দেশের প্রথম নারী আম্পায়ার জেসি
jugantor
দেশের প্রথম নারী আম্পায়ার জেসি

  ওমর ফারুক রুবেল  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০০৯ সালে ক্রিকেট আম্পায়ারিং কোর্স শুরু। ধাপে ধাপে নিজেকে পরিণত করেছেন। অবশেষে এক যুগ পর মিলল সেই স্বীকৃতি। দেশের প্রথম নারী আম্পায়ার হিসাবে নাম লিখিয়েছেন সাথিরা জাকির জেসি। এক যুগের বেশি সময় অপেক্ষা শেষে দেশে নারী আম্পায়ারের যাত্রা শুরু হয়েছে জেসির হাত ধরেই। শুধু তাই নয়, দেশের ৫১তম স্বাধীনতা দিবসে সাবেক পুরুষ ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজিত প্রীতি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই আম্পায়ারিং দিয়ে জেসির যাত্রা শুরু হয়। জেসি বলেন, ‘২০০৯ সালে জাতীয় দলে থাকতেই আমি, সালমা, পান্না থেকে শুরু করে সবাই কিন্তু মোটামুটি আম্পায়ারিং কোর্সটা করেছি। আজকে ২০২২ সালে এসে আমরা কাজ করার সুযোগ পেলাম বা শুরু করলাম।’

এক নারী ক্রিকেটারের টিকে থাকার লড়াই

উত্তরাঞ্চলীয় জেলা লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তার জন্ম। বাবা-মা চাইতেন মেয়ে ক্যাডেট কলেজে পড়বে। মেয়েও পড়াশোনায় বেশ ছিল। ফলে চাওয়া পাওয়ার হিসাব না মেলার কোনো কারণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার সচীন টেন্ডুলকারের নাম জানতেন জেসি। তবে প্রায়ই তিনি রেডিওতে চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফতের ক্রিকেট ধারাভাষ্যও শুনতেন। তখন থেকেই তার মনে স্বপ্ন উঁকি মারে টেন্ডুলকারের মতো ক্রিকেটার হওয়া। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? লালমনিরহাটের পাটগ্রামে জেসি যখন ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখতেন, তখন তার চারপাশে কেউ চিন্তা করেনি যে মেয়েরা ক্রিকেট খেলবে। ২০০১ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় দেশের একমাত্র ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) এসে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়া তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। জেসির কথায়, ‘আমি যখন আবেদন করলাম তখন আমার কার্ড আসেনি। কারণ বাংলাদেশে তখন মেয়েদের কোনো ক্রিকেট টিম ছিল না। সেজন্য বিকেএসপিতে মেয়েদের কোনো ক্রিকেট ছিল না। কিছুদিন অপেক্ষার পর যখন বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য কার্ড আসছিল না, তখন বাবাকে নিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে সাভারের বিকেএসপিতে যাই। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানাল মেয়েদের ক্রিকেট দল না থাকায় আমাকে ক্রিকেটের জন্য নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শারীরিক কিছু পরীক্ষার পর বিকেএসপির প্রশিক্ষকরা আমাকে পরামর্শ দিলেন, টেনিস কিংবা শুটিংয়ে ভর্তি হতে।’ তিনি যোগ করেন, ‘উপায় না দেখে তখন শুটিংয়ে ভর্তি হলাম। কিন্তু তার মন থাকত ছেলেদের ক্রিকেট খেলার মাঠে।’ এরপর ২০০৭ সালে ঢাকায় শুরু হলো মেয়েদের ক্রিকেটের হান্টিং। তখন সপ্তাহে একদিন তিনি ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। ২০০৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষার সময় জেসি জানতে পারেন, ঢাকায় মেয়েদের একটি ক্রিকেট লিগ শুরু হবে। তখন তিনি ঢাকা জেলা মহিলা ক্রিকেট দলে নাম লেখালেন। সে লিগে ভালোই পারফরম করেছিলেন জেসি। এরপর জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় তার। জেসির মা-বাবা চেয়েছিলেন তিনি যেন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। ২০১৬ সালে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। জেসি বলেন, আমার বিয়ে হওয়ার পর থেকে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে আমি আর ক্রিকেট খেলতে পারব না। একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সে ক্রিকেট খেলবে, এ বিষয়টি অনেকেই সহজভাবে নেয় না।’

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলে একজন ভারতীয় নারী কোচ এসেছিলেন। জেসির বিয়ের পর ওই নারী কোচ তাকে দল থেকে বাদ দেন। অজুহাত হিসাবে জেসির বিয়ের বিষয়টি সামনে এসেছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি জেসি। ভালো খেলা দেখিয়ে তিনি আবারও জাতীয় দলে ফিরে আসেন। বিয়ের পর এক সন্তানের জননী জেসি তার খেলা চালিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রিকেটের কোচ হিসাবে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় ক্রিকেট কোচিং এবং ক্রিকেটবিষয়ক অনুষ্ঠান করেন। ক্রিকেট মাঠের বাইরে গিয়েও উপস্থাপনা করছেন, ক্রিকেট বিশ্লেষণ করছেন, ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। এ ছাড়া কমেন্ট্রি বক্সেও ধারাভাষ্য দিয়েছেন ব্রেট লি, ব্রায়ান লারাদের মতো কিংবদন্তিদের পাশে বসে।

মা হওয়ার পর ফের লড়াই

মা হওয়ার পরও তার ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়াটাও ছিল এক নতুন বার্তা। কেননা বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে সেভাবে যত্ন নেওয়া হয়নি। তবুও নিজেই আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। মা হওয়ার পরও মনটা তার পড়ে থাকে মাঠে, যখন খেলা থাকে তখন আর কোনো কিছুতেই মনোযোগ যায় না। এমনকি ক্রিকেট খেলাটা চালিয়ে গিয়েছেন, পারফরম করেছেন। মেয়েদের ক্রিকেট আজ এতদূর আসার পেছনে তাই জেসিদের অবদানই সব থেকে বেশি।

জেসির ক্রিকেট ক্যারিয়ার

বাংলাদেশের হয়ে দুটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন জেসি। দুটি ওয়ানডে ম্যাচের দুই ইনিংসে মাত্র এক রান করেন। বোলিং হাতে দুই ম্যাচ খেললেও কোনো উইকেট পাননি।

ক্যারিয়ারে সাফল্য

বাংলাদেশ ২০১০ সালে চীনের গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের মহিলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় স্বাগতিক চীন জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রুপা পদক জেতেন। জেসি ওই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অন্যতম একজন সদস্য ছিলেন।

দেশের প্রথম নারী আম্পায়ার জেসি

 ওমর ফারুক রুবেল 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

২০০৯ সালে ক্রিকেট আম্পায়ারিং কোর্স শুরু। ধাপে ধাপে নিজেকে পরিণত করেছেন। অবশেষে এক যুগ পর মিলল সেই স্বীকৃতি। দেশের প্রথম নারী আম্পায়ার হিসাবে নাম লিখিয়েছেন সাথিরা জাকির জেসি। এক যুগের বেশি সময় অপেক্ষা শেষে দেশে নারী আম্পায়ারের যাত্রা শুরু হয়েছে জেসির হাত ধরেই। শুধু তাই নয়, দেশের ৫১তম স্বাধীনতা দিবসে সাবেক পুরুষ ক্রিকেটারদের নিয়ে আয়োজিত প্রীতি টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই আম্পায়ারিং দিয়ে জেসির যাত্রা শুরু হয়। জেসি বলেন, ‘২০০৯ সালে জাতীয় দলে থাকতেই আমি, সালমা, পান্না থেকে শুরু করে সবাই কিন্তু মোটামুটি আম্পায়ারিং কোর্সটা করেছি। আজকে ২০২২ সালে এসে আমরা কাজ করার সুযোগ পেলাম বা শুরু করলাম।’

এক নারী ক্রিকেটারের টিকে থাকার লড়াই

উত্তরাঞ্চলীয় জেলা লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তার জন্ম। বাবা-মা চাইতেন মেয়ে ক্যাডেট কলেজে পড়বে। মেয়েও পড়াশোনায় বেশ ছিল। ফলে চাওয়া পাওয়ার হিসাব না মেলার কোনো কারণ ছিল না। ছোটবেলা থেকেই বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটার সচীন টেন্ডুলকারের নাম জানতেন জেসি। তবে প্রায়ই তিনি রেডিওতে চৌধুরী জাফরুল্লাহ শরাফতের ক্রিকেট ধারাভাষ্যও শুনতেন। তখন থেকেই তার মনে স্বপ্ন উঁকি মারে টেন্ডুলকারের মতো ক্রিকেটার হওয়া। কিন্তু সেটা কীভাবে সম্ভব? লালমনিরহাটের পাটগ্রামে জেসি যখন ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন দেখতেন, তখন তার চারপাশে কেউ চিন্তা করেনি যে মেয়েরা ক্রিকেট খেলবে। ২০০১ সালে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় দেশের একমাত্র ক্রীড়াবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) এসে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়া তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। জেসির কথায়, ‘আমি যখন আবেদন করলাম তখন আমার কার্ড আসেনি। কারণ বাংলাদেশে তখন মেয়েদের কোনো ক্রিকেট টিম ছিল না। সেজন্য বিকেএসপিতে মেয়েদের কোনো ক্রিকেট ছিল না। কিছুদিন অপেক্ষার পর যখন বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য কার্ড আসছিল না, তখন বাবাকে নিয়ে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে সাভারের বিকেএসপিতে যাই। কিন্তু কর্তৃপক্ষ জানাল মেয়েদের ক্রিকেট দল না থাকায় আমাকে ক্রিকেটের জন্য নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শারীরিক কিছু পরীক্ষার পর বিকেএসপির প্রশিক্ষকরা আমাকে পরামর্শ দিলেন, টেনিস কিংবা শুটিংয়ে ভর্তি হতে।’ তিনি যোগ করেন, ‘উপায় না দেখে তখন শুটিংয়ে ভর্তি হলাম। কিন্তু তার মন থাকত ছেলেদের ক্রিকেট খেলার মাঠে।’ এরপর ২০০৭ সালে ঢাকায় শুরু হলো মেয়েদের ক্রিকেটের হান্টিং। তখন সপ্তাহে একদিন তিনি ছেলেদের সঙ্গে ক্রিকেট খেলতেন। ২০০৭ সালে এইচএসসি পরীক্ষার সময় জেসি জানতে পারেন, ঢাকায় মেয়েদের একটি ক্রিকেট লিগ শুরু হবে। তখন তিনি ঢাকা জেলা মহিলা ক্রিকেট দলে নাম লেখালেন। সে লিগে ভালোই পারফরম করেছিলেন জেসি। এরপর জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় তার। জেসির মা-বাবা চেয়েছিলেন তিনি যেন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন। ২০১৬ সালে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাশ করেন। জেসি বলেন, আমার বিয়ে হওয়ার পর থেকে অনেকেই ধারণা করেছিলেন যে আমি আর ক্রিকেট খেলতে পারব না। একটা মেয়ের বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর সে ক্রিকেট খেলবে, এ বিষয়টি অনেকেই সহজভাবে নেয় না।’

বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলে একজন ভারতীয় নারী কোচ এসেছিলেন। জেসির বিয়ের পর ওই নারী কোচ তাকে দল থেকে বাদ দেন। অজুহাত হিসাবে জেসির বিয়ের বিষয়টি সামনে এসেছিল। কিন্তু হাল ছাড়েননি জেসি। ভালো খেলা দেখিয়ে তিনি আবারও জাতীয় দলে ফিরে আসেন। বিয়ের পর এক সন্তানের জননী জেসি তার খেলা চালিয়ে গেছেন। একই সঙ্গে তিনি ক্রিকেটের কোচ হিসাবে প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থায় ক্রিকেট কোচিং এবং ক্রিকেটবিষয়ক অনুষ্ঠান করেন। ক্রিকেট মাঠের বাইরে গিয়েও উপস্থাপনা করছেন, ক্রিকেট বিশ্লেষণ করছেন, ধারাভাষ্য দিচ্ছেন। এ ছাড়া কমেন্ট্রি বক্সেও ধারাভাষ্য দিয়েছেন ব্রেট লি, ব্রায়ান লারাদের মতো কিংবদন্তিদের পাশে বসে।

মা হওয়ার পর ফের লড়াই

মা হওয়ার পরও তার ক্রিকেট খেলা চালিয়ে যাওয়াটাও ছিল এক নতুন বার্তা। কেননা বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) থেকে সেভাবে যত্ন নেওয়া হয়নি। তবুও নিজেই আবার সর্বোচ্চ পর্যায়ের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন। মা হওয়ার পরও মনটা তার পড়ে থাকে মাঠে, যখন খেলা থাকে তখন আর কোনো কিছুতেই মনোযোগ যায় না। এমনকি ক্রিকেট খেলাটা চালিয়ে গিয়েছেন, পারফরম করেছেন। মেয়েদের ক্রিকেট আজ এতদূর আসার পেছনে তাই জেসিদের অবদানই সব থেকে বেশি।

জেসির ক্রিকেট ক্যারিয়ার

বাংলাদেশের হয়ে দুটি স্বীকৃত আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি খেলেছেন জেসি। দুটি ওয়ানডে ম্যাচের দুই ইনিংসে মাত্র এক রান করেন। বোলিং হাতে দুই ম্যাচ খেললেও কোনো উইকেট পাননি।

ক্যারিয়ারে সাফল্য

বাংলাদেশ ২০১০ সালে চীনের গুয়াংজুতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান গেমসের মহিলা ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় স্বাগতিক চীন জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক রুপা পদক জেতেন। জেসি ওই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ক্রিকেট দলের অন্যতম একজন সদস্য ছিলেন।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন