড়ে নারীর। লঙ্ঘিত হয় অধিকার। ভয়াল নদীতে মাছ ধরার মতো পেশায় দেখা মেলে উপকূলের নারীর। জীবিকার তাগিদে নদীতে গিয়ে স্বামী ফিরে না। কখনো ফিরে এলেও নারীকে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে।

কুকরি মুকরির বিলকিস বেগমের স্বামী বাচ্চু মিয়া ফকির দুই সন্তান জন্মের পর বিনা নোটিশেই এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। প্রথম স্ত্রী বিউটি বেগম দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে বিলকিসকে বিয়ে করেন বাচ্চু মিয়া। কিন্তু বিয়ের পর বিলকিস জানতে পারেন বিউটি বেগম সুস্থ। একে একে দুটি সন্তান আসে বিলকিসের ঘরে। ছেলে মান্না আর মেয়ে লামিয়া। এক সময় বাচ্চু মিয়া চলে যান বিলকিসকে ফেলে। অনটনের মধ্যেও সন্তানদের লেখাপড়া করানোর ইচ্ছা ছিল বিলকিসের। মান্না পড়েছিল ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত। অবশেষে তাকে স্কুল ছাড়তে হয়েছে। লামিয়া এখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছে। তার লেখাপড়াও কতদূর যায় কে জানে!

এ প্রসঙ্গে বিলকিস বলেন, রাস্তার পাশে ছোট্ট ঝুপড়ি ঘর তুলে দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি।

কুকরি মুকরির বাবুগঞ্জ লঞ্চঘাটে শিরিন আক্তারের বসবাস। স্বর্ণা আর ঝর্ণা দুই মেয়ে খেলছে ঘরের কাছেই। স্বামী আর দুসন্তান নিয়েই তার পরিবার। রাস্তার পাশে টং ঘর বানিয়ে একটি দোকান করেছেন। পাশের ছোট্ট ঘরটিতে বসবাস। স্বামী জয়নাল আবেদীন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। শিরিনকে এখন শুধু সংসারের বোঝাই বইতে হচ্ছে না, স্বামীর চিকিৎসার ব্যবস্থাও করতে হচ্ছে। সারা দিন দোকানে বসে বেচাকেনা, চা বানানোর কাজ। পাশাপাশি সুযোগ বুঝে রান্নাবান্নার কাজটিও সেরে ফেলেন।

এ প্রসঙ্গে শিরিন আক্তার বলেন, কর্মব্যস্ততার মধ্যেই সন্তানদেরও দেখাশোনা করি। দোকানে একদিকে ক্রেতা, ওদিকে রান্নার আয়োজন। হাটবাজারের চিন্তাটাও আমাকেই করতে হয়।

দুস্থ এ নারীদের সংসার চালিয়ে নিতে সরকারি সাহায্য থাকলেও তা পাওয়ার সৌভাগ্য হাতেগোনা কয়েকজনের হয়। কুকরি মুকরি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন বলেন, উপকূল অঞ্চলে নারীদের মধ্যে যারা পরিবারের প্রধান, তাদের অনেকেই দুস্থ, অসহায়। এদের জন্য সরকারি-বেসরকারি কিছু প্রকল্প থাকলেও তা একেবারেই অপ্রতুল। সহায়তার পরিমাণ বাড়িয়ে এবং এদেরকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারলে এদের অবস্থার উন্নয়ন ঘটতে পারে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন