টুকরি তৈরি করে
jugantor
টুকরি তৈরি করে

  এ হাই মিলন  

২৯ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাড়ির উঠানে বসে একমনে পাতি তৈরি করছিলেন রূপগঞ্জের ফিরোজা বেগম। কাজ করতে করতে বারো বছর আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই আঁচলে চোখ মোছেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ছেলের দিকে তাকান একবার।

ফিরোজা বেগমের জীবনে আছেন তার তিন সন্তান। স্বামী সালু মিয়া বাঁশের কঞ্চি দিয়ে টুকরি তৈরি করতেন। স্বামীর কাছে তিনিও পাতি তৈরির কাজ শিখেছিলেন। দিনমজুর স্বামীর আয়ে ছোট্ট তিন সন্তানকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছিল তাদের। ফিরোজার বড় ছেলের বয়স তখন আট বছর। একদিন কাজের খোঁজে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেননি তার স্বামী। চার মাস নিখোঁজ থাকার পর সালু মিয়ার লাশ খুঁজে পাওয়া যায় পাশের জেলা নরসিংদীর একটি নদীতে। নিখোঁজ স্বামীকে খুঁজতে আর ছোট্ট শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন ফিরোজা। একদিকে পাওনাদারদের চাপ অপরদিকে সন্তানদের ক্ষুধার্ত মুখ। দিশেহারা ফিরোজা বেগম স্বামীর শেখানো কাজকেই পেশা হিসাবে বেছে নেন। মহাজনের এখানে কাজ শুরু করেন টুকরির কারিগর হিসাবে। টুকরি বুনতে বুনতেই নতুন জীবনের স্বপ্ন বোনেন ফিরোজা। সন্তানরা বড় হয়ে উঠলে মহাজনের কাজ ছেড়ে নিজেই বাঁশ কিনে টুকরি বোনা শুরু করেন। সঙ্গে যোগ দেয় তার তিন সন্তান।

উদ্যোক্তা ফিরোজা বেগম বলেন, তিন সন্তানই এখন ব্যবসা বুঝতে শিখেছে। বড় ছেলে রানা নিজেই এখন টুকরির মহাজন। ছোট ছেলে রবিন আর মেয়ে মারিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের কাজে সহায়তা করেন। টুকরি বানিয়ে ঋণমুক্ত হয়েছি। নতুন ঘর হয়েছে, আসবাবপত্র হয়েছে। পারিবারিকভাবে টুকরি বুনেই সংসারে সচ্ছলতা এনেছি।

ফিরোজার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো আগারপাড়া গ্রামে। ফিরোজার বড় ছেলে রানা মিয়া জানান, প্রতি মাসে তারা অন্তত এক হাজার টুকরি তৈরি করতে পারেন। ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে পাইকাররা সেসব টুকরি বাড়ি থেকেই সংগ্রহ করে। স্বল্প বিনিয়োগে বাড়িতে বসেই অবসর সময়ে টুকরি তৈরি করি। এটা লাভজনক ব্যবসা।

শুধু ফিরোজা বেগমই নয়, এ গ্রামের অন্তত একশটি পরিবার বাঁশের টুকরি তৈরির কাজ করেন। এসব টুকরি বিক্রি হয় ফতুল্লা, কুমিল্লা, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেসব টুকরি কেনেন পাইকাররা।

একটি বাড়ির উঠানে বসে টুকরির চাক বাঁধাইয়ের কাজ করছিলেন উর্মি নামে এক কিশোরী। তার বাবা মানিক মিয়া ও মা রোকসানা বেগমও এ কাজ করেন। উর্মি স্থানীয় প্রগতী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি এ কাজ করে বাবা-মাকে সহযোগিতা করে। উর্মির ছোট বোন হাবিবাও এ কাজ করে। হাবিবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

রোকসানা জানান, খাড়ি ব্যবসায়ী স্বামীর উপার্জনে সংসার চলে। অভাবের সংসারে মেয়েদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্যই টুকরির চাক বাঁধাইয়ের শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। অবসরে কাজ করে সামান্যই উপার্জন হয়। তবুও স্বপ্ন দেখেন, টুকরি বোনার সামান্য অর্থেই মেয়েদের পড়াশোনা হবে। তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে কাজে দেবে সঞ্চয়ের টাকা।

টুকরি তৈরি করে

 এ হাই মিলন 
২৯ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বাড়ির উঠানে বসে একমনে পাতি তৈরি করছিলেন রূপগঞ্জের ফিরোজা বেগম। কাজ করতে করতে বারো বছর আগের দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই আঁচলে চোখ মোছেন। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বড় ছেলের দিকে তাকান একবার।

ফিরোজা বেগমের জীবনে আছেন তার তিন সন্তান। স্বামী সালু মিয়া বাঁশের কঞ্চি দিয়ে টুকরি তৈরি করতেন। স্বামীর কাছে তিনিও পাতি তৈরির কাজ শিখেছিলেন। দিনমজুর স্বামীর আয়ে ছোট্ট তিন সন্তানকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটছিল তাদের। ফিরোজার বড় ছেলের বয়স তখন আট বছর। একদিন কাজের খোঁজে বের হয়ে আর ঘরে ফেরেননি তার স্বামী। চার মাস নিখোঁজ থাকার পর সালু মিয়ার লাশ খুঁজে পাওয়া যায় পাশের জেলা নরসিংদীর একটি নদীতে। নিখোঁজ স্বামীকে খুঁজতে আর ছোট্ট শিশুদের মুখে খাবার তুলে দিতেই ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন ফিরোজা। একদিকে পাওনাদারদের চাপ অপরদিকে সন্তানদের ক্ষুধার্ত মুখ। দিশেহারা ফিরোজা বেগম স্বামীর শেখানো কাজকেই পেশা হিসাবে বেছে নেন। মহাজনের এখানে কাজ শুরু করেন টুকরির কারিগর হিসাবে। টুকরি বুনতে বুনতেই নতুন জীবনের স্বপ্ন বোনেন ফিরোজা। সন্তানরা বড় হয়ে উঠলে মহাজনের কাজ ছেড়ে নিজেই বাঁশ কিনে টুকরি বোনা শুরু করেন। সঙ্গে যোগ দেয় তার তিন সন্তান।

উদ্যোক্তা ফিরোজা বেগম বলেন, তিন সন্তানই এখন ব্যবসা বুঝতে শিখেছে। বড় ছেলে রানা নিজেই এখন টুকরির মহাজন। ছোট ছেলে রবিন আর মেয়ে মারিয়া পড়াশোনার পাশাপাশি আমাদের কাজে সহায়তা করেন। টুকরি বানিয়ে ঋণমুক্ত হয়েছি। নতুন ঘর হয়েছে, আসবাবপত্র হয়েছে। পারিবারিকভাবে টুকরি বুনেই সংসারে সচ্ছলতা এনেছি।

ফিরোজার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের গুতিয়াবো আগারপাড়া গ্রামে। ফিরোজার বড় ছেলে রানা মিয়া জানান, প্রতি মাসে তারা অন্তত এক হাজার টুকরি তৈরি করতে পারেন। ৫০ থেকে ৫৫ টাকা দরে পাইকাররা সেসব টুকরি বাড়ি থেকেই সংগ্রহ করে। স্বল্প বিনিয়োগে বাড়িতে বসেই অবসর সময়ে টুকরি তৈরি করি। এটা লাভজনক ব্যবসা।

শুধু ফিরোজা বেগমই নয়, এ গ্রামের অন্তত একশটি পরিবার বাঁশের টুকরি তৈরির কাজ করেন। এসব টুকরি বিক্রি হয় ফতুল্লা, কুমিল্লা, সিলেট, সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেসব টুকরি কেনেন পাইকাররা।

একটি বাড়ির উঠানে বসে টুকরির চাক বাঁধাইয়ের কাজ করছিলেন উর্মি নামে এক কিশোরী। তার বাবা মানিক মিয়া ও মা রোকসানা বেগমও এ কাজ করেন। উর্মি স্থানীয় প্রগতী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি এ কাজ করে বাবা-মাকে সহযোগিতা করে। উর্মির ছোট বোন হাবিবাও এ কাজ করে। হাবিবা চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

রোকসানা জানান, খাড়ি ব্যবসায়ী স্বামীর উপার্জনে সংসার চলে। অভাবের সংসারে মেয়েদের পড়াশোনা আর ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের জন্যই টুকরির চাক বাঁধাইয়ের শ্রমিক হিসাবে কাজ করেন। অবসরে কাজ করে সামান্যই উপার্জন হয়। তবুও স্বপ্ন দেখেন, টুকরি বোনার সামান্য অর্থেই মেয়েদের পড়াশোনা হবে। তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে কাজে দেবে সঞ্চয়ের টাকা।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন