বাংলাদেশ নারী ফুটবলের তিন যোদ্ধা

এ বছরে হংকংয়ে জকি কাপ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল দল। বছর চারেক ধরে সফলতা দেখিয়ে যাচ্ছেন মারিয়া, কৃষ্ণা, সানজিদা, মৌসুমী, মনিকা, আঁখি, তহুরার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে এ মাসেই ভুটান যাচ্ছেন ওরা। এই দলটির সিংহভাগে রয়েছেন তিন কিশোরী ফুটবলার মারিয়া মান্দা, মনিকা চাকমা ও আঁখি খাতুন। কিশোরী ফুটবলারদের এই তিন সেনানিকে নিয়ে লিখেছেন ওমর ফারুক রুবেল। আলোকচিত্রী শরিফ মাহমুদ

প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর ডেস্ক   

সংগ্রামী মেয়ে মারিয়া মান্দা

বুঝে ওঠার আগেই হারিয়েছেন বাবা বীরেন্দ্র মারাককে। সমাজের আর দশটা মেয়ের মতোই পুতুল খেলে কেটেছে তার শৈশব। সমবয়সীদের সঙ্গে ইট-পাথরের সুরকিতে রান্না-বান্না। এসব খেলার সময়টা পার করেছেন অনেক আগেই। এরপর একা একা ফুটবল খেলেন। খালি পায়ে ফুটবল খেলতে খেলতে মারিয়া মান্দা চলে আসেন বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টে। ২০১১ সালে ফুটবলে হাতেখড়ি হয় মারিয়া মান্দার। ২০১৩ সালে ধোবাউড়ার বিখ্যাত কলসিন্দুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম চ্যাম্পিয়ন হওয়া দলের সদস্য তিনি। তারপরেই তার পায়ে ওঠে বুট। আর বদলাতে থাকে মারিয়া মান্দার পৃথিবী। এখন বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়ক মারিয়া মান্দা। যার নেতৃত্বে ভারতকে হারিয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ।

জীবনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে এই পর্যায়ে এসেছেন মারিয়া মান্দা। ময়মনসিংহের কলসিন্দুর থেকে যখন প্রথম চ্যাম্পিয়ন হন তখন তিনি মায়ের সঙ্গে মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করতেন। কারণ পিতৃহীন সংসারে মাকে মানুষের বাড়িতে গৃহপরিচারিকার কাজ করে সংসার চালাতে হতো। মাকে সহযোগিতা করতেন মারিয়া। ছেলেবেলায় বাবাকে হারানোয় বাবার আদর কি তা কখনও বুঝতে পারেননি মারিয়া। আর স্বামীকে হারিয়ে অথৈ সমুদ্রে পড়েন তার মা এনাতো মান্দা। সহায়-সম্বল কিছু নেই। কিন্তু ছেলেমেয়েদের মুখে তো খাবার তুলে দিতে হবে। ছেলেমেয়েদের মানুষ করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপরিচারিকার কাজ নেন।

এ প্রসঙ্গে মারিয়া মান্দা বলেন, আমাদের তিন বোন, একমাত্র ভাইকে মানুষ করতে কী অমানুষিক কষ্ট-ই না করেছেন আমার মা। মায়ের উপার্জনে সংসার চালানো কঠিন বলে বড় বোন পাপিয়া মান্দাও একই কাজ শুরু করেন। এখনও অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন আমার মা। তবে মায়ের কষ্ট সার্থক হয়েছে। ২০১৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৪ জাতীয় দলে ডাক পড়ে আমার। তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে আমার সহ-অধিনায়কত্বেই চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই পর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন দলের সহ-অধিনায়কও ছিলাম আমি। এরপর জায়গা হয় মূল জাতীয় দলে। শিলিগুড়িতে অনুষ্ঠিত সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা রানার্স আপ হই। অনূর্ধ্ব-১৫ সাফে আমাকে অধিনায়কত্বের দায়িত্ব দেয়া হয়।

এরপরের গল্পটা পুরো বাংলাদেশ জানে। মারিয়ার হাত ধরে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলে সাম্রাজ্য গেড়ে বসা ভারতকে একই টুর্নামেন্টে হারায় দুই-দু’বার। একবার গ্রুপ পর্বে। আরেকবার ফাইনালে।

মাঠে অধিনায়ক মারিয়ার খেলার ধরনটা পুরোদস্তুর মিডফিল্ডারের মতো। তাকে কিছুটা মেলানো যায় স্পেন ও বার্সেলোনার মিডফিল্ডার সার্জিও বুসকেটসের সঙ্গে। পা থেকে বল কেড়ে নিতে হবে, সেখানে মারিয়া। আবার মাঝ মাঠে বল দখলে রাখতে হবে, সেখানেও আছেন মারিয়া। বল পায়ে নাও, প্রয়োজন হলে হোল্ড কর, সুযোগ হলে দ্রুত উইংয়ে ভালো একটি পাস দাও। এক কথায় সাধারণ ফুটবল। কিন্তু ক’জনই-বা পারে এভাবে খেলতে? মারিয়া মান্দা এত সহজভাবে দারুণ খেলতে পারেন বলেই তাকে অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশ মহিলা দলের কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন।

খেলতে গিয়ে সমাজের নানা বাধার মুখেও পড়েছিলেন মারিয়া। মারিয়ার মতে, যখন খেলাধুলা শুরু করি, তখন গ্রামের মানুষ বলত মেয়ে মানুষরা তো ফুটবল খেলে না, ছেলেরা ফুটবল খেলে। তখন আমরা বলতাম, শুধু ছেলেরাই পারে না মেয়েরাও পারে। সেভাবে আমরা খেলাধুলা করছি। যখন ভালো রেজাল্ট করতে পারছি, তখন সবাই বুঝতে পারছে যে মেয়েরা সবকিছু পারে। আমার বোনরা বলছিল, তোমার পড়াশোনা নষ্ট হবে। তোমার পড়াশোনার সমস্যা হবে। আমি বলেছিলাম, আমি খেলাধুলাও করব। এখন সাফল্য আসায় সবাই আমাকে সমর্থন করেন। অথচ এই আমাকেই প্রথম প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলতে হয়েছিল খালি পায়ে। বুট কেনার সামর্থ্য ছিল না আমার। ওই ম্যাচেই ফুটবলের প্রেমে পড়ে যাই। সামর্থ্যরে সবটুকু দিয়ে নিজেকে প্রমাণের চেষ্টা করি। তারপরই স্থানীয় কোচ এবং বাফুফের সংশ্লিষ্টদের নজরে পড়ি।

মারিয়া সম্পর্কে কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটন বলেন, মারিয়া সিনিয়র ও বয়সভিত্তিক সব দলেরই গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। পায়ে বল রাখার ক্ষমতা ভালো তার। যে কোনো পরিস্থিতিতেই ভালো পাস দিতে পারে। মাঠের বাইরেও দারুণ ঠাণ্ডা মেজাজের, কোনো ঝামেলা নেই তার মধ্যে।

ড্রিবলিংয়ে সেরা মনিকা

অন্যদের মতো মনিকা চাকমার মা’ও চাইতেন মেয়ে সংসারের কাজ করুক। কিন্তু ইচ্ছা শক্তি আর চেষ্টা মনিকাকে নিয়ে এসেছে ফুটবলে। বাবা বিন্দু কুমার কৃষিকাজ করেন। মা রবি মালা গৃহিণী। পরিবারের পাঁচ বোনের মধ্যে সবার ছোট মনিকা চাকমা। অন্য মেয়েদের মতো বাবা-মাও চেয়েছেন তাদের মেয়ে সাংসারিক কাজ করবে। কিন্তু মনিকার মন ছুটে যেত ফুটবল খেলায়। তাই বাবার বকুনি কিংবা মায়ের শাসন- কোনো কিছুই ওকে ঘরে আটকে রাখতে পারেনি। ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই লুকিয়ে ফুটবল খেলতেন মনিকা। মনিকা একজন দক্ষ ফুটবলার এটি দৃষ্টি এড়ায় না তার স্কুলের শিক্ষক বীর সেনের। তার অনুপ্রেরণাতেই মনিকা এখন সবুজ গালিচায় আলো ছড়াচ্ছেন। মনিকার জন্ম খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীচরে। ১৫ বছরেই তিনি বাংলাদেশের নারী ফুটবলের সেরা তারকা। বল নিয়ে তার দু’পায়ের কারুকাজে মোহিত সবাই। তার আছে ড্রিবলিং করার অসাধারণ ক্ষমতা। দুটি ম্যাচে হয়েছেন ম্যাচ সেরা।

রাঙামাটির ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষার্থী মনিকা। ফুটবলে তার উত্থান ২০১১ সালে বঙ্গমাতা কাপ দিয়ে। প্রথমে ময়মনসিংহের হয়ে বঙ্গমাতায় খেলেছিলেন। এরপর রাঙামাটিতে নিজেদের স্কুলের হয়ে খেলেন মনিকা। ২০১৩ সালে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টের ফাইনালে উঠলেও ময়মনসিংহের কাছে হেরে যায় মনিকার স্কুল। তবে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্টই বদলে দেয় পাহাড়ি মেয়েটির জীবনের গল্প।

প্রিয় খেলোয়াড়দের সম্পর্কে মনিকা বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাবিনা খাতুন আমার প্রিয় ফুটবলার। ইউটিউব ও টিভিতে মেসি, নেইমার, রোনালদো, মার্সেলোদের খেলা দেখে ড্রিবলিং শিখেছি। মাঠে আমি আমার স্বাভাবিক খেলাটাই খেলে থাকি। আর খেলতে খেলতে বুঝতে পারি না কতটা ভালো খেলছি। গোল করার সময় খুব উত্তেজনা আসে। আমি বল নিয়ে ঢুকছি আর ওদের যে বিট করতেছি আমার মনে হয় না ওরা আমার আশপাশে আছে।

তাঁতিপাড়ার গুণী মেয়ে আঁখি

দীর্ঘদেহী, গায়ের রং শ্যামলা কালো। তাই অনেকেই তাকে কৃষ্ণকলি বলে থাকেন। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে ‘কায়সার হামিদ’ খ্যাতি কুড়িয়েছেন আঁখি খাতুন। জিতেছেন জয়া আলোকিত নারী-২০১৮ সম্মাননাও।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পাটখোলা গ্রামের তাঁতিপাড়ার মেয়ে আঁখি। বাবা আক্তার হোসেন ও মা নাসিমা বেগম তাঁত বুনেন। খেলার মাঠে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতার এই ডিফেন্ডারকে অনেক দূর থেকেও চেনা যায়। রক্ষণভাগে খেললেও গোল করতে খুবই দক্ষ বিকেএসপি’র দশম শ্রেণীর এই ছাত্রী। উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে আঁখির ‘হেড ওয়ার্ক’ চমৎকার। খেলার স্টাইল অনেকটাই যেন সাবেক তারকা ডিফেন্ডার কায়সার হামিদের মতো। লম্বা পায়ে ট্যাকলগুলো হয় নিখুঁত, পজিশন জ্ঞান প্রখর। সবচেয়ে ভালো গুণ, নিচ থেকে দুই উইংয়ে মাপা এরিয়াল পাস দিয়ে আক্রমণ তৈরি করতে পারেন। সবকিছু মিলিয়ে আঁখি হয়ে উঠেছেন ফুটবল মাঠে রক্ষণভাগের এক দক্ষ সেনানি।

২০১৪ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর ইব্রাহিম বালিকা বিদ্যালয় থেকে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলেন আঁখি। এরপর ভর্তি হন বিকেএসপিতে। ২০১৫ সালে তাজিকিস্তানে অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১৪ আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ দলে সুযোগ পান। এরপর আঁখি হয়ে ওঠেন ফুটবল তারকা। এখন বাংলাদেশ দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ফুটবলার।

অথচ এই আঁখির ফুটবলার হওয়ার কথা ছিল না। দুই ভাই- বোনের মধ্যে ছোট আঁখি। পড়াশোনার পাশাপাশি বাবা আক্তার হোসেনকে তাঁত বোনার কাজে সহযোগিতা করতেন তিনি। সকালে ঘুম থেকে উঠে বই নিয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে রাজশাহীর শাহজাদপুর ইব্রাহিম মেমোরিয়াল স্কুলে যেতেন আঁখি। বিকালে বাবার তাঁতের কাজে সহায়তা করতেন। কিন্তু আঁখির উচ্চতা দেখে তাকে ফুটবলের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন শিক্ষক মনসুর রহমান। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় মনসুরের কথায় রাজি হন আঁখি। সেই থেকে শুরু তার ফুটবলে আসা। স্কুলের হয়ে একবার বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্টে খেলেছেন। কিন্তু বিভাগীয় পর্যায়ের বেশি দূর এগুতে পারেননি তিনি। তবে দমে যাননি আঁখি। নিজের কারিশমা দেখিয়ে খেলা চালিয়ে গেছেন। একসময় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) প্রতিভা অন্বেষণে কোচদের নজর কাড়েন। সেই থেকে বিকেএসপি’র ছাত্রী জাতীয় দলের এই ডিফেন্ডার। এখন তো জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার। তবে রক্ষণভাগের খেলোয়াড় হওয়া সত্ত্বেও দু’গোল করে এখন তিনি ‘মহিলা দলের কায়সার হামিদ’ খ্যাতি পেয়েছেন।

আঁখির খেলা সম্পর্কে কোচ গোলাম রব্বানী ছোটন বলেন, আঁখি মেয়েদের দলের কায়সার হামিদ। তার উচ্চতা প্রায় পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি। আমাদের গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী। তবে মাঠে আঁখির ভূমিকা ইতালির সাবেক অধিনায়ক পাওলো মালদিনির মতো। ওকে আমি দলে তাই ভাবি।’

নিজেকে একজন ফুটবলার হিসেবে তৈরি করা প্রসঙ্গে আঁখি বলেন, আমি টেলিভিশনে বিদেশি ফুটবল খেলা দেখে দেখে ড্রিবলিং, ব্যাকহিলের অনুশীলন করি। এভাবে খেলতে আমার ভালো লাগে।

অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা ফুটবলারদের অর্জন

২০১৫ সালে নেপালে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ রিজিওনাল চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়

২০১৬ সালে তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ চ্যাম্পিয়ন

২০১৬ সালে ঢাকায় এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাই পর্বে চ্যাম্পিয়ন

২০১৭ সালে থাইল্যান্ডে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফাইনাল রাউন্ডে খেলছে

২০১৭ সালে ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন

২০১৮ সালে হংকংয়ে জকি কাপ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন।