নারী নেত্রীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হৃদ্যতা
jugantor
নারী নেত্রীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হৃদ্যতা

  রীতা ভৌমিক  

১৫ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ জাতীয় শোক দিবস। এ দিনই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ষড়যন্ত্রকারীরা সপরিবারে হত্যা করে। বিদেশে অবস্থান করায় তার দুই কন্যা সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনেক নারী নেত্রী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারী নেত্রীদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়, আন্তরিক ও হৃদ্যতাময়। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু রাজনীতি অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীদের সংশ্লিষ্ট করতে চেয়েছিলেন তা নয়, তিনি সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নারী নেত্রীদের সংশ্লিষ্ট করতে চেয়েছিলেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলার অনেক নারী রাজনীতিবিদদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিমদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা বানু, শামসুন নাহার মাহমুদ, বদরুন্নেছা আহম্মদ, দৌলতুন নেসা খাতুন, রাজিয়া বানু, তফতুন্নেসা, মেহেরুন নেসা প্রমুখ জয়ী হন।

এ ছাড়া তার বাড়িতে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নারী নেত্রী, সংরক্ষিত নারী আসনের এমএনএ, এমপিদের আনাগোনাও কম ছিল না। এ নারী নেত্রীদের সঙ্গে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু কারাগারে অথবা বাড়িতে না থাকলে প্রয়োজনে তিনিও তাদের দিকনির্দেশনা দিতেন। একজন অভিভাবকের মতো রাজনীতির নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা দুজনেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

রাজনীতিতে নারী নেত্রীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আমেনা বেগম, নূরজাহান মুরশিদ, বদরুন্নেছা আহম্মদ, মমতাজ বেগম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কণিকা বিশ্বাস, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার নেত্রী ফরিদা রহমান, জোহরা তাজউদ্দীন, নাদিরা হক, খালেদা হাবীব, আইভী রহমান, ফরিদা মেরি, নূরজাহান কামাল প্রমুখ নারী নেত্রীরাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতিতে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যরা দেশের জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। নারী অধিকার প্রশ্নে কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা রাখবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ বিষয়টি নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫টি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুজন নারীকে প্রতিমন্ত্রী পদে নিয়োগ প্রদান করেছিলেন। বেগম বদরুন্নেছা আহম্মদকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং নূরজাহান মুরশিদকে সমাজকল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

তবে এটাও ধারণা করা যায়, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে নারীর অংশগ্রহণ হয়েছিল কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবিতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ এবং আওয়ামী মহিলা লীগের দাবির প্রেক্ষাপটে। ১৫ সংরক্ষিত নারী আসন এবং দুজন নারী প্রতিমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে নারীর অবস্থান বা সম্পৃক্ততার সূত্রপাত ঘটে। যদিও বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রে রাজনীতিতে নারীর সম্পৃক্ততা বা অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম।

১৯৭০-এ পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচিত এমএলএ নূরজাহান মুরশিদ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি আদায়ে দিল্লি পার্লামেন্টের উভয় হাউজের যুক্ত অধিবেশনে বক্তৃতা দেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেভাবে বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়ে শতশত নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে সেই পাকিস্তানের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী নন সেটাও জানান। পাকিস্তানের এ আক্রমণের কঠোর নিন্দা করে ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সরকারের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য আবেদন করেন। এ কারণে পাকিস্তান সামরিক জান্তা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ অবস্থাতেই তাকে চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তার বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। নূরজাহান মুরশিদের ওপর ইয়াহিয়ার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন রসিকতা করেন। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নূরজাহান মুরশিদকে কী বলেছিলেন তা তিনি ‘আমার কিছু স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন-‘তিনি হেসে বলেন, ‘নামের আগে মিসেস লিখবেন না, বেগম লিখবেন না, ইয়াহিয়া খান কেমন করে বুঝবেন যে আপনি একজন ছেলে না মেয়ে?’ ইয়াহিয়া খানের দণ্ডাদেশের সঙ্গে আমার ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সম্পর্ক কী তা ভেবে আমি একটু অবাক হচ্ছি। এমন সময় তাজউদ্দীন আহমদ, নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও মনসুর আলী এসে আমাদের কথায় যোগ দিলেন। তাদের কথার মধ্য দিয়ে জানতে পারলাম, আমার বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ এনেছিলেন ইয়াহিয়া খান যা একমাত্র পুরুষদের বিরুদ্ধেই আনা চলে। অতঃপর সবাইকে এক সারিতে এনে ইয়াহিয়া খানের এ দণ্ডাদেশ দেওয়ার রীতির আমরা প্রশংসাই করলাম।’... বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নূরজাহান মুরশিদের এমনই সহজ-সরল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

১৯৫৫ সালের ৯ এপ্রিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বদরুন্নেছা আহম্মদের লেখা একটি পত্রে জানা যায়-‘আমাদের কাছে কেউ কোনোদিন চাঁদাও চায় না। তাই বলে একসঙ্গে এক বছরের চাঁদা চেয়ে বসবেন না। ও দিতেও পারব না! কেননা M.L.A হয়ে এক পয়সা তো পেলাম না। শুনছি নাকি Budgets টাকা পাশ করা হয়েছে। সুতরাং মহিলা নাকি দিচ্ছে, অবশ্য আমি নিজে দেখিনি। তাই বলতে পারছি না সঠিক খবর। ভাবছি একটা Case করলে কেমন হয়।

১৯৫৫ সালের ২৯ এপ্রিলের আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন-

‘মুজিব ভাই,

আবার কিছুটা বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। আসার দিন শুনলাম কামরুজ্জামানের কাছে যে, আমার নাম নাকি Submit করা হয়েছে Convention এ, তবে তিনিও নাকি জানেন না। সেই খবরটা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি। যদি সত্যি তা হয় তাহলে ফেরত ডাকে ২-১ লাইনে জানিয়ে দেবেন। ঢাকা যাওয়ার জন্য বাইরে যাওয়াটা Cancel করে দেব, তা ছাড়া পুরান Constitution এর বইগুলো আর একবার ঝালিয়ে দিতে হবে। ইতোমধ্যে একটু কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা আপাতত বন্ধ করে দিতে হবে। চিঠিটা ৭-৮ দিন নিয়ে ঘুরলে হবে না-নিজে দিতে না পারলে বউকে বলবেন জানিয়ে দিতে। আশা করি কথাটার গুরুত্ব দেবেন।’

বদরুন্নেছা আহম্মদের মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক শোকবাণীতে বলেছেন-

‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম বীরাঙ্গনা বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং মন্ত্রিসভার আমার অন্যতম সহকর্মী বেগম বদরুন্নেছা আহম্মদের অকাল মৃত্যুতে আমি মর্মাহত।

আমাদের মুক্তি সংগ্রামে এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে জাতীয় পুনর্গঠনে তার ভূমিকা অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগত জীবনে নানা বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও সুদীর্ঘকালে তিনি সেভাবে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে থেকে জনগণের সেবা করেছেন। সুখে দুঃখে ও সংগ্রামে জনসাধারণের সঙ্গে একান্ত হয়ে কাজ করেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পরম-করুণাময় তার বিদেহী আত্মার শান্তি দান করুন।’

১৯৭০-এর নির্বাচনের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে অংশ নেওয়ার জন্য ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু মমতাজ বেগমকে ৮০০ টাকা হাতে দিয়ে বলেন, ‘তুমি দরখাস্ত কর গিয়ে। পার্টিতে ৮০০ টাকা জমা দিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ফরম নিতে হবে।’ মমতাজ বেগম ৮০০ টাকা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় ফরম নিতে হবে? বঙ্গবন্ধু তাকে ফরম নেওয়ার জায়গা বলে দেন। মমতাজ বেগম ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমএনএ নির্বাচিত হন।

গণভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা নিয়ে কণিকা বিশ্বাস বলেন, বঙ্গবন্ধু খাদির সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি পরে আসন আলোকিত করে বসে আছেন। আমার পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ। কপালে সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, হাতে শাঁখা। আমি গুটি গুটি পায়ে বঙ্গবন্ধুর দিকে এগিয়ে যাই। হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কিরে তিনি বুঝি আসেননি! তাকে ধরা যায় না, পিছলে বেরিয়ে যায়। আমি তো আগেই জেনেছি, বীরেন বাবু বিয়ে করেছেন। আওয়ামী লীগের এক ছাত্রনেত্রীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। যাকে আমি সামনে পেয়েছি। আজ থাক ওসব কথা। পারিবারিক সম্পর্কের কথা জিজ্ঞেস করি। তোমার শ্বশুর মহাশয়-শাশুড়ি মা ভালো আছেন তো? আমি যখন প্রথম সংগঠন করতে আরম্ভ করি, বীরেন বাবুর বাড়ি আওয়ামী লীগের সংগঠকদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। আমি মায়ের হাতের হালকা রান্নাও খেয়েছি। তারা বুঝি তোমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন? আচ্ছা তোমাদের বাড়ির সেই গোলের ঘর ও সেই খাট আছে? আমি যে খাটে শুয়েছি। আমার সঙ্গে আরও বড় বড় নেতারাও যেতেন। আমরা ওই খাটে বসেছি, শুয়েছি। একটা গদিও বানিয়ে দিয়েছিলেন। এতদিনে কি আছে?’

কণিকা বিশ্বাসের প্রতিউত্তরে বলেন, স্যার, আমি ওই ঘরে থাকি। গদিটা মেরামত করেছি। কারণ ওটা ইতিহাসখ্যাত খাট। ওর মূল্য হিসাব করা যায় না।

এমন সহজ-সরল সম্পর্ক ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারীনেত্রী, নারী সংসদ সদস্যদের। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারীনেত্রীদের শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কই নয়, পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল।

নারী নেত্রীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হৃদ্যতা

 রীতা ভৌমিক 
১৫ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আজ জাতীয় শোক দিবস। এ দিনই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ষড়যন্ত্রকারীরা সপরিবারে হত্যা করে। বিদেশে অবস্থান করায় তার দুই কন্যা সেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অনেক নারী নেত্রী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়িতে তাদের অবাধ যাতায়াত ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারী নেত্রীদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত সুদৃঢ়, আন্তরিক ও হৃদ্যতাময়। লিখেছেন-রীতা ভৌমিক

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু রাজনীতি অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনা, আইন প্রণয়ন ও নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে নারীদের সংশ্লিষ্ট করতে চেয়েছিলেন তা নয়, তিনি সামাজিক-অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নারী নেত্রীদের সংশ্লিষ্ট করতে চেয়েছিলেন। ১৯৫৪ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাংলার অনেক নারী রাজনীতিবিদদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সংস্পর্শে আসার সুযোগ হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিমদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা বানু, শামসুন নাহার মাহমুদ, বদরুন্নেছা আহম্মদ, দৌলতুন নেসা খাতুন, রাজিয়া বানু, তফতুন্নেসা, মেহেরুন নেসা প্রমুখ জয়ী হন।

এ ছাড়া তার বাড়িতে ছাত্রলীগ, আওয়ামী লীগের নারী নেত্রী, সংরক্ষিত নারী আসনের এমএনএ, এমপিদের আনাগোনাও কম ছিল না। এ নারী নেত্রীদের সঙ্গে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বঙ্গবন্ধু কারাগারে অথবা বাড়িতে না থাকলে প্রয়োজনে তিনিও তাদের দিকনির্দেশনা দিতেন। একজন অভিভাবকের মতো রাজনীতির নানা বিষয়ে পরামর্শ দিতেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বেগম ফজিলাতুন নেছা দুজনেই নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

রাজনীতিতে নারী নেত্রীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আমেনা বেগম, নূরজাহান মুরশিদ, বদরুন্নেছা আহম্মদ, মমতাজ বেগম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কণিকা বিশ্বাস, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা শাখার নেত্রী ফরিদা রহমান, জোহরা তাজউদ্দীন, নাদিরা হক, খালেদা হাবীব, আইভী রহমান, ফরিদা মেরি, নূরজাহান কামাল প্রমুখ নারী নেত্রীরাও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে রাজনীতিতে নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন, বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্যরা দেশের জাতীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন। নারী অধিকার প্রশ্নে কার্যকর ও গতিশীল ভূমিকা রাখবেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এ বিষয়টি নারীর সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫টি সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুজন নারীকে প্রতিমন্ত্রী পদে নিয়োগ প্রদান করেছিলেন। বেগম বদরুন্নেছা আহম্মদকে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবং নূরজাহান মুরশিদকে সমাজকল্যাণ ও পরিবার পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়।

তবে এটাও ধারণা করা যায়, ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী আসনে নারীর অংশগ্রহণ হয়েছিল কবি সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবিতে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে স্মারকলিপি প্রেরণ এবং আওয়ামী মহিলা লীগের দাবির প্রেক্ষাপটে। ১৫ সংরক্ষিত নারী আসন এবং দুজন নারী প্রতিমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে নারীর অবস্থান বা সম্পৃক্ততার সূত্রপাত ঘটে। যদিও বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্রে রাজনীতিতে নারীর সম্পৃক্ততা বা অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম।

১৯৭০-এ পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের নির্বাচিত এমএলএ নূরজাহান মুরশিদ একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতি আদায়ে দিল্লি পার্লামেন্টের উভয় হাউজের যুক্ত অধিবেশনে বক্তৃতা দেন। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী বাংলাদেশের সামরিক ও বেসামরিক বিভিন্ন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় যেভাবে বেপরোয়া আক্রমণ চালিয়ে শতশত নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে সেই পাকিস্তানের সঙ্গে কোনোরকম সম্পর্ক রক্ষায় আগ্রহী নন সেটাও জানান। পাকিস্তানের এ আক্রমণের কঠোর নিন্দা করে ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশের সরকারের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য আবেদন করেন। এ কারণে পাকিস্তান সামরিক জান্তা তার ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে নিরুদ্দেশ অবস্থাতেই তাকে চৌদ্দ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। তার বিষয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে।

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে আসেন। নূরজাহান মুরশিদের ওপর ইয়াহিয়ার এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদিন রসিকতা করেন। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু নূরজাহান মুরশিদকে কী বলেছিলেন তা তিনি ‘আমার কিছু স্মৃতিকথা’ গ্রন্থে তুলে ধরেছেন-‘তিনি হেসে বলেন, ‘নামের আগে মিসেস লিখবেন না, বেগম লিখবেন না, ইয়াহিয়া খান কেমন করে বুঝবেন যে আপনি একজন ছেলে না মেয়ে?’ ইয়াহিয়া খানের দণ্ডাদেশের সঙ্গে আমার ছেলে বা মেয়ে হওয়ার সম্পর্ক কী তা ভেবে আমি একটু অবাক হচ্ছি। এমন সময় তাজউদ্দীন আহমদ, নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান ও মনসুর আলী এসে আমাদের কথায় যোগ দিলেন। তাদের কথার মধ্য দিয়ে জানতে পারলাম, আমার বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ এনেছিলেন ইয়াহিয়া খান যা একমাত্র পুরুষদের বিরুদ্ধেই আনা চলে। অতঃপর সবাইকে এক সারিতে এনে ইয়াহিয়া খানের এ দণ্ডাদেশ দেওয়ার রীতির আমরা প্রশংসাই করলাম।’... বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নূরজাহান মুরশিদের এমনই সহজ-সরল সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

১৯৫৫ সালের ৯ এপ্রিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বদরুন্নেছা আহম্মদের লেখা একটি পত্রে জানা যায়-‘আমাদের কাছে কেউ কোনোদিন চাঁদাও চায় না। তাই বলে একসঙ্গে এক বছরের চাঁদা চেয়ে বসবেন না। ও দিতেও পারব না! কেননা M.L.A হয়ে এক পয়সা তো পেলাম না। শুনছি নাকি Budgets টাকা পাশ করা হয়েছে। সুতরাং মহিলা নাকি দিচ্ছে, অবশ্য আমি নিজে দেখিনি। তাই বলতে পারছি না সঠিক খবর। ভাবছি একটা Case করলে কেমন হয়।

১৯৫৫ সালের ২৯ এপ্রিলের আরেকটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন-

‘মুজিব ভাই,

আবার কিছুটা বাধ্য হয়ে লিখতে হচ্ছে। আসার দিন শুনলাম কামরুজ্জামানের কাছে যে, আমার নাম নাকি Submit করা হয়েছে Convention এ, তবে তিনিও নাকি জানেন না। সেই খবরটা আপনার কাছে জানতে চাচ্ছি। যদি সত্যি তা হয় তাহলে ফেরত ডাকে ২-১ লাইনে জানিয়ে দেবেন। ঢাকা যাওয়ার জন্য বাইরে যাওয়াটা Cancel করে দেব, তা ছাড়া পুরান Constitution এর বইগুলো আর একবার ঝালিয়ে দিতে হবে। ইতোমধ্যে একটু কলকাতা যাওয়ার প্রয়োজন ছিল, সেটা আপাতত বন্ধ করে দিতে হবে। চিঠিটা ৭-৮ দিন নিয়ে ঘুরলে হবে না-নিজে দিতে না পারলে বউকে বলবেন জানিয়ে দিতে। আশা করি কথাটার গুরুত্ব দেবেন।’

বদরুন্নেছা আহম্মদের মৃত্যুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক শোকবাণীতে বলেছেন-

‘বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের অন্যতম বীরাঙ্গনা বিশিষ্ট আওয়ামী লীগ নেত্রী এবং মন্ত্রিসভার আমার অন্যতম সহকর্মী বেগম বদরুন্নেছা আহম্মদের অকাল মৃত্যুতে আমি মর্মাহত।

আমাদের মুক্তি সংগ্রামে এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে জাতীয় পুনর্গঠনে তার ভূমিকা অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। ব্যক্তিগত জীবনে নানা বাধা বিপত্তি সত্ত্বেও সুদীর্ঘকালে তিনি সেভাবে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে থেকে জনগণের সেবা করেছেন। সুখে দুঃখে ও সংগ্রামে জনসাধারণের সঙ্গে একান্ত হয়ে কাজ করেছেন তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

পরম-করুণাময় তার বিদেহী আত্মার শান্তি দান করুন।’

১৯৭০-এর নির্বাচনের জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে অংশ নেওয়ার জন্য ১৯৭১-এর ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে বঙ্গবন্ধু মমতাজ বেগমকে ৮০০ টাকা হাতে দিয়ে বলেন, ‘তুমি দরখাস্ত কর গিয়ে। পার্টিতে ৮০০ টাকা জমা দিয়ে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির ফরম নিতে হবে।’ মমতাজ বেগম ৮০০ টাকা নিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় ফরম নিতে হবে? বঙ্গবন্ধু তাকে ফরম নেওয়ার জায়গা বলে দেন। মমতাজ বেগম ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে এমএনএ নির্বাচিত হন।

গণভবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম দেখা নিয়ে কণিকা বিশ্বাস বলেন, বঙ্গবন্ধু খাদির সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি পরে আসন আলোকিত করে বসে আছেন। আমার পরনে লালপেড়ে সাদা শাড়ি, লাল ব্লাউজ। কপালে সিঁদুরের টিপ, সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর, হাতে শাঁখা। আমি গুটি গুটি পায়ে বঙ্গবন্ধুর দিকে এগিয়ে যাই। হাত জোড় করে নমস্কার জানিয়ে তার সামনে দাঁড়াতেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘কিরে তিনি বুঝি আসেননি! তাকে ধরা যায় না, পিছলে বেরিয়ে যায়। আমি তো আগেই জেনেছি, বীরেন বাবু বিয়ে করেছেন। আওয়ামী লীগের এক ছাত্রনেত্রীর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। যাকে আমি সামনে পেয়েছি। আজ থাক ওসব কথা। পারিবারিক সম্পর্কের কথা জিজ্ঞেস করি। তোমার শ্বশুর মহাশয়-শাশুড়ি মা ভালো আছেন তো? আমি যখন প্রথম সংগঠন করতে আরম্ভ করি, বীরেন বাবুর বাড়ি আওয়ামী লীগের সংগঠকদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতাম। আমি মায়ের হাতের হালকা রান্নাও খেয়েছি। তারা বুঝি তোমাকে পাঠিয়ে দিয়েছেন? আচ্ছা তোমাদের বাড়ির সেই গোলের ঘর ও সেই খাট আছে? আমি যে খাটে শুয়েছি। আমার সঙ্গে আরও বড় বড় নেতারাও যেতেন। আমরা ওই খাটে বসেছি, শুয়েছি। একটা গদিও বানিয়ে দিয়েছিলেন। এতদিনে কি আছে?’

কণিকা বিশ্বাসের প্রতিউত্তরে বলেন, স্যার, আমি ওই ঘরে থাকি। গদিটা মেরামত করেছি। কারণ ওটা ইতিহাসখ্যাত খাট। ওর মূল্য হিসাব করা যায় না।

এমন সহজ-সরল সম্পর্ক ছিল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারীনেত্রী, নারী সংসদ সদস্যদের। এভাবেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নারীনেত্রীদের শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কই নয়, পারিবারিক সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন