অদম্য অপরাজিত বাংলার বাঘিনীরা
jugantor
অদম্য অপরাজিত বাংলার বাঘিনীরা

  ওমর ফারুক রুবেল  

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতে লাল-সবুজের পতাকা। মুখে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ স্লোগান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে হাজার হাজার উৎসুক মানুষের ভিড়। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত বিমানবন্দর সড়ক। বিমানবন্দরের ভেতরে আরেক দৃশ্য। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, কর্মচারীদের হুড়াহুড়ি সেলফি তোলার জন্য। সাবিনা খাতুন, সানজিদা আক্তার, ঋতুপর্ণা চাকমা, রুপনা চাকমাদের সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য কত বাহানা তাদের। এসবই ছিল একদল অদম্য মেয়েদের সফলতার প্রতিফলন। যে সফলতায় ফের জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। ভালোবাসায় ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। গতি, ক্ষিপ্রতা, এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা, হার না মানার প্রতিজ্ঞা, ময়দানি প্রতিপক্ষকে ছাড় না দেওয়া-এক টুর্নামেন্টেই নিজেদের চিনিয়েছেন বাংলার বাঘিনীরা। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ভবন-চার ঘণ্টার এ যাত্রাই বলে দিচ্ছে লাল-সবুজের মেয়েরা এশীয় মানচিত্রের দক্ষিণ অংশে সবার সেরা। সফল এ মেয়েদের সংবর্ধনা দিতে পেরে গর্বিত বাঙালি জাতি। নেপাল থেকে ফিরে লিখেছেন-ওমর ফারুক রুবেল

নতুন ইতিহাস

দক্ষিণ এশীয় গণ্ডিতে নিজেদের সেরা প্রমাণ করেছেন সাবিনারা। বিশ্ববাসীকে আরও একবার জানিয়ে দিয়েছেন মেয়েরাও পারে। ১৯ সেপ্টেম্বর হিমালয়ের পাদদেশে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, তা লাল-সবুজের মেয়েদের অনন্য করে তুলেছে। মেয়েদের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের এক টুর্নামেন্টেই তিনটি ইতিহাস রচনা করেছে সাবিনা খাতুন বাহিনী। গত পাঁচ আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়ে প্রথম ইতিহাসের সূচনা করেন। ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে দ্বিতীয় ইতিহাসে নাম লেখান তারা। এ দুটি দেশের বিপক্ষে আগে কখনোই জয় ছিল না। শেষে দক্ষিণ এশীয় গণ্ডিতে প্রথমবার শিরোপা জিতে সাত দেশের মধ্যে সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইতিহাসের আরেকটি অংশ হন কোচ গোলাম রব্বানীর শিষ্যরা।

ইতিহাসের পথে পথে

বাঙালি ললনা মানেই চির লাজুক-এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখালেন সাবিনারা। ময়দানি লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের জালে মুহুর্মুহু আক্রমণ আর গোলের পর গগনবিদারি চিৎকার করে দেশবাসীকে উৎসবে ডেকে আনা যেন মামুলিতে রূপান্তর করেছেন তারা। এক টুর্নামেন্টেই নিজেদের জাত চিনিয়েছেন তারা। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মালদ্বীপকে ৩-০ গোলে, পাকিস্তানকে ৬-০ গোলে এবং ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে এ-গ্রুপের সেরা দল হিসাবেই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন সাবিনারা। সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে ওঠেন। আর শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ঝাঁ চকচকে সোনালি ট্রফিতে চুমু খান।

৫ পুরস্কার জয় বাঘিনীদের

এক টুর্নামেন্টে কত কিছু অর্জন সাবিনাদের। মেয়েদের সাফের খেলা শেষে ছয়টি পুরস্কার রেখেছিল সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ)। যার পাঁচটিই জিতেছেন বাংলার রাজকন্যারা। চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম পুরস্কারের ট্রফি জিতেছেন তারা। পুরো প্রতিযোগিতায় দুটি হ্যাটট্রিকসহ ৮ গোল করে সর্বাধিক গোলদাতা হয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন জিতেছেন সেরা গোলদাতার গোল্ডেন বুট। গোল করে এবং সতীর্থদের গোল করিয়ে জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিও। প্রতিপক্ষের জালে ২৩টি গোল করলেও নিজের জালে মাত্র একটি গোল করতে দিয়েছেন বাংলাদেশের গোলকিপার রুপনা চাকমা। তাই টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের ট্রফি জিতেছেন তিনি। সব শেষে ভালো খেলা উপহার দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ফেয়ার প্লে ট্রফিও দেশে নিয়ে এসেছেন সাবিনারা।

গোলাম রব্বানী কোচ

সংবর্ধনা ও রাজসিক আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলকে। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও ফুটবল ফেডারেশনকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমাদের এই পথচলা আসলে অনেক দিনের। ২০১২ সালে প্রথমে আমাদের পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকের এ সাফল্য। আমরা একটা ভালো ফল করে এসেছি। আমাদের এখন চিন্তা হচ্ছে সামনের দিকে কীভাবে আরও এগিয়ে যাওয়া যায়। জুনিয়র পর্যায়ে আমরা সফলতা পাচ্ছিলাম, কিন্তু সিনিয়র পর্যায়ে পাচ্ছিলাম না। আমাদের প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান সবার বিশ্বাস ছিল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ মেয়েরা সফলতা এনে দেবে। আমাদের প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান, ডিরেক্টর সবাই আমাদের পুশ করেছেন হার্ড ওয়ার্ক করার জন্য। মেয়েরা হার্ড ওয়ার্ক করেছে বলেই আমরা এখন চ্যাম্পিয়ন।

সাবিনা খাতুন অধিনায়ক

এই ট্রফি সব মানুষের। গত চার-পাঁচ বছর ধরে একটা জায়গাতেই ছিলাম। দিনশেষে আমরা সফলতা পেয়েছি-এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। কারণ, এরপর আর বলার অবকাশ থাকে না যে দেশের মানুষ ফুটবলের প্রতি কতটা আসক্ত এবং তারা কতটা ভালোবাসেন। ২০১২ সাল থেকে মেয়েদের ফুটবল ভালোভাবে চলছে এবং গত চার-পাঁচ বছরের যদি সাফল্য দেখেন, মেয়েদের পরিশ্রম দেখেন, সেটারই ফল আমরা পেয়েছি।

সানজিদা আক্তার

ভাবতে পারিনি ছাদখোলা বাসে আসব। অনেক ভালো লেগেছে। আমার স্ট্যাটাস যে এত ভাইরাল হবে, কখনো ভাবিনি। যদিও আমার ফ্যান-ফলোয়ার আছে। তাদের জন্য লিখেছি। আমার মনে হয়নি এতদূর এগিয়ে যাবে। আসলে আমি কেন, আমরা কেউ-ই কখনো ভাবতে পারিনি বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবেসে, আমাদের এভাবে বরণ করে নেবে। প্রায় সবারই এটা প্রথম অভিজ্ঞতা। দেখে অনেক ভালো লাগছে।

কৃষ্ণা রানি সরকার

আগে বয়সভিত্তিক দলের হয়ে শিরোপা জিতেছি। তখন এতটা আনন্দ হয়নি। কারণ সে সময় বয়সভিত্তিক দলে অনেক ট্রফিই আমরা জিতেছি। তবে সিনিয়র পর্যায়ে এই প্রথম। এত ভালো লাগা আর কখনো হয়নি। আসলে আমরা আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছি। সবার মনের মধ্যে শিরোপা জেতার একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেটার প্রতিফলন ঘটেছে নেপালে। এই শিরোপাকে আমি সবার ওপরে রাখব।

রুপনা চাকমা

এত বড় টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হব, আগে কল্পনাও করতে পারিনি। মনে হচ্ছে জীবনের বড় অর্জন পেয়ে গেছি। আমার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। পুরো টুর্নামেন্টে ভালো খেলেই জিতেছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পোস্টের নিচে আমি অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে ছিলাম। যা দেশকে বড় একটি সম্মান পেতে সহায়তা করেছে। চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার পেয়ে আমি খুব খুশি।

আঁখি খাতুন

দেশের মানুষের ভালোবাসা আর স্নেহ আমাদের এই ট্রফি এনে দিয়েছে। আমরা দেশের জন্য খেলেছি। সাত দেশের মধ্যে সেরা হয়েছি। সবাইকে পরাজিত করেছি। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে ডিফেন্ডার হিসাবে নিজের পজিশনকে অক্ষত রাখতে পেরেছি। এটাই আমার ক্যারিয়ারের সেরা পাওয়া। জীবনের সেরা জিনিস পেয়ে গেছি।

মাসুরা পারভীন

ফাইনালে আমি খুব বেশিক্ষণ খেলতে পারিনি, এটা ভেবে একটু খারাপ লেগেছিল। প্রত্যেকটি ম্যাচেই সুন্দর খেলা উপহার দিয়েছি। যার জন্য জয়গুলো সহজে পেয়েছি। প্রত্যেক বিভাগে সবাই নিজের কাজগুলো সুন্দর করে করেছে। তাই অধরা এ ট্রফি ধরা দিয়েছে। আমি গর্বিত এ দলের সদস্য হতে পেরে।

মনিকা চাকমা

আমরা সিনিয়র পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, এটা গর্বের। শুরু থেকে শেষ, সব ম্যাচেই পরিকল্পনামাফিক খেলেছি আমরা। কোচ যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই খেলেছি। তাই আমরা পেরেছি। আমাদের চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। দেশের মানুষকে একটি শিরোপা উপহার দিতে পেরেছি। এর চেয়ে গর্বিত বিষয় আর কি হতে পারে।

মারিয়া মান্দা

দশরথের গ্যালারিজুড়েই ছিল নেপালের দর্শক। আমাদের সমর্থন করার মতো অনেক প্রবাসী দর্শক ছিলেন। আমরা তাদের শক্তিতে বলিয়ান হয়েই খেলেছি। আমাদের জিততে হবে এ মনোভাব ছিল। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে সবাই কেঁদেছি। এটা ছিল আনন্দের কান্না। দেশকে কিছু এনে দেওয়ার আনন্দাশ্রু।

সিরাত জাহান স্বপ্না

এত্ত এত্ত দর্শক ছিল যে, অন্য কেউ হলে চাপে পড়ে যেত। কিন্তু আমরা চাপে পড়িনি। আমরা যে দিক দিয়ে খেলেছি সেদিক দিয়েই গোল পেয়েছি। আল্লাহ সহায় ছিলেন আমাদের প্রতি। তা ছাড়া গোলকিপিং, ডিফেন্ডিং, মিডফিল্ড, ফরোয়ার্ড-সব পজিশনেই সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করেছে। তাই তো একের পর এক জয় হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছে।

ঋতুপর্ণা চাকমা

আমার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন এটি। টুর্নামেন্টের বিভিন্ন পর্যায়ে গোল করেছি। যার একটি উৎসর্গ করেছিলাম আমার প্রয়াত ছোট ভাই পার্বণ চাকমাকে। গত জুনে ভাইকে হারিয়েছি। তাই শিরোপার জন্যই খেলেছিলাম। যাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি আমি দেশবাসীর সঙ্গে আমার ভাইকেও উৎসর্গ করতে পারি। ওপারে ভালো থাকিস ভাই।

শামসুন্নাহার সিনিয়র

দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে আমাদের। বিশেষ করে সিনিয়র নারী দলের। আগে বয়সভিত্তিক দলগুলো শিরোপা জিতেছে একাধিকবার। দেশের মানুষ আনন্দে উদ্বেল হয়েছিলেন। এবার সেই উপলক্ষ্য এনে দিতে পেরে আমরাও গর্বিত। আমরা দেশের জন্য কিছু করতে পেরে সবাই খুশি।

নিলুফার ইয়াসমিন

সাফের ফাইনালে যখন আমরা খেলছিলাম, তখন হয়তো প্রত্যাশা করেছিলাম ট্রফি জিতব। জিতেছি। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকের অভিনন্দন পেয়েছি আমরা। শত শত, হাজার হাজার মানুষের অভিনন্দন পেয়েছি। কিন্তু দেশে এসে যা পেলাম তা আশাও করিনি আমি। এত সুন্দর আয়োজন হবে আমাদের নিয়ে তা কল্পনাতেও ছিল না আমার।

শামসুন্নাহার জুনিয়র

অন্য ম্যাচের কথা আমার মনে নেই। ফাইনালে সিরাত জাহান স্বপ্নাকে উঠিয়ে যখন আমাকে নামানো হলো, তখন বুঝে গিয়েছিলাম স্যার (কোচ) আমার ওপর ভরসা করছেন। মাঠে নেমেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকি। শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা পাই। দেশকে ট্রফি জেতানো দলের গর্বিত একজন সদস্য হতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান।

শিউলি আজিম

আগে কখনো ভাবতেই পারিনি এত বড় অর্জন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নেপালে যখন গিয়েছিলাম, প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু খেলা শুরুর আগে এতটা ভালো খেলব তা আশা করিনি। আমরা সবাই অসাধারণ খেলেছি। নৈপুণ্য প্রদর্শন করে দেশকে ট্রফি এনে দিয়েছি। দেশের মানুষের ভালোবাসা আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে আগামীতে।

তহুরা খাতুন

অনুশীলনের সময় আমাদের গোলাম রব্বানী স্যার অনেক ধরনের পরিকল্পনার কথা জানাতেন। কীভাবে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া যায়। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কীভাবে ট্যাকল করা যায়। মাঠে আমরা সেভাবেই তাদের বিপক্ষে খেলেছি। শেষ পর্যন্ত ট্রফি নিয়ে দেশে এসেছি। এটাই সেরা অর্জন।

অদম্য অপরাজিত বাংলার বাঘিনীরা

 ওমর ফারুক রুবেল 
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

হাতে লাল-সবুজের পতাকা। মুখে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ স্লোগান। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বাইরে হাজার হাজার উৎসুক মানুষের ভিড়। স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত বিমানবন্দর সড়ক। বিমানবন্দরের ভেতরে আরেক দৃশ্য। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা, কর্মচারীদের হুড়াহুড়ি সেলফি তোলার জন্য। সাবিনা খাতুন, সানজিদা আক্তার, ঋতুপর্ণা চাকমা, রুপনা চাকমাদের সঙ্গে একটি ছবি তোলার জন্য কত বাহানা তাদের। এসবই ছিল একদল অদম্য মেয়েদের সফলতার প্রতিফলন। যে সফলতায় ফের জেগে উঠেছে বাংলাদেশ। ভালোবাসায় ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। গতি, ক্ষিপ্রতা, এগিয়ে যাওয়ার মানসিকতা, হার না মানার প্রতিজ্ঞা, ময়দানি প্রতিপক্ষকে ছাড় না দেওয়া-এক টুর্নামেন্টেই নিজেদের চিনিয়েছেন বাংলার বাঘিনীরা। কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দর থেকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) ভবন-চার ঘণ্টার এ যাত্রাই বলে দিচ্ছে লাল-সবুজের মেয়েরা এশীয় মানচিত্রের দক্ষিণ অংশে সবার সেরা। সফল এ মেয়েদের সংবর্ধনা দিতে পেরে গর্বিত বাঙালি জাতি। নেপাল থেকে ফিরে লিখেছেন-ওমর ফারুক রুবেল

নতুন ইতিহাস

দক্ষিণ এশীয় গণ্ডিতে নিজেদের সেরা প্রমাণ করেছেন সাবিনারা। বিশ্ববাসীকে আরও একবার জানিয়ে দিয়েছেন মেয়েরাও পারে। ১৯ সেপ্টেম্বর হিমালয়ের পাদদেশে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, তা লাল-সবুজের মেয়েদের অনন্য করে তুলেছে। মেয়েদের সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের এক টুর্নামেন্টেই তিনটি ইতিহাস রচনা করেছে সাবিনা খাতুন বাহিনী। গত পাঁচ আসরের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে সেমিফাইনালে নাম লিখিয়ে প্রথম ইতিহাসের সূচনা করেন। ফাইনালে নেপালকে হারিয়ে দ্বিতীয় ইতিহাসে নাম লেখান তারা। এ দুটি দেশের বিপক্ষে আগে কখনোই জয় ছিল না। শেষে দক্ষিণ এশীয় গণ্ডিতে প্রথমবার শিরোপা জিতে সাত দেশের মধ্যে সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করে ইতিহাসের আরেকটি অংশ হন কোচ গোলাম রব্বানীর শিষ্যরা।

ইতিহাসের পথে পথে

বাঙালি ললনা মানেই চির লাজুক-এই প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখালেন সাবিনারা। ময়দানি লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের জালে মুহুর্মুহু আক্রমণ আর গোলের পর গগনবিদারি চিৎকার করে দেশবাসীকে উৎসবে ডেকে আনা যেন মামুলিতে রূপান্তর করেছেন তারা। এক টুর্নামেন্টেই নিজেদের জাত চিনিয়েছেন তারা। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে মালদ্বীপকে ৩-০ গোলে, পাকিস্তানকে ৬-০ গোলে এবং ভারতকে ৩-০ গোলে হারিয়ে এ-গ্রুপের সেরা দল হিসাবেই টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেন সাবিনারা। সেমিফাইনালে ভুটানকে ৮-০ গোলে বিধ্বস্ত করে ফাইনালে ওঠেন। আর শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ঝাঁ চকচকে সোনালি ট্রফিতে চুমু খান।

৫ পুরস্কার জয় বাঘিনীদের

এক টুর্নামেন্টে কত কিছু অর্জন সাবিনাদের। মেয়েদের সাফের খেলা শেষে ছয়টি পুরস্কার রেখেছিল সাউথ এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন (সাফ)। যার পাঁচটিই জিতেছেন বাংলার রাজকন্যারা। চ্যাম্পিয়ন হয়ে প্রথম পুরস্কারের ট্রফি জিতেছেন তারা। পুরো প্রতিযোগিতায় দুটি হ্যাটট্রিকসহ ৮ গোল করে সর্বাধিক গোলদাতা হয়ে অধিনায়ক সাবিনা খাতুন জিতেছেন সেরা গোলদাতার গোল্ডেন বুট। গোল করে এবং সতীর্থদের গোল করিয়ে জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফিও। প্রতিপক্ষের জালে ২৩টি গোল করলেও নিজের জালে মাত্র একটি গোল করতে দিয়েছেন বাংলাদেশের গোলকিপার রুপনা চাকমা। তাই টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের ট্রফি জিতেছেন তিনি। সব শেষে ভালো খেলা উপহার দেওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার ফেয়ার প্লে ট্রফিও দেশে নিয়ে এসেছেন সাবিনারা।

গোলাম রব্বানী কোচ

সংবর্ধনা ও রাজসিক আয়োজনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাই যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেলকে। বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন ও ফুটবল ফেডারেশনকে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমাদের এই পথচলা আসলে অনেক দিনের। ২০১২ সালে প্রথমে আমাদের পরিবর্তনটা শুরু হয়েছিল। সেটার পরিপ্রেক্ষিতে সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে আজকের এ সাফল্য। আমরা একটা ভালো ফল করে এসেছি। আমাদের এখন চিন্তা হচ্ছে সামনের দিকে কীভাবে আরও এগিয়ে যাওয়া যায়। জুনিয়র পর্যায়ে আমরা সফলতা পাচ্ছিলাম, কিন্তু সিনিয়র পর্যায়ে পাচ্ছিলাম না। আমাদের প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান সবার বিশ্বাস ছিল বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ মেয়েরা সফলতা এনে দেবে। আমাদের প্রেসিডেন্ট, চেয়ারম্যান, ডিরেক্টর সবাই আমাদের পুশ করেছেন হার্ড ওয়ার্ক করার জন্য। মেয়েরা হার্ড ওয়ার্ক করেছে বলেই আমরা এখন চ্যাম্পিয়ন।

সাবিনা খাতুন অধিনায়ক

এই ট্রফি সব মানুষের। গত চার-পাঁচ বছর ধরে একটা জায়গাতেই ছিলাম। দিনশেষে আমরা সফলতা পেয়েছি-এটাই আমাদের বড় প্রাপ্তি। কারণ, এরপর আর বলার অবকাশ থাকে না যে দেশের মানুষ ফুটবলের প্রতি কতটা আসক্ত এবং তারা কতটা ভালোবাসেন। ২০১২ সাল থেকে মেয়েদের ফুটবল ভালোভাবে চলছে এবং গত চার-পাঁচ বছরের যদি সাফল্য দেখেন, মেয়েদের পরিশ্রম দেখেন, সেটারই ফল আমরা পেয়েছি।

 

সানজিদা আক্তার

ভাবতে পারিনি ছাদখোলা বাসে আসব। অনেক ভালো লেগেছে। আমার স্ট্যাটাস যে এত ভাইরাল হবে, কখনো ভাবিনি। যদিও আমার ফ্যান-ফলোয়ার আছে। তাদের জন্য লিখেছি। আমার মনে হয়নি এতদূর এগিয়ে যাবে। আসলে আমি কেন, আমরা কেউ-ই কখনো ভাবতে পারিনি বাংলাদেশের মানুষ এত ভালোবেসে, আমাদের এভাবে বরণ করে নেবে। প্রায় সবারই এটা প্রথম অভিজ্ঞতা। দেখে অনেক ভালো লাগছে।

কৃষ্ণা রানি সরকার

আগে বয়সভিত্তিক দলের হয়ে শিরোপা জিতেছি। তখন এতটা আনন্দ হয়নি। কারণ সে সময় বয়সভিত্তিক দলে অনেক ট্রফিই আমরা জিতেছি। তবে সিনিয়র পর্যায়ে এই প্রথম। এত ভালো লাগা আর কখনো হয়নি। আসলে আমরা আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছি। সবার মনের মধ্যে শিরোপা জেতার একটি আকাঙ্ক্ষা ছিল। সেটার প্রতিফলন ঘটেছে নেপালে। এই শিরোপাকে আমি সবার ওপরে রাখব।

রুপনা চাকমা

এত বড় টুর্নামেন্টে আমরা চ্যাম্পিয়ন হব, আগে কল্পনাও করতে পারিনি। মনে হচ্ছে জীবনের বড় অর্জন পেয়ে গেছি। আমার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন। পুরো টুর্নামেন্টে ভালো খেলেই জিতেছি। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পোস্টের নিচে আমি অতন্দ্র প্রহরীর মতো আগলে ছিলাম। যা দেশকে বড় একটি সম্মান পেতে সহায়তা করেছে। চ্যাম্পিয়ন ট্রফির সঙ্গে টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপারের পুরস্কার পেয়ে আমি খুব খুশি।

আঁখি খাতুন

দেশের মানুষের ভালোবাসা আর স্নেহ আমাদের এই ট্রফি এনে দিয়েছে। আমরা দেশের জন্য খেলেছি। সাত দেশের মধ্যে সেরা হয়েছি। সবাইকে পরাজিত করেছি। সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হচ্ছে ডিফেন্ডার হিসাবে নিজের পজিশনকে অক্ষত রাখতে পেরেছি। এটাই আমার ক্যারিয়ারের সেরা পাওয়া। জীবনের সেরা জিনিস পেয়ে গেছি।

মাসুরা পারভীন

ফাইনালে আমি খুব বেশিক্ষণ খেলতে পারিনি, এটা ভেবে একটু খারাপ লেগেছিল। প্রত্যেকটি ম্যাচেই সুন্দর খেলা উপহার দিয়েছি। যার জন্য জয়গুলো সহজে পেয়েছি। প্রত্যেক বিভাগে সবাই নিজের কাজগুলো সুন্দর করে করেছে। তাই অধরা এ ট্রফি ধরা দিয়েছে। আমি গর্বিত এ দলের সদস্য হতে পেরে।

মনিকা চাকমা

আমরা সিনিয়র পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি, এটা গর্বের। শুরু থেকে শেষ, সব ম্যাচেই পরিকল্পনামাফিক খেলেছি আমরা। কোচ যেভাবে বলেছেন, সেভাবেই খেলেছি। তাই আমরা পেরেছি। আমাদের চাওয়া পূর্ণ হয়েছে। দেশের মানুষকে একটি শিরোপা উপহার দিতে পেরেছি। এর চেয়ে গর্বিত বিষয় আর কি হতে পারে।

মারিয়া মান্দা

দশরথের গ্যালারিজুড়েই ছিল নেপালের দর্শক। আমাদের সমর্থন করার মতো অনেক প্রবাসী দর্শক ছিলেন। আমরা তাদের শক্তিতে বলিয়ান হয়েই খেলেছি। আমাদের জিততে হবে এ মনোভাব ছিল। রেফারি শেষ বাঁশি বাজানোর সঙ্গে সঙ্গে সবাই কেঁদেছি। এটা ছিল আনন্দের কান্না। দেশকে কিছু এনে দেওয়ার আনন্দাশ্রু।

সিরাত জাহান স্বপ্না

এত্ত এত্ত দর্শক ছিল যে, অন্য কেউ হলে চাপে পড়ে যেত। কিন্তু আমরা চাপে পড়িনি। আমরা যে দিক দিয়ে খেলেছি সেদিক দিয়েই গোল পেয়েছি। আল্লাহ সহায় ছিলেন আমাদের প্রতি। তা ছাড়া গোলকিপিং, ডিফেন্ডিং, মিডফিল্ড, ফরোয়ার্ড-সব পজিশনেই সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করেছে। তাই তো একের পর এক জয় হাতের মুঠোয় ধরা দিয়েছে।

ঋতুপর্ণা চাকমা

আমার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন এটি। টুর্নামেন্টের বিভিন্ন পর্যায়ে গোল করেছি। যার একটি উৎসর্গ করেছিলাম আমার প্রয়াত ছোট ভাই পার্বণ চাকমাকে। গত জুনে ভাইকে হারিয়েছি। তাই শিরোপার জন্যই খেলেছিলাম। যাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি আমি দেশবাসীর সঙ্গে আমার ভাইকেও উৎসর্গ করতে পারি। ওপারে ভালো থাকিস ভাই।

শামসুন্নাহার সিনিয়র

দীর্ঘ ১২ বছরের অপেক্ষার অবসান হয়েছে আমাদের। বিশেষ করে সিনিয়র নারী দলের। আগে বয়সভিত্তিক দলগুলো শিরোপা জিতেছে একাধিকবার। দেশের মানুষ আনন্দে উদ্বেল হয়েছিলেন। এবার সেই উপলক্ষ্য এনে দিতে পেরে আমরাও গর্বিত। আমরা দেশের জন্য কিছু করতে পেরে সবাই খুশি।

নিলুফার ইয়াসমিন

সাফের ফাইনালে যখন আমরা খেলছিলাম, তখন হয়তো প্রত্যাশা করেছিলাম ট্রফি জিতব। জিতেছি। এরপর থেকে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে অনেকের অভিনন্দন পেয়েছি আমরা। শত শত, হাজার হাজার মানুষের অভিনন্দন পেয়েছি। কিন্তু দেশে এসে যা পেলাম তা আশাও করিনি আমি। এত সুন্দর আয়োজন হবে আমাদের নিয়ে তা কল্পনাতেও ছিল না আমার।

শামসুন্নাহার জুনিয়র

অন্য ম্যাচের কথা আমার মনে নেই। ফাইনালে সিরাত জাহান স্বপ্নাকে উঠিয়ে যখন আমাকে নামানো হলো, তখন বুঝে গিয়েছিলাম স্যার (কোচ) আমার ওপর ভরসা করছেন। মাঠে নেমেই প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকি। শেষ পর্যন্ত গোলের দেখা পাই। দেশকে ট্রফি জেতানো দলের গর্বিত একজন সদস্য হতে পেরে আমি সৌভাগ্যবান।

শিউলি আজিম

আগে কখনো ভাবতেই পারিনি এত বড় অর্জন আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। নেপালে যখন গিয়েছিলাম, প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু খেলা শুরুর আগে এতটা ভালো খেলব তা আশা করিনি। আমরা সবাই অসাধারণ খেলেছি। নৈপুণ্য প্রদর্শন করে দেশকে ট্রফি এনে দিয়েছি। দেশের মানুষের ভালোবাসা আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে আগামীতে।

তহুরা খাতুন

অনুশীলনের সময় আমাদের গোলাম রব্বানী স্যার অনেক ধরনের পরিকল্পনার কথা জানাতেন। কীভাবে প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া যায়। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের কীভাবে ট্যাকল করা যায়। মাঠে আমরা সেভাবেই তাদের বিপক্ষে খেলেছি। শেষ পর্যন্ত ট্রফি নিয়ে দেশে এসেছি। এটাই সেরা অর্জন।

 

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন