সচেতনতা বেড়েছে মেয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মেয়েশিক্ষার্থীদের স্যানিটেশন, পানি ও হাইজিন ব্যবস্থার উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৫ সালের ২৩ জুন একটি পরিপত্র জারি করে। পরিপত্রে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহের টয়লেট ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা উন্নতকরণ বাস্তবায়নে বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলোতে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনায় বাজেট বরাদ্দের পাশাপাশি ব্যাপক সচেতনতা প্রয়োজন। লিখেছেন রীতা ভৌমিক। আলোকচিত্রী আ.হ.ম ফয়সাল

  যুগান্তর ডেস্ক    ০৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নেত্রকোণার বাংলা ইউনিয়নের হবিবপুর গ্রাম। এ গ্রামেরই মেয়ে খাদিজা আক্তার। প্রতিদিন এক মাইল হেঁটে স্কুলে যায়। ও কৃষ্ণগোবিন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী। দুই বোন এক ভাইয়ের মধ্যে খাদিজা সবার ছোট। বড় বোন মহিলা মাদ্রাসার ছাত্রী। সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময়ে ওর প্রথম মাসিক হয়। প্রথম মাসিক হওয়ার কথা বলতে গিয়ে খাদিজা আক্তার বলেন, মাকে প্রথম জানাই। মা আমাকে নতুন সুতি কাপড় দেন মাসিককালীন সময়ে ব্যবহার করার জন্য। প্রথম প্রথম কয়েকমাস মাসিককালীন সময়ে স্কুলে যেতাম না। সহপাঠীদের সামনে যেতে লজ্জা করত। আমার সহপাঠীরাও আমার মতোই মাসিককালীন সময়ে স্কুলে আসত না। আরেকটি সমস্যা ছিল, তখন স্কুলে মাত্র দুটি বাথরুম ছিল। ছাত্রী সংখ্যা অনুযায়ী বাথরুমের সংখ্যা ছিল কম। তারপর বাথরুমে পানি ছিল না। তাই বাথরুম নোংরা থাকত। এই সমস্যার কারণেও মাসিককালীন সময়ে স্কুলে যেতাম না। আমাদের স্কুলে ২০১৭ সালে ঋতু স্টুডেন্ট ফোরাম গঠিত হয়। এর মাধ্যমে মাসিক সম্পর্কে খোলামেলা জানতে পারি। আমাদের স্কুলে এখন বাথরুমের সংখ্যা বেড়েছে। তবে ৫১৩ জন মেয়েশিক্ষার্থীর জন্য চারটি মাত্র বাথরুম। এখন বাথরুমে সবসময় পানি থাকে, সাবানের ব্যবস্থাও রয়েছে। বাথরুম পরিষ্কার থাকে। আমার শ্রেণীতে ৯২ জন মেয়েশিক্ষার্থী রয়েছে। এখন প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ মেয়ে মাসিককালীন সময়ে স্কুলে আসে। বেশিরভাগ মেয়ে স্যানিটারি প্যাড ব্যবহার করে। স্কুলে মেয়েশিক্ষার্থীরা নিয়মিত হওয়ায় তারা রেজাল্টও ভালো করছে। উপবৃত্তিও পাচ্ছে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্কুল-কলেজের মেয়েদের মধ্যে প্রজননস্বাস্থ্য, ঋতুকালীন সময়ে করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে প্রাথমিক ধারণা দেয়া হচ্ছে। যাতে মেয়েরা নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হয়। অন্যদের সচেতন করতে পারে।

এ প্রসঙ্গে বেসরকারি সংস্থা র্ডপ এর গবেষণা পরিচালক মোহাম্মদ যোবায়ের হাসান জানান, নেত্রকোণার হাওর এলাকায় স্বাস্থ্যবান্ধব বাথরুম করার জন্য ২০১৭ সালে আটটি উপজেলায় একটি জরিপ কাজ পরিচালনা করা হয়। স্কুলের বাথরুমের দরজা ঠিক আছে কিনা, পানি ও আলো-বাতাস রয়েছে কিনা এরকম কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়। শতকরা ৩২ শতাংশ শিক্ষার্থী বলেছে, তারা বাথরুম ব্যবহারে আস্থা পাচ্ছে না। শতকরা ৭৫ শতাংশ বলেছে প্যাড ব্যবহারের সুযোগ পায় না।

গুসি আন্তর্জাতিক শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও র্ডপ প্রতিষ্ঠাতা এএইচএম নোমান বলেন, র্ডপ ২০১৬ সালের জুলাই মাস থেকে নেত্রকোণার ৮টি উপজেলায় স্কুল পর্যায়ে মাসিক বা ঋতুকালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে ‘ঋতু’ প্রকল্পের বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ৮টি উপজেলায় নির্বাচিত ৮৯টি মাধ্যমিক স্কুলের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণীর প্রায় ১৭ হাজার ছাত্রীর পানি, স্যানিটেশন এবং হাইজিন অধিকার নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি স্কুলগামী ছাত্রীদের সঠিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন তথা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাথরুম ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার উন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জারিকৃত পরিপত্র ২০১৫ বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। প্রতিটি স্কুলে একজন শিক্ষককে দায়িত্ব দেয়া হবে। যে শিক্ষার্থীর স্যানিটারি প্যাড দরকার তিনি তাকে তা সরবরাহ করবেন।

ব্র্যাকের ম্যানেজার মেহজাবিন আহমেদের মতে, ব্র্যাকের স্বাস্থ্য সেবিকারা স্যানিটারি প্যাড স্কুলে পৌঁছে দেয়। কিন্তু মেয়েরা কিনতে আগ্রহী নয়।

নেত্রকোণা হাজী ফয়েজউদ্দিন আকন্দ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আজহারুল হকের মতে, পাঠ্যপুস্তকে প্রজননস্বাস্থ্য, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি অধ্যায়টা আগে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের না পড়িয়ে বলতেন বাড়িতে পড়ে নিবে। শিক্ষকদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করায় তাদের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে। এখন শিক্ষকরা মাসিক স্বাস্থ্যবিধি অধ্যায়টা মেয়েদের পড়াতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।

এ প্রসঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের (মাধ্যমিক) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মান্নান বলেন, সহজে শিক্ষার্থীদের প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে ধারণা দেয়ার জন্য প্রাইমারি কারিকুলামে প্রজননস্বাস্থ্য, হাইজিন ইত্যাদি বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তাসমিমা হোসেনও শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের প্রজননস্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলেন। তার মতে, সেক্টর পরিকল্পনা উন্নয়নে ২০১৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ ন্যাশনাল হাইজিন বেজলাইন সার্ভে অনুযায়ী প্রতি ১৮৭ জন শিক্ষার্থীর জন্য একটি বাথরুমের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও মাসিক সম্পর্কে জানাতে হবে। ছেলেমেয়ে উভয়কেই সচেতন করতে হবে।

এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান এমপি বলেন, শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে মেয়েশিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় বাথরুম নির্মাণ করা হচ্ছে। একদিকে স্বাস্থ্য সুরক্ষা অন্যদিকে বাথরুমের সমস্যার কারণে যাতে তারা স্কুল থেকে ঝরে না পড়ে। তবে গ্রামের স্কুলগুলোতে হাই কমোড না করে প্যান কমোড করা, বেসিনের ওপর আয়না বসানো দরকার নেই। কারণ এতে অর্থের অপচয় হবে। গ্রামের মেয়েরা হাই কমোড ব্যবহার করতে জানে না। তদারকির অভাবে এগুলো নষ্ট হচ্ছে। এই বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.