একজন গুলশান ই ইয়াসমীন

গুলশান ই ইয়াসমীন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবাধ বিচরণ। একাধারে তিনি কবি, লেখক, গীতিকার, সঙ্গীতশিল্পী, চিত্রশিল্পী ও সমাজকর্মী। লিখেছেন- রীতা ভৌমিক আলোকচিত্রী শরিফ মাহমুদ

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

‘মাগো আমায় যেতে দাও/ চাঁদ মামার দেশে’। গুলশান ই ইয়াসমীন মাত্র ছয় বছর বয়সে এই ছড়াটি লিখে বুক পোস্টে পাঠিয়ে দেন দৈনিক সংবাদের ‘আসর সন্দেশ’ এ। কিছুদিনের মধ্যেই তা প্রকাশ হয়। সেই থেকে লেখালেখির শুরু তার। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। শৈশবে ছবি আঁকার প্রতিও তার প্রচণ্ড ঝোঁক ছিল। যে কোনো জিনিস দেখেই এঁকে ফেলতেন।

গুলশান ই ইয়াসমীনের জন্ম ১৯৫৭ সালের ১৪ আগস্ট। বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলার করতোয়া হাউসের বিখ্যাত খন্দকার পরিবারে। বাবা খন্দকার হায়দার আলী রাজশাহীর রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। তার বাবা ভারতের শিবপুর ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনির্ভাসিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেন। মা হোসনে আরা লেডি ব্রের্বোণ স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করেন। আট ভাইবোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। বাবার কাছেই তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। মামার বাড়ি থেকে তাদের বাড়ির দুরত্ব ছিল মাত্র এক কিলোমিটার। মামার বাড়িতে থাকতেন ওস্তাদ ইসমাইল হোসেন খান। ছেলেবেলায় ওস্তাদজি তাকে পড়াতেন। তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় বগুড়ার বিএম স্কুলে। এখানে তিনি পঞ্চম শ্রেণীতে ভর্তি হন। এ স্কুলে তার গানে হাতেখড়ি হয় সঙ্গীত শিক্ষক শিবেন কুণ্ডুর কাছে। বগুড়ার করতোয়া খেলাঘর আসরে নিয়মিত গণসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীতের চর্চা করতেন। বগুড়ার সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে গণিতে লেটারসহ মেট্রিক পাস করেন । বগুড়া আজিযুল হক কলেজ থেকে প্রি-মেডিক্যাল পাস করেন। পড়াশোনার জন্য ১৯৭৬ সালে তিনি বড় ভাই প্রকৌশলী খন্দকার আজাদুর রহমানের সঙ্গে ঢাকায় আসেন। ভর্তি হন ইডেন মহিলা কলেজে। পড়াকালীন সময়ে ১৯৭৮ সালে প্রকৌশলী হুমায়ুন রশীদের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামীর সহযোগিতায় লেখাপড়া, ছবি আঁকা, গান সমান তালে চালিয়ে যান।

এ প্রসঙ্গে গুলশান ই ইয়াসমীন বলেন, পারিবারিক সহযোগিতা না পেলে আমার এ পথ চলা মসৃণ হতো না। বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী এবং তিন মেয়ে দিতান, জিসান আর জাহারা’র সহযোগিতা, অনুপ্রেরণায় আমি চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী, লেখক ও একজন গীতিকার হিসেবে নিজের জায়গা করতে পেরেছি। একজন নারীর সামনের দিকে এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে পরিবারের সবার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।

গুলশান ই ইয়াসমীন ইডেন মহিলা কলেজ থেকে বিএসসি পাস করেন। এ বছরই ঢাকার গুলশানের একটি বাড়িতে তার প্রথম চিত্র প্রদর্শনী হয়। এরপর ১৯৮৬ ও ’৮৭ সালে চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমি এবং ১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে চিত্র প্রদর্শনী হয়। দেশের বাইরে জাপানে তার একক চিত্র প্রদর্শনী হয়। উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে বাংলায় এমএ পাস করেন। শান্তা মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি থেকে ২০১৪ সালে গর্ভনমেন্ট অ্যান্ড পলিটিক্সি প্রোগামে এমএসএস এ গোল্ড মেডেল পান।

পড়াশোনা, ছবি আঁকা ও সঙ্গীতের প্রতি অদম্য আগ্রহই তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী অজয় রায়ের কাছে সঙ্গীতে বছর চারেক তালিম নেন। এছাড়া নজরুল সঙ্গীত শিল্পী সুধীন দাশ, আলতাফ হোসেন, হাফিজুর রহমান, ভারতের প্রখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী মায়া সেন, মৃণাল বন্দোপাধ্যায়ের কাছে সঙ্গীতে তালিম নেন। নিয়মিত রবীন্দ্র ও আধুনিক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে বিটিভি ও রেডিও’র তালিকাভুক্ত হন ১৯৮৬ সালে। পাশাপাশি ছবি আঁকাও চালিয়ে যান। ১৯৯৭ সালের ১২ জুন লন্ডনের সোয়ানলী বিশ্ববিদ্যালয়ে একক চিত্র প্রদর্শনীতে অংশ নেন। ‘সত্যসুন্দর’, ‘গানগুলি মোর’, ‘স্বপন পাড়ের ডাক শুনেছি’ ও ‘সত্যমঙ্গল’ শিরোনামে ১৯৯৪ সালে ভারতের কলকাতার আটলান্টিক মিউজিক থেকে চার ভলিউমের রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি অ্যালবাম বের হয়। ‘দিয়াশলাই’, ‘রানার’ নামে দুটি আধুনিক গানের ক্যাসেট বের হয়েছে।

শিশুদের সংস্কৃতিমনা হিসেবে গড়ে তুলতে ঢাকার মোহাম্মদপুরের একটি ভাড়া বাড়িতে ‘জীয়ন কাঠি একাডেমী’ নামে নাচ, গান, কবিতা আবৃত্তি, কেরাত, চিত্রাংকন ইত্যাদি বিষয় শেখানোর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান খোলেন। এ প্রতিষ্ঠানটি চিলড্রেন অ্যান্ড ওমেন ভিশন ফাউন্ডেশন নামে শিশুদের প্রতিভা মূল্যায়নের কার্যক্রম চলমান রেখেছে।

তার বইয়ের সংখ্যা ৫০ এর উপরে। এসব বইয়ের মধ্যে রয়েছে কবিতা গ্রন্থ, শিশু-কিশোর সায়েন্স ফিকশন, প্রবন্ধ, ছড়া ইত্যাদি। সাড়ে চারশ কবিতা নিয়ে ‘কবিতা সমগ্র’ বের হয়েছে ২০১৪ সালে। তার উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে ছড়ার বই ‘হাডুডু’, সায়েন্স ফিকশন ‘কানা মামার ভূত’, বিজ্ঞানের ‘হিংটি’, ‘বিজ্ঞানী ফুসিল’, ‘চিন্তা বুড়ি’, ‘হিরো থেকে জিরো’, ‘ওয়ার্ডস অব সাইলেন্স’ ইত্যাদি।

সঙ্গীতে অবদানের জন্য ১৯৯৪ সালে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত ও চিত্রশিল্পী হিসেবে খুলনা সড়ক ও জনপথ মহিলা ক্লাব থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার সাংবাদিক সংস্থা থেকে চিত্রশিল্পে এবং কণ্ঠ সঙ্গীতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৬ সালে পেয়েছেন মানবাধিকার স্বর্ণপদক। ১৯৯৭ সালেও এ সংস্থা তাকে সমাজসেবা এবং সঙ্গীতে অবদানের জন্য স্বর্ণপদক প্রদান করে। ১৯৯৮ সালের ২৯ জুলাই ভারতের আটলান্টিক মিউজিক কোম্পানি থেকে পেয়েছেন গোল্ডেন ডিস্ক পুরস্কার। আমেরিকার বায়োগ্রাফিকাল ইন্সটিটিউট থেকে ২০০০ সালে সঙ্গীত, চিত্রকলা ও লেখালেখির জন্য পেয়েছেন ‘ওম্যান অব দ্য ইয়ার টু থাউজেন্ড’ পুরস্কার। এছাড়া তিনি জেনেসিস নজরুল সম্মাননা পদক ২০০৩, ভাসানী স্মৃতি পুরস্কার ২০০৪, সমাজসেবায় বিশেষ অবদানের জন্য ন্যাশনাল টাইমস ফাউন্ডেশন পুরস্কার, স্বাধীনতা সংসদ থেকে সাহিত্যিক, কণ্ঠশিল্পী ও সমাজসেবা পুরস্কার লাভ করেন। পূবাইলে মীরেরবাজারে চামুরডাতে ২০১৭ সালের ১৩ মে তার নামে সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘কবি গুলশান ই ইয়াসমীন লেইন’। তার নামে এ সড়ক ফলক উন্মোচন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী।

একজন নারী হিসেবে তরুণ প্রজন্মের নারীদের নিয়েও ভাবেন তিনি। মেয়েদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান প্রতিবন্ধকতা নিরাপত্তাহীনতা। নিরাপদ আবাসনের অভাবে অনেক মেয়ের পক্ষেই গ্রাম থেকে শহরে এসে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। মেয়েদের নিরাপদ আবাসনের জন্য তিনি ঢাকার বসুন্ধরার ১নং রোডের ব্লক বি’র ২৭৬নং বাড়ির দোতলা-তিনতলায় খোলেন ছাত্রী হোস্টেল। তার হোস্টেলে নর্থ সাউথের কয়েকজন ছাত্রী রয়েছেন। সমাজসেবামূলক কাজেও সম্পৃক্ত রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে। চিলড্রেন অ্যান্ড ওমেন ভিশন ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি বৃদ্ধা, পরিত্যক্ত নারী ও অসচ্ছল নারীদের আর্থিক সহযোগিতার জন্য ভাতা প্রদান করেন। হেলথ ক্যাম্পিং, ওষুধ বিতরণ, শীত বস্ত্র, শাড়ি, লুঙ্গি বিতরণসহ বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কাজও করেন।