শীতের গুড় তৈরিতে নারীদের কর্মযজ্ঞ
jugantor
শীতের গুড় তৈরিতে নারীদের কর্মযজ্ঞ

  গাজী মুনছুর আজিজ  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শীতের সকাল। বাড়ির এক কোণায় বসানো মাটির বড় চুলা। চুলার ওপর টিনের পাত্রে খেজুর রস। রস থেকে তৈরি হবে সুস্বাদু গুড়। রস জ্বাল দিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করছেন কয়েকজন নারী। এমন দৃশ্য চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে শীত এলেই দেখা মেলে। আর এ কাজে বছরের পর বছর যুক্ত আছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক নারীরা। এতে পরিবারে আসে বাড়তি আর্থিক গতি। প্রান্তিক নারীদের শ্রম, ঘামের বিনিময়ে তৈরি সুস্বাদু গুড় ছড়িয়ে পড়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। এমনকি বিদেশেও। মূলত স্বাদের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার খেজুর গুড়ের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে।

তবে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজটি অধিকাংশ সময় পুরুষরাই করে থাকেন। অন্যদিকে গুড় তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। সংসারের নানা কাজ সেরে তারা হাত লাগান গুড় তৈরির কাজে। খেজুর গুড়ের খোঁজে বের হলে এমন দৃশ্যেরই দেখা মেলে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে।

চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের এক বাড়িতে সকালে গিয়ে দেখা গেল চুলায় খেজুরের রস জ্বাল দিচ্ছেন কয়েকজন নারী। প্রায় দুই ফুট উঁচু মাটির চুলা। চুলাটি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন ফুট। প্রস্থ আড়াই ফুটের কাছাকাছি। আর তার ওপর টিনের পাত্র। পাত্রে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে খেজুর রস। চুলার মুখে বসে আগুন দিচ্ছেন একজন নারী। মাঝেমধ্যে উঠে কাঠি দিয়ে গুড় নাড়াচাড়া করছেন। তার নাম আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘বাড়ির সবাই মিলেই গুড় তৈরির কাজ করে থাকি। আসলে খেজুর রস সংগ্রহ করেন বাড়ির পুরুষরা। আর গুড় তৈরির কাজটা বাড়ির মেয়েরাই বেশি করে থাকেন। অবশ্য বাড়ির পুরুষরাও গুড় তৈরির কাজ করেন। আসলে আমরা বাড়ির বউ, ঝি, স্বামী-সন্তান সবাই মিলেই গুড় তৈরির কাজ করে থাকি। গুড় তৈরি হলে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করি। অনেক সময় বাড়ি এসেও অনেকে গুড় কেনেন। পাইকাররাও অনেক সময় বাড়ি থেকে এখানে এসে গুড় কিনে নিয়ে যান। আমরা ঝোলা গুড়, দানাদার গুড়, পাটালি গুড় তৈরি করি। এসব গুড় নানা দামে বিক্রি হয়। ভালো-মন্দ হিসাবে ৩০০ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয়।’ বলতে বলতে আছিয়া বেগম আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়েন গুড় তৈরির কাজে। এ যেন শত শত বছরের গ্রাম বাংলার নারীদের টিকে থাকার চির সংগ্রামের চিত্র।

আলমডাঙ্গা কলা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘শীতকালে আমাদের জেলার অতি পরিচিত একটি দৃশ্য হলো খেজুর গাছের রস সংগ্রহ। এ রস দিয়ে তৈরি হয় মজাদার খেজুর গুড়। আর খেজুর গুড় দিয়েই তৈরি হয় নানা স্বাদের পিঠা-পায়েস। রস সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুরুষদের বেশি দেখা গেলেও গুড় তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আসলে শীতকালে এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গুড় তৈরির দৃশ্য দেখা যায়। আর গুড় তৈরির ক্ষেত্রে বাড়ির নারীরাও এগিয়ে আসেন। নারীদের এ অংশগ্রহণ আবহমান কাল থেকে গ্রামবাংলার যেন এক চিরচেনা রূপ। নারীর এ অংশগ্রহণ পুরুষের লড়াইকে আরও বেশি সহজ করে তোলে। বাড়তি গতি আনে সংসারে।’

রাজধানীতে অনলাইনে খেজুরের গুড় ও রস বিক্রি করেন এমন এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম ছরোয়ার লিটন বলেন, ‘খেজুরের গুড়ের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। সেজন্য আমরা অনেক বছর ধরেই অনলাইনে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে আসছি। চুয়াডাঙ্গায় আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ হয়ে থাকে। আমরা দেখি গুড় তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির নারীরাও কাজ করে থাকেন সমান তালে। তাদের এ অংশগ্রহণ সমাজে নারীদের অবদানের একটি চির পরিচিত চিত্র। এটা এ অঞ্চলের পরিচিত দৃশ্য।’

পুরুষের পাশাপাশি নারীদের দক্ষ হাত খেজুর রসের গুড় তৈরিতে রীতিমতো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলে। আর এসব টুকরো টুকরো চিত্রই যেন বলে দেয়, সমাজে নারীর অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

শীতের গুড় তৈরিতে নারীদের কর্মযজ্ঞ

 গাজী মুনছুর আজিজ 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

শীতের সকাল। বাড়ির এক কোণায় বসানো মাটির বড় চুলা। চুলার ওপর টিনের পাত্রে খেজুর রস। রস থেকে তৈরি হবে সুস্বাদু গুড়। রস জ্বাল দিয়ে খেজুর গুড় তৈরি করছেন কয়েকজন নারী। এমন দৃশ্য চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে শীত এলেই দেখা মেলে। আর এ কাজে বছরের পর বছর যুক্ত আছেন এ অঞ্চলের প্রান্তিক নারীরা। এতে পরিবারে আসে বাড়তি আর্থিক গতি। প্রান্তিক নারীদের শ্রম, ঘামের বিনিময়ে তৈরি সুস্বাদু গুড় ছড়িয়ে পড়ে এক জেলা থেকে আরেক জেলায়। এমনকি বিদেশেও। মূলত স্বাদের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার খেজুর গুড়ের সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে।

তবে খেজুর গাছের রস সংগ্রহের কাজটি অধিকাংশ সময় পুরুষরাই করে থাকেন। অন্যদিকে গুড় তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও রয়েছে বড় ভূমিকা। সংসারের নানা কাজ সেরে তারা হাত লাগান গুড় তৈরির কাজে। খেজুর গুড়ের খোঁজে বের হলে এমন দৃশ্যেরই দেখা মেলে চুয়াডাঙ্গার বিভিন্ন গ্রামে।

চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জের এক বাড়িতে সকালে গিয়ে দেখা গেল চুলায় খেজুরের রস জ্বাল দিচ্ছেন কয়েকজন নারী। প্রায় দুই ফুট উঁচু মাটির চুলা। চুলাটি দৈর্ঘ্যে প্রায় তিন ফুট। প্রস্থ আড়াই ফুটের কাছাকাছি। আর তার ওপর টিনের পাত্র। পাত্রে জ্বাল দেওয়া হচ্ছে খেজুর রস। চুলার মুখে বসে আগুন দিচ্ছেন একজন নারী। মাঝেমধ্যে উঠে কাঠি দিয়ে গুড় নাড়াচাড়া করছেন। তার নাম আছিয়া বেগম। তিনি বলেন, ‘বাড়ির সবাই মিলেই গুড় তৈরির কাজ করে থাকি। আসলে খেজুর রস সংগ্রহ করেন বাড়ির পুরুষরা। আর গুড় তৈরির কাজটা বাড়ির মেয়েরাই বেশি করে থাকেন। অবশ্য বাড়ির পুরুষরাও গুড় তৈরির কাজ করেন। আসলে আমরা বাড়ির বউ, ঝি, স্বামী-সন্তান সবাই মিলেই গুড় তৈরির কাজ করে থাকি। গুড় তৈরি হলে স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করি। অনেক সময় বাড়ি এসেও অনেকে গুড় কেনেন। পাইকাররাও অনেক সময় বাড়ি থেকে এখানে এসে গুড় কিনে নিয়ে যান। আমরা ঝোলা গুড়, দানাদার গুড়, পাটালি গুড় তৈরি করি। এসব গুড় নানা দামে বিক্রি হয়। ভালো-মন্দ হিসাবে ৩০০ থেকে শুরু করে ৫০০ টাকা পর্যন্ত প্রতি কেজি গুড় বিক্রি হয়।’ বলতে বলতে আছিয়া বেগম আবারও ব্যস্ত হয়ে পড়েন গুড় তৈরির কাজে। এ যেন শত শত বছরের গ্রাম বাংলার নারীদের টিকে থাকার চির সংগ্রামের চিত্র।

আলমডাঙ্গা কলা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ইকবাল হোসাইন বলেন, ‘শীতকালে আমাদের জেলার অতি পরিচিত একটি দৃশ্য হলো খেজুর গাছের রস সংগ্রহ। এ রস দিয়ে তৈরি হয় মজাদার খেজুর গুড়। আর খেজুর গুড় দিয়েই তৈরি হয় নানা স্বাদের পিঠা-পায়েস। রস সংগ্রহের ক্ষেত্রে পুরুষদের বেশি দেখা গেলেও গুড় তৈরির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আসলে শীতকালে এখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই গুড় তৈরির দৃশ্য দেখা যায়। আর গুড় তৈরির ক্ষেত্রে বাড়ির নারীরাও এগিয়ে আসেন। নারীদের এ অংশগ্রহণ আবহমান কাল থেকে গ্রামবাংলার যেন এক চিরচেনা রূপ। নারীর এ অংশগ্রহণ পুরুষের লড়াইকে আরও বেশি সহজ করে তোলে। বাড়তি গতি আনে সংসারে।’

রাজধানীতে অনলাইনে খেজুরের গুড় ও রস বিক্রি করেন এমন এক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গোলাম ছরোয়ার লিটন বলেন, ‘খেজুরের গুড়ের জন্য চুয়াডাঙ্গা জেলার সুনাম রয়েছে দেশজুড়ে। সেজন্য আমরা অনেক বছর ধরেই অনলাইনে খেজুরের রস ও গুড় বিক্রি করে আসছি। চুয়াডাঙ্গায় আমাদের নিজস্ব তত্ত্বাবধানে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরির কাজ হয়ে থাকে। আমরা দেখি গুড় তৈরির ক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি বাড়ির নারীরাও কাজ করে থাকেন সমান তালে। তাদের এ অংশগ্রহণ সমাজে নারীদের অবদানের একটি চির পরিচিত চিত্র। এটা এ অঞ্চলের পরিচিত দৃশ্য।’

পুরুষের পাশাপাশি নারীদের দক্ষ হাত খেজুর রসের গুড় তৈরিতে রীতিমতো অপরিহার্য হয়ে উঠেছে এ অঞ্চলে। আর এসব টুকরো টুকরো চিত্রই যেন বলে দেয়, সমাজে নারীর অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন