মাতৃত্বপূর্ব আস্থার নাম ‘লিলি আপা’
jugantor
মাতৃত্বপূর্ব আস্থার নাম ‘লিলি আপা’

  কাজী সুলতানুল আরেফিন  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারি করিয়ে আস্থা অর্জন করেছেন স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি। তিনি উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত। গত আট বছরে প্রায় ৭৩৫ প্রসূতির নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন লিলি। এতে ক্লিনিকটিতে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে আস্থা বেড়েছে বহুগুণ।

সরেজমিন ক্লিনিকটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মী লিলি রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন অনেক মা। গর্ভবতী মায়েদের পরামর্শ দিচ্ছেন। যাদের ওষুধ প্রয়োজন, তাদের ওষুধ দিচ্ছেন। ১৯৯৮ সালে বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে কাজিপাড়া গ্রামে ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জমি দিয়েছিলেন স্থানীয় রমিনা খাতুন। এ ক্লিনিকটি থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার আর জেলা আধুনিক সদর হাসপাতাল ৩৫ কিলোমিটার। গর্ভবতী মায়েদের প্রসবব্যথা উঠলেই ছুটে আসেন মেহেরুন নেহার লিলির কাছে। এতে হাতের নাগালে নরমাল ডেলিভারি করতে পেরে যেমন অর্থ বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় শহরের হাসপাতালগুলোতে যেতে হচ্ছে না। গ্রামের নারীদের কাছে ‘লিলি আপা’ হিসাবে পরিচিত এ স্বাস্থ্যকর্মী।

জানা গেছে, ২০১১ সালে মেহেরুন নেহার লিলি কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হিসাবে চাকরিতে যোগ দেন। যোগদানের পর তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন প্রাথমিক চিকিৎসা। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৫ সালে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শুরু করেন নরমাল ডেলিভারি কার্যক্রম।

প্রথম ডেলিভারির কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে। মাত্র এক ঘণ্টার চেষ্টায় সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে স্বাভাবিক বাচ্চা প্রসবের পর থেকেই তার কাজের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষ খুঁজে পায় আস্থার নতুন ঠিকানা। আট বছরে প্রায় ৭০০ নরমাল ডেলিভারি করিয়ে হয়ে উঠেছেন আস্থার প্রতীক। এ কারণে ক্লিনিকটি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ক্লিনিক হিসাবে পুরস্কারও লাভ করেছে।

স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি বলেন, ‘প্রথম প্রথম আমার প্রচণ্ড ভয় লাগত। ভাবতাম আমার দ্বারা এ জটিল কাজ কীভাবে সম্ভব হবে! ফরিদা আক্তার নামে এক নারীর প্রথম ডেলিভারি সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে আমার সাহস বেড়ে যায়। কনকনে শীতে অথবা বৃষ্টিতে ভিজে, সারা রাত পরিশ্রম করে যখন একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভ থেকে ফুটফুটে সুস্থ সন্তান দুনিয়াতে আসত, তখন ভুলে যেতাম সব কষ্ট। আমার নিকটাত্মীয় অনেকের ডেলিভারি করিয়েছি, যেটা আমার ভালোলাগা ও প্রাপ্তি। আমার এ অসাধ্য কাজে সার্বিক পরামর্শসহ সাহস জুগিয়েছেন তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. পীতাম্বর রায়, এইচআই শরীফ উদ্দিন, এএইচআই জমির উদ্দিন এবং এইচএ দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যারা সিজার করাতে পারেন না, তারা খুব সহজে নরমাল ডেলিভারি করাতে আমার কাছে আস্থা নিয়ে আসছেন। এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। প্রতিটি শিশু ও মা সুস্থ রয়েছেন। এখন রাতে-দিনে সমস্যা হলেই ডাক পড়ে। রোগীরা সরাসরি কিংবা মুঠোফোনে সমস্যার কথা বলছেন। তাদের সেবা করতে পেরে ভালো লাগে।

মাতৃত্বপূর্ব আস্থার নাম ‘লিলি আপা’

 কাজী সুলতানুল আরেফিন 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে গর্ভবতী মায়েদের নরমাল ডেলিভারি করিয়ে আস্থা অর্জন করেছেন স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি। তিনি উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের কাজিপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে কর্মরত। গত আট বছরে প্রায় ৭৩৫ প্রসূতির নরমাল ডেলিভারি করিয়েছেন লিলি। এতে ক্লিনিকটিতে স্বাভাবিক সন্তান প্রসবে আস্থা বেড়েছে বহুগুণ।

সরেজমিন ক্লিনিকটিতে গিয়ে দেখা যায়, স্বাস্থ্যকর্মী লিলি রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন। শিশুদের নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছেন অনেক মা। গর্ভবতী মায়েদের পরামর্শ দিচ্ছেন। যাদের ওষুধ প্রয়োজন, তাদের ওষুধ দিচ্ছেন। ১৯৯৮ সালে বুড়াবুড়ি ইউনিয়নে কাজিপাড়া গ্রামে ক্লিনিকটি প্রতিষ্ঠিত হয়। জমি দিয়েছিলেন স্থানীয় রমিনা খাতুন। এ ক্লিনিকটি থেকে তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার আর জেলা আধুনিক সদর হাসপাতাল ৩৫ কিলোমিটার। গর্ভবতী মায়েদের প্রসবব্যথা উঠলেই ছুটে আসেন মেহেরুন নেহার লিলির কাছে। এতে হাতের নাগালে নরমাল ডেলিভারি করতে পেরে যেমন অর্থ বেঁচে যাচ্ছে, তেমনি দোরগোড়ায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ায় শহরের হাসপাতালগুলোতে যেতে হচ্ছে না। গ্রামের নারীদের কাছে ‘লিলি আপা’ হিসাবে পরিচিত এ স্বাস্থ্যকর্মী।

জানা গেছে, ২০১১ সালে মেহেরুন নেহার লিলি কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হিসাবে চাকরিতে যোগ দেন। যোগদানের পর তেঁতুলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে প্রাথমিক চিকিৎসার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন প্রাথমিক চিকিৎসা। ২০১৪ সালে ঠাকুরগাঁও সদর হাসপাতালে কমিউনিটি স্কিল বার্থ অ্যাটেনডেন্ট (সিএসবিএ) বিষয়ে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১৫ সালে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শুরু করেন নরমাল ডেলিভারি কার্যক্রম।

প্রথম ডেলিভারির কাজটি করেছিলেন অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে। মাত্র এক ঘণ্টার চেষ্টায় সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে স্বাভাবিক বাচ্চা প্রসবের পর থেকেই তার কাজের প্রশংসা ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে। হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষ খুঁজে পায় আস্থার নতুন ঠিকানা। আট বছরে প্রায় ৭০০ নরমাল ডেলিভারি করিয়ে হয়ে উঠেছেন আস্থার প্রতীক। এ কারণে ক্লিনিকটি উপজেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ ক্লিনিক হিসাবে পুরস্কারও লাভ করেছে।

স্বাস্থ্যকর্মী মেহেরুন নেহার লিলি বলেন, ‘প্রথম প্রথম আমার প্রচণ্ড ভয় লাগত। ভাবতাম আমার দ্বারা এ জটিল কাজ কীভাবে সম্ভব হবে! ফরিদা আক্তার নামে এক নারীর প্রথম ডেলিভারি সম্পন্ন হওয়ার পর থেকে আমার সাহস বেড়ে যায়। কনকনে শীতে অথবা বৃষ্টিতে ভিজে, সারা রাত পরিশ্রম করে যখন একজন গর্ভবতী মায়ের গর্ভ থেকে ফুটফুটে সুস্থ সন্তান দুনিয়াতে আসত, তখন ভুলে যেতাম সব কষ্ট। আমার নিকটাত্মীয় অনেকের ডেলিভারি করিয়েছি, যেটা আমার ভালোলাগা ও প্রাপ্তি। আমার এ অসাধ্য কাজে সার্বিক পরামর্শসহ সাহস জুগিয়েছেন তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. পীতাম্বর রায়, এইচআই শরীফ উদ্দিন, এএইচআই জমির উদ্দিন এবং এইচএ দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকেই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এখানকার হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত মানুষ যারা সিজার করাতে পারেন না, তারা খুব সহজে নরমাল ডেলিভারি করাতে আমার কাছে আস্থা নিয়ে আসছেন। এখন পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। প্রতিটি শিশু ও মা সুস্থ রয়েছেন। এখন রাতে-দিনে সমস্যা হলেই ডাক পড়ে। রোগীরা সরাসরি কিংবা মুঠোফোনে সমস্যার কথা বলছেন। তাদের সেবা করতে পেরে ভালো লাগে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন