বেতন চাইলে জেলে দেওয়ার ভয় দেখায়
jugantor
বেতন চাইলে জেলে দেওয়ার ভয় দেখায়

  রীতা ভৌমিক  

০১ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অভিবাসী নারী শ্রমিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতনের পাশাপাশি ওয়েজ থিফট অর্থাৎ বেতন চুরিরও শিকার হচ্ছেন। তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমের বিনিময়ে তাদের বেতন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন সোনিয়া আক্তার। কিন্তু সেখানে দুই বাড়িতে কাজ করতে হতো তাকে। ও স্বপ্ন দেখেছিল বিদেশে গিয়ে রোজগার করে ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবে। ডকইয়ার্ডে রং শ্রমিক স্বামীর একার রোজগারে সংসার চলছিল না। তাই এগারো বছরের ছেলে আর স্বামীকে বাবার বাড়িতে রেখে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছিলেন কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের এ গৃহবধূ।

বন্যা নামে এক দালাল মিরপুর টেকনিক্যালের মেসে খাবার সরবরাহ করত। সোনিয়ার ফুফু বিদেশে যাওয়ার জন্য মিরপুর টেকনিক্যালে আসেন এক মাসের প্রশিক্ষণ নিতে। সেখানে ফুফুর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় দালাল বন্যার সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার (৩০) বলেন, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য দালাল বন্যাকে বিশ হাজার টাকা দিই। মিরপুর টেকনিক্যালে এক মাস প্রশিক্ষণ নিই। প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা করে তিন মাস বেতন পাই। এরপর বেতন বন্ধ করে দেয়। বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলেই বলত দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। এভাবে চার মাস কেটে যায়। সপ্তাহে একদিন বাড়ির যে কোনো একজনের সঙ্গে তিন মিনিট ফোনে কথা বলতে দিত। ফোনে জানতে পারি, গৃহকর্তা কোনো টাকা পাঠায়নি। এদিকে কঠোর পরিশ্রম করছি। সকাল থেকে দুপুরে গৃহকর্ত্রীর বাবার বাড়ি এবং বেলা ২টা থেকে তার বাসায় কাজ করি। এই কঠোর পরিশ্রমের পরও তিন মাসের পর থেকে বেতন নাই। ঈদে ছেলেরে কিছুই কিনে দিতে পারিনি। এ কষ্টে কান্না করছিলাম। আমার কান্না দেখে গৃহকর্ত্রী জিজ্ঞেস করে, কেন কান্না করছি? বেতন না পাওয়ার কথা বলতেই ওরা আমাকে একটা ঘরে সারা দিন আটকে রাখে। খাবার দেয় না। পরদিন দুপুরবেলা আমার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আকামা নেই, টাকা-পয়সা নেই, মোবাইল নেই, কাপড়চোপড় নেই। কী করব বুঝতে পারছিলাম না! ঘণ্টাখানেক বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। এরপরও ওরা দরজা খোলে না। নিরুপায় হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পেট্রলপাম্পের সামনে আসি। পেছনে গৃহকর্তা আমাকে অনুসরণ করে। পেট্রলপাম্পে একজন বাঙালির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে তার বাড়িতে এক মাস রাখেন। আকামা না থাকায় কাজ করতে পারছিলাম না। শেষমেশ পুলিশের কাছে ধরা দিই। পুলিশ গৃহকর্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দুই বছরের চুক্তিতে গিয়ে মাত্র তিন মাসের বেতন পাই। সাত মাস কাজ করেও পুরো বেতন না পেয়ে দেশে ফিরে এলাম। দূতাবাসে যোগাযোগ, দেশে ফিরে দালালের বিরুদ্ধে মামলা করব এগুলো কিছুই জানতাম না। বরং দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দালাল আমাকে না চেনার ভান করে। এদিকে ফুফু ৪০ হাজার টাকা দিয়েও বিদেশে যেতে পারেননি। তিনি সৌদি আরবের জায়গায় মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলেন। তাই ওরা পাসপোর্ট ও ৪০ হাজার টাকা কোনোটাই ফেরত দেয়নি। ফুফু এবং আমি দুজনেই ওই দালালের মাধ্যমে নিঃস্ব হয়েছি।

ফেরত আসা আরেক অভিবাসী নারী শ্রমিক নবাবগঞ্জের বরসংসাবাদের নারগিছ। বেবি সিটারের কাজ নিয়ে ২০২০ সালে কাতারে যান। এক বান্ধবীর মাধ্যমে দালাল আসমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আসমার বাড়ি বরিশালে। আসমা তাকে বলে, কাতারের একটি ভালো ভিসা আছে। টাকা-পয়সা লাগবে না। শুধু বাচ্চা রাখা আর স্কুলে আনা-নেওয়া করতে হবে। সেখানে পৌঁছেই নারগিছের চোখ ছানাবড়া। দালালের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই।

এ প্রসঙ্গে নারগিছ (৩০) বলেন, আমার গৃহকর্ত্রী একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়াতেন। ওই বাড়িতে আমি ছাড়াও তুফিয়ার একজন গৃহপরিচারিকা ছিল। গৃহকর্ত্রী স্কুলে গেলে তার কাজও আমাকে করতে হতো। প্রথম প্রথম তার কাজ করে দিতাম। এক সময় ম্যাডামকে বিষয়টি জানাই। ও ম্যাডামকে বলে, ‘আমি মিথ্যা কথা বলছি।’ ম্যাডাম ওর কথা বিশ্বাস করায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে বলি। এতে ওই গৃহকর্মী আমার ওপর আরও রেগে যায়। রান্নাঘরের দেওয়ালে আমার মাথা ঠুকে দেয়। ওই গৃহকর্মীর নামে নালিশ করায় আট মাসের মাথায় গৃহকর্ত্রী আমার বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আট মাস বেতন পাই। বাকি চার মাসের বেতন পাইনি। বেতন চাইলে আমাকে জেলে দেওয়ার ভয় দেখাত। ওই গৃহকর্মীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করি। ওই থানার কর্মকর্তা ফোন করে তাদের সব জানায়। গৃহকর্ত্রী ড্রাইভার পাঠিয়ে আমাকে থানা থেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে রাখে। আমাকে জিজ্ঞেস করে থানায় কেন গেলাম? আমাকে মেরে ফেলার, জেলে পচিয়ে মারার হুমকি দেয়। আমাকে শাসায় তাদের নামে কোনো মন্দ কথা বলতে পারব না। তার বাবার বাড়িতে দুই মাস আমাকে কাজ করতে হয়। ওরাও আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এরপর ড্রাইভার দিয়ে আমাকে এয়ারপোর্ট পাঠিয়ে দেয়। অন্যদিকে পুলিশকে খবর দেয়। এয়ারপোর্ট থেকে পুলিশ আমাকে সফর জেলে নিয়ে যায়। গৃহকর্ত্রী আমাকে জেলে পচিয়ে মারবে বলেছিল, সেটাই করার চেষ্টা করেছে। আমি জেলে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলংকা, তুফিয়া, ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার অনেক মেয়েদের দেখি। জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনো দুর্বব্যহার করেনি। খাবার দিয়েছে। দুদিন পর আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়। আমার সঙ্গে ওই দিন আরেকজন বাংলাদেশিও দেশে ফিরেন। দেশে ফিরে গৃহকর্ত্রী, দালালের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করি নাই। মামলা করব সেটা ভাবনায় আসেনি।

সোনিয়া আক্তার এবং নারগিছ দুজনেই নির্যাতনের শিকার হয়ে চুক্তির মেয়াদের আগেই দেশে ফিরে এসেছেন। সোনিয়া সাত মাস কাজ করে তিন মাস এবং এক বছর কাজ করেন নারগিছ আট মাসের বেতন পেয়েছেন। নির্যাতনের পাশাপাশি ন্যায্য বেতন প্রাপ্তি থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তারা তাদের শ্রম বাবদ যে অর্থ পায়নি, তা ফেরত পাওয়ারও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিনের মতে, কাজ করেও বেতন না পাওয়ায় আইনগতভাবে দেওয়ানি মামলা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মামলা করতে গেলে অভিযোগকারীকে কোর্ট ফি দিতে হয়। বাড়তি হিসাবে আইনজীবীর খরচও লাগে। অভিযোগকারীরা আদালতে মামলা দায়ের করতে আগ্রহী না হয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। এ ছাড়া গন্তব্য দেশ থেকে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন। এ ব্যাপারে তারা দূতাবাসেরও কোনো সহযোগিতা পায় না। এর ফলে তারা বকেয়া বেতন এবং সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণের টাকা কখনোই আদায় করতে পারেন না। দালালদের আইনের আওতায় আনলে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব।

ফেরত আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএমইটির ঊর্ধ্বতন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানার মতে, বিএমইটির বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, বিদেশগামী নারী কর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ মোট কর্মী সংখ্যার শতকরা ১ ভাগেরও কম। প্রাপ্ত অভিযোগের বেশিরভাগই নারী কর্মীদের দেশে ফেরত আনা সংক্রান্ত। এ ছাড়া বেতনবিষয়ক যেসব অভিযোগ পাওয়া যায় তা বিএমইটির অভিযোগ সেল থেকে যাচাই সাপেক্ষে সত্যতা প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। কর্মীর কর্মস্থল বিদেশে হওয়ায় কর্মীর বেতনভাতা বা অন্য যে কোনো সমস্যা নিরসনে সে দেশে অবস্থানকালে অভিযোগ করলে গন্তব্য দেশের আইন অনুযায়ী দ্রুত প্রতিকার পেতে পারেন। গন্তব্য দেশের দূতাবাসে অভিযোগ করলেও বেতনভাতা সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান হয়ে থাকে। এই অভিযোগগুলো যেহেতু গন্তব্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেহেতু এ সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে গন্তব্য দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী মামলা করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। তবে যেসব অভিযোগের সঙ্গে এ দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির বা অন্য কোনো ব্যক্তি সম্পৃক্ত রয়েছে সে সব ক্ষেত্রে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর ধারা ২২, ২৭, ২৮ ও ৪১ মতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো আইনের ৪১ ধারা অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তা ছাড়া কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এ বিষয়ে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা দায়ের করলে তিনি কোর্টের মাধ্যমেও এর প্রতিকার পেতে পারেন।

সরকারের সেবা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিএমইটি তথা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ইমাম, শিক্ষকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ-সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। সচেতনতাবিষয়ক তথ্য বিভিন্ন টিভিসি, নাটিকা, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। বিএমইটির অধীন মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো নিয়মিতভাবে প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে প্রচার করছে। বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় অভিবাসন বিষয়ে প্রদত্ত বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে অভিহিত করা হয়।

বিএমইটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২২-এর মে পর্যন্ত ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮১৯ জন নারী অভিবাসন করেছেন। এ সংখ্যক নারীর সবাই নির্যাতনের শিকার হয়নি। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুরো বেতন না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড সার্ভিসের সভাপতি অধ্যাপক ইশরাত শামীমের মতে, অভিবাসী নারী কর্মীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে, কাজ করেও তাদের বেতন না পাওয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া নারী অভিবাসীদের দেশ এবং বিদেশে সহায়তা পরিষেবার জ্ঞান প্রদান করা। টেকসই পুনঃএকত্রীকরণ ইত্যাদির জন্য প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সহযোগিতা করা।

বেতন চাইলে জেলে দেওয়ার ভয় দেখায়

 রীতা ভৌমিক 
০১ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

অভিবাসী নারী শ্রমিকরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতনের পাশাপাশি ওয়েজ থিফট অর্থাৎ বেতন চুরিরও শিকার হচ্ছেন। তাদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ বন্ধে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমের বিনিময়ে তাদের বেতন পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে সৌদি আরব গিয়েছিলেন সোনিয়া আক্তার। কিন্তু সেখানে দুই বাড়িতে কাজ করতে হতো তাকে। ও স্বপ্ন দেখেছিল বিদেশে গিয়ে রোজগার করে ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবে। ডকইয়ার্ডে রং শ্রমিক স্বামীর একার রোজগারে সংসার চলছিল না। তাই এগারো বছরের ছেলে আর স্বামীকে বাবার বাড়িতে রেখে গৃহপরিচারিকার কাজ নিয়ে ২০১৯ সালের ১৭ নভেম্বর সৌদি আরব পাড়ি দিয়েছিলেন কেরানীগঞ্জের ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের এ গৃহবধূ।

বন্যা নামে এক দালাল মিরপুর টেকনিক্যালের মেসে খাবার সরবরাহ করত। সোনিয়ার ফুফু বিদেশে যাওয়ার জন্য মিরপুর টেকনিক্যালে আসেন এক মাসের প্রশিক্ষণ নিতে। সেখানে ফুফুর মাধ্যমে তার পরিচয় হয় দালাল বন্যার সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে সোনিয়া আক্তার (৩০) বলেন, সৌদি আরব যাওয়ার জন্য দালাল বন্যাকে বিশ হাজার টাকা দিই। মিরপুর টেকনিক্যালে এক মাস প্রশিক্ষণ নিই। প্রতি মাসে ২২ হাজার টাকা করে তিন মাস বেতন পাই। এরপর বেতন বন্ধ করে দেয়। বেতনের কথা জিজ্ঞেস করলেই বলত দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। এভাবে চার মাস কেটে যায়। সপ্তাহে একদিন বাড়ির যে কোনো একজনের সঙ্গে তিন মিনিট ফোনে কথা বলতে দিত। ফোনে জানতে পারি, গৃহকর্তা কোনো টাকা পাঠায়নি। এদিকে কঠোর পরিশ্রম করছি। সকাল থেকে দুপুরে গৃহকর্ত্রীর বাবার বাড়ি এবং বেলা ২টা থেকে তার বাসায় কাজ করি। এই কঠোর পরিশ্রমের পরও তিন মাসের পর থেকে বেতন নাই। ঈদে ছেলেরে কিছুই কিনে দিতে পারিনি। এ কষ্টে কান্না করছিলাম। আমার কান্না দেখে গৃহকর্ত্রী জিজ্ঞেস করে, কেন কান্না করছি? বেতন না পাওয়ার কথা বলতেই ওরা আমাকে একটা ঘরে সারা দিন আটকে রাখে। খাবার দেয় না। পরদিন দুপুরবেলা আমার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। আকামা নেই, টাকা-পয়সা নেই, মোবাইল নেই, কাপড়চোপড় নেই। কী করব বুঝতে পারছিলাম না! ঘণ্টাখানেক বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। এরপরও ওরা দরজা খোলে না। নিরুপায় হয়ে হাঁটতে হাঁটতে পেট্রলপাম্পের সামনে আসি। পেছনে গৃহকর্তা আমাকে অনুসরণ করে। পেট্রলপাম্পে একজন বাঙালির সঙ্গে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে তার বাড়িতে এক মাস রাখেন। আকামা না থাকায় কাজ করতে পারছিলাম না। শেষমেশ পুলিশের কাছে ধরা দিই। পুলিশ গৃহকর্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দুই বছরের চুক্তিতে গিয়ে মাত্র তিন মাসের বেতন পাই। সাত মাস কাজ করেও পুরো বেতন না পেয়ে দেশে ফিরে এলাম। দূতাবাসে যোগাযোগ, দেশে ফিরে দালালের বিরুদ্ধে মামলা করব এগুলো কিছুই জানতাম না। বরং দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করলে দালাল আমাকে না চেনার ভান করে। এদিকে ফুফু ৪০ হাজার টাকা দিয়েও বিদেশে যেতে পারেননি। তিনি সৌদি আরবের জায়গায় মালয়েশিয়া যেতে চেয়েছিলেন। তাই ওরা পাসপোর্ট ও ৪০ হাজার টাকা কোনোটাই ফেরত দেয়নি। ফুফু এবং আমি দুজনেই ওই দালালের মাধ্যমে নিঃস্ব হয়েছি।

ফেরত আসা আরেক অভিবাসী নারী শ্রমিক নবাবগঞ্জের বরসংসাবাদের নারগিছ। বেবি সিটারের কাজ নিয়ে ২০২০ সালে কাতারে যান। এক বান্ধবীর মাধ্যমে দালাল আসমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। আসমার বাড়ি বরিশালে। আসমা তাকে বলে, কাতারের একটি ভালো ভিসা আছে। টাকা-পয়সা লাগবে না। শুধু বাচ্চা রাখা আর স্কুলে আনা-নেওয়া করতে হবে। সেখানে পৌঁছেই নারগিছের চোখ ছানাবড়া। দালালের কথার সঙ্গে কাজের কোনো মিল নেই।

এ প্রসঙ্গে নারগিছ (৩০) বলেন, আমার গৃহকর্ত্রী একটি প্রতিবন্ধী স্কুলে পড়াতেন। ওই বাড়িতে আমি ছাড়াও তুফিয়ার একজন গৃহপরিচারিকা ছিল। গৃহকর্ত্রী স্কুলে গেলে তার কাজও আমাকে করতে হতো। প্রথম প্রথম তার কাজ করে দিতাম। এক সময় ম্যাডামকে বিষয়টি জানাই। ও ম্যাডামকে বলে, ‘আমি মিথ্যা কথা বলছি।’ ম্যাডাম ওর কথা বিশ্বাস করায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখতে বলি। এতে ওই গৃহকর্মী আমার ওপর আরও রেগে যায়। রান্নাঘরের দেওয়ালে আমার মাথা ঠুকে দেয়। ওই গৃহকর্মীর নামে নালিশ করায় আট মাসের মাথায় গৃহকর্ত্রী আমার বেতন দেওয়া বন্ধ করে দেয়। আট মাস বেতন পাই। বাকি চার মাসের বেতন পাইনি। বেতন চাইলে আমাকে জেলে দেওয়ার ভয় দেখাত। ওই গৃহকর্মীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করি। ওই থানার কর্মকর্তা ফোন করে তাদের সব জানায়। গৃহকর্ত্রী ড্রাইভার পাঠিয়ে আমাকে থানা থেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে রাখে। আমাকে জিজ্ঞেস করে থানায় কেন গেলাম? আমাকে মেরে ফেলার, জেলে পচিয়ে মারার হুমকি দেয়। আমাকে শাসায় তাদের নামে কোনো মন্দ কথা বলতে পারব না। তার বাবার বাড়িতে দুই মাস আমাকে কাজ করতে হয়। ওরাও আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। এরপর ড্রাইভার দিয়ে আমাকে এয়ারপোর্ট পাঠিয়ে দেয়। অন্যদিকে পুলিশকে খবর দেয়। এয়ারপোর্ট থেকে পুলিশ আমাকে সফর জেলে নিয়ে যায়। গৃহকর্ত্রী আমাকে জেলে পচিয়ে মারবে বলেছিল, সেটাই করার চেষ্টা করেছে। আমি জেলে বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলংকা, তুফিয়া, ভারত, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়ার অনেক মেয়েদের দেখি। জেল কর্তৃপক্ষ আমাদের সঙ্গে কোনো দুর্বব্যহার করেনি। খাবার দিয়েছে। দুদিন পর আমাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়। আমার সঙ্গে ওই দিন আরেকজন বাংলাদেশিও দেশে ফিরেন। দেশে ফিরে গৃহকর্ত্রী, দালালের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করি নাই। মামলা করব সেটা ভাবনায় আসেনি।

সোনিয়া আক্তার এবং নারগিছ দুজনেই নির্যাতনের শিকার হয়ে চুক্তির মেয়াদের আগেই দেশে ফিরে এসেছেন। সোনিয়া সাত মাস কাজ করে তিন মাস এবং এক বছর কাজ করেন নারগিছ আট মাসের বেতন পেয়েছেন। নির্যাতনের পাশাপাশি ন্যায্য বেতন প্রাপ্তি থেকেও তারা বঞ্চিত হয়েছেন। অথচ তারা তাদের শ্রম বাবদ যে অর্থ পায়নি, তা ফেরত পাওয়ারও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

এ প্রসঙ্গে সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরিদা ইয়াসমিনের মতে, কাজ করেও বেতন না পাওয়ায় আইনগতভাবে দেওয়ানি মামলা করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মামলা করতে গেলে অভিযোগকারীকে কোর্ট ফি দিতে হয়। বাড়তি হিসাবে আইনজীবীর খরচও লাগে। অভিযোগকারীরা আদালতে মামলা দায়ের করতে আগ্রহী না হয়ে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির চেষ্টা করেন। এ ছাড়া গন্তব্য দেশ থেকে সাক্ষ্য প্রমাণ সংগ্রহ করা তাদের জন্য কঠিন। এ ব্যাপারে তারা দূতাবাসেরও কোনো সহযোগিতা পায় না। এর ফলে তারা বকেয়া বেতন এবং সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণের টাকা কখনোই আদায় করতে পারেন না। দালালদের আইনের আওতায় আনলে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সুরক্ষায় নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব।

ফেরত আসা অভিবাসী নারী শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের অভিযোগ প্রসঙ্গে বিএমইটির ঊর্ধ্বতন পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মোঃ মাসুদ রানার মতে, বিএমইটির বিগত কয়েক বছরের তথ্য পর্যলোচনা করলে দেখা যায়, বিদেশগামী নারী কর্মীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত অভিযোগ মোট কর্মী সংখ্যার শতকরা ১ ভাগেরও কম। প্রাপ্ত অভিযোগের বেশিরভাগই নারী কর্মীদের দেশে ফেরত আনা সংক্রান্ত। এ ছাড়া বেতনবিষয়ক যেসব অভিযোগ পাওয়া যায় তা বিএমইটির অভিযোগ সেল থেকে যাচাই সাপেক্ষে সত্যতা প্রমাণিত হলে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। কর্মীর কর্মস্থল বিদেশে হওয়ায় কর্মীর বেতনভাতা বা অন্য যে কোনো সমস্যা নিরসনে সে দেশে অবস্থানকালে অভিযোগ করলে গন্তব্য দেশের আইন অনুযায়ী দ্রুত প্রতিকার পেতে পারেন। গন্তব্য দেশের দূতাবাসে অভিযোগ করলেও বেতনভাতা সংক্রান্ত অভিযোগের সমাধান হয়ে থাকে। এই অভিযোগগুলো যেহেতু গন্তব্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেহেতু এ সংক্রান্ত অভিযোগ বিষয়ে গন্তব্য দেশের শ্রম আইন অনুযায়ী মামলা করলে প্রতিকার পাওয়া যায়। তবে যেসব অভিযোগের সঙ্গে এ দেশের রিক্রুটিং এজেন্সির বা অন্য কোনো ব্যক্তি সম্পৃক্ত রয়েছে সে সব ক্ষেত্রে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩-এর ধারা ২২, ২৭, ২৮ ও ৪১ মতে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো আইনের ৪১ ধারা অনুযায়ী নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তা ছাড়া কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি এ বিষয়ে কোনো ফৌজদারি বা দেওয়ানি মামলা দায়ের করলে তিনি কোর্টের মাধ্যমেও এর প্রতিকার পেতে পারেন।

সরকারের সেবা প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিএমইটি তথা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি ও সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ইমাম, শিক্ষকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন ওয়ার্কশপ-সেমিনারের আয়োজন করা হচ্ছে। সচেতনতাবিষয়ক তথ্য বিভিন্ন টিভিসি, নাটিকা, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রচার করা হচ্ছে। বিএমইটির অধীন মাঠ পর্যায়ের অফিসগুলো নিয়মিতভাবে প্রদত্ত সেবা সম্পর্কে স্থানীয়ভাবে প্রচার করছে। বিদেশগামী কর্মীদের প্রশিক্ষণ প্রদানের সময় অভিবাসন বিষয়ে প্রদত্ত বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে অভিহিত করা হয়।

বিএমইটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৯৯১ সাল থেকে ২০২২-এর মে পর্যন্ত ১০ লাখ ৫০ হাজার ৮১৯ জন নারী অভিবাসন করেছেন। এ সংখ্যক নারীর সবাই নির্যাতনের শিকার হয়নি। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পুরো বেতন না পাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড সার্ভিসের সভাপতি অধ্যাপক ইশরাত শামীমের মতে, অভিবাসী নারী কর্মীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে, কাজ করেও তাদের বেতন না পাওয়া ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অভিবাসী নারী শ্রমিকদের মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া নারী অভিবাসীদের দেশ এবং বিদেশে সহায়তা পরিষেবার জ্ঞান প্রদান করা। টেকসই পুনঃএকত্রীকরণ ইত্যাদির জন্য প্রত্যাবর্তনকারী অভিবাসী নারী শ্রমিকদের সহযোগিতা করা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন