লাকপারি পর্বতের চূড়ায় শায়লা

মাস দুয়েক আগে তিব্বতের লাকপারি অভিযান সম্পন্ন করেছেন শায়লা পারভীন। তার সহযাত্রী ছিলেন এভারেস্টজয়ী এমএ মুহিত ও কাজী বাহালুল মজনু। কেমন ছিল তাদের এই অভিযান। পর্বতারোহী শায়লা পারভীনের সঙ্গে কথা বলে লিখেছেন-শিল্পী নাগ

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেপালি সময় বেলা তিনটার দিকে লাকপারি পর্বতের চূড়ায় উঠলাম। সারা দিন এত কষ্ট হয়েছে চূড়ায় উঠে কোনো অনুভূতি কাজ করেনি আমার। মুহিত ভাই বাংলাদেশের পতাকা আর বিএসটিসি’র পতাকা ওড়ালেন। এভাবেই শায়লা পারভীন তিব্বতের লাকপারি অভিযানের অনুভূতি প্রকাশ করলেন।

তিব্বতের লাকপারি অভিযানের উদ্দেশ্যে শায়লা পারভীন যাত্রা করেন ২৯ এপ্রিল। প্রথমে ঢাকা থেকে নেপাল যান তিন পর্বতারোহী এভারেস্টজয়ী এমএ মুহিত, কাজী বাহালুল মজনু ও শায়লা পারভীন। নেপালে পৌঁছেই ৩০ এপ্রিল দু’জনে থামিল মার্কেট থেকে পর্বতারোহনের পোশাক কেনার পর্বটা সেরে ফেলেন। বাকি কেনাকাটা সারেন ২ মে। কারণ পর্বতের উচ্চতার উপর পর্বতারোহীর পোশাকের ধরনেরও পরিবর্তন হয়। কাজী বাহালুল আর শায়লা পারভীন দু’জনেরই ৬ হাজার মিটার উচ্চতার উপরে যাওয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। শায়লা পারভীন ও তার সহযাত্রীরা ২ মে ক্লাইম্বালয়া নামক স্থানে নেপালি এজেন্সির সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।

এ প্রসঙ্গে শায়লা পারভীন বলেন, নেপাল থেকে চীনের সীমান্তের দিকে আমরা যাত্রা করি ৩ মে। সন্ধ্যার দিকে গাড়িতে করে রসুয়াগারি নামক স্থানে পৌঁছি। ওখান থেকে চীনা সীমান্তের দূরত্ব ছিল দেড় কিলোমিটার। রাতটা ওখানে কাটিয়ে সকালে চীনা সীমান্ত পাড়ি দিলাম আমরা। চীনের কেরুং শহরে পৌঁছে হোটেলে উঠলাম। উদ্দেশ্য চীনের পরিবেশের সঙ্গে নিজেদের ভারসাম্য মেলানো। তাই শহরের পাশে টিলার মতো পাহাড়ে আমরা হাইট গেইনে গেলাম। রাতটা হোটেলে কাটিয়ে পরের দিন গাড়িতে তিংড়ি পৌঁছি। তিংড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে চীনা সময় দুপুর সাড়ে তিনটা বেজে যায়। তিংড়িতেও একদিন রইলাম পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য। এরি ফাঁকে আশপাশের পাহাড়ে হাইট গেইন করি। ৮ মে সকাল ৯টার দিকে তিংড়ি থেকে এভারেস্ট বেইস ক্যাম্পের দিকে যাত্রা শুরু করি আমরা। গাড়িতে বেইস ক্যাম্পে পৌঁছাতে আমাদের সময় লাগে সাড়ে তিন ঘণ্টা। ওখানে খেয়ে-দেয়ে বিশ্রাম নিই। এজেন্সি আগে থেকেই আমাদের খাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছিল। ওখানে অসংখ্য এভারেস্ট অভিযাত্রী ছিলেন। আমাদের এজেন্সির দশজন এভারেস্ট ক্লাইবারের সঙ্গে পরিচয় হল। তাদের কাছ থেকে নতুন নতুন গল্প শোনার সুযোগ হল। আমরা মাত্র তিনজন ছিলাম লাকপারি অভিযানের যাত্রী।

শায়লা সহযাত্রীদের সঙ্গে বেইসক্যাম্পে ১১ মে পর্যন্ত অবস্থান করেন পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার জন্য। ওখানে পৌঁছাতেই তাদের শরীরে আলস্য ভর করে। খাওয়া-দাওয়ার রুচিও কমে যায়। আশপাশটাও ঘুরে-ফিরে দেখেন ওরা। ১২ মে সকালে হেঁটে মিডল ক্যাম্পের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করেন। তাদের তিনজনের সঙ্গে ছিলেন একজন শেরপা। তাদের সবার কাঁধে ছয়-সাত কেজি ওজনের একটি ব্যাগ। দুই বোতল পানি, পোশাক, হালকা শুকনো খাবার, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। হাঁটতে হাঁটতে মিডল ক্যাম্পে পৌঁছান তারা। রাতটা ওখানে কাটিয়ে পরদিন হেঁটে অ্যাডভান্স বেইস ক্যাম্পের দিকে যাত্রা শুরু করেন। বিকাল সাড়ে চারটার দিকে অ্যাডভান্স বেইস ক্যাম্পে পৌঁছান। দুপুরের পর থেকে আবহাওয়া খুব খারাপ হতে থাকে। অল্প অল্প তুষারপাত হয়। ওরা নির্দিষ্ট তাঁবুতে উঠে রাতের খাবার খান। সেখানে আগে থেকেই খাবারের ব্যবস্থা ছিল। অ্যাডভান্স বেইস ক্যাম্পে ১৬ মে পর্যন্ত তারা অবস্থান করেন। হাইট গেইন করার জন্য একদিন শায়লা সহযাত্রীদের সঙ্গে এভারেস্টের ট্রাম্পন পয়েন্ট পর্যন্ত যান। ১৭ মে রাত আড়াইটায় তারা সামিটের দিকে যাত্রা করেন। ওদের সঙ্গে ছিলেন তিনজন শেরপা। সবাই মেইন রোপে ছিলেন। অর্থাৎ একটি রোপে সবাই বাঁধা ছিলেন।

শায়লার মতে, প্রথমে শেরপা, এরপর মুহিত ভাই, আমি। এরপর শেরপা, বাহালুল ভাই, শেরপা। এভাবে ক্রমান্বয়ে আমরা প্রথমে হালকা হালকা চড়াই উঠি। শেরপা সাবধানে এগুচ্ছিলেন। কেননা এ পথে অনেক লুকায়িত বরফের ফাটল ছিল। শেরপাকে অনুসরণ করে মুহিত ভাই এগিয়ে গেলেও আমি হঠাৎ লুকায়িত বরফের ফাটলে (হিডেনে) পড়ে যাই। সবাই আমাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যান। প্রধান শেরপা ফিরে এসে আমাকে টেনে উপরে তুলেন। ক্ষণিকের জন্য আমি ভয় পেয়ে যাই। এরপর সতর্কতার সঙ্গে হাঁটতে থাকি। যত এগুতে থাকি পথ খাড়া হতে থাকে। পথ খাড়া হওয়ায় শেরপা ফিক্সড রোপ বাঁধে। ফিক্সড রোপ ধরে ধীরে ধীরে উপরের দিকে এগুতে থাকি। এই পথটা কঠিন বরফে আবৃত ছিল। কোথাও কোথাও ব্লু আইস ছিল, কোথাও কোথাও লুকায়িত বরফের ফাটল ছিল। এভাবেই এগুতে এগুতে আইস পার্ট শেষ হয়। চূড়া থেকে আমরা অল্প কিছুটা নিচে। এর পরের অংশটা রক পার্ট। এই পথটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ছিল। একে তো রক পার্ট, আমাদের টার্ম প্রণ করে উঠতে হবে। তারপরে রকগুলো ছিল গুঁড়ো গুঁড়ো, ছোট ছোট খণ্ড। শেষের দিকে বিশ থেকে পঁচিশ মিটার পথ আবার বরফে আবৃত। নেপালি সময় বেলা তিনটার দিকে তিব্বতের লাকপারি পর্বতের চূড়ায় উঠলাম। আধ ঘণ্টার মতো সেখানে অবস্থান করে একইভাবে নিচে নেমে এলাম। এত লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে আমরা ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করি। হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল। রাত সাড়ে ৯টায় আমরা বেইস ক্যাম্পে পৌঁছি। প্রায় ১৮ ঘণ্টার লম্বা টেকিং শেষ হল।

 

 

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter