ফাতেমার পণ্য যাচ্ছে ছয় দেশে
jugantor
ফাতেমার পণ্য যাচ্ছে ছয় দেশে

  এটিএম সামসুজ্জোহা  

০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নীরবে যে নারীরা আলো জ্বেলে যান সমাজে, তাদের সাফল্যের ভিডিও ভাইরাল হয় না, নেই তাদের লক্ষ লক্ষ ফ্যান-ফলোয়ার। তবু তারা বাঁচেন প্রেরণা দিতে। প্রচারহীন সেসব নারীর একজন ফাতেমা খাতুন। সংগ্রামী ও আত্মপ্রত্যয়ী এ নারী অতিসাধারণ হয়েও তিনি এখন অসাধারণ। যার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অজপাড়াগাঁয়ের কয়েকশ পরিবারের নারী সদস্য। পুরুষও কাজ করে তার কারখানায়।

গ্রামে স্কুল ছিল না। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে স্কুল। পাড়া-পড়শি কেউ যেত না ওই স্কুলে। সঙ্গীর অভাবে ফাতেমারও স্কুল যাওয়া হয়নি। পরিবারে তিনি সবার বড়। তার দুই ভাইয়েরও পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। তের-চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়। স্বামীর সংসারেও অবস্থা ভালো ছিল না। বিয়ের দুই বছরের মাথায় পুত্রসন্তানের মা হন ফাতেমা। এরপর আরেক পুত্রসন্তান জন্ম দেন। সংসারের সদস্য বেড়ে যাওয়ায় চারদিক থেকে ঘিরে ধরে অভাব-অনটন। দম ফেলতে পারছিলেন না স্বামী বাবুল হক। তাই চোরাইপথে কাজের সন্ধানে ভারতে যান ফাতেমার স্বামী। সেটি ছিল ১৯৯১ সাল। ভারতের পাঞ্জাবে গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ করেন বাবুল। আড়াই বছর পর পনের হাজার টাকা নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। ওই টাকা দিয়ে শুরু করেন মুদিদোকান। কিছুদিন ভালোই চলছিল তাদের সংসার, কিন্তু মুদিদোকানে বাকি পড়ায় ধীরে ধীরে পুঁজি শেষ হয়ে যায়। তারপরও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা। আর এর সবটুকুই সম্ভব হয়েছে ফাতেমার দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের ফলে।

তবে পথ দেখিয়েছে স্থানীয় এক এনজিও। সামান্য কিছু পুঁজি আর এ এনজিওর ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় ফাতেমার নতুন পথচলা। চারটি মেশিন কিনে বাড়িতেই স্থাপন করেন পা মোছার পাপোশ তৈরির কারখানা। আর এভাবেই ফাতেমা হয়ে ওঠেন সাহসী এক নারী উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা হিসাবে অনন্য ভূমিকা রাখায় জাতীয়ভাবে পুরস্কৃতও হয়েছেন তিনি। ২০০৪ সালে শুরু করা ক্ষুদ্র এ শিল্পটি কালের পরিক্রমায় বর্তমানে বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। ফাতেমার এখন দুটি কারখানা। চারটি মেশিন থেকে ষাটটি মেশিন হয়েছে। খুব অল্প সময়ে তার উৎপাদিত পাপোশের কদর বাড়ে। দেশ ও দেশের বাইরে বিক্রি হচ্ছে তার বানানো পাপোশ। প্রতি ছয় মাস পরপর সাত-আট লাখ টাকার অর্ডার আসে রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, জার্মানি, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

এক সময় ফাতেমা নিজেই এ কাজ করতেন। এখন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন শ্রমিকদের। সঙ্গে করছেন কারখানা তদারকি। তার স্বামী কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাতের কাজ করছেন। তার কারখানায় কাজ করছে দুইশত নারী ও পুরুষ। তার মধ্যে শিক্ষার্থীও রয়েছে। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন তৈরি হয় কমপক্ষে তিন হাজার পাপোশ, টেবিল ম্যাট ও দেয়ালম্যাটসহ বাহারি পণ্য। আর এ পণ্য বিক্রির টাকায় চলে ওইসব খেটে খাওয়া শ্রমিকের সংসার। চলে অনেকের পড়াশোনার খরচ। দৈনিক আয় করেন তারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

জেলা শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত শহর রানীশংকৈল উপজেলা। এ উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কাদিহাট জোতপাড়া গ্রামে ফাতেমার কারখানা। ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাসসহ দেশের অনেক গুণিজন ফাতেমার কারখানা পরিদর্শন করে বিস্ময় প্রকাশ করেন। জীবনসংগ্রামের কঠিন সময় পার করে পরিবারটি এখন খুশির আনন্দে ভাসছে। ফাতেমার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক নারীই এখন স্বপ্ন দেখছেন স্বাবলম্বী হওয়ার।

ফাতেমা বলেন, ‘করোনায় দেশের গার্মেন্ট শিল্পগুলো প্রণোদনা পেলেও সেই সুবিধা আমরা পাইনি। শত বাধা ডিঙ্গিয়ে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। সুতা ও ঝুটের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবে কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই স্বল্পসুদে ঋণ পেলে এ শিল্পে যুক্ত হয়ে বেকারত্ব ঘুচবে অনেকের। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি উৎসাহ পাবেন তারা।’

ফাতেমার পণ্য যাচ্ছে ছয় দেশে

 এটিএম সামসুজ্জোহা 
০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নীরবে যে নারীরা আলো জ্বেলে যান সমাজে, তাদের সাফল্যের ভিডিও ভাইরাল হয় না, নেই তাদের লক্ষ লক্ষ ফ্যান-ফলোয়ার। তবু তারা বাঁচেন প্রেরণা দিতে। প্রচারহীন সেসব নারীর একজন ফাতেমা খাতুন। সংগ্রামী ও আত্মপ্রত্যয়ী এ নারী অতিসাধারণ হয়েও তিনি এখন অসাধারণ। যার হাত ধরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের অজপাড়াগাঁয়ের কয়েকশ পরিবারের নারী সদস্য। পুরুষও কাজ করে তার কারখানায়।

গ্রামে স্কুল ছিল না। বাড়ি থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে স্কুল। পাড়া-পড়শি কেউ যেত না ওই স্কুলে। সঙ্গীর অভাবে ফাতেমারও স্কুল যাওয়া হয়নি। পরিবারে তিনি সবার বড়। তার দুই ভাইয়েরও পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। তের-চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে হয়। স্বামীর সংসারেও অবস্থা ভালো ছিল না। বিয়ের দুই বছরের মাথায় পুত্রসন্তানের মা হন ফাতেমা। এরপর আরেক পুত্রসন্তান জন্ম দেন। সংসারের সদস্য বেড়ে যাওয়ায় চারদিক থেকে ঘিরে ধরে অভাব-অনটন। দম ফেলতে পারছিলেন না স্বামী বাবুল হক। তাই চোরাইপথে কাজের সন্ধানে ভারতে যান ফাতেমার স্বামী। সেটি ছিল ১৯৯১ সাল। ভারতের পাঞ্জাবে গার্মেন্টস শ্রমিকের কাজ করেন বাবুল। আড়াই বছর পর পনের হাজার টাকা নিয়ে তিনি বাড়ি ফেরেন। ওই টাকা দিয়ে শুরু করেন মুদিদোকান। কিছুদিন ভালোই চলছিল তাদের সংসার, কিন্তু মুদিদোকানে বাকি পড়ায় ধীরে ধীরে পুঁজি শেষ হয়ে যায়। তারপরও ঘুরে দাঁড়িয়েছেন, সংসারে এনেছেন সচ্ছলতা। আর এর সবটুকুই সম্ভব হয়েছে ফাতেমার দৃঢ় মনোবল ও আত্মবিশ্বাসের ফলে।

তবে পথ দেখিয়েছে স্থানীয় এক এনজিও। সামান্য কিছু পুঁজি আর এ এনজিওর ৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে শুরু হয় ফাতেমার নতুন পথচলা। চারটি মেশিন কিনে বাড়িতেই স্থাপন করেন পা মোছার পাপোশ তৈরির কারখানা। আর এভাবেই ফাতেমা হয়ে ওঠেন সাহসী এক নারী উদ্যোক্তা। উদ্যোক্তা হিসাবে অনন্য ভূমিকা রাখায় জাতীয়ভাবে পুরস্কৃতও হয়েছেন তিনি। ২০০৪ সালে শুরু করা ক্ষুদ্র এ শিল্পটি কালের পরিক্রমায় বর্তমানে বৃহৎ আকার ধারণ করেছে। ফাতেমার এখন দুটি কারখানা। চারটি মেশিন থেকে ষাটটি মেশিন হয়েছে। খুব অল্প সময়ে তার উৎপাদিত পাপোশের কদর বাড়ে। দেশ ও দেশের বাইরে বিক্রি হচ্ছে তার বানানো পাপোশ। প্রতি ছয় মাস পরপর সাত-আট লাখ টাকার অর্ডার আসে রাশিয়া, ইউক্রেন, পোল্যান্ড, জার্মানি, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে।

এক সময় ফাতেমা নিজেই এ কাজ করতেন। এখন প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন শ্রমিকদের। সঙ্গে করছেন কারখানা তদারকি। তার স্বামী কাঁচামাল সংগ্রহ ও বাজারজাতের কাজ করছেন। তার কারখানায় কাজ করছে দুইশত নারী ও পুরুষ। তার মধ্যে শিক্ষার্থীও রয়েছে। সবার অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রতিদিন তৈরি হয় কমপক্ষে তিন হাজার পাপোশ, টেবিল ম্যাট ও দেয়ালম্যাটসহ বাহারি পণ্য। আর এ পণ্য বিক্রির টাকায় চলে ওইসব খেটে খাওয়া শ্রমিকের সংসার। চলে অনেকের পড়াশোনার খরচ। দৈনিক আয় করেন তারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা।

জেলা শহর থেকে প্রায় ৪২ কিলোমিটার দূরে সীমান্ত শহর রানীশংকৈল উপজেলা। এ উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের পশ্চিম কাদিহাট জোতপাড়া গ্রামে ফাতেমার কারখানা। ঠাকুরগাঁও জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মুকেশ চন্দ্র বিশ্বাসসহ দেশের অনেক গুণিজন ফাতেমার কারখানা পরিদর্শন করে বিস্ময় প্রকাশ করেন। জীবনসংগ্রামের কঠিন সময় পার করে পরিবারটি এখন খুশির আনন্দে ভাসছে। ফাতেমার সাফল্য দেখে এলাকার অনেক নারীই এখন স্বপ্ন দেখছেন স্বাবলম্বী হওয়ার।

ফাতেমা বলেন, ‘করোনায় দেশের গার্মেন্ট শিল্পগুলো প্রণোদনা পেলেও সেই সুবিধা আমরা পাইনি। শত বাধা ডিঙ্গিয়ে আমরা উঠে দাঁড়িয়েছি। সুতা ও ঝুটের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় কিছুটা কষ্ট হচ্ছে। তবে কোনো বিড়ম্বনা ছাড়াই স্বল্পসুদে ঋণ পেলে এ শিল্পে যুক্ত হয়ে বেকারত্ব ঘুচবে অনেকের। নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টির পাশাপাশি উৎসাহ পাবেন তারা।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন